বাউলধর্মে দ্বীনে এলাহী! বাউল মতবাদ। পর্ব—৪৬
বাউলধর্মে দ্বীনে এলাহী! বাউল মতবাদ। পর্ব—৪৬
বাউলধর্মে দ্বীনে এলাহী!
দ্বীন-ই-ইলাহী। ১৫৮২ সালে মুঘল বাদশাহ আকবর প্রবর্তিত একটি ধর্ম। তিনি ধর্মীয় বিষয়ে গবেষণার জন্য ১৫৭৫ খ্রীস্টাব্দে আকবর ফতেপুর সিক্রিতে একটা উপাসনা ঘর তৈরী করেন। যা 'ধর্ম সভা' নামে পরিচিত। সেখানে তিনি বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের কথা শুনতেন। অবশেষে সকল ধর্মের সারকথা নিয়ে তিনি নতুন একটি নিরপেক্ষ ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই 'দীন-ই-ইলাহি' নামে পরিচিত।
যদিও সম্রাট আকবর তার আবিস্কৃত ধর্ম পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করে যেতে পারেননি। কিন্তু তার সেই রিজেক্ট ধর্মকে লালন ফকির ও বাউল সম্প্রদায় নিজেদের ধর্ম বলে পরিচয় দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করছে। দেখুন, লালন লিখেছে—
ডানে বেদ বামে কোরান মাঝখানে ফকিরের বয়ান
যাঁর হয়েছে দিব্যজ্ঞান সে-ই দেখতে পায়৷ —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬৫)
তাঁর (লালনের) মতাদর্শে সর্বধর্মের সমন্বয় রয়েছে। —(বাংলাদেশের বাউল, পৃ. ২৩)
আহমদ শরীফ তাঁর বাউলতত্ত্ব বইয়ে লিখেছেন—
বিভিন্ন মতবাদের মিশ্রণে গড়ে উঠেছে বাউল মত । হিন্দু-মুসলমানের মিলনে হয়েছে বাউল সম্প্রদায়, তাই পরমত সহিষ্ণুতা, অসাম্প্রদায়িকতা, গ্রহণশীলতা, বোধের বিচিত্রতা, মনের ব্যাপকতা ও উদার সদাশয়তা এদের বৈশিষ্ট্য। —(বাউল সাধনা, পৃ. ৩০)
ফকির লালন শাহ'র ইসলাম তথা দ্বীনে এলাহি প্রতিষ্ঠিত না হলে সাধুগুরুগণের ‘অখণ্ড ভারতপংথ' নবপ্রাণশক্তিকে উদ্ভাসিত হবে না বিশ্বমানচিত্রে। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৮১)
সত্যধর্ম বা দ্বীনে এলাহীকে কেউ সমূলে ধ্বংস করতে পারে না। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৮০)
এ বক্তব্যগুলো থেকে আমরা জানতে পারলাম—বাউলদের ধর্ম ইসলাম নয়, বরং সকল ধর্মের সমন্বয় গঠিত একটি স্বতন্ত্র ধর্ম। যার পূর্ব রূপ হলো ‘দীনে এলাহী’।
ইসলাম কী বলে?
‘দীনে ইলাহী’ নামক এ ধর্মটি একটি কুফরী ধর্ম। কারণ, ইসলাম ধর্ম মানবজীবনের জন্য পরিপূর্ণ ও চূড়ান্ত ধর্ম। এটার ভেতরে কোনো কিছু কমবেশি করা জায়েয নেই। ইসলামের এই আইন ও কনসেপ্টের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে এটা আবিস্কার করা হয়েছে। অথচ । কারণ, মহান আল্লাহ বলেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে ইসলামকে (চির দিনের জন্য) পছন্দ করে নিলাম।” —(সুরা মায়িদা : ৩)
সুতরাং পরিপূর্ণ এ ধর্ম থেকে কাটছাট করে এবং অন্য ধর্ম থেকে কিছু মতবাদ এনে জগাখিচুরি করে নতুন ধর্ম বানানো সুস্পষ্ট কুফরী। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ
“এবং সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং সত্যকে গোপনও করো না, যখন (প্রকৃত অবস্থা) তোমরা ভালোভাবে জানো।” —(সুরা বাকারা : ৪২)
অত্র আয়াতের ব্যখ্যায় হযরত কাতাদাহ রহি. বলেন,
لا تلبسوا اليهودية والنصرانية بالإسلام وانتم تعلمون ان دين الله الاسلام وان اليهودية والنصرانية بدعة ليست من الله
“ইহুদি ধর্ম এবং খ্রিস্টধর্মকে ইসলামের সাথে মিশিয়ে ফেলো না। কারণ, তুমি জানো যে, ইসলাম আল্লাহর ধর্ম। আর নব্য ইহুদি এবং খ্রিস্টধর্ম আল্লাহর ধর্ম নয়, বরং নবউদ্ভাবিত।” —(তাফসীরে ইবনে কাসীর, খ. ১ পৃ. ৩৭৯)
অতএব, যারা সব ধর্মের সমন্বয়ে মধ্যবর্তী একটি মতবাদ দাঁড় করিয়ে সেটাকে মানতে শুরু করে, তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا أُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا
“যারা আল্লাহ ও তার রাসুলগণকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলগণের মধ্যে পার্থক্য করতে চায় ও বলে, আমরা কতক (রাসুল)-এর প্রতি তো ঈমান রাখি এবং কতককে অস্বীকার করি, আর (এভাবে) তারা (কুফর ও ঈমানের মাঝখানে) মাঝামাঝি একটি পথ অবলম্বন করতে চায়, এরূপ লোকই সত্যিকারের কাফির। আর, আমি কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছি।” —(সুরা নিসা : ১৫০-১৫১)
বুঝতে পারলাম—আল্লাহ তাআলার ঘোষণানুযায়ী ‘দীনে ইলাহী’ মতবাদ একটি সুস্পষ্ট কুফরি মতবাদ। অথচ এই কুফরী মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতেই লালন ফকিরের ধরাপৃষ্ঠে আগমন। দেখুন, এ কথা তারাই লিখেছে—
ফকির লালন শাহ তাই জগতবাসীর উদ্ধারকর্তা সম্যক গুরুরূপে অবতীর্ণ হন মানুষের সকল দ্বীনের উপর সত্যদ্বীন তথা দ্বীনে এলাহি প্রকাশ করতে। —(অখণ্ড লালনসঙ্গীত, পৃ. ৬২)
অথচ মহান রব্ব বলেছেন—
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
“আল্লাহই তো হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ নিজ রাসুলকে প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি অন্য সব দ্বীনের উপর তাকে জয়যুক্ত করেন, তাতে মুশরিকগণ এটাকে যতই অপ্রীতিকর মনে করুক।” —(সুরা তাওবা : ৩৩)
সুতরাং ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে ‘দ্বীনে এলাহী’ নামক কুফরী মতবাদ বাস্তবায়নের পথে যারা হাটছে, তারা সুস্পষ্ট কুফরিতে লিপ্ত।
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
কুরআনের চেয়ে মুমিন দামী! হেযবুত তওহীদ। পর্ব–১৬
পবিত্র কুরআন সরাসরি আল্লাহপাকের কালাম। পৃথিবীর সব কিছু মাখলুক হলেও আল্লাহ-র কালাম মাখলুক নয়। সুতরাং ...
মুফতী রিজওয়ান রফিকী
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
৪০৩৩
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন