আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

৪. অধ্যায়ঃ পবিত্রতা

হাদীস নং: ২৮৬
অধ্যায়ঃ পবিত্রতা
উযু করা ও উত্তমরূপে উযু করার প্রতি অনুপ্রেরণা
২৮৬. মুসলিম শরীফে আবু হাযিম সূত্রে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ একদা হযরত আবু হুরায়রা (রা) সালাতের জন্য উযূ করছিলেন, আর আমি তখন তাঁর পিছনে দাঁড়ানো ছিলাম। এরপর তিনি তাঁর হাত বগল পর্যন্ত ধৌত করলেন। আমি তাঁকে বললামঃ হে আবু হুরায়রা। এ কোন ধরনের উযু? তিনি বললেনঃ হে বনী ফাররূখ! তোমরা এখানে তা যদি আমি জানতাম, তাহলে এরূপ উযূ করতাম না। আমি আমার (পরম) বন্ধু রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে বলতে শুনেছিঃ মুমিন ব্যক্তির উযূর পানি যতদূর পৌঁছবে, (জান্নাতের) অলংকার ততদূর পৌছবে।
(ইবন খুযায়মা তাঁর 'সহীহ' গ্রন্থে অনুরূপ বর্ণনা করেন। তবে তিনি বলেন, "আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে বলতে শুনেছি: অলংকার উযূর স্থানসমূহে পৌঁছবে। الحلية জান্নাতীর চূড়ি ইত্যাদি যা পরানো হবে তা অথবা অনুরূপ।
كتاب الطَّهَارَة
التَّرْغِيب فِي الْوضُوء وإسباغه
286 - وَلمُسلم عَن أبي حَازِم قَالَ كنت خلف أبي هُرَيْرَة وَهُوَ يتَوَضَّأ للصَّلَاة فَكَانَ يمد يَده حَتَّى يبلغ إبطه فَقلت لَهُ يَا أَبَا هُرَيْرَة مَا هَذَا الْوضُوء فَقَالَ يَا بني فروخ أَنْتُم هَاهُنَا لَو علمت أَنكُمْ هَاهُنَا مَا تَوَضَّأت هَذَا الْوضُوء سَمِعت خليلي رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول تبلغ الْحِلْية من الْمُؤمن حَيْثُ الْوضُوء
وَرَوَاهُ ابْن خُزَيْمَة فِي صَحِيحه بِنَحْوِ هَذَا إِلَّا أَنه قَالَ سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول إِن الْحِلْية تبلغ مَوَاضِع الطّهُور
الْحِلْية مَا يحلى بِهِ أهل الْجنَّة من الأساور وَنَحْوهَا

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছে হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে خَلِيْلٌ শব্দে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ বন্ধু, সঙ্গী। শব্দটির উৎপত্তি خَلَّةٌ থেকে। خَلَّةٌ এর অর্থ প্রয়োজন, অভ্যন্তর, গুণ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ফাঁকা স্থান, হৃদ্যতা, সৌহার্দ্য, মৈত্রী, বন্ধুত্ব ইত্যাদি। উলামায়ে কেরাম ধাতুগত অর্থের দিকে লক্ষ করে خَلِيْلٌ শব্দটির অর্থ করেন, অন্তরঙ্গ বন্ধু অর্থাৎ এমন বন্ধু, যার মুহাব্বত ও ভালোবাসা হৃদয়ের অভ্যন্তরে পৌছে যায় এবং সে ভালোবাসা হৃদয়কে এমনভাবে পরিপূর্ণ করে ফেলে যে, অন্য কারও প্রেম-ভালোবাসার কোনও স্থান সেখানে থাকে না. এমনকি তার কোনও প্রয়োজনও থাকে না।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে শব্দটি ব্যবহার করে যেন বোঝাচ্ছেন তাঁর অন্তর নবীপ্রেমে ঠাসা। সেখানে অন্য কারও মুহাব্বত ও ভালোবাসার কোনও স্থান নেই। যেন এই ভালোবাসা তাঁর স্বভাব-প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গেছে।

প্রশ্ন হতে পারে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো ইরশাদ করেছেন-

لَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيلاً لاَتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلاً وَلَكِنَّهُ أَخِي وَصَاحِبِي وَقَدِ اتَّخَذَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ صَاحِبَكُمْ خَلِيلا

(আমি যদি কাউকে খলীলরূপে গ্রহণ করতাম, তবে আবূ বকরকেই গ্রহণ করতাম। কিন্তু সে আমার ভাই ও আমার বন্ধু। আল্লাহ তা'আলাই তোমাদের সঙ্গীকে (অর্থাৎ আমাকে) বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন)। (সহীহ মুসলিম: ২৩৮৩)

এ অবস্থায় হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বন্ধু বললেন কীভাবে?

উত্তর হলো, প্রকৃতপক্ষে উভয় কথার মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পক্ষ হতে কোনও মানুষকে খলীল না বানানোর কথা বলেছেন। কোনও সাহাবী বা অন্য কারও পক্ষ হতে তাঁকে খলীল বানানো যাবে না, এরূপ কথা তিনি বলেননি। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. তো জানাচ্ছেন যে, তিনি নিজের পক্ষ হতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খলীলরূপে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বটা হয়েছে হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর পক্ষ হতে, যা উল্লিখিত হাদীছের বিরোধী নয়।

হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর এ বক্তব্য যে, আমি আমার খলীল ও অন্তরঙ্গ বন্ধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, এর দ্বারা তিনি হাদীছটির গুরুত্ব ও মাহাত্ম্যের প্রতি শ্রোতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। এক তো তিনি জানাচ্ছেন যে, হাদীছটি তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে সরাসরি শুনেছেন, অন্য কারও মাধ্যমে নয়।
দ্বিতীয়ত তিনি হাদীছটির ভাব ও মর্মবস্তুতে এতটা অভিভূত যে, এর সূত্র বর্ণনায় সব সময়কার মতো 'রাসূলুল্লাহ' না বলে ভক্তি-ভালোবাসার অভিব্যক্তির সঙ্গে 'আমার খলীল' শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুতরাং আমাদেরও হাদীছটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং এর দাবি অনুযায়ী কাজও করতে হবে।

হাদীছটিতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- تبلغُ الحِلْيةُ من المؤمِنِ حيث يبلُغُ الوضوءُ (মুমিনের অলংকার ওই পর্যন্ত পৌছাবে, যে পর্যন্ত তার ওযূর পানি পৌঁছায়)। জান্নাতে মুমিনদের বিভিন্ন অলংকারে ভূষিত করা হবে। যেমন ইরশাদ হয়েছে-

يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيَابًا خُضْرًا مِّن سُندُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ

তাদেরকে সেখানে স্বর্ণকঙ্কনে অলংকৃত করা হবে। আর তারা মিহি ও পুরু সবুজ রেশমি কাপড় পরিহিত থাকবে। (সূরা কাহফ, আয়াত ৩১)

অন্যত্র ইরশাদ-

جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا ۖ وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ

স্থায়ী বসবাসের জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে। সেখানে তাদেরকে সোনার বালা ও মোতির দ্বারা অলংকৃত করা হবে আর সেখানে তাদের পোশাক হবে রেশম। (সূরা ফাতির, আয়াত ৩৩)

আখিরাত হলো কর্মফল ভোগের জায়গা আর দুনিয়া কর্মের স্থান। এখানে বিধি-নিষেধ আছে। ওখানে কোনও বিধি-নিষেধ নেই। তাই এখানে পুরুষের জন্য রেশমি কাপড় ও সোনার অলংকার ব্যবহার করা হারাম। কিন্তু ওখানে হারাম নয়; বরং পুরস্কার। যারা দুনিয়ায় রেশমি কাপড় ও স্বর্ণালংকার ব্যবহার থেকে বেঁচে থাকবে, তারা আখিরাতে এর দ্বারা পুরস্কৃত হবে। তাদেরকে রেশমি কাপড় ও স্বর্ণালংকারের ভূষণ দেওয়া হবে।

যেসব কারণে মুমিনগণ জান্নাতে অলংকার দ্বারা সজ্জিত হবে, তার একটি হলো ওযূ করা। ওযূর পানি হাত ও পায়ের যতদূর পৌঁছবে, ততদূর পর্যন্ত তাদের অলংকারও পৌঁছবে। কুরআন মাজীদের বর্ণনা অনুযায়ী সে অলংকার হবে সোনা-রুপার বালা। এর দ্বারা উৎসাহ পাওয়া যায় যে, ওযূ করার সময় ফরয পরিমাণের অতিরিক্ত কিছুটা অংশও ধোওয়া হবে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. সাহাবায়ে কেরাম নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসতেন সর্বাপেক্ষা বেশি। আমাদের অন্তরেও তাঁদের মতো নবীপ্রেম থাকা চাই।

খ. জান্নাতে মুমিনদেরকে অলংকার দ্বারা সজ্জিত করা হবে।

গ. আমাদেরকে অবশ্যই সুন্দর ও সুচারুরূপে ওযূ করতে হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান