আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২১. অধ্যায়ঃ সদ্ব্যবহার

হাদীস নং: ৩৮২২
অধ্যায়ঃ সদ্ব্যবহার
সম্পর্ক ছিন্নকারীর সাথে সম্পর্ক অটুট রাখার প্রতি অনুপ্রেরণা এবং সম্পর্ক ছিন্নকরার প্রতি ভীতি প্রদর্শন
৩৮২২. হযরত আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার বন্ধু আমাকে কয়েকটি ভালো কাজের উপদেশ দিয়েছেন তা হলো: ১. তিনি আমাকে আমার চেয়ে অবস্থাশালী ব্যক্তির প্রতি তাকাতে নিষেধ করেছেন, ২. তিনি আমাকে আমার চেয়ে নিম্নবিত্ত ব্যক্তির প্রতি তাকাতে বলেছেন, ৩. আমাকে দুঃস্থদের ভালোবাসতে এবং তাদের নিকটবর্তী হতে বলেছেন, ৪. আমাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে বলেছেন, যদিও তারা তা বজায় না রাখে, ৫. আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দা পরোয়া না করতে নির্দেশ দিয়েছেন, ৬. তিক্ত হলেও আমাকে সত্য বলতে নির্দেশ দিয়েছেন, ৭. আমি যেন সর্বদা "লা-হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ" (আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত মন্দকাজ থেকে বিরত থাকা এবং ভালো কাজ করার সামর্থ্য কারো নেই) বলি। কেননা, তা জান্নাতের খনিসমূহের অন্যতম।
(তাবারানী, ইবনে হিব্বান নিজ শব্দে তার সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।)
كتاب البر والصلة
التَّرْغِيب فِي صلَة الرَّحِم وَإِن قطعت والترهيب من قطعهَا
3822- وَعَن أبي ذَر رَضِي الله عَنهُ قَالَ أَوْصَانِي خليلي صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بخصال من الْخَيْر أَوْصَانِي أَن لَا أنظر إِلَى من هُوَ فَوقِي وَأَن أنظر إِلَى من هُوَ دوني وأوصاني بحب
الْمَسَاكِين والدنو مِنْهُم وأوصاني أَن أصل رحمي وَإِن أَدْبَرت وأوصاني أَن لَا أَخَاف فِي الله لومة لائم وأوصاني أَن أَقُول الْحق وَإِن كَانَ مرا وأوصاني أَن أَكثر من لَا حول وَلَا قُوَّة إِلَّا بِاللَّه فَإِنَّهَا كنز من كنوز الْجنَّة

رَوَاهُ الطَّبَرَانِيّ وَابْن حبَان فِي صَحِيحه وَاللَّفْظ لَهُ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

নবী করীম ﷺ গরীব-মিসকীনদের মহব্বত করতেন এবং অন্যদেরকেও অনুরূপ করতে আদেশ করতেন। গরীব ঈমানদারদের মর্যাদা আল্লাহর কাছে খুব বেশি। তাদের দু'আ ও প্রার্থনার ফলস্বরূপ আল্লাহ উম্মতের উপর খায়ের ও বরকত নাযিল করেন। যে কওমের প্রভাব-প্রতিপত্তিশীল লোক গরীব ও মিসকীন সম্প্রদায়কে মহব্বত করেন এবং তাদের প্রতি দয়া ও রহম প্রদর্শন করেন, সে কওম অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিল করে।

পার্থিব প্রভাব-প্রতিপত্তি বা ধন-দৌলতের ব্যাপারে কখনো উপরের দিকে দৃষ্টিপাত করা ঠিক নয়। নিজেকে সংযত ও সঠিক রাখার জন্য নিজের চেয়ে কম প্রভাব-প্রতিপত্তি বা ধন-দৌলতের অধিকারীদের দিকে দৃষ্টিপাত করা উচিত। এতে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিদের জন্য সবক রয়েছে।

আত্মীয়-স্বজনের প্রতি দয়া ও রহম প্রদর্শন করা ঈমানদার ব্যক্তির অবশ্য কর্তব্য। আত্মীয়-স্বজনের বাহবা কুড়ানোর জন্য এ কাজ করা উচিত হবে না। একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের প্রতি সদয় হতে হবে এবং নিয়্যত সঠিক হলে আল্লাহ তার প্রতিদান দেবেন।

মানুষের কাছে সওয়াল করা ঈমানদার ব্যক্তিদের স্বভাব ও আচরণ বিরুদ্ধ কাজ। আল্লাহ যাদের বন্ধু ও অভিভাবক, তারা কেন মানুষের কাছে হাত পেতে নিজেদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করবে। যারা মানুষের মুখাপেক্ষী নয়, আল্লাহ তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দেন।

অন্যের নিকট তিক্ত হলেও সত্য কথা বলা উচিত। কোনরূপ ভয়-ভীতি বা প্রেম-প্রীতি বা কারো স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য সত্য গোপন করা যাবে না। মু'মিন ব্যক্তি সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলবেন এবং অনুরূপভাবে নিন্দুকের নিন্দা বা অপমানকারীর অপমান, ভয় প্রদর্শনকারীর ভীতি আল্লাহর প্রকৃত বান্দাদেরকে আল্লাহর রাস্তা থেকে দূরে সরাতে পারে না। কারণ ঈমানদার ব্যক্তি মনে করেন সারা দুনিয়ার মানুষ তার কোন অমঙ্গল করতে পারবে না। মানুষের উপর আল্লাহর যত হক রয়েছে তার মধ্যে এটাও অন্যতম যে, বান্দা অন্য মানুষের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করবে।

'লা হাওলা ওলা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' কালেমা খুব বেশি করে পড়ার মধ্যে এক দুনিয়ার নসীহত রয়েছে। দুনিয়ার যাবতীয় শক্তি-সামর্থ্য এবং যোগ্যতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। দুনিয়ার কোন শক্তি তাঁর ইচ্ছা কার্যকরী করতে বাধা দিতে পারে না। তিনি যার মঙ্গল করতে চান সারা দুনিয়ার মানুষ তার অমঙ্গল করতে পারবে না। তিনি যার অমঙ্গল করতে চান সারা দুনিয়ার মানুষ তার মঙ্গল করতে পারবে না। তিনি মানুষকে মঙ্গল ও কল্যাণের রাস্তায় পরিচালিত করেন। তিনি যাবতীয় দুর্বলতার উর্ধ্বে। মানুষের বোধগম্য বা অবোধগম্য যত শক্তি ও সামর্থ্য রয়েছে, তার একচ্ছত্র অধিকারী হলেন আল্লাহ তা'আলা। তাঁর শক্তি কখনো লয় হবে না। আল্লাহ সম্পর্কে এ ধরনের চিন্তা মনের মধ্যে পোষণ করা এবং মুখের দ্বারা তা স্বীকার করা ও প্রকাশ করার মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ রয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান