আল্লাহর কাছে কীভাবে চাইতে হয়? (হজের সফর)
আল্লাহর কাছে কীভাবে চাইতে হয়? (হজের সফর)
[ দোয়া কবুল হওয়াই বড় বিষয় নয়, বরং কী দোয়া করছি সেটাই মুখ্য। আল্লাহওয়ালাদের জীবন নির্বিঘ্নে কাটে না, কষ্ট থাকে; কিন্তু আল্লাহ সেই কষ্ট সহ্যের ক্ষমতাও দেন। অনেক সময় আমরা ছোট ছোট বিষয় নিয়ে দোয়া করি, কিন্তু আল্লাহর দরবারে সেই দোয়া কবুল হয়ে গেলে পরে আফসোস করি যে বড় কিছু চাইতে পারতাম না। কারণ দোয়ার কবুলিয়তের মুহূর্তটি খুবই মূল্যবান। বিশেষ করে মক্কা-মদিনার মতো পবিত্র স্থানে দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বেশি, এবং সেখানে করা দোয়া ও আগ্রহ (জজবা) স্থায়ী হয়ে যায়। তাই আমাদের উচিত আল্লাহর কাছে উন্নত দোয়া ও আফিয়াত (কল্যাণ ও নিরাপত্তা) চাওয়া, এবং নিজের পছন্দ-অপছন্দের ওপর নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া বোধ ও মাসনুন দোয়ার মাধ্যমে চাওয়া। সবচেয়ে বড় দোয়া হলো আল্লাহ যেন আমাদের সঠিকভাবে দোয়া করার তাওফিক দেন।]
১৪ই জানুয়ারি ২০০৭, রবিবার, বেলা ১১টায় মক্কার বাসায় স্যার মোযাকারা করেন। যা ছিল মদিনায় যাবার আগের দিন।
(মুযাকারায় সাথীদের মধ্যে কারও একজনের কিছু কথার পরিপ্রেক্ষিতে) বলছিল যে, সাহাবাদের জীবনের জন্য দোয়া করি আবার ভয়ও লাগে, আর ভয় এটা লাগে যে, যদি আবার কবুল হয়ে যায়। ওই ভয় করার দরকার নেই। আল্লাহওয়ালাদের জীবন চাই বিনা ভয়ে। এ জন্যে যে, আল্লাহ তায়ালা বড় মেহেরবান, কোনো নেয়ামত দেওয়ার সময় যদি জাহেরিভাবে ওটা ভারী হয়, তাহলে বহন করার ক্ষমতা দিয়ে তারপর দেবেন। আর দুনিয়াতে মানুষ এটা জানে। একজন মহিলা মনে করা যাক তার সন্তান নেই, সন্তানের জন্য দোয়া করছে। সন্তানের জন্য যখন দোয়া করে তখন এই দোয়া সে করে না যে, বাচ্চা যখন বড় হবে তখন আমার পেট যেন ফেটে না যায়। ওগুলো বলার কোনো দরকার নেই। বাচ্চা যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, মাসল ইত্যাদি ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকে। তো আল্লাহ তায়ালা আল্লাহওয়ালাদের জীবন দান করেন, তাহলে সেই জীবনের সাথে আনুষঙ্গিক যা কিছু আছে, সেগুলো দিয়ে দান করেন। সে জন্যে আমাদের শয়তান ভয় দেখায়, দোয়া করলে যদি আল্লাহওয়ালাদের জীবন হয়ে যায়, তাহলে তুমি কী করবে? তো ওগুলো শয়তানের ধোঁকা। আল্লাহর কাছে চাই, আল্লাহ তায়ালা যদি কবুল করেন আনুষঙ্গিক সব-সহ দেবেন। আরবিতে একটা কথা আছে যে, শীত এলো কম্বল-সহ। ওই শীত যদি আসে তো সাথে সাথে কম্বল চলে আসে। এ জন্যে ঈমানি আমলি জগতের দোয়াই বেশি করা আর আমাদের বস্তুজগতের যেগুলো চাহিদা দিলের মধ্যে আছে, নাজায়েজ থেকে তো আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়া; যেন ওগুলোর খেয়াল আল্লাহ তায়ালা আমাদের থেকে দূর করেন। আর জায়েজ এবং হালাল যেগুলো, সেগুলোর ব্যাপারেও আল্লাহর কাছে চাওয়া যে, আল্লাহ, তুমি মেহেরবানি করে আমার এ হাজতগুলোকে আমার দিল থেকে কমিয়ে দাও। যাতে আমি সম্পূর্ণ শক্তির সাথে তোমার ওই নেয়ামত চাইতে পারি, যেগুলো তুমি দিতে চাও, আর তা না হলে আমি যদি ওটাও চাই, এটাও চাই, তাহলে সব চাহিদাগুলো দুর্বল হয়ে যাবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মাসনুন দোয়ার মধ্যে আছে,
وَاقْطَعْ عَنِّي حَاجَاتِ الدُّنْيَا بِالشَّوْقِ إِلَى لِقَائِكَ
"তোমার সাক্ষাতের ব্যাকুলতা দিয়ে আমার জাগতিক সব প্রয়োজনকে তুচ্ছ করে দাও।" তো আল্লাহর দিকে যাওয়ার আগ্রহ আল্লাহ তায়ালা আমার এত বেশি বাড়িয়ে দেন যে, আমার জাগতিক প্রয়োজনগুলো আমার দিল থেকে চলে যায়। আর যদি প্রয়োজনগুলো আল্লাহ তায়ালা দিল থেকে দূর করে দেন, তাহলে ওই প্রয়োজনগুলো না মেটার কারণে তার কোনো কষ্ট হবে না। যদিও বাইরে থেকে লোকে মনে করবে যে খুব কষ্টের মধ্যে আছে। নবীদের ওলি-আল্লাহদের জীবনে দেখা যায় যে, দিনের পর দিন উপবাস করছেন। আর উপবাসের কারণে শারীরিক কষ্ট স্বীকার করছেন। কিন্তু পরে আবার লক্ষ করা যায় যে, যার দোয়াতে আসমান-জমিন বদলে যায়, সে একবেলা নিজের জন্যে আল্লাহর কাছ থেকে খাবার চেয়ে নিতে পারে না? এর রহস্য কী? মানুষ খুব কষ্টের মধ্যে দেখছে, নিজের ওটা খেয়ালই নেই দোয়ার সময়। আল্লাহকে যে দোয়ার সময় বলবেন যে, আয় আল্লাহ, আমি উপবাস করছি, আমাকে খাবার দাও, দোয়ার সময় তো খেয়ালই পড়ছে না ওটা। এটা এত তুচ্ছ হয়ে গেছে যে, খেয়ালই পড়ছে না। তো আল্লাহর কাছে বেশি করে চাওয়া আমাদের এখান থেকে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে যে, যে জজবাত কাইফিয়ত নিয়ে এখান থেকে যাব ওগুলো স্থায়ী হয়ে যায়, এ জন্যে বড় বেশি সতর্কতার দরকার। আল্লাহর ঘরের দিকে দাঁড়িয়ে এখানে তাকিয়ে এখানে দোয়ার মধ্যে যেসব জিনিস আমার দিলের মধ্যে থাকে, ওগুলো তার মনের ভেতর স্থায়ী হয়ে যায়। এই জায়গা হচ্ছে সবকিছু স্থায়ী করে ফেলার জায়গা। হাজেরা আলাইহাস সালাম একটা আমল করেছেন, তো ওটা স্থায়ী হয়ে গেছে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ইসমাঈল আলাইহিস সালাম আমল করেছেন, তো ওগুলো স্থায়ী হয়ে গেছে। তো মক্কা শরিফ এমন একটা জায়গা যে, সবকিছু এখানে স্থায়ী হয়ে যায়। আমার দিলের বাতিল ফাসিদ জজবাগুলো যদি থাকে বা দুনিয়াবি জজবাগুলো থাকে, আর এই জজবাগুলো নিয়ে আমি দোয়া করি, আমল করি, ছাই করি! আর এগুলো নিয়ে এখান থেকে যাই, তাহলে বড় বেশি আশঙ্কা যে, ওই খারাপ জজবাগুলো স্থায়ী হয়ে যাবে। সে জন্যে আল্লাহর কাছে উন্নত জজবার জন্যে দোয়া করা, বাকি আল্লাহর কাছে সবকিছুতে যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাসনুন দোয়ার মধ্যে আছে, খুব বেশি চাই আফিয়াতের সাথে সহজে সহজে। আর তো কুরআন শরিফে আল্লাহ তায়ালা এই দোয়া শিখিয়েছেন, এমন বোঝা চাপিয়ো না, যেটা আমার জন্যে বহন করা কঠিন হয়। وَلاَ تُحَمِّلْنَا مَا لاَ طَاقَةَ لَنَا بِهِ তো আফিয়াতের সাথে যেন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ঈমানি আমলি জিন্দেগি দেন, নবীদের সাহাবীদের উসওয়াহ আল্লাহ তায়ালা আমাদের নসিব করেন, আর মদিনাতে যাওয়ার পরে ওইরকম আমাদের হাজতগুলো যেরকম মোযাকারা হলো, এই হাজতগুলো আল্লাহর কাছে পেশ করতে পারি, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে পেশ করতে পারি।
একিন রাখি ইনশাআল্লাহ যেগুলো পেশ করব, যদি খারাপ ধরনের জিনিস না হয়, ইনশাআল্লাহ খারাপ জিনিস তো আল্লাহর কাছে চাইব না-ও, হয়ে যাবে। যেগুলো চাইব হয়ে যাবে। বাকি এটা বিবেচনার জিনিস যে, এটাই চাইব কি না; পরে না আবার আফসোস করতে হয় যে, এটাই কেন চাইলাম। আমার জানাশুনা অনেক সাধারণ ভাইয়ের জীবনেও এমন ঘটেছে যে, হঠাৎ মনের মধ্যে আম খাওয়ার শখ হয়েছে। মুখ ফুটে কাউকে সে বলেওনি। তার আগেই আম হাজির। এমনটা বিস্ময়করভাবে ঘটেছে, বলে সে আফসোস করেছে যে, আমি কেন তখন এই সাধারণ একটা বস্তু মনে মনে প্রার্থনা করলাম! হায়, আম না চেয়ে যদি অন্য কিছু চাইতাম। একটা মস্ত বড় সুযোগ হারালাম। তখন কবুলিয়তের মুহূর্ত ছিল, যার কারণে আমটা পেয়ে গেলাম। কত আফসোস হয় যে, হায় একটা আমি নিয়ে নিলাম। পরে ওরকম আফসোস যেন না হয়, যে পরে আবার আফসোস করি যে কী একটা নিয়ে নিলাম। আরও কিছু চাইতে পারতাম। আল্লাহর কাছে খুব বেশি করে চাওয়া যে, আয় আল্লাহ! তুমি আমাকে দিয়ে উন্নত দোয়া করাও। খুব বেশি করে আল্লাহর কাছে চাওয়া। উন্নত দোয়া করাও।
سُبْحَانَ الله وَبِحَمْدِهِ ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ نَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ ، نَسْتَغْفِرُكَ وَنَتُوبُ إِلَيْكَ. سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عمَّا يَصِفُوْنَ، وَسَلاَمٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَ، وَالْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، آمِيْن.
মন্তব্য (...)
এ সম্পর্কিত আরও প্রবন্ধ
দাওয়াতের প্রাণ মুহাব্বত
আল্লাহ তাআ’লা আমাদেরকে ইখলাসের হুকুম দিয়েছেন। ইবাদতের মধ্যে যেমন ইখলাস দিয়েই তার মূল্য। পরিমাণে খুবই...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১৭ জানুয়ারি, ২০২৬
৫৭৭৬
দুআ কবুল না হওয়ার কারণ: আমরা কি ভুল চাইছি?
[প্রদত্ত বয়ান থেকে সংগৃহীত] أعوذ بالله من الشيطان الرجيم. بسم الله الرحمن الرحيم مَنۡ عَمِلَ صَالِح...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
১২ জানুয়ারি, ২০২৬
৬৭৮৬
বাহ্যিক উন্নতি নাকি আত্মিক সমৃদ্ধি?
আল্লাহ তাআলা নেক আমলের আদেশ দিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে সুন্দর জীবন দান করার ওয়াদা করেছেন। সুন্দর জীবন...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারি, ২০২৬
৬১০৮
মন চাহি জিন্দেগী, রব চাহি জিন্দেগী
হিন্দুস্তানের মেওয়াতীরা তাদের গ্রাম্য সাদাসিধা ভাষায় একটা কথা বলতেন, এখনো বলেন অনেকে: জীবন দুই ধরন...
প্রফেসর হযরত মুশফিক আহমদ রহ.
২০ জানুয়ারি, ২০২৬
৬২৮৯
মন্তব্য (0)
কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!
মন্তব্য করতে লগইন করুন