কিতাবুস সুনান - ইমাম আবু দাউদ রহঃ

২. নামাযের অধ্যায়

হাদীস নং: ১৫২৯
আন্তর্জাতিক নং: ১৫২৯
নামাযের অধ্যায়
৩৬৭. ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা সম্পর্কে।
১৫২৯. মুহাম্মাদ ইবনে রাফে (রাহঃ) ...... আবু সাঈদ খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি বলে, আমি রব হিসাবে আল্লাহকে, দ্বীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসাবে মুহাম্মাদ (ﷺ)কে পেয়ে সন্তুষ্ট তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে।
كتاب الصلاة
باب فِي الاِسْتِغْفَارِ
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ رَافِعٍ، حَدَّثَنَا أَبُو الْحُسَيْنِ، زَيْدُ بْنُ الْحُبَابِ حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ شُرَيْحٍ الإِسْكَنْدَرَانِيُّ، حَدَّثَنِي أَبُو هَانِئٍ الْخَوْلاَنِيُّ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا عَلِيٍّ الْجَنْبِيَّ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَنْ قَالَ رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولاً وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ " .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

'আল্লাহ আমার রব্ব'-এর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশের অর্থ
رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبًّا (আল্লাহ আমার রব্ব, এতে আমি সন্তুষ্ট)। এখানে দু'টি কথা। এক হলো আল্লাহ তা'আলা রব্ব ও প্রতিপালক। দ্বিতীয় হলো এর উপর আমার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তা'আলা রব্ব- এ কথার অর্থ আল্লাহ তা'আলা আমার সৃষ্টিকর্তা, আমার প্রতিপালক, আমার জীবন ও মরণের মালিক। তিনি সারা জাহানের মালিক ও মাবুদ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ও পরিচালনা করছেন।

এ কথার উপর আমার সন্তুষ্টির অর্থ হলো- আমি আমার অন্তরে এ বিশ্বাস পোষণ করি। সুতরাং আমি কেবল তাঁকেই ভালোবাসি, তাঁকেই ভয় করি, তাঁরই কাছে আশা রাখি। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি। আমি তাঁর বিকল্প খুঁজি না। আমি তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকি, কোনও আপত্তি তুলি না। আমি একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই ইবাদত করি। আমি তাঁরই আদেশ-নিষেধ পালনে বদ্ধপরিকর।

মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার রাসূল এ কথার প্রতি সন্তুষ্টির অর্থ
وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) মুহাম্মাদ আমার রাসূল'। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূল- এর অর্থ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে শেষ যমানার নবী-রাসূল করে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের কাছে তাঁর আদেশ-নিষেধ পৌঁছিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের প্রতি তাঁর সর্বশেষ কিতাব কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। তিনি সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোনও নবী-রাসূল আসবে না। এটা আমার বিশ্বাস। আমি এ বিশ্বাসে সন্তুষ্ট। তিনি আমার ভালোবাসা। আমি নিজ প্রাণ অপেক্ষাও তাঁকে বেশি ভালোবাসি। সুতরাং তিনি যে হিদায়াত নিয়ে এসেছেন, আমি খুশিমনে তার অনুসরণ করব। আমি তাঁর সুন্নতমতো জীবনযাপন করব। তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শের উপর অন্য কোনওকিছুকে প্রাধান্য দিব না। বরং আমি আমার জান-মাল দিয়ে তাঁর সুন্নাহের প্রচার-প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত থাকব।

আমি এতে সন্তুষ্ট যে, ইসলাম আমার দীন
وَبِالْإِسْلَام دِينًا 'এবং (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) ইসলাম আমার দীন'। দীন হলো কতিপয় আকীদা-বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের সমষ্টি। এর নাম ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে এ দীন প্রদান করেছেন। সবশেষে হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে এটাকে পরিপূর্ণ করেছেন। এ দীনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে কুরআন-সুন্নাহে। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে ইসলাম নামক দীনের নি'আমত দান করেছেন। আমি এর প্রতিটি আদেশ-নিষেধে সন্তুষ্ট। আমি সর্বান্তঃকরণে তা গ্রহণ করে নিয়েছি। আমার অন্তরে দীনের কোনও বিধান নিয়ে বিন্দুমাত্র খটকা নেই। বরং আমি এর অনুসরণ করে পরিতৃপ্তি বোধ করি। আমি এতে শান্তি অনুভব করি। জীবনের কোনও ক্ষেত্রে এ দীনের কোনও বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না। এ দীন পরিপূর্ণ। তাই এর কোনও বিকল্প থাকতেও পারে না। কাজেই এ দীনের অনুসরণকেই আমি আমার দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের নাজাত লাভের উপায় বলে বিশ্বাস করি।

সুতরাং আযানের এ দুআটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটা নিজ ঈমানের ঘোষণা এবং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনযাপনের এক অঙ্গীকার। আযানের পর নামায আদায় এ অঙ্গীকারের প্রথম প্রতিফলন। অতঃপর নামাযীর কর্তব্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার একজন অনুগত বান্দারূপে আপন কর্তব্যকর্মে নিয়োজিত থাকা। যেহেতু এ দুআ এক পরম আনুগত্যের অঙ্গীকার, তাই এর ফযীলতও অনেক বড়।

দুআটির ফযীলত
এ দু'আটির একটি নগদ লাভও আছে। সে লাভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা যেহেতু নিজ ঈমানের ঘোষণা দেওয়া হয়, তাতে নিজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয় এবং সে ঈমানের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনাচারের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়, তাই অন্তরে ঈমানের স্বাদ এসে যায়। ভাবতে ভালো লাগে যে, আল্লাহ আমার রব্ব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী এবং ইসলাম আমার দীন। এ ভালো লাগার কারণে দীনের উপর চলা সহজ হয়ে যায়; বরং দীনের প্রতিটি বিধান পালনে এক অনির্বচনীয় আনন্দ বোধ হয়। সুতরাং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীছে ইরশাদ করেন-

ذَاقَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا.

যে ব্যক্তি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তার রব্ব, ইসলাম তার দীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রাসূল, সে ঈমানের স্বাদ পেয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৪; জামে তিরমিযী: ২৬২৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৭৭৯; মুসনাদুল বাযযার: ১৩১৮; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৬৬৯২; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৯৪; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ১৯৫; শু'আবুল ঈমান ১৯৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৪)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. আল্লাহ আমার রব্ব- এ বিশ্বাসে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহমুখী করে রাখা ও আল্লাহর আনুগত্যে নিবেদিত থাকা ঈমানের দাবি।

খ. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী ও রাসূল- অন্তরে এ চেতনা উজ্জীবিত রাখতে হবে। এ চেতনা তাঁর অনুসরণে প্রাণশক্তি জোগাবে।

গ. ইসলাম আমার দীন। এটা আমার গৌরব। এ গৌরববোধ একজন মুমিনের পক্ষে সকল ক্ষেত্রে দীনের উপর চলার অনুপ্রেরণা।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান