আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

১৩. অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ

হাদীস নং: ২২০৪
অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ
অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ
সালাত ও এর বাইরে কুরআন পাঠের প্রতি উৎসাহ দান, কুরআন শিক্ষা ও এর শিক্ষাদানের ফযীলত এবং সিজদা-ই-তিলাওয়াত আদায়ের প্রতি উৎসাহ দান প্রসঙ্গে
২২০৪. হযরত আবু উমামা বাহিলী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি যে, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা কুরআন কিয়ামতের দিন তার সংশ্লিষ্টদের সুপারিশকারী হয়ে আসবে। হাদীসের শেষ পর্যন্ত।
(মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেন। পূর্ণ হাদীসটি ইনশা আল্লাহ্ সামনে আসবে।)
كتاب قِرَاءَة الْقُرْآن
كتاب قِرَاءَة الْقُرْآن
التَّرْغِيب فِي قِرَاءَة الْقُرْآن فِي الصَّلَاة وَغَيرهَا وَفضل تعلمه وتعليمه وَالتَّرْغِيب فِي سُجُود التِّلَاوَة
2204 - وَعَن أبي أُمَامَة الْبَاهِلِيّ رَضِي الله عَنهُ قَالَ سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول اقرؤوا الْقُرْآن فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْم الْقِيَامَة شَفِيعًا لاصحابه

الحَدِيث رَوَاهُ مُسلم وَيَأْتِي بِتَمَامِهِ إِن شَاءَ الله

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীছটিতে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াতের একটি ফযীলত এই বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন কুরআন তার তিলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশকারী হবে। এ এক বিরাট ফযীলত। কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত আছে আরও বহু। তবে কেবল এই একটি ফযীলতও যদি থাকত, তবুও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই তিলাওয়াত করা জরুরি হতো। কেননা কিয়ামত এক ভয়াবহ দিন। সেদিন প্রত্যেকে ইয়া নাফসী ইয়া নাফসী করবে। প্রত্যেকেরই নিজেকে নিয়ে চিন্তা হবে, হায় আমার কী হবে, হায় আমার কী হবে! সেদিন মহাবিচারক আল্লাহ তা'আলার বিচারের দরবার বসবে। প্রত্যেককে তার পাপ-পুণ্যের বদলা দেওয়া হবে। আল্লাহ তা'আলার জালাল ও মহাপ্রতাপ গুণের প্রকাশ ঘটবে। নবী-রাসুলগণ পর্যন্ত প্রচণ্ড ভয়ের মধ্যে থাকবেন। সাধারণদের ভয়ের কোনও সীমা থাকবে না। প্রত্যেকেরই নিজ পাপকর্মের দিকে খেয়াল যাবে। সবকিছু মনে পড়ে যাবে। আমলনামাও খুলে দেওয়া হবে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنشُورًا اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَىٰ بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا

এবং কিয়ামতের দিন আমি (তার আমলনামা) লিপিবদ্ধরূপে তার সামনে বের করে দেব, যা সে উন্মুক্ত পাবে। (বলা হবে) তুমি নিজ আমলনামা পড়ো। আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাব নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ১৩, ১৪)

ঘোরতর বিপদের সে দিনে প্রত্যেকের নিজেকে বড় অসহায় বোধ হবে। এ অবস্থায় কোনও সাহায্যকারীর প্রয়োজন মনে হবে। কিন্তু প্রত্যেকেই যখন নিজের চিন্তায় বিভোর থাকবে, তখন কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসবে? দয়াময় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য সে ব্যবস্থাও করে রেখেছেন। তবে সে ব্যবস্থা বান্দাকে অবলম্বন করতে হবে ইহজীবনেই, এই দুনিয়ায়। ব্যবস্থাটি হলো কুরআন মাজীদের বেশি বেশি তিলাওয়াত ও কুরআন মাজীদের যথাযথ অনুসরণ।

হাদীছটিতে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন কুরআন সুপারিশকারী হবে। কার জন্য সুপারিশকারী হবে? বলা হয়েছে- لأَصْحَابه (তার নিয়মিত পাঠকদের জন্য)। أَصْحَابُ শব্দটি صَاحِبُ এর বহুবচন। এর মূল হলো صُحْبَةٌ (সাহচর্য)। কাজেই আসহাবুল কুরআন বলা হবে তাদেরকেই, যারা কুরআনের সঙ্গ ও সাহচর্য অবলম্বন করে। অর্থাৎ নিয়মিত কুরআন পড়ে। যে ব্যক্তি মাঝেমধ্যে কখনও পড়ে, তাকে সাহিবুল কুরআন বা কুরআনওয়ালা বলা যায় না। সুতরাং কুরআন মাজীদের এ ফযীলত পেতে হলে, কিয়ামতের দিন কুরআনকে নিজের জন্য সুপারিশকারীরূপে পেতে হলে কুরআন পড়তে হবে নিয়মিত। নিজেকে কুরআনের সঙ্গী বানিয়ে নিতে হবে। তা হতে পারে কেবল নিয়মিত পড়ার দ্বারা এবং কুরআন মাজীদের যথাযথ অনুসরণ করার দ্বারা।

'কুরআন সুপারিশকারী হবে' কথাটি দ্বারা বোঝা যায় কিয়ামতের দিন কুরআন কথা বলবে এবং কুরআনের কোনও আকৃতি থাকবে। কিন্তু কুরআন তো আল্লাহ তা'আলার কালাম, তাঁর কথা। তাঁর কালাম বা তাঁর কথা হলো তাঁর গুণ। আল্লাহ তা'আলার গুণের কোনও আকৃতি হতে পারে না। তাহলে কুরআন সুপারিশকারী হবে কীভাবে?

এর উত্তর হলো, কুরআন তিলাওয়াতের যে ছাওয়াব, সেই ছাওয়াবকে আল্লাহ তা'আলা মানুষের আকৃতি দান করবেন। সে আকৃতিটিই কথা বলবে ও সুপারিশ করবে। ছাওয়াবকে যে মানুষের আকৃতি দেওয়া হবে, তা বিভিন্ন হাদীছে প্রমাণিত যেমন কবরের অবস্থার বিবরণ সম্পর্কিত এক দীর্ঘ হাদীছে আছে-

وَيَأْتِيهِ رَجُلٌ حَسَنُ الْوَجْهِ طَيِّبُ الرِّيحِ فَيَقُولُ لَهُ: أَبْشِرْ بِالَّذِي يَسُرُّكَ، فَهَذَا يَوْمُكَ الَّذِي كُنْتَ تُوعَدُ، فَيَقُولُ: مَنْ أَنْتَ؟ فَوَجْهُكَ الْوَجْهُ الَّذِي يَأْتِي بِالْخَيْرِ، فَيَقُولُ: أَنَا عَمَلُكَ الصَّالِحُ.

তার কাছে (অর্থাৎ নেককার কবরবাসীর কাছে) সুন্দর চেহারার উত্তম সুরভির এক ব্যক্তি আসবে। সে তাকে বলবে, তুমি আনন্দদায়ক বিষয়ের সুসংবাদ নাও। এটা সেই দিন, যার ওয়াদা তোমাকে দেওয়া হয়েছিল। কবরবাসী বলবে, তুমি কে? তোমার চেহারা তো এমন চেহারা, যা কল্যাণ নিয়ে আসে। সে বলবে, আমি তোমার সৎকর্ম। (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৬৩৩৭; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ১২০৫৯; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১০৭; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ৩৯০; আল আজুররী, আশ শারী'আহ: ৮৬৪;মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ৭৮৯; ইবনুল মুবারক, আয যুহদ ওয়ার রাকাইক: ১২১৯)

কুরআন তিলাওয়াত করাও যেহেতু একটি শ্রেষ্ঠ সৎকর্ম, তাই এ সৎকর্মকেও মানবাকৃতি দান করা অসম্ভব কিছু নয়। বরং হাদীছ দ্বারা এর প্রমাণও পাওয়া যায়। যেমন এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَالرَّجُلِ الشَّاحِبِ، فَيَقُولُ : أَنَا الَّذِي أَسْهَرْتُ لَيْلَكَ، وأظمأتُ نَهَارَكَ.
কিয়ামতের দিন কুরআন বিবর্ণ এক ব্যক্তির আকৃতিতে এসে উপস্থিত হবে এবং বলবে, আমিই সেই, যে তোমার রাতকে নির্ঘুম রেখেছে এবং তোমার দিনকে রেখেছে পিপাসার্ত। (সুনানে ইবন মাজাহ: ২৭৮১)

বিবর্ণ এক ব্যক্তির আকারে আসার কারণ সম্ভবত কুরআনওয়ালার অবস্থা প্রকাশ করা। যে ব্যক্তি রাত জেগে কুরআন পড়ে, দিনেও কুরআন নিয়ে থাকে, আর এ কারণে তার বিশ্রামের সুযোগ কম হয়, তার শরীরে স্বাভাবিকভাবেই এর আছর পড়বে বৈ কি। তিলাওয়াতের শ্রম-সাধনার বিনিময়ে যে ছাওয়াব তার অর্জিত হবে, তা বিবর্ণ ব্যক্তির তার স্বাস্থ্যহানি ঘটবে এবং তার চেহারার রং বদলে যাবে। এ কারণেই কুরআন আকৃতিতে হাজির হবে। আর এরূপ চেহারায় সে যখন আল্লাহ তা'আলার কাছে তার পাঠকের পক্ষে সুপারিশ করবে, তখন সুপারিশ অতি সহজেই গ্রহণও করে নেওয়া হবে।

আলোচ্য হাদীছে যে বলা হয়েছে কুরআন সুপারিশকারী হবে, তা দ্বারা বান্দার মনে এ আশা সঞ্চার করাই উদ্দেশ্য যে, কুরআনের সুপারিশ অবশ্যই গৃহীত হবে। কাজেই তার সুপারিশ লাভের উদ্দেশ্যে বেশি বেশি কুরআন পাঠ করো। হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

يَجِيءُ الْقُرْآنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَقُولُ : يَا رَبِّ حَلهِ، فَيُلْبَسُ تَاجَ الكَرَامَةِ، ثُمَّ يَقُولُ: يَا رَبِّ زِدْهُ، فَيُلْبَسُ حُلَّةَ الكَرَامَةِ ، ثُمَّ يَقُولُ : يَا رَبِّ ارْضَ عَنْهُ، فَيَرْضَى عَنْهُ، فَيُقَالُ لَهُ : اقْرَأْ وَارْقَ.

কিয়ামতের দিন কুরআন এসে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! তাকে (অর্থাৎ তার পাঠককে) অলংকৃত করুন। তখন তাকে সম্মানের মুকুট পরানো হবে। কুরআন বলবে, হে আমার প্রতিপালক! তার শোভা আরও বৃদ্ধি করুন। তখন তাকে সম্মাননা পোশাক পরানো হবে। কুরআন বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আপনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন। তারপর তাকে বলা হবে, তুমি পড়তে থাকো আর উপরে চড়তে থাকো। (জামে' তিরমিযী: ২৯১৫; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩০০৪৭; মুসনাদুল বাযযার: ৯০৩৪; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২০২৯; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ১৮৪২)
হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

الْقُرْآنُ شَافِعُ مُشَقَّعُ.

'কুরআন এমন এক সুপারিশকারী, যার সুপারিশ গৃহীত হবে।' (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩০৫২; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা : ১৯৭০৬; শু'আবুল ঈমান: ১৮৫৫; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর: ৮৬৫৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ২০৮৭)

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. আখিরাতে মুমিন ব্যক্তির পক্ষে শাফা'আতের ব্যবস্থা থাকবে। এটা সত্য। এর উপর বিশ্বাস রাখতে হবে।

খ. কিয়ামতের দিন কুরআন মাজীদও সুপারিশকারীরূপে উপস্থিত হবে।

গ. কুরআনের সুপারিশ লাভ করার উদ্দেশ্যে আমাদেরকে বেশি বেশি কুরআন পাঠ করতে হবে।

ঘ. কুরআন দেখে দেখে পড়া হোক বা মুখস্থ, সর্বাবস্থায় কুরআন পাঠের এ ফযীলত অর্জিত হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান