প্রবন্ধ
আত্মশুদ্ধি কেন জরুরি?
৪ আগস্ট, ২০২৬
০
০
রকমারি তাদের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ শিরোনামে একটি বিশেষ আলোচনা ও পডকাস্ট সিরিজ পরিচালনা করে। এ আয়োজনে সমসাময়িক সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ইসলামি জীবনধারার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয় এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কার্যকর সমাধান উপস্থাপন করা হয়।
এই সাক্ষাৎকারটি উক্ত সিরিজ থেকে ট্রান্সক্রিপ্ট করা হয়েছে। শায়খ উমায়ের কোব্বাদী থেকে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন রকমারি ইসলামি বুকস-এর সিনিয়র ব্র্যান্ড এক্সিকিউটিভ, মাওলানা নুরুল্লাহ মারুফ।
শায়খ, আমি প্রথমেই জানতে চাই—আত্মশুদ্ধি আসলে কী? ‘ইসলাহুন নাফস’ বা আত্মশুদ্ধি বলতে কী বোঝায়?
উত্তর : ইসলাহুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি বলতে নিজের নফস (আত্মা) ও অন্তরকে পরিশুদ্ধ করাকে বোঝায়। শব্দটির মধ্যেই এর অর্থ নিহিত রয়েছে।
মানুষের অন্তরে নানা ধরনের রোগ বাসা বাঁধে, অথচ আমরা অনেক সময় তা অনুভবই করি না। যেমন আমাদের শরীরের রোগ হয় এবং আমরা তার চিকিৎসা করি, তেমনি অন্তরেরও রোগ রয়েছে। সেই অন্তরের রোগের চিকিৎসা গ্রহণ করাই হলো আত্মশুদ্ধি।
অন্তরের রোগ কী? অন্তরের রোগ বলতে বোঝায়—অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ ইত্যাদি। পৃথিবীতে যত অন্যায়, যত অপরাধ সংঘটিত হয়—তা ছোট হোক বা বড়—তার মূল চালিকাশক্তি হলো এই অন্তরের রোগ।
ইবনুল কাইয়্যমি আল-জাওযিয়্যাহ রহ. একটি প্রসিদ্ধ কথা উল্লেখ করেছেন যে, أُصُولُ الْخَطَايَا كُلِّهَا ثَلَاثَةٌ অধিকাংশ গুনাহের মূল কারণ তিনটি—অহংকার, হিংসা, লোভ। [ফাওয়ায়িদ : ১০৬]
আমরা লক্ষ্য করলে দেখব, প্রায় প্রতিটি অপরাধের পেছনে এই তিনটির অন্তত একটি কার্যকর থাকে। এগুলোই হলো অন্তরের রোগ।
আর আত্মশুদ্ধি হলো—এসব রোগ দূর করে অন্তরে আল্লাহভীতি (তাকওয়া), আল্লাহর ভালোবাসা, আখিরাতের চিন্তা, শোকর, সবর এবং অন্যান্য উত্তম গুণাবলি প্রতিষ্ঠা করা। একজন প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য যে গুণগুলো অপরিহার্য, সেগুলো নিজের চরিত্রে ধারণ করাই হলো ইসলাহুন নাফস বা আত্মশুদ্ধি।
একজন মুসলিমের জন্য আত্মশুদ্ধি কতটা জরুরি?
উত্তর : যদি একজন মুসলিম জান্নাত লাভ করতে চান এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চান, তাহলে আত্মশুদ্ধি তার জন্য অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা সূরা আশ-শামসে বলেন
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا. وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا
অবশ্যই সে-ই সফল, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে-ই ব্যর্থ, যে তাকে কলুষিত করেছে। [সূরা আশ-শামস : ৯-১০]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন
يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ . إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ
যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; উপকারে আসবে শুধু সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর কাছে নির্মল অন্তর নিয়ে উপস্থিত হবে। [সূরা আশ-শু‘আরা : ৮৮-৮৯]
রাসূলুল্লাহ ﷺ-ও অন্তরকে শুদ্ধ করার গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন
أَلَا وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً، إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ الْقَلْبُ
জেনে রাখো, শরীরে একটি গোশতের টুকরা আছে। তা যদি সঠিক হয়, তবে সমগ্র শরীরই সঠিক হয়। আর তা যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে সমগ্র শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখো, সেটি হলো অন্তর। [সহীহ বুখারী : ৫২]
অন্তর পরিষ্কার না থাকলে কী হয়? অন্তর নষ্ট হয়ে গেলে তার প্রভাব মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর পড়ে। তখন চোখ, কান, জিহ্বা, হাত-পা—সবকিছু দিয়েই গুনাহ প্রকাশ পেতে থাকে।
গুনাহের পরিণতি হলো জাহান্নাম। গুনাহ যেন আগুনের মতো। যেমন একটি দেশলাই কাঠির মধ্যে আগুন লুকিয়ে থাকে, কিন্তু ঘষা না দিলে তা প্রকাশ পায় না; তেমনি গুনাহের ভয়াবহ বাস্তবতা দুনিয়ায় পুরোপুরি অনুভব করা না গেলেও আখিরাতে তা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তখন বোঝা যাবে, প্রতিটি গুনাহ আসলে জাহান্নামের আগুনেরই দিকে নিয়ে যায়।
তাই নবীজি ﷺ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন—অন্তরকে ঠিক করতে হবে। কারণ, অন্তর ঠিক হলে আমলও ঠিক হবে, আর অন্তর নষ্ট হলে মানুষের আমলও নষ্ট হয়ে যাবে।
সুতরাং, জাহান্নাম থেকে বাঁচতে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হলে আত্মশুদ্ধি ও অন্তরের পরিশুদ্ধি অপরিহার্য।
অন্তর পরিষ্কার না থাকলে কি ইবাদত কবুল হবে?
উত্তর : আমরা নামায, রোজা, হজ, যাকাতসহ বিভিন্ন ইবাদত আদায় করি। এসব ইবাদত সঠিকভাবে আদায় করার ব্যাপারে আমরা খুবই সচেতন থাকি। আমরা চিন্তা করি—আমার নামায ঠিক হলো কি না, রোজা সহিহ হলো কি না। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নামায যেমন জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম, তেমনি জান্নাত লাভের জন্য অন্তরের পরিশুদ্ধিও অপরিহার্য। অথচ আমরা বাহ্যিক আমলের প্রতি যতটা যত্নশীল, অন্তরের শুদ্ধতার ব্যাপারে ততটা সচেতন নই।
তাহলে প্রশ্ন হলো—যদি অন্তর পরিশুদ্ধ না হয়, কিন্তু নামায-রোজা বাহ্যিকভাবে ঠিকঠাক হয়, তাহলে কি সেই ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে?
উত্তর : প্রতিটি ইবাদতের দুটি দিক রয়েছে।
প্রথমত, ইবাদতটি শরিয়তের দৃষ্টিতে সহিহ (শুদ্ধ) হওয়া। প্রত্যেক ইবাদতের কিছু ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাহ ও মুস্তাহাব রয়েছে। এগুলো যথাযথভাবে আদায় করা হলে ইবাদতটি সহিহ বা শুদ্ধ হয়। যত বেশি সুন্নাহ ও মুস্তাহাবের অনুসরণ করা হবে, ইবাদত তত বেশি পরিপূর্ণ হবে।
দ্বিতীয়ত, ইবাদতটি আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্য (কবুল) হওয়া। ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য শুধু বাহ্যিক শুদ্ধতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অন্তরের শুদ্ধতা, ইখলাস (একনিষ্ঠতা) এবং তাকওয়া।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
إِنَّ اللَّهَ لَا يَنْظُرُ إِلَى صُوَرِكُمْ وَأَمْوَالِكُمْ، وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ وَأَعْمَالِكُمْ
নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান। [সহীহ মুসলিম : ২৫৬৪]
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা দেখেন মানুষের অন্তর কতটা পরিশুদ্ধ, কতটা বিনয়ী এবং ইবাদত কতটা একনিষ্ঠভাবে শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়েছে। এটিই হলো ‘ইখলাস’।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন
إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
আল্লাহ তো কেবল মুত্তাকীদের থেকেই (আমল) গ্রহণ করেন। [সূরা আল-মায়িদাহ : ২৭]
তাকওয়া হলো অন্তরের একটি গুণ, আর এটিই আত্মশুদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, কোনো ইবাদত শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সহিহ হতে পারে; অর্থাৎ ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহ যথাযথভাবে আদায় হয়েছে। কিন্তু সেই ইবাদত আল্লাহর কাছে তখনই কবুল হবে, যখন ইবাদতকারীর অন্তর পরিশুদ্ধ হবে এবং সে ইখলাস ও তাকওয়ার সঙ্গে ইবাদত করবে।
ইবনুল জাওযী রহ. এ বিষয়ে বলেন, নামায, রোজা, হজ কিংবা যাকাত—যে ইবাদতই হোক না কেন, আত্মশুদ্ধি ও অন্তরের পরিশুদ্ধি ছাড়া তা আল্লাহর কাছে প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য হয় না।
তিনি আরও বলেন, এমন অনেক ইবাদতকারী আছেন যারা নামায, রোজা, হজ ও যাকাতের বাহ্যিক বিধান পালনে অত্যন্ত যত্নবান; কিন্তু নিজেদের অন্তরের সংশোধনের ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব দেন না। ফলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাদের ইবাদত সহিহ হতে পারে। কোনো মুফতি বলবেন না যে তাদের নামায বা রোজা আদায়ই হয়নি। কিন্তু আল্লাহর কাছে সেই ইবাদত কবুল হবে কি না—সেটি নির্ভর করে অন্তরের শুদ্ধতা, তাকওয়া ও ইখলাসের ওপর। [ইবনুল জাওযী, আত-তাবসিরাহ : ২/২০৮]
কবুল না হলে ইবাদতের ফল কী?
উত্তর : যদি কোনো ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে আখিরাতে তার প্রকৃত প্রতিদান পাওয়া যাবে না।
হাদিসে এসেছে,
فَتُلَفُّ كَمَا يُلَفُّ الثَّوْبُ الْخَلَقُ، فَيُضْرَبُ بِهَا وَجْهُهُ
কিছু মানুষের নামায এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করা হবে, যেন ময়লা কাপড় মানুষের মুখের দিকে ছুড়ে মারা হয়। [জামেউস সগীর : ৫০৪৫]
আবার আমরা সেই প্রসিদ্ধ হাদিসও জানি, যেখানে কিয়ামতের দিন একজন ক্বারি, একজন শহীদ (মুজাহিদ) এবং একজন দানশীল ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলার সামনে উপস্থিত করা হবে। তারা দাবি করবে যে, তারা আল্লাহর জন্য এসব আমল করেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দেবেন—তোমরা এসব কাজ আমার সন্তুষ্টির জন্য করোনি; বরং মানুষের প্রশংসা, খ্যাতি ও সম্মান লাভের জন্য করেছিলে। দুনিয়াতেই তোমরা সেই প্রশংসা পেয়ে গেছ। অতএব, আজ আমার কাছে তোমাদের জন্য কোনো প্রতিদান নেই। [সহীহ মুসলিম : ১৯০৫]
এ থেকেই বোঝা যায়, ইবাদতের বাহ্যিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতা, তাকওয়া ও ইখলাসই আল্লাহর কাছে আমল কবুল হওয়ার মূল ভিত্তি।
আমরা তো জানি ইখলাস (একনিষ্ঠতা) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাহলে ইখলাস ও আত্মশুদ্ধি—দুটো কি একই জিনিস?
উত্তর : আত্মশুদ্ধি ও ইখলাস এক জিনিস নয়; তবে তারা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহ. শরীয়তকে সামগ্রিকভাবে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন—
১. ইলম (জ্ঞান)
২. আমল (কর্ম)
৩. ইখলাস (একনিষ্ঠতা)
সাধারণত শরীয়তের আলোচনা ইলম ও আমলকে কেন্দ্র করেই বেশি হয়। কিন্তু আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নফস) হলো শরীয়তেরই একটি অপরিহার্য অংশ এবং সহযোগী। একে শরীয়ত থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
শরীয়তের দুটি দিক রয়েছে—
আওয়ামির (الأوامر) : আল্লাহর আদেশসমূহ।
নাওয়াহি (النواهي) : আল্লাহর নিষেধসমূহ।
এই আদেশগুলো যথাযথভাবে পালন করা এবং নিষেধগুলো থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আমলকে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলাই হলো আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্য।
আর এ জন্য ইখলাস, তাকওয়া, আল্লাহর ভালোবাসা, শোকর ও সবর—এসব গুণ অপরিহার্য। এগুলো মানুষকে শরীয়তের পূর্ণতা অর্জনে সাহায্য করে।
অতএব, যার আত্মশুদ্ধি অর্জিত হবে, তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ইখলাস, তাকওয়া ও অন্যান্য উত্তম গুণাবলি বিকশিত হবে।
এটি অনেকটা সূর্য উদিত হওয়ার মতো। সূর্য উঠলে যেমন আলো আপনাআপনি ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি আত্মশুদ্ধি অর্জিত হলে মানুষের মধ্যে ইখলাস, তাকওয়া ও শরীয়তের পূর্ণ অনুসরণ স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশ পায়।
আপনি বললেন, পৃথিবীর অধিকাংশ অপরাধের মূল কারণ অন্তরের অশুদ্ধতা। কিন্তু অনেক মানুষ তো শরীয়তে বিশ্বাসই করে না। তাদের ক্ষেত্রে আত্মশুদ্ধির ভূমিকা কী?
উত্তর : সব অপরাধ এক ধরনের নয়। কুরআনের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো কুফর ও শিরক।
আল্লাহ তাআলা বলেন
إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ
নিশ্চয়ই শিরক হলো সবচেয়ে বড় জুলুম বা মহাঅন্যায়। [সূরা লুকমান : ১৩]
অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না। [সূরা আন-নিসা : ৪৮]
গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, কুফর ও শিরকের মূলেও রয়েছে অহংকার। অহংকার যদি বীজ হয়, তবে কুফর ও শিরক তার ফল। কারণ, যে ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে অস্বীকার করে, অথবা তাঁর সঙ্গে অন্যকে শরিক করে, সে মূলত আল্লাহর বিরুদ্ধেই অহংকার প্রদর্শন করে।
এজন্য কুরআনে মক্কার কাফিরদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন
إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ
তাদেরকে যখন বলা হতো, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, তখন তারা অহংকার করত। [সূরা আস-সাফফাত : ৩৫]
অর্থাৎ, অহংকারই তাদের ঈমান গ্রহণের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
অহংকারেরও কয়েকটি মূল বীজ রয়েছে, যেমন—জাহালাত (অজ্ঞতা), রিয়া (লোক দেখানো), উজব (আত্মতুষ্টি ও নিজের প্রতি অতিরিক্ত সন্তুষ্টি)।
যখন মানুষ প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করে এবং আল্লাহর সঠিক পরিচয় (মারিফাত) লাভ করে, তখন তার অন্তর পরিবর্তিত হয়। তার অপরাধপ্রবণতা কমে যায় এবং সে ঈমানের পথে অগ্রসর হয়।
আত্মশুদ্ধির পথে কোনো বাধা আছে কি?
উত্তর : হাসান আল-বাসরী রহ. বলেন, আত্মশুদ্ধির পথে প্রধান বাধা হলো ছয়টি ভুল মানসিকতা।
১. ‘পরে তওবা করব’—এই মানসিকতা
অনেকে মনে করে—পরে তওবা করব। শেষ বয়সে হজ করে নেব। পরে কোনো আলেমের সাহচর্যে গেলে ঠিক হয়ে যাব। পরে দাওয়াতের কাজে যুক্ত হব।
এভাবে সে তাওবাকে পিছিয়ে দেয় এবং আল্লাহর রহমতকে গুনাহ করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে। অথচ কে কখন মৃত্যুবরণ করবে, তা কেউ জানে না।
২. ইলম অর্জন করব, কিন্তু পরে আমল করব
কেউ কেউ জ্ঞান অর্জন করে, কিন্তু ভাবে—এখন শুধু শিখি, পরে একসময় আমল করব।
এই বিলম্বের মানসিকতা আত্মশুদ্ধির বড় বাধা।
৩. রিয়া বা লোক দেখানো
অনেকেই ইবাদত করে, কিন্তু উদ্দেশ্য হয় মানুষের প্রশংসা অর্জন করা। ইখলাস ছাড়া কোনো আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।
৪. আল্লাহর ফয়সালায় অসন্তুষ্ট থাকা
মানুষ ভাবে—আল্লাহ আমাকে এটা দিলেন না কেন? অমুককে এত দিলেন, আমাকে কম দিলেন কেন?
এ ধরনের অসন্তুষ্টি অন্তরকে কলুষিত করে।
৫. আখিরাতকে দূরে মনে করা
যে ব্যক্তি মৃত্যু ও আখিরাতের কথা ভুলে থাকে, সে সহজেই গুনাহে লিপ্ত হয়। মৃত্যুর বাস্তবতা হৃদয়ে জীবন্ত না থাকলে আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়া কঠিন।
৬. শোকরের অভাব
অনেকেই মনে করে—আমি আমার মেধা, দক্ষতা ও পরিশ্রমের জোরে সব অর্জন করেছি। সে আল্লাহর নেয়ামতকে নিজের অধিকার মনে করে; আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে দেখে না। ফলে তার অন্তর থেকে শোকর বিদায় নেয়।
এই ছয়টি মানসিকতাই মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। [ইকাযু উলিল হিমামিল আলিয়া : ১৩২]
শয়তান কীভাবে সূক্ষ্মভাবে গুনাহের ফাঁদে ফেলে?
উত্তর : শয়তানের ক্ষমতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। যদি কোনো মানুষ দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়—আমি এই গুনাহ করব না, তাহলে অসংখ্য শয়তান একত্র হলেও তাকে জোর করে সেই গুনাহে লিপ্ত করতে পারবে না।
ধরা যাক, একজন মানুষ একা একটি ঘরে রয়েছে। তার হাতে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট—সবকিছুই আছে। সে চাইলে মুহূর্তেই গুনাহে ডুবে যেতে পারে। কিন্তু যদি সে আল্লাহর ভয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় যে গুনাহ করবে না, তাহলে শয়তান তাকে বাধ্য করতে পারবে না।
শয়তানের কাজ কেবল কুমন্ত্রণা দেওয়া এবং গুনাহকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা। সে মানুষের ওপর গুনাহ চাপিয়ে দিতে পারে না।
কুরআনে শয়তান কিয়ামতের দিন বলবে
وَمَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُمْ مِنْ سُلْطَانٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي
তোমাদের ওপর আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না। আমি শুধু তোমাদের আহ্বান করেছিলাম, আর তোমরাই আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। [সূরা ইবরাহিম : ২২]
অর্থাৎ, শয়তান গুনাহকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে, কিন্তু গুনাহ করার সিদ্ধান্ত মানুষ নিজেই নেয়।
শয়তানকে একটি শোরুমের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সে গুনাহকে আকর্ষণীয়ভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করে। কিন্তু গুনাহের আসল উৎস হলো মানুষের নফস। মানুষ যদি নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণায় সাড়া না দেয়, তাহলে শয়তান তাকে কোনোভাবেই গুনাহে বাধ্য করতে পারে না।
শয়তান থেকে বাঁচার জন্য আপনি বললেন, একজন মানুষকে দৃঢ় সংকল্প করতে হবে—আমি এই গুনাহ করব না। কিন্তু অনেকেই চাইলেও এমন দৃঢ় মানসিকতা অর্জন করতে পারেন না। তাই তারা আত্মউন্নয়নের বই পড়েন, আলেমদের নসিহত শোনেন, বিভিন্নভাবে নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। তবুও সফল হতে পারেন না। তাহলে এই মানসিক দৃঢ়তা অর্জনের উপায় কী?
উত্তর : মানসিক দৃঢ়তা বা আত্মশুদ্ধি একদিনে অর্জিত হয় না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এই পথে মানুষ ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। কখনো সামনে এগিয়ে যায়, কখনো হোঁচট খায়, কখনো ভুল করে বা গুনাহে পতিত হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সেখানেই থেমে না থেকে আবার উঠে দাঁড়ানো, আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং নতুন উদ্যমে পথচলা শুরু করা। আত্মশুদ্ধির এই সংগ্রাম মানুষের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। কারণ, একজন মানুষ ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করবে কি না—তা নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তার আত্মশুদ্ধির সফর শেষ হয় না।
তাই একজন মুমিনের উচিত সারাজীবন নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং প্রতিটি হোঁচটের পর আবারও তাঁর দিকেই ফিরে আসা। এভাবেই ধৈর্য, তওবা ও অবিচল প্রচেষ্টার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।
অনেক মানুষ আছেন, যারা বিভিন্ন খুতবা, জুমার বয়ান, ওয়াজ-নসিহত বা ইসলামি বই পড়ে উপলব্ধি করেন যে, তাদের আত্মশুদ্ধি অর্জন করা দরকার। তারা প্র্যাকটিসিং মুসলিম হতে চান। কিন্তু নানা বাধা, প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বলতার কারণে তারা এগোতে পারেন না। তাদের জন্য আপনার এমন কোনো সহজ পরামর্শ আছে কি, যা আত্মশুদ্ধির পথে চলাকে সহজ করে দিতে পারে?
উত্তর : যেকোনো নেক কাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভালো চিন্তা আসার সঙ্গে সঙ্গে তা বাস্তবায়ন করে ফেলা।
যখন কোনো মানুষের অন্তরে এই চিন্তা জাগে—আমি নিজেকে সংশোধন করব, গুনাহ ছেড়ে দেব, আল্লাহর পথে ফিরে আসব—তখন সেই চিন্তাকে অবহেলা করা উচিত নয়। তাসাওউফ ও তাযকিয়ার পরিভাষায় অন্তরে উদিত এই নেক প্রেরণাকে وَارِدٌ (ওয়ারিদ) বলা হয়। অর্থাৎ, এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আগত একটি কল্যাণকর অনুপ্রেরণা।
যেমন শয়তান মানুষকে গুনাহের দিকে আহ্বান করে, তেমনি আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের মাধ্যমে মানুষের অন্তরে নেক আমলের আগ্রহ সৃষ্টি করেন। এখন যদি মানুষ শয়তানের কুমন্ত্রণায় সাড়া দেয়, তবে সে গুনাহের পথে অগ্রসর হয়। আর যদি আল্লাহর দেওয়া এই নেক প্রেরণাকে গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে আমল শুরু করে, তবে সে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যায়।
এখানে মূল শিক্ষা হলো—নেক কাজকে বিলম্ব না করা।
হাসান আল-বাসরী রহ.-এর আলোচনায়ও আমরা দেখি, আত্মশুদ্ধির পথে বড় বাধাগুলোর একটি হলো—পরে করব; এই মানসিকতা।
যখনই অন্তরে কোনো নেক ইচ্ছা জাগে, তখনই তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা উচিত। কারণ, ভালো কাজকে অযথা পিছিয়ে দেওয়া মানুষের বড় একটি দুর্বলতা।
উলামাদের মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ কথা রয়েছে التَّسْوِيفُ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ ভালো কাজকে কালক্ষেপণ করা (পরে করব বলে পিছিয়ে দেওয়া) শয়তানের কাজ।
অর্থাৎ, শয়তান চায় মানুষ নেক কাজের সিদ্ধান্ত নিলেও তা যেন সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবায়ন না করে। মানুষ যখন বলে, ‘আজ নয়, কাল থেকে’, ‘আরও কিছুদিন পরে’, ‘একটু সময় হলে শুরু করব’—তখন সে অজান্তেই শয়তানের একটি বড় কৌশলের শিকার হয়ে যায়।
তাই আত্মশুদ্ধির পথে চলতে চাইলে একটি নীতি মনে রাখা জরুরি—নেক কাজের ইচ্ছা জাগার সঙ্গে সঙ্গে তা শুরু করে দিন। কারণ, যে মানুষ ভালো কাজকে বিলম্বিত না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে প্রথম পদক্ষেপ নেয়, আল্লাহ তাআলা তার জন্য পরবর্তী পথও সহজ করে দেন।
আপনি আগে অন্তরের বিভিন্ন রোগের কথা বলেছেন—যেমন অহংকার, রিয়া, হিংসা, লোভ-লালসা ইত্যাদি। আমরা বিভিন্ন ওয়াজ-নসিহতে শুনি, এগুলো মানুষের অন্তরের সবচেয়ে বড় রোগ। কিন্তু একজন মানুষ কীভাবে বুঝবে যে তার নিজের মধ্যেও এসব রোগ আছে কি না?
উত্তর : এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। কারণ, কোনো রোগ নির্ণয় না করলে যেমন তার চিকিৎসা সম্ভব নয়, তেমনি অন্তরের রোগ চিহ্নিত না করলে আত্মশুদ্ধিও সম্ভব নয়।
অন্তরের রোগ নির্ণয়ের দুটি উপায় রয়েছে।
প্রথমত, কিছু রোগ আছে যা একজন মানুষ আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেই বুঝতে পারে। এসব রোগের চিকিৎসাও তুলনামূলক সহজ।
দ্বিতীয়ত, কিছু রোগ এত সূক্ষ্ম যে মানুষ নিজে তা বুঝতে পারে না। সেক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক বা পথপ্রদর্শকের প্রয়োজন হয়। এখানে শিক্ষক বলতে এমন একজন হক্কানি আলেম বা তাযকিয়া ও ইসলাহের মেহনত করেন—এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হচ্ছে। তাঁর সাহচর্যে গেলে তিনি মানুষের অন্তরের দুর্বলতাগুলো ধরিয়ে দিতে পারেন এবং সংশোধনের পথ দেখাতে পারেন।
কীভাবে বুঝবো আমার মধ্যে অহংকার আছে?
উত্তর : যদি অহংকারের কথা বলি, তাহলে রাসূলুল্লাহ ﷺ অহংকার চেনার মোটাদাগে দুটি স্পষ্ট আলামত আমাদের শিখিয়েছেন।
তিনি বলেছেন
الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ
অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা। [সহীহ মুসলিম : ১৪৭]
এই হাদিসে অহংকারের দুটি স্পষ্ট লক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছে—
১. সত্য গ্রহণ করতে না পারা।
পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কিংবা ব্যক্তিগত—যেকোনো বিষয়ে সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও যদি একজন মানুষ নিজের অহংকারের কারণে তা গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে বুঝতে হবে তার অন্তরে অহংকার রয়েছে।
২. মানুষকে তুচ্ছ বা হেয় মনে করা।
কোনো মানুষকে নিজের চেয়ে ছোট, তুচ্ছ বা মূল্যহীন মনে করা, অথবা তাকে অবজ্ঞার চোখে দেখা—এটিও অহংকারের সুস্পষ্ট আলামত। এটি বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। যেমন—আমি আলেম, সে আলেম নয়। আমি বেশি শিক্ষিত, সে কম শিক্ষিত। আমি ধনী, সে গরিব। আমার ব্যবসা সফল, তার নয়। আমি বেশি সুন্দর। আমার বয়স বা অভিজ্ঞতা বেশি, তাই আমি শ্রেষ্ঠ।
জ্ঞান, সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ, বয়স কিংবা অভিজ্ঞতার কারণে অন্যকে নিজের চেয়ে ছোট মনে করা অহংকারেরই প্রকাশ।
অতএব, একজন মানুষ যতই নিজেকে বিনয়ী বলে মনে করুক, যদি সে সত্য মেনে নিতে কষ্ট অনুভব করে বা অন্য মানুষকে হেয় করে দেখে, তাহলে তার উচিত নিজের অন্তরকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। কারণ, এগুলো অহংকারের সুস্পষ্ট লক্ষণ, আর অহংকার আত্মশুদ্ধির পথে অন্যতম বড় বাধা।
কীভাবে বুঝবো আমার মধ্যে হিংসা আছে?
উত্তর : ইবনুল কাইয়্যমি আল-জাওযিয়্যাহ রহ. এবং হাতিম আল-আসাম রহ.-সহ অনেক আলেম বলেছেন, অধিকাংশ গুনাহের মূল তিনটি—অহংকার, হিংসা ও লোভ। [শুয়াবুল ঈমান : ৬/২৬; ফাওয়ায়িদ : ১০৬]
অহংকারের লক্ষণ আলোচনা করার পর এবার হিংসার লক্ষণ বুঝতে হবে। হিংসার প্রধান আলামত হলো—অন্য কারও কোনো নেয়ামত, সফলতা বা প্রাপ্তি দেখে নিজের অন্তরে জ্বালা অনুভব করা এবং মনে মনে কামনা করা যে, তার কাছ থেকে সেই নেয়ামত চলে যাক।
তবে শুধু কারও নেয়ামত দেখে অন্তরে সাময়িক কষ্ট বা অস্বস্তি অনুভব হওয়াই পূর্ণাঙ্গ হিংসা নয়। যদি মানুষ সেই অনুভূতির বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং তা লালন না করে, তাহলে আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা করা যায়।
কিন্তু যখন সে মনে মনে কামনা করতে শুরু করে—তার কাছে এই নেয়ামত না থাকলেই ভালো হতো, সে এটা হারিয়ে ফেলুক—তখন সেটিই প্রকৃত হিংসা।
আর যদি সে শুধু মনে মনে কামনা করেই থেমে না থাকে; বরং সেই নেয়ামত ধ্বংস করার জন্য বাস্তব প্রচেষ্টা শুরু করে, তাহলে তা হিংসার আরও ভয়াবহ স্তরে পৌঁছে যায়।
কীভাবে বুঝবো আমার মধ্যে দুনিয়ার লোভ আছে?
উত্তর : দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত লোভের একটি বড় লক্ষণ হলো—মানুষ ধীরে ধীরে হারামের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই হারাম হতে পারে—হারাম উপার্জন, সুদ বা অবৈধ সম্পদ, অবৈধ ভোগ-বিলাস, অবৈধ যৌন আকাঙ্ক্ষা (শাহওয়াত), অথবা যেকোনো ধরনের গুনাহ, যা মানুষ বারবার করতে করতে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে।
যখন একজন মানুষ হারামকে সহজভাবে নিতে শুরু করে এবং তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তা দুনিয়ার লোভ অন্তরে গভীরভাবে শেকড় গেড়ে বসার একটি বড় লক্ষণ।
তাই আত্মশুদ্ধির জন্য প্রত্যেক মানুষের উচিত নিয়মিত নিজের অন্তরকে যাচাই করা—আমার মধ্যে কি অহংকার, হিংসা বা দুনিয়ার লোভ জন্ম নিচ্ছে? যদি এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তবে দেরি না করে আল্লাহর কাছে তাওবা করা এবং অন্তরের চিকিৎসা শুরু করা উচিত।
আমরা সাধারণত লোভ বলতে শুধু টাকা-পয়সার লোভকেই বুঝি। লোভ কি শুধু অর্থ-সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
উত্তর : না। লোভ শুধু অর্থ-সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের অন্তরে বিভিন্ন ধরনের লোভ জন্ম নিতে পারে। যেমন—সম্পদের লোভ, পদ-পদবির লোভ, সম্মান ও মর্যাদার লোভ, খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার লোভ, সেলিব্রিটি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, মানুষের প্রশংসা পাওয়ার লোভ।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর বহু উদাহরণ দেখা যায়। যেমন কেউ একটি পোস্ট করার পর বারবার দেখছে—কতজন লাইক দিল, কতজন মন্তব্য করল, কতজন শেয়ার করল। এই অতিরিক্ত আকর্ষণও দুনিয়ার প্রতি আসক্তি ও লোভের একটি রূপ হতে পারে।
আপনি বললেন, হারামের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া লোভের একটি লক্ষণ। কিন্তু কেউ যদি নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য হালাল পথেই থাকে, তাহলেও কি এই লোভ দোষণীয়?
উত্তর : হ্যাঁ, অতিরিক্ত লোভ তখনও দোষণীয় হতে পারে। কারণ, অনেক সময় এটি ধীরে ধীরে মানুষকে হারামের দিকে নিয়ে যায়।
ধরা যাক, কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি দাওয়াতি পোস্ট প্রকাশ করল। এটি অবশ্যই একটি ভালো কাজ। এরপর যদি সে স্বাভাবিকভাবে দেখে কতজন মানুষ উপকৃত হলো বা কী প্রতিক্রিয়া এসেছে, এতে কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু যদি সে বারবার লাইক, মন্তব্য ও মানুষের প্রশংসার হিসাব নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই প্রবণতা ধীরে ধীরে তার নিয়তকে প্রভাবিত করতে পারে। একসময় আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে মানুষের প্রশংসা পাওয়াই তার মূল লক্ষ্য হয়ে যেতে পারে। তখন এই প্রবণতা রিয়া, আত্মপ্রশংসা বা অন্যান্য অন্তরের রোগের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া, এ ধরনের আসক্তি মানুষের দৈনন্দিন ইবাদত, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য নেক আমলের প্রতিও উদাসীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই ইসলাম এমন সব বিষয় থেকেও সতর্ক থাকতে শিক্ষা দেয়, যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে গুনাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে সাহাবি আবু দারদা রাযি.-এর একটি প্রসিদ্ধ বাণী রয়েছে। তিনি বলেন, অনেক সময় গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য কিছু হালাল বিষয়ও পরিহার করতে হয়। এটিও তাকওয়ার অংশ। [ইবনু রজব হাম্বলী, জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম : ১/২১৭]
অর্থাৎ, যে কাজটি নিজে বৈধ হলেও যদি আশঙ্কা থাকে যে তা ধীরে ধীরে মানুষকে হারাম বা গুনাহের দিকে নিয়ে যাবে, তাহলে আল্লাহভীতির কারণে তা থেকে বিরত থাকা তাকওয়ারই একটি নিদর্শন।
আপনি বললেন, অধিকাংশ অপরাধের মূল তিনটি—অহংকার, হিংসা ও লোভ। রাগের সঙ্গে কি এই তিনটির কোনো সম্পর্ক আছে?
উত্তর : অবশ্যই আছে। প্রকৃতপক্ষে অন্তরের যত রোগ রয়েছে, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেগুলোর অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে এই তিনটি মূল রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
যেমন—কৃপণতা মূলত লোভেরই একটি প্রকাশ। স্বার্থপরতা কখনো লোভের, আবার কখনো অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। রাগ অনেক সময় অহংকার থেকে সৃষ্টি হয়, আবার অনেক সময় লোভ বা ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত লাগার কারণেও জন্ম নেয়।
অর্থাৎ, অন্তরের বহু রোগের শিকড় খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তা শেষ পর্যন্ত অহংকার, হিংসা কিংবা লোভের কাছেই গিয়ে পৌঁছায়।
তাই কেউ যদি বলে, ‘আমি একটু রাগী মানুষ, এটাই আমার স্বভাব’, অথবা ‘আমার এই রাগের কারণেই অনেক ভালো কাজ হয়, তাই এটা পরিবর্তনের দরকার নেই’—তাহলে এ ধরনের চিন্তাও এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা। এমনকি নিজের এই দোষকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করাও অহংকারের একটি সূক্ষ্ম রূপ হতে পারে।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ একজন সাহাবিকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর একটি নসিহত করেছিলেন— لَا تَغْضَبْ রাগ করো না।
সাহাবি বারবার একই নসিহত চাইলে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতিবারই বলেছিলেন— لَا تَغْضَبْ রাগ করো না। [সহীহ বুখারী : ৬১১৬]
এ থেকে বোঝা যায়, নিয়ন্ত্রণহীন রাগ এমন একটি স্বভাব, যা সংশোধন করা একজন মুমিনের জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ, এটি এমন একটি বিষয় নয়, যা ‘আমার স্বভাব’ বলে ছেড়ে দেওয়া যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, রাগ অনুভব করা স্বাভাবিক মানবীয় আবেগ; ইসলাম রাগের অস্তিত্বকে নিষিদ্ধ করেনি। নিষিদ্ধ হলো রাগের বশবর্তী হয়ে অন্যায় করা, মানুষের প্রতি জুলুম করা বা আল্লাহর সীমালঙ্ঘন করা।
এ প্রসঙ্গে একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী মাইমুন ইবন মিহরান রহ.-এর একটি সুন্দর উপদেশ উল্লেখ করা হয়। তাঁকে এক ব্যক্তি বললেন, আমি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, কী করব?
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, রাগের সময় তুমি কি তোমার হাত ও মুখ নিয়ন্ত্রণ করতে পারো?
লোকটি বলল, হ্যাঁ, পারি।
তখন তিনি বললেন
فَإِنْ غَضِبْتَ فَامْلِكْ لِسَانَكَ وَيَدَكَ
রাগ উঠলে অন্তত তোমার এই দুটি জিনিস—মুখ ও হাত—নিয়ন্ত্রণ করো। [তারিখু দিমাশক : ২১/৪৪৩]
অর্থাৎ, রাগ অনুভব হওয়া এক বিষয়; কিন্তু সেই রাগের কারণে কাউকে কষ্ট দেওয়া, অপমান করা, গালি দেওয়া বা আঘাত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একজন মুমিনের কর্তব্য হলো রাগের মুহূর্তেও নিজের কথা ও কাজকে শরিয়তের সীমার মধ্যে রাখা।
একটি বিতর্কিত বিষয় নিয়ে জানতে চাই। অনেকেই বলেন, কারও স্বভাব ‘জালালি তবিয়ত’, আবার কারও ‘জামালি তবিয়ত’। অনেক সময় রাগী স্বভাবকে ‘জালালি তবিয়ত’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
উত্তর : রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন সকল উত্তম চরিত্র ও গুণাবলির পরিপূর্ণ আদর্শ। তাঁর চরিত্রে প্রয়োজনের সময় দৃঢ়তা যেমন ছিল, তেমনি ছিল অসীম দয়া, কোমলতা, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা।
তাই মানুষের নিয়ন্ত্রণহীন রাগ বা বদমেজাজকে ‘জালালি তবিয়ত’ নামে বৈধতা দেওয়া বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা সঠিক নয়।
অনেক সময় মানুষ নিজের রাগ, কঠোর ব্যবহার বা দুর্ব্যবহারকে এই পরিভাষার আড়ালে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু এটি গ্রহণযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গি নয়।
যদি রাগ শরিয়তের সীমা অতিক্রম করে, মানুষের প্রতি জুলুম, কষ্ট বা অবিচারের কারণ হয়, তাহলে সেটিকে কোনো বিশেষ নাম দিয়ে বৈধ করা যায় না। বরং তা সংশোধন করা একজন মুসলিমের দায়িত্ব।
অতএব, ‘জালালি তবিয়ত’ শব্দ ব্যবহার করে নিজের রাগকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা অনুচিত। একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের চরিত্রকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ অনুযায়ী গড়ে তোলা এবং অন্তরের সব ধরনের রোগ থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা।
বর্তমান যুগে আমরা মানুষের মধ্যে রিয়া, হিংসা ও অহংকার খুব বেশি দেখতে পাই। কেউ নিজের সম্পদ, পদ-পদবি, ব্যবসা বা অন্যান্য নেয়ামত নিয়ে অহংকার করে, আবার কেউ বুঝে বা না বুঝে হিংসা ও রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। আপনি আগে বলেছিলেন—সব ধরনের অন্তরের রোগের মূল তিনটি—অহংকার, হিংসা ও লোভ। তাহলে এই তিনটি রোগ থেকে মুক্তির উপায় কী?
উত্তর : আমি এ ক্ষেত্রে বিষয়টিকে দুইভাবে দেখব।
একটি হলো—সব অন্তরের রোগের মৌলিক বা সামগ্রিক চিকিৎসা। আরেকটি হলো—প্রতিটি রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা।
প্রথমে সামগ্রিক চিকিৎসার কথাই বলি।
আমাদের শরীরে কোনো রোগ হলে আমরা কী করি? প্রথমেই একজন দক্ষ চিকিৎসকের কাছে যাই। নিজের সমস্যাগুলো খুলে বলি এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করি। অন্তরের রোগও ঠিক তেমনই। রোগ যখন রোগই, তখন শরীরের হোক বা অন্তরের—চিকিৎসক তো লাগবেই।
তাই আত্মশুদ্ধির প্রথম কাজ হলো একজন হক্কানি শায়েখ বা এমন একজন আলেমের সাহচর্য গ্রহণ করা, যিনি তাযকিয়া ও ইসলাহের মেহনত করেন। তাঁর কাছে নিজের অবস্থা খুলে বলা এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে আত্মশুদ্ধির পথচলা শুরু করা।
তবে যদি এমন কোনো শায়েখের সাহচর্য সহজলভ্য না হয়, তাহলেও বিকল্প পথ রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন
لِكُلِّ شَيْءٍ صِقَالَةٌ، وَصِقَالَةُ الْقُلُوبِ ذِكْرُ اللَّهِ
প্রত্যেক বস্তুর একটি পালিশ বা পরিচ্ছন্ন করার উপায় রয়েছে, আর অন্তরের পালিশ হলো আল্লাহর জিকির। [মিশকাতুল মাসাবীহ : ২২৮৬]
যেমন কাপড় পরিষ্কার করতে সাবান লাগে, তেমনি অন্তর পরিষ্কার হয় আল্লাহর স্মরণে।
কিন্তু এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—জিকির বলতে শুধু ‘আল্লাহ, আল্লাহ’ বা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলাকেই বোঝায় না। জিকির একটি ব্যাপক বিষয়। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর জিকির হলো—কুরআন তিলাওয়াত।
কুরআনের সঙ্গে একজন মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হবে, তার অন্তরও তত বেশি পরিশুদ্ধ হবে। গুনাহ যেমন অন্তরে মরিচা ফেলে, তেমনি কুরআনের তিলাওয়াত সেই মরিচা ধীরে ধীরে দূর করে দেয়।
এ কারণে তাযকিয়ার ইমামগণ বলেছেন دَوَاءُ الْقَلْبِ تِلَاوَةُ الْقُرْآنِ অন্তরের প্রধান চিকিৎসা হলো কুরআন তিলাওয়াত।
আর তৃতীয় মৌলিক চিকিৎসা হলো, প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করা।
ফরজে আইন পরিমাণ ইলম অর্জন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। কারণ, ইলম মানুষের অন্তরে সচেতনতা সৃষ্টি করে, হালাল-হারামের পার্থক্য শেখায় এবং আত্মসমালোচনার শক্তি তৈরি করে। তাই আত্মশুদ্ধির জন্য মৌলিক দ্বীনি ইলম অর্জনও অত্যন্ত জরুরি।
এবার যদি নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার কথা বলি, তাহলে প্রথমেই আসে অহংকার।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. বলতেন
لَا يَحْقِرَنَّ أَحَدٌ أَحَدًا مِنَ الْمُسْلِمِينَ؛ فَإِنَّ صَغِيرَ الْمُسْلِمِينَ عِنْدَ اللَّهِ كَبِيرٌ
তোমাদের মধ্যে কেউ কখনো কোনো মুসলমানকে তুচ্ছ মনে করবে না। কারণ যে মুসলমান তোমার চোখে ছোট, সে আল্লাহর কাছে অনেক বড়, সম্মানিত ও মূল্যবান। [ইতহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন : ৮/৩৪৩]
এ প্রসঙ্গে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.-এর একটি ঘটনা খুব শিক্ষণীয়। তিনি একবার রাক্কা শহরে গিয়ে একজন দরবেশের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন। কিন্তু সেই ব্যক্তি তাঁকে গুরুত্ব দিলেন না, এমনকি সালামেরও উত্তর দিলেন না। পরে যখন জানতে পারলেন, যাঁকে তিনি অবজ্ঞা করেছেন তিনি যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ., তখন তিনি অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে তাঁর কাছে ছুটে গেলেন।
তিনি বললেন, হযরত! আপনি নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, আমার রোগ অহংকার। আমাকে এমন একটি আমল শিখিয়ে দিন, যা আমি সারাজীবন করতে পারি।
তখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. বললেন
إِذَا خَرَجْتَ مِنْ مَنْزِلِكَ فَلَا يَقَعْ نَظَرُكَ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا رَأَيْتَ أَنَّهُ خَيْرٌ مِنْكَ
যখনই ঘর থেকে বের হবে এবং কোনো মানুষের সঙ্গে দেখা হবে, মনে মনে এই সিদ্ধান্ত নেবে—এই মানুষটি আমার চেয়ে ভালো।
এটি অহংকার ভাঙার এক অসাধারণ চিকিৎসা। [খাত্তাবী, আল-উযলাহ : ২২০]
কেউ যদি মনে প্রশ্ন করে, ‘আমি কীভাবে ভাবব যে আমার ছাত্র, সন্তান বা আমার চেয়ে ছোট কেউ আমার চেয়ে ভালো?’
এর সুন্দর উত্তর দিয়েছেন ইমাম গাযালী রহ.। তিনি বলেন
— যদি অন্যজন বয়সে ছোট হয়, তাহলে ভাবো—তার গুনাহ কম, তাই সে আমার চেয়ে ভালো হতে পারে।
— যদি সে বয়সে বড় হয়, তাহলে ভাবো—সে আমার চেয়ে বেশি ইবাদতের সুযোগ পেয়েছে।
— যদি সে আলেম না হয়, তাহলে ভাবো—সে না জেনে ভুল করে; আর আমি জেনে ভুল করি।
— আর যদি সে আলেম হয়, তাহলে তো আল্লাহই তাকে ইলমের মর্যাদা দিয়েছেন।
এভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করলে অহংকার ধীরে ধীরে দূর হতে শুরু করবে।
প্রশ্ন হতে পারে, যদি একজন বাবা মনে করেন, ‘আমার সন্তান হয়তো আল্লাহর কাছে আমার চেয়েও উত্তম হতে পারে’, কিংবা একজন শিক্ষক মনে করেন, ‘আমার ছাত্রও আমার চেয়ে ভালো হতে পারে’, তাহলে তিনি তাকে শাসন করবেন কীভাবে?
এ প্রশ্নের খুব সুন্দর উত্তর দিয়েছেন হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ.। তিনি একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন।
ধরুন, একজন প্রহরী রাজপ্রাসাদের ফটকে পাহারা দিচ্ছেন। বাদশাহ নির্দেশ দিয়েছেন—রাত দশটার পর এই ফটক দিয়ে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। এখন যদি নির্ধারিত সময়ের পর বাদশাহর নিজের ছেলে, অর্থাৎ রাজপুত্রও সেখানে আসে, তাহলেও প্রহরী তাকে প্রবেশ করতে দেবে না।
কেন? সে কি রাজপুত্রকে নিজের চেয়ে ছোট বা তুচ্ছ মনে করে?
না। বরং সে বাদশাহর নির্দেশ পালন করছে। তার দায়িত্বই হলো সেই আদেশ বাস্তবায়ন করা।
ঠিক তেমনি একজন বাবা সন্তানের ভুল দেখলে তাকে সংশোধন করবেন, একজন শিক্ষক ছাত্রকে শাসন করবেন, একজন কর্মকর্তা তার অধীনস্থকে দায়িত্ব অনুযায়ী পরিচালনা করবেন। তবে এই শাসনের উদ্দেশ্য হবে ‘সংশোধন’, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা নয়।
তিনি মনে করবেন, ‘আল্লাহ আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি তাঁর হুকুম পালন করছি।’ কিন্তু কখনোই এভাবে ভাববেন না—‘আমি তার চেয়ে বড়’, ‘সে আমার চেয়ে নিকৃষ্ট’, কিংবা ‘তাকে ছোট করে দেখার অধিকার আমার আছে।’
এমন মানসিকতা থাকলে শাসনও ইবাদতে পরিণত হয় এবং অহংকার থেকেও মানুষ নিরাপদ থাকে।
হিংসা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা কী?
উত্তর : হযরত আবু দারদা রাযি. একটি অত্যন্ত মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি বলেন
مَنْ كَثُرَ ذِكْرُ الْمَوْتِ قَلَّ حَسَدُهُ
যে ব্যক্তি বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে, তার অন্তরে হিংসা কমে যায়। [ইহ্ইয়াউ উলূমিদ্দীন : ৩/১৮৯]
এটি বোঝার জন্য একটি সাধারণ উদাহরণই যথেষ্ট। ধরুন, দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছে। একদিন তাদের একজন রাতে শুয়ে ভাবতে শুরু করল, ‘আর কতদিনই বা বাঁচব? দশ-পনেরো বছর ধরে মামলা করলাম। এরপরও তো একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।’
এই একটি চিন্তাই তার অন্তরকে বদলে দিতে পারে।
পরদিন তার আচরণ আর আগের মতো থাকবে না। কারণ, মৃত্যুচিন্তা মানুষের অন্তর থেকে হিংসার আগুনকে অনেকটাই নিভিয়ে দেয়।
অবশ্যই যার প্রতি হিংসা জন্মায়, তার জন্য দোয়া করা, তার কল্যাণ কামনা করা—এসবও হিংসার চিকিৎসা। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর চিকিৎসা হলো, মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা।
দুনিয়ার লোভ থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কী?
উত্তর : লোভের সবচেয়ে শক্তিশালী চিকিৎসা হলো, আখিরাতের চিন্তা অন্তরে জীবন্ত রাখা।
দুনিয়ার প্রয়োজনের চিন্তা করা দোষের নয়। যদি দুনিয়ার চিন্তা নিষিদ্ধ হতো, তাহলে আল্লাহ তাআলা আমাদের এই দোয়া শিক্ষা দিতেন না—
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً
হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন। [সূরা বাকারা : ২০১]
সমস্যা দুনিয়ার চিন্তা নয়; সমস্যা তখনই, যখন দুনিয়ার ভালোবাসা অন্তরে এমনভাবে জায়গা করে নেয় যে আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়।
একটি অন্ধকার ঘরের কথা চিন্তা করুন। সেখানে যদি আলো না থাকে, তাহলে সাপ-বিচ্ছু ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণী সেখানে বাসা বাঁধবেই। কিন্তু ঘরে একটি আলো জ্বালিয়ে দিলে অন্ধকার দূর হয়ে যায়। অন্তরের অবস্থাও ঠিক তেমন। যখন অন্তরে আখিরাতের আলো জ্বলে ওঠে, তখন দুনিয়ার লোভ, মোহ ও অতিরিক্ত আসক্তি ধীরে ধীরে দূর হয়ে যায়।
তাই লোভের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো—আখিরাতকে সবসময় সামনে রাখা এবং মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা।
অহংকার দূর করার এমন কোনো সহজ আমল আছে, যা সবাই নিয়মিত করতে পারে?
উত্তর : হ্যাঁ, আছে। অহংকার দূর করার অন্যতম সহজ ও কার্যকর আমল হলো—নিজে থেকে আগে সালাম দেওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
الْبَادِئُ بِالسَّلَامِ بَرِيءٌ مِنَ الْكِبْرِ
যে আগে সালাম দেয়, সে অহংকার থেকে মুক্ত। [মুসনাদে আহমাদ : ২৮৮৭৬]
বাস্তবে আমরা অনেক সময় দেখি—বাবা সন্তানের আগে সালাম দিতে সংকোচবোধ করেন, শিক্ষক ছাত্রকে আগে সালাম দেন না, বড় ভাই ছোট ভাইকে আগে সালাম দিতে চান না, ধনী গরিবকে আগে সালাম দিতে চান না। অনেক ক্ষেত্রেই এর পেছনে সূক্ষ্ম এক ধরনের অহংকার কাজ করে।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন অহংকারমুক্ত। তিনি ছোট-বড়, ধনী-গরিব, শিশু-বৃদ্ধ—সকলকে আগে সালাম দিতেন।
তাই যে ব্যক্তি নিজে থেকে আগে সালাম দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলে, তার অন্তরে বিনয় সৃষ্টি হয় এবং অহংকার ধীরে ধীরে দূর হতে থাকে।
ছোট একটি সুন্নত—কিন্তু আত্মশুদ্ধির পথে এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
গোনাহের ক্ষতি - ১ম পর্ব
হামদ ও সালাতের পর। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযাদার প্রসঙ্গে বলেন, مَن لم يَدَعْ ق...
আলোকময় কুরআন
আজ জুমু'আর দিন। এ দিনে সূরা কাহাফ তিলাওয়াতের বিশেষ ফযীলত রয়েছে। এটা পনের পারায় শুরু হয়ে ষোল পারায় শে...
দুআ একটি ইবাদতঃ দুআ কেন কবুল হয় না?
...
ওলী হওয়ার সহজ পথ
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] হামদ ও সালাতের পর… আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে আজ এখানে একত্র করেছেন ...
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন