প্রবন্ধ
বাউল সাধনার মূলে ধর্মদ্রোহীতা! বাউল মতবাদ। পর্ব—৪৮
৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
১১২৫
০
বাউলরা যদিও বিভিন্ন ধর্মচর্চা করার কথা বলে থাকে, কিন্তু বাস্তবতা হলো—তারা ধর্মদ্রোহী। এই সমাজ থেকে ধর্ম উঠিয়ে দেয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। দেখুন, ফকির লালনের কয়েকটা গান—যা নিন্মে তুলে ধরলাম ধরা হলো—
এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে,
যেদিন হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে,
ধর্ম-কুল গোত্র জাতির, তুলবে নাগো কেহ জিকির,
কেঁদে বলে লালন ফকির কে মোরে দেখায়ে দেবে। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ১১৩)
সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন,
লালন বলে আমার আমি
না জানি সন্ধান। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৫০)
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কি রূপ
দেখলাম না এই নজরে, জগৎ জুড়ে জাতের কথা
লোকে গল্প করে যথাতথা, লালন বলে জাতের ফাতা
ডুবিয়েছি সাধ বাজারে। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ২৬)
এসব দেখি কানার হাট-বাজার, বেদ-বিধির পর শাস্ত্র কানা, আর এক কানা মন আমার। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ৩০)
লালনের এসব গানের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তার অনুসারীরা লিখেছে—
ফকির লালন শাহ আজীবন স্বপ্ন দেখতেন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জাতহীন-ধনি-গরীব বিরোধী এক মানবিক সমাজের। যে সমাজে মানুষই সব; মানুষের মানবিকমূল্যবোধই সমাজের সহায়ক। যে সমাজে শুধু প্রেম থাকবে, ভালোবাসা থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, জাত-পাত-গোত্রের কোনোই বৈষম্য থাকবে না। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ১১০(
আসলে চরম সত্যিটা এই যে, প্রচলিত ধর্ম-শাস্ত্র-প্রথা-কুসংস্কার, জাত-পাত- গোত্র-বর্ণ-সম্প্রদায় ও তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ফকির লালন শাহ একান্তে, বিশ্বাসে ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। যেহেতু বিশ্বস্রষ্টা একজন, সেহেতু পৃথিবীর সকল শ্রেণির মানুষই তার সৃষ্টি এবং সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাহলে মানুষে মানুষে কেন এত ভেদাভেদ, কেন এত পার্থক্য, কেন এত বৈষম্য। ধর্মের পরিচয়ে না, আমরা শুধু মানুষ এই পরিচয়ে আমাদের পরিচয় হবে এবং সকলে মিলে মানব সমাজের বাসিন্দা হবো-এই ছিলো পালনের চাওয়া-পাওয়া। ধর্ম নয়, মানুষ বড়, মানুষ শ্রেষ্ঠ- এই নীতি এই ধারার অন্যতম দিক। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ২৮)
অধার্মিকতা বা ধর্ম নিরপেক্ষতাই মানবের বন্ধনমুক্তির একক উপায়—এটাই লালনদর্শনের মূল প্রতিপাদ্য। যাঁরা অধার্মিক তাঁরা 'লা শেরেক' এবং পরিপূর্ণ ধর্মশূন্য বা ধর্ম নিরপেক্ষ। They Know THE NOT। কেবল তাঁদের শিক্ষাকে (The School of Great No) গ্রহণ করতে পারলেই মানব সমাজের সত্যিকার কল্যাণসাধন আশা করা যায়। আদিতেও এর কোনো বিকল্প ছিল না। আজও নেই এবং অনাগতকালেও থাকবে না। এ মহাসত্যই লালনদর্শনের সারবস্তু। —(লালনদর্শন, পৃ. ১০৪)
তাকে (লালন) নির্দিষ্ট কোনো ধর্মে, গোত্রে, জাতে, সম্প্রদায়ে, কালে, পরিবারে একেবারে আবদ্ধ করা যায় না। মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে লালনের বিশ্বচরাচরে বিচরণ। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ২৫-২৬)
বিভিন্ন মতবাদের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাউল মত। হিন্দু-মুসলমানের মিলনে হয়েছে বাউল সম্প্রদায়, তাই পরমত সহিষ্ণুতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গ্রহণশীলতা, বোধের বিচিত্রতা, মনের ব্যাপকতা ও উদার সদাশয়তা এদের বৈশিষ্ট্য। —(বাউল সাধনা, পৃ. ৩০)
শুধু তাই নয়, বরং ধর্ম বিদ্বেষ তাদের প্রতিটা শিরায় শিরায় বহমান। দেখুন, বাউল সম্রাট লালন ফকির লিখেছে—
জাত না গেলে পাইনে হরি
কী ছার জাতের গৌরব করি
ছুঁসলে বলিয়ে
লালন কয় জাত (ধর্ম) হাতে পেলে,
পুড়াতাম আগুন দিয়ে। —(মহাত্মা লালন, পৃ. ১১৮)
উপরিউক্ত বক্তব্যসমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়—বাউলদের নিজস্ব কোনো স্বীকৃত ধর্মীয় ভিত্তি নেই; বরং তারা চরম পর্যায়ের ধর্মবিদ্বেষী চিন্তাধারার অনুসারী। ধর্মীয় মোড়ক ব্যবহার করে ধর্মবিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়াই তাদের মূল মিশন। এ কারণেই সকল সেক্যুলার ও ধর্মদ্রোহী নাস্তিক মহল—যেমন আহমেদ শরীফ, ফরহাদ মাজহার প্রমুখ—তাদেরকে প্রকাশ্য ও পূর্ণ সমর্থন দিয়ে থাকে।
ইসলাম কী বলে?
এই আখেরী যুগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা সবার ওপর ফরজ। শুধু তাই নয়, বরং পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলাম গ্রহণ করাও ফরজ। মহান আল্লাহ বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
“হে মুমিনগণ, ইসলামে সম্পূর্ণরূপে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” —(সুরা বাকারা : ২০৮)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
“হে মুমিনগণ, অন্তরে আল্লাহকে সেইভাবে ভয় করো, যেভাবে তাকে ভয় করা উচিত। (সাবধান! অন্য কোনও অবস্থায় যেন) তোমাদের মৃত্যু (না আসে, বরং) এই অবস্থায়ই যেন আসে যে, তোমরা মুসলিম।” —(সুরা আলে ইমরান : ১০২)
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا ۖ وَكَذَٰلِكَ الْيَوْمَ تُنسَىٰ
“আর যে আমার উপদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে বড় সংকটময়। আর কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ করে উঠাবো। সে বলবে—হে রব্ব, তুমি আমাকে অন্ধ করে উঠালে কেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম! আল্লাহ বলবেন, এভাবেই তােমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিলো, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে। আজ সেভাবেই তােমাকে ভুলে যাওয়া হবে।” —(সুরা ত্ব-হা : ১২৪-১২৬)
وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ ۖ وَسَاءَتْ مَصِيرًا
“আর যে ব্যক্তি তার সামনে হিদায়াত স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করবে ও মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য কোনও পথ অনুসরণ করবে, আমি তাকে সেই পথেই ছেড়ে দেব, যা সে অবলম্বন করেছে। আর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব, যা অতি মন্দ ঠিকানা।” —(সুরা নিসা : ১১৫)
وَمَنْ يَرْتَدِدْ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَيَمُتْ وَهُوَ كَافِرٌ فَأُولَئِكَ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
“যদি তোমাদের মধ্যে কেউ নিজ দীন পরিত্যাগ করে, তারপর কাফির অবস্থায় মারা যায়, তবে এরূপ লোকের কর্ম দুনিয়া ও আখিরাতে বৃথা যাবে। তারাই জাহান্নামী। তারা সেখানেই সর্বদা থাকবে।” —(সুরা বাকারা : ২১৭)
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“যে ব্যক্তিই ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন অবলম্বন করতে চাবে, তার থেকে সে দীন কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে মহা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” —(সুরা আলে ইমরান : ৮৫)
إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ ۗ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ ۗ وَمَن يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট (গ্রহণযোগ্য) দীন কেবল ইসলামই। যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিলো, তারা তাদের কাছে জ্ঞান আসার পর কেবল পারস্পরিক বিদ্বেষবশত ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছে। আর যে-কেউ আল্লাহর আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করবে (তার স্মরণ রাখা উচিত যে,) আল্লাহ অতি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।” —(সুরা আলে ইমরান : ১৯)
সুতরাং, ধর্মবিদ্বেষী বাউল মতবাদ থেকে আমাদের ঈমানকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ধর্মবিদ্বেষী শাহবাগী ও বাউলদের মধ্যে এক বিরাট মিল লক্ষ্য করা যায়—উভয়ে নোংড়া চিন্তাধারা ও অশুদ্ধ পথকে পছন্দ করে।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
মৃত্যুর পর বরযখ, কেয়ামত ও আখেরাত
এ কথা সবাই জানে ও মানে, যে ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করেছে তাকে মৃত্যু বরণ করতেই হবে। কিন্তু মৃত্যুর পর কী ...
তাওহীদের ক্ষেত্রে প্রান্তিকতাঃ দু’টি উদাহরণ
...
ঝাড়ফুঁক-তাবীয : একটি দালীলিক বিশ্লেষণ (৩য় পর্ব)
...
তাহাফফুযে খতমে নবুওত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونؤمن به ونتوكل عليه،ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا،...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন