আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

১৩. অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ

হাদীস নং: ২২১৭
অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ
অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ
সালাত ও এর বাইরে কুরআন পাঠের প্রতি উৎসাহ দান, কুরআন শিক্ষা ও এর শিক্ষাদানের ফযীলত এবং সিজদা-ই-তিলাওয়াত আদায়ের প্রতি উৎসাহ দান প্রসঙ্গে
২২১৭. হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) সূত্রে নবী করীম (ﷺ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ নিশ্চয়ই এই কুরআন হল আল্লাহর দস্তরখান। অতএব তাঁর দস্তরখান থেকে যতদূর সম্ভব তোমরা আপ্যায়ন গ্রহণ কর। নিশ্চয়ই কুরআন হচ্ছে আল্লাহর রজ্জু, প্রোজ্জ্বল আলো ও অব্যর্থ নিরাময়। একে যে আঁকড়ে থাকবে, তার জন্য এটি হবে রক্ষা কবচ। যে এর অনুসরণ করবে, তার জন্য হবে মুক্তিদাতা। সে পথভ্রষ্ট হবে না যে, তাকে ভৎসনা করা হবে। আর সে বক্র হবে না যে, তাকে সোজা করতে হবে। কুরআনের আশ্চর্য রহস্যাবলী শেষ হবে না এবং বারংবার তিলাওয়াত করলেও তা পুরনো মনে হবে না। তোমরা এ কুরআন তিলাওয়াত কর। কেননা আল্লাহ্ এর তিলাওয়াতে প্রতি অক্ষরে দশটি করে নেকী দান করেন। তোমরা শুনে নাও, আমি বলছি না যে, 'আলিফ-লাম-মীম' একটি অক্ষর, বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর ও মীম একটি অক্ষর।
(হাদীসটি হাকিম সালিহ ইবন উমর... ইবরাহীম আল-হাজারী... আবুল আহওয়াস সূত্রে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন। হাকিম বলেন, সালিহ ইবন উমর ইবরাহীম আল-হাজারী থেকে একা এ হাদীসটি বর্ণনা করেন। তবে হাদীসটি সহীহ।)
كتاب قِرَاءَة الْقُرْآن
كتاب قِرَاءَة الْقُرْآن
التَّرْغِيب فِي قِرَاءَة الْقُرْآن فِي الصَّلَاة وَغَيرهَا وَفضل تعلمه وتعليمه وَالتَّرْغِيب فِي سُجُود التِّلَاوَة
2217- وَعَن عبد الله يَعْنِي ابْن مَسْعُود رَضِي الله عَنهُ عَن النَّبِي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ إِن هَذَا الْقُرْآن مأدبة الله فاقبلوا مأدبته مَا اسْتَطَعْتُم إِن هَذَا الْقُرْآن حَبل الله والنور الْمُبين والشفاء النافع عصمَة لمن تمسك بِهِ وَنَجَاة لمن اتبعهُ لَا يزِيغ فيستعتب وَلَا يعوج فَيقوم وَلَا تَنْقَضِي عجائبه وَلَا يخلق من كَثْرَة الرَّد اُتْلُوهُ فَإِن الله يَأْجُركُمْ على تِلَاوَته كل حرف عشر حَسَنَات أما إِنِّي لَا أَقُول الم حرف وَلَكِن ألف حرف وَلَام حرف وَمِيم حرف

رَوَاهُ الْحَاكِم من رِوَايَة صَالح بن عمر عَن إِبْرَاهِيم الهجري عَن أبي الْأَحْوَص عَنهُ وَقَالَ تفرد بِهِ صَالح بن عمر عَنهُ وَهُوَ صَحِيح

হাদীসের ব্যাখ্যা:

কুরআন মাজীদ আল্লাহর কালাম। এ কালাম রহমতের অফুরন্ত ভান্ডার। সবদিক থেকেই এ গ্রন্থ কল্যাণে ভরপুর। এর অর্থ বোঝা এবং এর অনুসরণের মধ্যে অশেষ কল্যাণ তো রয়েছেই। কেবল পড়ার মধ্যেও এর উপকারিতা অসাধারণ। কেবল পড়লেও এর প্রত্যেক হরফে একটি করে নেকী পাওয়া যায় এবং সে নেকী দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়, যেমনটা এ হাদীছে বলা হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টাকে অধিকতর স্পষ্ট করার জন্য ইরশাদ করেন-

لَا أَقُوْلُ : الم حَرْفٌ، وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ، وَلَام حَرْفٌ، وَمِيم حَرْفٌ (আমি বলছি না الم একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ)। অর্থাৎ আলিফ, লাম ও মীম আলাদা আলাদা তিনটি হরফ। তাই এ তিন হরফ পড়ার দ্বারা একটি নয়; বরং তিনটি নেকী পাওয়া যাবে, যা বৃদ্ধি পেয়ে ত্রিশটি নেকীতে পরিণত হবে।

প্রশ্ন হতে পারে, الم -এর ভেতর তো তিনটি হরফই আছে, একটি হরফ নয়, কাজেই হাদীছটিতে এ তিনটিকে একটি হরফ বলার কথা আসছে কেন?

উত্তর হলো, আরবীতে অনেক সময় শব্দ (كلمة)-কেও হরফ বলা হয়ে থাকে, যেমন অনেক সময় বাক্য (كلام)- কে كلمة (শব্দ) বলা হয়। সাধারণত শব্দ গঠিত হয় কয়েকটি হরফ দ্বারা। আবার হরফের সমষ্টিকেও যখন 'হরফ' বলা হয়, তখন কেউ মনে করতে পারে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে হরফ দ্বারা শব্দ বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ প্রত্যেক শব্দে এক নেকী হবে, যা দশগুণ বৃদ্ধি করা হবে। এই সন্দেহ নিরসনের জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হরফ দ্বারা শব্দ নয়; বরং হরফই বোঝানো উদ্দেশ্য। কাজেই الم পড়ার দ্বারা আলাদা তিনটি হরফ পড়া হয়। ফলে এর দ্বারা ত্রিশটি নেকী অর্জিত হবে।

কুরআনের অর্থ জানা না থাকলেও তিলাওয়াত দ্বারা ছাওয়াব লাভ
লক্ষণীয়, হাদীছটিতে উদাহরণ হিসেবে الم আনা হয়েছে। বিভিন্ন সূরার শুরুতে এরকম কিছু হরফ আছে। এগুলোকে আল-হুরূফুল মুকাত্তা'আত বলা হয়। এর অর্থ আল্লাহ তা'আলা ছাড়া কেউ জানে না। তা সত্ত্বেও বলা হয়েছে এ হরফগুলো পড়ার দ্বারা ত্রিশ নেকী পাওয়া যাবে। বোঝা গেল ছাওয়াব পাওয়ার জন্য কুরআনের অর্থ বোঝা জরুরি নয়। অর্থ না বুঝেও কুরআন তিলাওয়াত করলে প্রত্যেক হরফে দশ নেকী পাওয়া যাবে। মনে রাখতে হবে, কুরআন মানবরচিত কোনও গ্রন্থের মতো নয়। মানুষের লেখা বই-পুস্তক না বুঝে পড়লে কোনও ফায়দা নেই। কিন্তু আল্লাহর কিতাব পুরোপুরিই নূর। এর সঙ্গে যে-কোনও রকমের সংশ্লিষ্টতাই ফায়দাজনক। বুঝে বুঝে পড়লে ফায়দা অনেক বেশি, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু না বুঝে পড়লেও যে ফায়দা আছে, আলোচ্য হাদীছই তার প্রমাণ।

বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পড়ে, সে তার বিনিময়ে একটি নেকী পাবে, যা দশগুণ বৃদ্ধি করা হবে। সুতরাং এ ছাওয়াব দেখে পড়লেও পাওয়া যাবে, মুখস্থ পড়লেও পাওয়া যাবে। মূল বিষয় হলো পড়া। পড়ার কাজটা যেভাবেই হোক তাতেই ছাওয়াব পাওয়া যাবে। যেমন অন্যকে শিক্ষাদান করা, দলীলরূপে কোনও আয়াত পেশ করা এবং তিলাওয়াতের নিয়তে তা উচ্চারণ করা, দুআর আয়াত পড়া আর তিলাওয়াতের নিয়ত রাখা ইত্যাদি। কাজেই কেউ যদি কোনও কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে আর আয়াত হিসেবে পড়ার নিয়ত রাখে, সে প্রত্যেক হরফে দশ নেকী পাবে বলে আশা করা যায়। কেননা بسم الله الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ সূরা নামলের ৩০ নং আয়াত। তাছাড়া এটি দুই সূরার মধ্যে পার্থক্যকারী আয়াতও বটে।

প্রকাশ থাকে যে, কুরআন তিলাওয়াতের এ ছাওয়াব পাওয়ার জন্য সহীহ-শুদ্ধভাবে পাঠ করা শর্ত। সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়লেই তা কুরআন পাঠ হয়, অন্যথায় তা কুরআন থাকে না, অন্য কিছু হয়ে যায়। তাই সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য যার বিশুদ্ধ তিলাওয়াত জানা আছে এমন কারও কাছে রীতিমতো মশুক করতে হবে। হাঁ, তোতলামির কারণে কিংবা নিজ অক্ষমতার কারণে যদি কেউ সহীহ-শুদ্ধভাবে পড়তে না পারে, তা ভিন্ন কথা।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন আল্লাহর কিতাব, কোনও মানবরচিত গ্রন্থ নয়।

খ. কুরআন পাঠ করলে প্রতি হরফে দশ নেকী পাওয়া যায়।

গ. কুরআন বুঝে পড়া উত্তম। তবে না বুঝে পড়লেও ছাওয়াব পাওয়া যায়।

ঘ. প্রত্যেক মুসলিমের নিয়মিত কুরআন পড়া উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান