আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

১৩. অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ

হাদীস নং: ২২৪৫
অধ্যায়ঃ কুরআন পাঠ
কুরআনের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা ও মধুর স্বরে কুরআন পাঠের প্রতি উৎসাহ দান
২২৪৫. ইবন আবু মুলায়কা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, হযরত উবায়দুল্লাহ্ ইবন আবু ইয়াগীদ (রা) বলেছেনঃ একদিন আবু লুবাবা (রা) আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। আমরা তাঁকে অনুসরণ করলাম। কিছু তিনি ঘরে ঢুকে গেলেন। আমরাও তাঁর ধরে গিয়েই উপস্থিত হলাম। দেখলাম কী, একজন ছিন্নবস্ত্রধারী লোক। সে বলছে। আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সুমধুর স্বরে কুরআন পাঠ করে না, সে আমাদের কেউ নয়। বর্ণনাকারী বলেন, আমি ইবন আবু মুলায়কাকে বললাম, হে আবু মুহাম্মদ। আপনি বলুনতো, যদি কেউ সুকন্ঠের অধিকারী না হয়? তিনি বললেন, যতদূর সম্ভব সুন্দর উচ্চারণের চেষ্টা করবে।
(হাদীসাটি আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। এর মারফু’ অংশটি বুখারী-মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণিত রয়েছে।)
كتاب قِرَاءَة الْقُرْآن
التَّرْغِيب فِي تعاهد الْقُرْآن وتحسين الصَّوْت بِهِ
2245- وَعَن ابْن أبي مليكَة قَالَ قَالَ عبيد الله بن أبي يزِيد رَضِي الله عَنْهُمَا مر بِنَا أَبُو لبَابَة فاتبعناه حَتَّى دخل بَيته فَدَخَلْنَا عَلَيْهِ فَإِذا رجل رث الْهَيْئَة يَقُول سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول لَيْسَ منا من لم يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ
قَالَ فَقلت لِابْنِ أبي مليكَة يَا أَبَا مُحَمَّد أَرَأَيْت إِن لم يكن حسن الصَّوْت قَالَ يُحسنهُ مَا اسْتَطَاعَ

وَرَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالْمَرْفُوع مِنْهُ فِي الصَّحِيحَيْنِ من حَدِيث أبي هُرَيْرَة

হাদীসের ব্যাখ্যা:

يَتَغَنَّ بِالقُرْآن এর অর্থ সুর দিয়ে কুরআন পড়া। অর্থাৎ কুরআন পাঠের যে বিশেষ সুর, সেই সুরে, ভক্তি ও মুহাব্বতের সঙ্গে এবং আল্লাহর ভয়ে কান্নার ভঙ্গিতে কুরআন পড়া। অধিকাংশের মতে হাদীছে এটাই বোঝানো উদ্দেশ্য। তবে এর মানে এ নয় যে, সংগীত শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী গানের বিভিন্ন সুরের সাথে সুর মিলিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করা হবে। এরূপ পড়াটা কুরআনের সঙ্গে সুস্পষ্ট বেআদবী। তাতে কুরআনপাঠের যে মূল উদ্দেশ্য, অন্তর নরম করা, দিল-মন আল্লাহর দিকে ঝোঁকা ও ঈমান বলীয়ান করা, তা মোটেই পূরণ হয় না। কাজেই এ জাতীয় সুরে কুরআন পাঠ করা হতে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। কোনও কোনও বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবেই এ জাতীয় সুরে কুরআন পড়তে নিষেধ করা হয়েছে।

কুরআন পাঠের নিজস্ব এক সুর আছে। সারা বিশ্বের মানুষ মৌলিকভাবে সে সুরেই কুরআন পড়ে থাকে। অঞ্চল ও পাঠকভেদে কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণ একটা মিল সকলের ও সর্বাঞ্চলের কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যেই রয়েছে। প্রত্যেকের উচিত আপন সামর্থ্য অনুযায়ী সেই সুরে যথাসম্ভব সৌন্দর্য ও মাধুর্য নিয়ে আসার চেষ্টা করা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও মধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং অন্যদেরকেও তাতে উৎসাহ দিতেন। হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. চমৎকার সুরে কুরআন পড়তেন বলে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রশংসা করেছেন। হযরত উমর ফারুক রাযি. তাঁকে বলতেন, আপনি আমাদেরকে আমাদের রব্বকে স্মরণ করিয়ে দিন। তখন হযরত আবূ মূসা রাযি. সুন্দর সুরে কুরআন পাঠ করতেন। একবার হযরত উমর ফারূক রাযি. বলেন, যে ব্যক্তি আবু মূসার মতো সুর দিয়ে কুরআন পড়তে পারে, সে যেন তা করে।

হযরত উকবা ইবন আমির রাযি.-ও খুব সুন্দর সুরে কুরআন পড়তেন। হযরত উমর রাযি. তাঁকে বলতেন, আপনি আমাকে অমুক সূরা পড়ে শোনান। তিনি তা শোনাতেন। হযরত উমর রাযি. মন দিয়ে শুনতেন আর ক্রন্দন করতেন। হযরত উমর রাযি. কোনও যুবকের সুর সুন্দর হলে তাকে ইমামত করতে দিতেন।

বস্তুত সুন্দর সুরে পাঠ করলে কুরআন পাঠের সৌন্দর্য বেড়ে যায়। তা বাড়ানোটা কাম্যও বটে। এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

زَيْنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ.

তোমরা নিজেদের সুর দ্বারা কুরআনকে অলংকৃত করো। (সুনানে দারিমী ৩৫৪৩; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৮৭৩৭; মুসনাদে ইবনুল জা'দ; ২০৭৭; মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ৭৭৪)

অপর এক হাদীছে ইরশাদ-

حَسِنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ، فَإِنَّ الصَّوْتَ الْحَسَنَ يَزِيدُ الْقُرْآنَ حُسْنًا.

'তোমরা নিজেদের সুর দ্বারা কুরআনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করো। কেননা সুন্দর সুর কুরআনের সৌন্দর্য বাড়ায়।' (সুনানে দারিমী: ৩৫৪৪; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান ১৯৫৫)

কুরআন তিলাওয়াতে ক্রন্দন করা বা ক্রন্দনের ভাব করা
সুর দিয়ে কুরআন পড়ার ভেতর ক্রন্দন করা বা ক্রন্দনের আভাস থাকাটাও জরুরি। সর্বোত্তম সুর তা-ই, যার মধ্যে ক্রন্দন বা ক্রন্দনের ভাব থাকে। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হয়, কার কুরআন পড়া সর্বাপেক্ষা সুন্দর। তিনি বললেন, যার তিলাওয়াত শুনলে তোমার মনে হবে সে আল্লাহকে ভয় করে। হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, সর্বাপেক্ষা সুন্দর সুরের কুরআন পাঠক সে-ই, যার পাঠ শুনলে তোমার মনে হবে সে আল্লাহকে ভয় করে। (সুনানে ইবন মাজাহ ১৩৩৯: ইবনুল মুবারক, আয যুহদ ওয়ার রাকাইক: ১১৪ )

কুরআন তিলাওয়াতকালে সকলেরই যে কান্না আসবে এটা অনিবার্য নয়। কারণ কান্না আসাটা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাধীন। তাই যার কান্না না আসে, সে কান্নার ভান করবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

إِنَّ هَذَا الْقُرْآنَ نَزَلَ بِحُزْنٍ وَكَابَة، فَإِذَا قَرَأْتُمُوهُ فَابْكُوا، فَإِنْ لَمْ تَبْكُوا فَتَبَاكَوْا.

নিশ্চয়ই এ কুরআন নাযিল হয়েছে বেদনা ও বিষণ্ণতার সঙ্গে। সুতরাং তোমরা যখন কুরআন পড়বে, তখন ক্রন্দন করবে। আর ক্রন্দন না আসলে ক্রন্দনের ভান করবে। (বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ২১০৫৮; শু'আবুল ঈমান ১৮৯১; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৬৮৯; মুসনাদুল বাযযার: ১২৩৫)

বেদনা ও বিষণ্ণতার সঙ্গে নাযিল হওয়ার অর্থ হলো কুরআনে রয়েছে হাশরের ভয়াবহ অবস্থার বিবরণ, পুরস্কার ও শাস্তির ঘোষণা, বিগত সব জাতির দৃষ্টান্তমূলক পরিণতির বর্ণনা। এছাড়া এমনসব ভীতিকর ঘটনার উল্লেখ, যা শুনলে অন্তর ভীত ও প্রকম্পিত হয় এবং আল্লাহর ভয়ে মন গলে যায় আর এভাবে বান্দার অন্তর আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলশ্রুতিতে সে আল্লাহর মর্জি মোতাবেক চলার তথা শরীয়তের অনুসরণ করার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়। এদিকে ইঙ্গিত করে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

اَللّٰہُ نَزَّلَ اَحۡسَنَ الۡحَدِیۡثِ کِتٰبًا مُّتَشَابِہًا مَّثَانِیَ ٭ۖ تَقۡشَعِرُّ مِنۡہُ جُلُوۡدُ الَّذِیۡنَ یَخۡشَوۡنَ رَبَّہُمۡ ۚ ثُمَّ تَلِیۡنُ جُلُوۡدُہُمۡ وَقُلُوۡبُہُمۡ اِلٰی ذِکۡرِ اللّٰہِ

আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী- এমন এক কিতাব, যার বিষয়বস্তুসমূহ পরস্পর সুসামঞ্জস্য, (যার বক্তব্যসমূহ) পুনরাবৃত্তিকৃত, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এর দ্বারা তাদের শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তারপর তাদের দেহ-মন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। (সূরা যুমার, আয়াত ২৩)

কুরআন পাওয়ার পর হিদায়াতের জন্য অন্যসব ধর্মগ্রন্থ ও মতবাদ থেকে বিমুখ হয়ে যাওয়া

কারও কারও মতে يَتَغَنَّ এর অর্থ নিজেকে ঐশ্বর্যবান ও বেনিয়ায মনে করা। অর্থাৎ কুরআন দ্বারা অন্য সব ধর্মগ্রন্থ এবং মানবরচিত পথনির্দেশ ও বিধি-বিধান থেকে বেনিয়ায হয়ে যাওয়া। বোঝানো হচ্ছে, কুরআন এসে যাওয়ার পর মানুষের হিদায়াতের জন্য অন্য কোনওকিছুর প্রয়োজন বাকি থাকেনি। হিদায়াত লাভের জন্য এ কিতাবই যথেষ্ট। অন্যসব আসমানী কিতাব একে তো নির্দিষ্ট কাল ও নির্দিষ্ট জাতির জন্য নাযিল করা হয়েছিল। তদুপরি সেসব কিতাবকে তার অনুসারীগণ সংরক্ষণ করেনি। ফলে তার মধ্যে বহু রদবদল হয়ে গেছে। তারা নিজেরাও ইচ্ছাকৃতভাবে তার মধ্যে বিকৃতি সাধন করেছে। তাই সেসব কিতাব থেকে হিদায়াত পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। আর মানবরচিত বই-পুস্তকের সে ক্ষমতাই নেই যে, মানুষকে সত্যের পথ দেখাবে। এ অবস্থায় ঈমানদার ব্যক্তির কর্তব্য কেবল কুরআন মাজীদ থেকেই হিদায়াত গ্রহণ করা এবং হিদায়াতের জন্য অন্যসব কিতাব ও বই-পুস্তক থেকে সম্পূর্ণ বেনিয়ায ও অনপেক্ষ হয়ে যাওয়া।

যারা সঠিক পথ পাওয়ার আশায় কুরআন মাজীদ ছেড়ে বা কুরআন মাজীদের বদলে অন্য কোনও কিতাব বা মানবরচিত বই-পুস্তকের আশ্রয় নেয়, তারা নিতান্তই ভুলের মধ্যে আছে। তারা হিদায়াত তো পায়ই না, উল্টো পথভ্রষ্টতার শিকার হয়ে যায়। কুরআন পরিপূর্ণ হিদায়াত গ্রন্থ। কিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে অনুসরণ করতে হবে কেবলই সর্বশেষ এই আসমানী কিতাবে। ইমাম তাবারী রহ. ও অন্যান্য মুফাসসিরগণ ইয়াহইয়া ইবন জা'দাহ রহ.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, কয়েকজন মুসলিম ইহুদিদের কাছ থেকে শোনা কিছু কথা লিপিবদ্ধ করে তা নিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়েছিলেন। তারা তা তাঁর সামনে পেশ করলে তিনি ইরশাদ করেন, কোনও সম্প্রদায়ের পথভ্রষ্ট হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তারা তাদের কাছে তাদের নবীর নিয়ে আসা বাণী থেকে বিমুখ হয়ে অন্য কারও আনীত বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলা নাযিল করেন-

اَوَلَمۡ یَکۡفِہِمۡ اَنَّاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ یُتۡلٰی عَلَیۡہِمۡ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَرَحۡمَۃً وَّذِکۡرٰی لِقَوۡمٍ یُّؤۡمِنُوۡنَ

তবে কি তাদের জন্য এটা (অর্থাৎ এই নিদর্শন) যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদেরকে পড়ে শোনানো হচ্ছে? নিশ্চয়ই যে সমস্ত লোক বিশ্বাস করে, তাদের জন্য এতে রয়েছে রহমত ও উপদেশ। (সূরা আনকাবুত, আয়াত ৫১)

এর দ্বারা বোঝা গেল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পর আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির পথে চলার জন্য তাঁর নিয়ে আসা হিদায়াতকেই যথেষ্ট মনে করতে হবে। এর বাইরে অন্য কোনওকিছুর শরণাপন্ন হওয়া যাবে না।

কুরআন দ্বারা নিজেকে ঐশ্বর্যবান মনে করা
কারও কারও মতে يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ এর অর্থ হলো কুরআন দ্বারা নিজেকে এমন ধনবান মনে করা যে, অর্থসম্পদ না থাকার কোনও আক্ষেপ তার অন্তরে থাকবে না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কুরআন পড়তে পারে, কুরআন বুঝতে পারে এবং কুরআনের ভেতর যে অফুরন্ত ইলম ও জ্ঞান নিহিত রয়েছে, তা থেকেও আপন সামর্থ্য মোতাবেক আহরণ করতে পেরেছে, তার উচিত নিজেকে একজন সম্পদশালী লোক বলে গণ্য করা। কুরআনের জ্ঞান অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদের বিপরীতে দুনিয়ার বাহ্যিক বিত্ত-বৈভবের কোনও মূল্য নেই। তাই কুরআনের জ্ঞানীজনের উচিত নিজ সম্পদের মূল্য বোঝা। তার উচিত মন-মস্তিষ্কে আপন মূল্যবোধ জাগ্রত রাখা। সে অবশ্যই আয়-রোজগার করবে, কিন্তু তা লোভের বশবর্তীতে নয়; বরং প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে এবং আল্লাহর পথে খরচ করা ও আল্লাহর বান্দাদের সেবা করার উদ্দেশ্যে। এ উদ্দেশ্যে সে তার পক্ষে যে উপায় অবলম্বন করা সম্ভব তা করবে। তবে নির্ভর করবে আল্লাহর উপর। আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজ ইচ্ছায় যতটক সম্পদ দান করেন তাতে খুশি থাকবে। সেইসঙ্গে করআনের যে অমূল্য সম্পদ সে লাভ করেছে তা দ্বারা নিজেকে মহাধনী মনে করবে। সে কিছুতেই দুনিয়ার ধনবানদের অর্থসম্পদের দিকে লক্ষ করবে না এবং নিজেকে তাদের তুলনায় গরিব মনে করবে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-

وَلَقَدْ آتَيْنَاكَ سَبْعًا مِّنَ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنَ الْعَظِيمَ لَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَىٰ مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ

'আমি তোমাকে এমন সাতটি আয়াত দিয়েছি, যা বারবার পড়া হয় এবং দিয়েছি মর্যাদাপূর্ণ কুরআন। আমি তাদের (অর্থাৎ কাফেরদের) বিভিন্ন লোককে মজা লোটার যে উপকরণ দিয়েছি, তুমি তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ো না এবং তাদের প্রতি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না। আর যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য তোমার (বাৎসল্যের) ডানা নামিয়ে দাও।' (সূরা হিজর, আয়াত ৮৭, ৮৮)

হাদীছটির এ তিন রকম ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে এর একটি অন্যটি থেকে আলাদা নয়। একইসঙ্গে এ হাদীছের সবগুলো ব্যাখ্যা গ্রহণ করা সম্ভব। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যাকে কুরআন পড়ার ও বোঝার তাওফীক দিয়েছেন, সে দুনিয়ার ধনবানদের তুলনায় নিজেকে গরিব মনে করবে না। সে আল্লাহ তা'আলার পথে চলার এবং দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ বা মানবরচিত কোনও মতবাদের দ্বারস্থ হবে না। সে কুরআনের মহাধন দ্বারা নিজেকে মহাধনী মনে করবে, নিজের জন্য কুরআনের হিদায়াতকে যথেষ্ট ও পরিপূর্ণ মনে করবে এবং আকুল প্রাণে ভক্তি-মুহাব্বতের সঙ্গে যথাসম্ভব সুমধুর সুরে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করবে। তাকে এটা করতেই হবে। যদি তার বিশ্বাস ও চিন্তাভাবনা এর বিপরীত হয়, তার কাজকর্ম ও রীতিনীতি এর বিরোধী হয় এবং সে যথাযথ নিয়মে কুরআন তিলাওয়াত থেকেও বিমুখ থাকে, তবে তার পক্ষে তা বড়ই দুর্ভাগ্যজনক। তার সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলোচ্য হাদীছে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন- فَلَيْسَ مِنَّا (সে আমাদের একজন নয়)। অর্থাৎ সে আমাদের নীতি ও আদর্শের অন্তর্ভুক্ত নয়।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন সুর দিয়ে ভক্তি-ভালোবাসা ও বিনয়-নম্রতার সঙ্গে তিলাওয়াত করতে হবে।

খ. যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা কুরআন দিয়েছেন তারা কুরআনের বাইরে অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ বা মতাদর্শের অনুসারী হতে পারে না।

গ. কুরআনের আলেম, হাফেজ ও কারী কিছুতেই কোনও অবস্থায়ই নিজেকে গরিব ভাবতে পারে না। তা ভাবা উচিত নয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান