আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ
৬. অধ্যায়ঃ নফল
হাদীস নং: ৯৭৫
অধ্যায়ঃ নফল
সকাল ও সন্ধ্যায় কতিপয় আয়াত তিলাওয়াত ও যিকর করার প্রতি অনুপ্রেরণা
৯৭৫. হযরত আবূ সাল্লাম মামতুর হাবাশী (রা) থেকে বর্ণিত। একদা তিনি হিমসের এক মসজিদে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় তাঁর কাছ দিয়ে এক ব্যক্তি পথ অতিক্রম করছিল। তারা বলল: এতো রাসূলুল্লাহ (সা) এর খাদিম। সেমতে তিনি দাঁড়ালেন। সে বলল, আপনি আমার নিকট এমন একটি হাদীস বর্ণনা করুন, যাতে আপনার ও তাঁর মধ্যে মিথ্যাবাদীর অনুপ্রবেশ ঘটেনি। তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় বলেঃ
رَضِينَا بِاللَّه رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دينا وَبِمُحَمَّدٍ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم رَسُولا
"আল্লাহকে রবরূপে এবং ইসলামকে দীনরূপে এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল মেনে নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট।" এই দু'আ পাঠ করবে, তার প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করা আল্লাহ নিজের উপর অপরিহার্য করে নেন।
(আবূ দাউদ নিজ শব্দযোগে এবং তিরমিযী আবু সা'দ সা'ঈদ ইবন মারযুবান হতে, তিনি আবু সালামা থেকে,
তিনি সাওবান থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন: এ হাদীসটি হাসান-গরীব। অন্য নুসখায় হাসান-সহীহ উল্লেখিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযীর মতে এরূপ নয়, বরং তাঁর মতে وَبِمُحَمَّدٍ نَبيا তিনি বলেন, দুটো শব্দ এভাবে একত্র করে বলা উচিত وَبِمُحَمَّدٍ نَبيا ورسولا ইবন মাজাহ সাবিক থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ-এর খাদিম আবু সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। আহমদ ও হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন: হাদীসটি আবু সাল্লাম সাবিক ইবন নাজীয়া থেকে বর্ণিত। আহমদ-এর নিকটও এরূপ। তিনি বলেন ذَلِك .....حين يصبح ইমাম মুসলিম আবু সাঈদ (রা) থেকে الصَّباح والمساء শব্দদ্বয় ব্যতীত অনুরূপ বর্ণনা করেন। তবে তাঁর হাদীসের শেষাংশে وَجَبت لَهُ الْجنَّة (তার জন্য জান্নাত অবধারিত) এসেছে। ইবন আবদুল বার তাঁর 'ইসতিয়াব' গ্রন্থে ইবন মাজাহ থেকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: হাদীসটি ওয়াকী মিসআর হতে, তিনি আবু আকীল থেকে, তিনি আবূ সালামা থেকে, তিনি সাবিক থেকে বর্ণনা করেন। তবে তাঁর বর্ণনায় ভুল রয়েছে। অনুরূপ সাল্লাম (র) .... আবূ সালামা (রা) -এর বর্ণনায়ও ভুল রয়েছে। তিনি বলেন, সাবিক-এর সাহাবী হওয়া বিশুদ্ধ মতে যথার্থ নয়।)
رَضِينَا بِاللَّه رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دينا وَبِمُحَمَّدٍ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم رَسُولا
"আল্লাহকে রবরূপে এবং ইসলামকে দীনরূপে এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল মেনে নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট।" এই দু'আ পাঠ করবে, তার প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করা আল্লাহ নিজের উপর অপরিহার্য করে নেন।
(আবূ দাউদ নিজ শব্দযোগে এবং তিরমিযী আবু সা'দ সা'ঈদ ইবন মারযুবান হতে, তিনি আবু সালামা থেকে,
তিনি সাওবান থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন: এ হাদীসটি হাসান-গরীব। অন্য নুসখায় হাসান-সহীহ উল্লেখিত হয়েছে। ইমাম তিরমিযীর মতে এরূপ নয়, বরং তাঁর মতে وَبِمُحَمَّدٍ نَبيا তিনি বলেন, দুটো শব্দ এভাবে একত্র করে বলা উচিত وَبِمُحَمَّدٍ نَبيا ورسولا ইবন মাজাহ সাবিক থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ-এর খাদিম আবু সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। আহমদ ও হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন: হাদীসটি আবু সাল্লাম সাবিক ইবন নাজীয়া থেকে বর্ণিত। আহমদ-এর নিকটও এরূপ। তিনি বলেন ذَلِك .....حين يصبح ইমাম মুসলিম আবু সাঈদ (রা) থেকে الصَّباح والمساء শব্দদ্বয় ব্যতীত অনুরূপ বর্ণনা করেন। তবে তাঁর হাদীসের শেষাংশে وَجَبت لَهُ الْجنَّة (তার জন্য জান্নাত অবধারিত) এসেছে। ইবন আবদুল বার তাঁর 'ইসতিয়াব' গ্রন্থে ইবন মাজাহ থেকে সহীহ সনদে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: হাদীসটি ওয়াকী মিসআর হতে, তিনি আবু আকীল থেকে, তিনি আবূ সালামা থেকে, তিনি সাবিক থেকে বর্ণনা করেন। তবে তাঁর বর্ণনায় ভুল রয়েছে। অনুরূপ সাল্লাম (র) .... আবূ সালামা (রা) -এর বর্ণনায়ও ভুল রয়েছে। তিনি বলেন, সাবিক-এর সাহাবী হওয়া বিশুদ্ধ মতে যথার্থ নয়।)
كتاب النَّوَافِل
التَّرْغِيب فِي آيَات وأذكار يَقُولهَا إِذا أصبح وَإِذا أَمْسَى
975 - وَعَن أبي سَلام رَضِي الله عَنهُ وَهُوَ مَمْطُور الحبشي أَنه كَانَ فِي مَسْجِد حمص فَمر بِهِ رجل فَقَالُوا هَذَا خَادِم رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فَقَامَ إِلَيْهِ فَقَالَ حَدثنِي بِحَدِيث سمعته من رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم لم يتداوله بَيْنك وَبَينه الدَّجَّال فَقَالَ سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول من قَالَ إِذا أصبح وَإِذا أَمْسَى رَضِينَا بِاللَّه رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دينا وَبِمُحَمَّدٍ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم رَسُولا إِلَّا كَانَ حَقًا على الله أَن يرضيه
رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَاللَّفْظ لَهُ وَالتِّرْمِذِيّ من رِوَايَة أبي سعد سعيد بن الْمَرْزُبَان عَن أبي سَلمَة عَن ثَوْبَان وَقَالَ حَدِيث حسن غَرِيب وَفِي بعض النّسخ حسن صَحِيح وَهُوَ بعيد وَعِنْده وَبِمُحَمَّدٍ نَبيا فَيَنْبَغِي أَن يجمع بَينهمَا فَيُقَال وَبِمُحَمَّدٍ نَبيا ورسولا
وَرَوَاهُ ابْن مَاجَه عَن سَابق عَن أبي سَلام رَضِي الله عَنهُ خَادِم النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَرَوَاهُ أَحْمد وَالْحَاكِم فَقَالَا عَن أبي سَلام سَابق بن نَاجِية وَعند أَحْمد أَنه يَقُول ذَلِك ثَلَاث مَرَّات حِين يُمْسِي وَحين يصبح وَهُوَ فِي مُسلم من حَدِيث أبي سعيد من غير ذكر الصَّباح
والمساء وَقَالَ فِي آخِره وَجَبت لَهُ الْجنَّة صحّح ابْن عبد الْبر النمري فِي الِاسْتِيعَاب رِوَايَة ابْن مَاجَه وَقَالَ رَوَاهُ وَكِيع عَن مسعر عَن أبي عقيل عَن أبي سَلامَة عَن سَابق فَأَخْطَأَ فِيهِ وَكَذَا فِي سَلام أبي سَلامَة فَأَخْطَأَ فِيهِ
قَالَ وَلَا يَصح سَابق فِي الصَّحَابَة
رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَاللَّفْظ لَهُ وَالتِّرْمِذِيّ من رِوَايَة أبي سعد سعيد بن الْمَرْزُبَان عَن أبي سَلمَة عَن ثَوْبَان وَقَالَ حَدِيث حسن غَرِيب وَفِي بعض النّسخ حسن صَحِيح وَهُوَ بعيد وَعِنْده وَبِمُحَمَّدٍ نَبيا فَيَنْبَغِي أَن يجمع بَينهمَا فَيُقَال وَبِمُحَمَّدٍ نَبيا ورسولا
وَرَوَاهُ ابْن مَاجَه عَن سَابق عَن أبي سَلام رَضِي الله عَنهُ خَادِم النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم وَرَوَاهُ أَحْمد وَالْحَاكِم فَقَالَا عَن أبي سَلام سَابق بن نَاجِية وَعند أَحْمد أَنه يَقُول ذَلِك ثَلَاث مَرَّات حِين يُمْسِي وَحين يصبح وَهُوَ فِي مُسلم من حَدِيث أبي سعيد من غير ذكر الصَّباح
والمساء وَقَالَ فِي آخِره وَجَبت لَهُ الْجنَّة صحّح ابْن عبد الْبر النمري فِي الِاسْتِيعَاب رِوَايَة ابْن مَاجَه وَقَالَ رَوَاهُ وَكِيع عَن مسعر عَن أبي عقيل عَن أبي سَلامَة عَن سَابق فَأَخْطَأَ فِيهِ وَكَذَا فِي سَلام أبي سَلامَة فَأَخْطَأَ فِيهِ
قَالَ وَلَا يَصح سَابق فِي الصَّحَابَة
হাদীসের ব্যাখ্যা:
১. সুবহানাল্লাহ! কতবড় সৌভাগ্যের সুসংবাদ যে, যে মুসলিম বান্দা এ সংক্ষিপ্ত কালিমাগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তিন তিনবার মাত্র উচ্চারণ করে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর দীনের সাথে তার ঈমানী সম্পর্ককে মযবূত করবে, আল্লাহ তা'আলার ফয়সালা হচ্ছে কিয়ামতের দিন তিনি তাকে অবশ্যই খুশি করবেন।
বস্তুত এত বড় সুসংবাদের কথা জানার পরও এ বিরাট নিয়ামত লাভে তৎপর না হওয়া বা এ থেকে গাফেল থাকা চরম বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
২.
'আল্লাহ আমার রব্ব'-এর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশের অর্থ
رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبًّا (আল্লাহ আমার রব্ব, এতে আমি সন্তুষ্ট)। এখানে দু'টি কথা। এক হলো আল্লাহ তা'আলা রব্ব ও প্রতিপালক। দ্বিতীয় হলো এর উপর আমার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তা'আলা রব্ব- এ কথার অর্থ আল্লাহ তা'আলা আমার সৃষ্টিকর্তা, আমার প্রতিপালক, আমার জীবন ও মরণের মালিক। তিনি সারা জাহানের মালিক ও মাবুদ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ও পরিচালনা করছেন।
এ কথার উপর আমার সন্তুষ্টির অর্থ হলো- আমি আমার অন্তরে এ বিশ্বাস পোষণ করি। সুতরাং আমি কেবল তাঁকেই ভালোবাসি, তাঁকেই ভয় করি, তাঁরই কাছে আশা রাখি। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি। আমি তাঁর বিকল্প খুঁজি না। আমি তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকি, কোনও আপত্তি তুলি না। আমি একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই ইবাদত করি। আমি তাঁরই আদেশ-নিষেধ পালনে বদ্ধপরিকর।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার রাসূল এ কথার প্রতি সন্তুষ্টির অর্থ
وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) মুহাম্মাদ আমার রাসূল'। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূল- এর অর্থ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে শেষ যমানার নবী-রাসূল করে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের কাছে তাঁর আদেশ-নিষেধ পৌঁছিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের প্রতি তাঁর সর্বশেষ কিতাব কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। তিনি সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোনও নবী-রাসূল আসবে না। এটা আমার বিশ্বাস। আমি এ বিশ্বাসে সন্তুষ্ট। তিনি আমার ভালোবাসা। আমি নিজ প্রাণ অপেক্ষাও তাঁকে বেশি ভালোবাসি। সুতরাং তিনি যে হিদায়াত নিয়ে এসেছেন, আমি খুশিমনে তার অনুসরণ করব। আমি তাঁর সুন্নতমতো জীবনযাপন করব। তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শের উপর অন্য কোনওকিছুকে প্রাধান্য দিব না। বরং আমি আমার জান-মাল দিয়ে তাঁর সুন্নাহের প্রচার-প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত থাকব।
আমি এতে সন্তুষ্ট যে, ইসলাম আমার দীন
وَبِالْإِسْلَام دِينًا 'এবং (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) ইসলাম আমার দীন'। দীন হলো কতিপয় আকীদা-বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের সমষ্টি। এর নাম ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে এ দীন প্রদান করেছেন। সবশেষে হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে এটাকে পরিপূর্ণ করেছেন। এ দীনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে কুরআন-সুন্নাহে। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে ইসলাম নামক দীনের নি'আমত দান করেছেন। আমি এর প্রতিটি আদেশ-নিষেধে সন্তুষ্ট। আমি সর্বান্তঃকরণে তা গ্রহণ করে নিয়েছি। আমার অন্তরে দীনের কোনও বিধান নিয়ে বিন্দুমাত্র খটকা নেই। বরং আমি এর অনুসরণ করে পরিতৃপ্তি বোধ করি। আমি এতে শান্তি অনুভব করি। জীবনের কোনও ক্ষেত্রে এ দীনের কোনও বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না। এ দীন পরিপূর্ণ। তাই এর কোনও বিকল্প থাকতেও পারে না। কাজেই এ দীনের অনুসরণকেই আমি আমার দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের নাজাত লাভের উপায় বলে বিশ্বাস করি।
সুতরাং আযানের এ দুআটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটা নিজ ঈমানের ঘোষণা এবং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনযাপনের এক অঙ্গীকার। আযানের পর নামায আদায় এ অঙ্গীকারের প্রথম প্রতিফলন। অতঃপর নামাযীর কর্তব্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার একজন অনুগত বান্দারূপে আপন কর্তব্যকর্মে নিয়োজিত থাকা। যেহেতু এ দুআ এক পরম আনুগত্যের অঙ্গীকার, তাই এর ফযীলতও অনেক বড়।
দুআটির ফযীলত
এ দু'আটির একটি নগদ লাভও আছে। সে লাভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা যেহেতু নিজ ঈমানের ঘোষণা দেওয়া হয়, তাতে নিজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয় এবং সে ঈমানের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনাচারের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়, তাই অন্তরে ঈমানের স্বাদ এসে যায়। ভাবতে ভালো লাগে যে, আল্লাহ আমার রব্ব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী এবং ইসলাম আমার দীন। এ ভালো লাগার কারণে দীনের উপর চলা সহজ হয়ে যায়; বরং দীনের প্রতিটি বিধান পালনে এক অনির্বচনীয় আনন্দ বোধ হয়। সুতরাং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীছে ইরশাদ করেন-
ذَاقَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا.
যে ব্যক্তি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তার রব্ব, ইসলাম তার দীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রাসূল, সে ঈমানের স্বাদ পেয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৪; জামে তিরমিযী: ২৬২৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৭৭৯; মুসনাদুল বাযযার: ১৩১৮; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৬৬৯২; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৯৪; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ১৯৫; শু'আবুল ঈমান ১৯৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৪)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. আল্লাহ আমার রব্ব- এ বিশ্বাসে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহমুখী করে রাখা ও আল্লাহর আনুগত্যে নিবেদিত থাকা ঈমানের দাবি।
খ. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী ও রাসূল- অন্তরে এ চেতনা উজ্জীবিত রাখতে হবে। এ চেতনা তাঁর অনুসরণে প্রাণশক্তি জোগাবে।
গ. ইসলাম আমার দীন। এটা আমার গৌরব। এ গৌরববোধ একজন মুমিনের পক্ষে সকল ক্ষেত্রে দীনের উপর চলার অনুপ্রেরণা।
বস্তুত এত বড় সুসংবাদের কথা জানার পরও এ বিরাট নিয়ামত লাভে তৎপর না হওয়া বা এ থেকে গাফেল থাকা চরম বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
২.
'আল্লাহ আমার রব্ব'-এর প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশের অর্থ
رَضِيْتُ بِاللَّهِ رَبًّا (আল্লাহ আমার রব্ব, এতে আমি সন্তুষ্ট)। এখানে দু'টি কথা। এক হলো আল্লাহ তা'আলা রব্ব ও প্রতিপালক। দ্বিতীয় হলো এর উপর আমার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তা'আলা রব্ব- এ কথার অর্থ আল্লাহ তা'আলা আমার সৃষ্টিকর্তা, আমার প্রতিপালক, আমার জীবন ও মরণের মালিক। তিনি সারা জাহানের মালিক ও মাবুদ। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ও পরিচালনা করছেন।
এ কথার উপর আমার সন্তুষ্টির অর্থ হলো- আমি আমার অন্তরে এ বিশ্বাস পোষণ করি। সুতরাং আমি কেবল তাঁকেই ভালোবাসি, তাঁকেই ভয় করি, তাঁরই কাছে আশা রাখি। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি। আমি তাঁর বিকল্প খুঁজি না। আমি তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকি, কোনও আপত্তি তুলি না। আমি একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই ইবাদত করি। আমি তাঁরই আদেশ-নিষেধ পালনে বদ্ধপরিকর।
মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার রাসূল এ কথার প্রতি সন্তুষ্টির অর্থ
وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) মুহাম্মাদ আমার রাসূল'। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাসূল- এর অর্থ আল্লাহ তা'আলা তাঁকে শেষ যমানার নবী-রাসূল করে পাঠিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের কাছে তাঁর আদেশ-নিষেধ পৌঁছিয়েছেন। তিনি তাঁর মাধ্যমে আমাদের প্রতি তাঁর সর্বশেষ কিতাব কুরআন মাজীদ নাযিল করেছেন। তিনি সর্বশেষ নবী। তাঁর পর আর কোনও নবী-রাসূল আসবে না। এটা আমার বিশ্বাস। আমি এ বিশ্বাসে সন্তুষ্ট। তিনি আমার ভালোবাসা। আমি নিজ প্রাণ অপেক্ষাও তাঁকে বেশি ভালোবাসি। সুতরাং তিনি যে হিদায়াত নিয়ে এসেছেন, আমি খুশিমনে তার অনুসরণ করব। আমি তাঁর সুন্নতমতো জীবনযাপন করব। তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শের উপর অন্য কোনওকিছুকে প্রাধান্য দিব না। বরং আমি আমার জান-মাল দিয়ে তাঁর সুন্নাহের প্রচার-প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত থাকব।
আমি এতে সন্তুষ্ট যে, ইসলাম আমার দীন
وَبِالْإِسْلَام دِينًا 'এবং (আমি এতে সন্তুষ্ট যে,) ইসলাম আমার দীন'। দীন হলো কতিপয় আকীদা-বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের সমষ্টি। এর নাম ইসলাম। আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক যুগে নবী-রাসূলগণের মাধ্যমে মানুষকে এ দীন প্রদান করেছেন। সবশেষে হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে এটাকে পরিপূর্ণ করেছেন। এ দীনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে কুরআন-সুন্নাহে। আমি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলা আমাকে ইসলাম নামক দীনের নি'আমত দান করেছেন। আমি এর প্রতিটি আদেশ-নিষেধে সন্তুষ্ট। আমি সর্বান্তঃকরণে তা গ্রহণ করে নিয়েছি। আমার অন্তরে দীনের কোনও বিধান নিয়ে বিন্দুমাত্র খটকা নেই। বরং আমি এর অনুসরণ করে পরিতৃপ্তি বোধ করি। আমি এতে শান্তি অনুভব করি। জীবনের কোনও ক্ষেত্রে এ দীনের কোনও বিকল্প আছে বলে আমি মনে করি না। এ দীন পরিপূর্ণ। তাই এর কোনও বিকল্প থাকতেও পারে না। কাজেই এ দীনের অনুসরণকেই আমি আমার দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের নাজাত লাভের উপায় বলে বিশ্বাস করি।
সুতরাং আযানের এ দুআটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটা নিজ ঈমানের ঘোষণা এবং আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনযাপনের এক অঙ্গীকার। আযানের পর নামায আদায় এ অঙ্গীকারের প্রথম প্রতিফলন। অতঃপর নামাযীর কর্তব্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার একজন অনুগত বান্দারূপে আপন কর্তব্যকর্মে নিয়োজিত থাকা। যেহেতু এ দুআ এক পরম আনুগত্যের অঙ্গীকার, তাই এর ফযীলতও অনেক বড়।
দুআটির ফযীলত
এ দু'আটির একটি নগদ লাভও আছে। সে লাভ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর দ্বারা যেহেতু নিজ ঈমানের ঘোষণা দেওয়া হয়, তাতে নিজ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয় এবং সে ঈমানের দাবি অনুযায়ী আল্লাহ তা'আলার আনুগত্য, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও ইসলাম মোতাবেক জীবনাচারের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়, তাই অন্তরে ঈমানের স্বাদ এসে যায়। ভাবতে ভালো লাগে যে, আল্লাহ আমার রব্ব, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী এবং ইসলাম আমার দীন। এ ভালো লাগার কারণে দীনের উপর চলা সহজ হয়ে যায়; বরং দীনের প্রতিটি বিধান পালনে এক অনির্বচনীয় আনন্দ বোধ হয়। সুতরাং প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীছে ইরশাদ করেন-
ذَاقَ طَعْمَ الْإِيْمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبَّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا.
যে ব্যক্তি এতে সন্তুষ্ট যে, আল্লাহ তার রব্ব, ইসলাম তার দীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রাসূল, সে ঈমানের স্বাদ পেয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম: ৩৪; জামে তিরমিযী: ২৬২৩; মুসনাদে আহমাদ: ১৭৭৯; মুসনাদুল বাযযার: ১৩১৮; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৬৬৯২; সহীহ ইবন হিব্বান ১৬৯৪; বায়হাকী, আল আসমা ওয়াস সিফাত: ১৯৫; শু'আবুল ঈমান ১৯৫; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ২৪)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. আল্লাহ আমার রব্ব- এ বিশ্বাসে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহমুখী করে রাখা ও আল্লাহর আনুগত্যে নিবেদিত থাকা ঈমানের দাবি।
খ. মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নবী ও রাসূল- অন্তরে এ চেতনা উজ্জীবিত রাখতে হবে। এ চেতনা তাঁর অনুসরণে প্রাণশক্তি জোগাবে।
গ. ইসলাম আমার দীন। এটা আমার গৌরব। এ গৌরববোধ একজন মুমিনের পক্ষে সকল ক্ষেত্রে দীনের উপর চলার অনুপ্রেরণা।
১. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.) ২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)