আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২২. অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার

হাদীস নং: ৪২৩৪
অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার
অনির্দিষ্ট অথবা কোন ব্যক্তি বিশেষকে অথবা কোন প্রাণী বা অন্য কিছুকে উল্লেখ করে কাউকে গালি দেওয়া অথবা লা'নত দেয়া এবং মোরগ, বিচ্ছু ও বাতাসকে গালি ও লা'নত দেয়ার প্রতি ভীতি প্রদর্শন এবং সতী-সাধ্বী ও দাস-দাসীর প্রতি অপবাদ দেয়ার প্রতি ভীতি প্রদর্শন
৪২৩৪. হযরত আবু জারী জাবির ইবন সুলায়ম (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি লোকদেরকে এক ব্যক্তির নেতৃত্ব মেনে নিতে দেখলাম। আর তিনি যা আদেশ করেন, তা তারা সাথে সাথে পালন করে। তখন আমি জিজ্ঞেসা করলাম: ইনি কে? তারা বলল: তিনি হলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ)। আমি বললামঃ ইয়া রাসুলুল্লাহ্। আপনার প্রতি সালাম। তিনি বলেনঃ তুমি "আলাইকাস্ সালাম" বলো না। কেননা, তা মৃতের প্রতি অভিবাদন। বরং বলবে, "আসসালামু আলাইকা।" সে বলে, তখন আমি বললাম, আপনি কি আল্লাহর রাসূল? তিনি বলেন: আমি ঐ আল্লাহর রাসূল, যখন তোমার প্রতি কোন বিপদ আসবে, তুমি তাঁর নিকট দু'আ করলে তিনি তোমার বিপদ মুক্ত করে দেবেন। আর যদি তুমি অভাবগ্রস্ত হও, তিনি তোমার ফসল উৎপাদন করে দেবেন। আর যখন তুমি কোন মরুভূমিতে অথবা তিনি বলেছেন, কোন ময়দানে সফর অবস্থায় তোমার বাহন পথ হারিয়ে ফেললে তুমি তার নিকট দু'আ করলে তিনি তোমার পথ দেখাবে। বর্ণনাকারী বলেন: আমি বললাম, আপনি আমাকে উপদেশ দান করুন। তিনি বলেন: তুমি কাউকে গালি দেবে না। এরপর আমি কোন স্বাধীন কিংবা পরাধীন (দাসকে) উট কিংবা বকরীকে কখনো গালি দেইনি। তিনি (আরও) বলেন : তুমি কোন সৎকাজকে তুচ্ছ মনে করবে না। এমন কি তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলা এও একটি সৎকাজ। আর তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র নলা পর্যন্ত উঠিয়ে রাখবে। আর যদি তুমি ভাল মনে না কর, তবে তা পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত রাখবে। আর তুমি তোমার পরিধেয় বস্ত্র প্রলম্বিত করবে না, কেননা তা অহংকারের লক্ষণ। আল্লাহ্ অহংকারীকে পসন্দ করেন না। কোন ব্যক্তি যদি তোমাকে গালি দেয় অথবা তোমার মধ্যে এমন একটি দোষ আছে, আর সে তা জেনে সে ব্যাপারে তোমাকে লজ্জা দেয়, তুমি তার মধ্যে যে দোষ আছে, তা জানা সত্ত্বেও তাকে লজ্জা দিবে না। কেননা, তার ঐ কথা তার প্রতি বর্তাবে।
(আবু দাউদ নিজ শব্দযোগে ও ইমাম তিরমিযী (র) বর্ণিত। তিনি বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ্ এবং ইবন হিব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে এবং নাসাঈ সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেন।
ইবন হিব্বানের অন্য বর্ণনায় অনুরূপ বর্ণিত আছে, তার শব্দমালা এরূপঃ "তোমার মধ্যে কোন দূষনীয় কিছু আছে, আর কোন ব্যক্তি তা জানে এবং তা নিয়ে যদি তোমাকে লজ্জা দেয়, তুমি তার মধ্যে কোন দোষ জ্ঞাত হওয়া সত্ত্বেও তাকে লজ্জা দেবে না। তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দেবে। কেননা, তা তার উপরই তা বর্তাবে। আর তোমার ধৈর্যের জন্য রয়েছে পুরষ্কার। তুমি কোন বস্তুকে গালি দেবে না। বর্ণনাকারী বলেন। এরপর আমি কোন প্রাণী বা কোন মানুষকে কখনও গালি দেইনি।
السنة বৃষ্টি হোক বা না হোক ফসলবিহীন বছরকে বলে।
المخيلة গর্ব করা, মানুষকে তুচ্ছ মনে করা।)
كتاب الأدب
الترهيب من السباب واللعن لا سيما لمعين آدميا كان أو دابة وغيرهما وبعض ما جاء في النهي عن سب الديك والبرغوث والريح والترهيب من قذف المحصنة والمملوك
4234- وَعَن أبي جري جَابر بن سليم رَضِي الله عَنهُ قَالَ رَأَيْت رجلا يصدر النَّاس عَن رَأْيه لَا يَقُول شَيْئا إِلَّا صدرُوا عَنهُ
قلت من هَذَا قَالُوا رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم
قلت عَلَيْك السَّلَام يَا رَسُول الله قَالَ لَا تقل عَلَيْك السَّلَام عَلَيْك السَّلَام تَحِيَّة الْمَيِّت قل السَّلَام عَلَيْك
قَالَ قلت أَنْت رَسُول الله قَالَ أَنا رَسُول الله الَّذِي إِذا أَصَابَك ضرّ فدعوته كشفه عَنْك وَإِن أَصَابَك عَام سنة فدعوته أنبتها لَك وَإِذا كنت بِأَرْض قفر أَو فلاة فضلت راحلتك فدعوته ردهَا عَلَيْك
قَالَ قلت اعهد إِلَيّ
قَالَ لَا تسبن أحدا فَمَا سببت بعده حرا وَلَا عبدا وَلَا بَعِيرًا وَلَا شَاة
قَالَ وَلَا تحقرن شَيْئا من الْمَعْرُوف وَأَن تكلم أَخَاك وَأَنت منبسط إِلَيْهِ وَجهك إِن ذَلِك من الْمَعْرُوف وارفع إزارك إِلَى نصف السَّاق فَإِن
أَبيت فَإلَى الْكَعْبَيْنِ وَإِيَّاك وإسبال الْإِزَار فَإِنَّهَا من المخيلة وَإِن الله لَا يحب المخيلة وَإِن امْرُؤ شتمك وعيرك بِمَا يعلم فِيك فَلَا تعيره بِمَا تعلم فِيهِ فَإِنَّمَا وبال ذَلِك عَلَيْهِ

رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَاللَّفْظ لَهُ وَالتِّرْمِذِيّ وَقَالَ حَدِيث حسن صَحِيح وَابْن حبَان فِي صَحِيحه وَالنَّسَائِيّ مُخْتَصرا فِي رِوَايَة لِابْنِ حبَان نَحوه وَقَالَ فِيهِ وَإِن امْرُؤ عيرك بِشَيْء يُعلمهُ فِيك فَلَا تعيره بِشَيْء تعلمه فِيهِ ودعه يكون وباله عَلَيْهِ وأجره لَك وَلَا تسبن شَيْئا
قَالَ فَمَا سببت بعد ذَلِك دَابَّة وَلَا إنْسَانا
السّنة هِيَ الْعَام المقحط الَّذِي لم تنْبت فِيهِ الأَرْض سَوَاء نزل غيث أَو لم ينزل
المخيلة بِفَتْح الْمِيم وَكسر الْخَاء الْمُعْجَمَة من الاختيال وَهُوَ الْكبر واستحقار النَّاس

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে-কোনও নেক কাজকে তুচ্ছ মনে করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। কারণ আল্লাহর কাছে কখন কোন আমল কবুল হয়ে যায় কেউ জানে না। হতে পারে অতি সাধারণ একটি আমল আল্লাহর কাছে এমন কবুল হয়েছে যে, তার মাধ্যমে তার দুনিয়া চমকে গেছে এবং আখিরাতেও তা নাজাতের অসিলা হবে। হাদীছে বর্ণিত এ ঘটনা অনেকেরই জানা যে, একটি কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক ব্যক্তি জান্নাত পেয়ে গেছে। এক হাদীছে আছে, মানুষ কখনও কখনও এমন কথা বলে, যে কথার সে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না। অথচ তার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে অতি উচ্চমর্যাদা তাকে দান করেন।

এ প্রসঙ্গে বিশর হাফী রহ.-এর ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি প্রথম জীবন কাটিয়েছেন আমোদ-ফুর্তি করে। সে অবস্থায় তিনি একদিন পথে হাঁটছিলেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন রাস্তায় এক টুকরা কাগজ পড়ে আছে। তুলে দেখেন তাতে আল্লাহর নাম লেখা। কত মানুষ এ পথে চলেছে। তাদের পায়ের তলে পড়ে পড়ে কাগজখানির যাচ্ছেতাই অবস্থা। তার খুব খারাপ লাগল। তিনি সেটি নিয়ে এক আতরের দোকানে গেলেন। সেখান থেকে কিছু আতর কিনলেন এবং কাগজটি যত্নের সাথে পরিষ্কার করে সে আতর তাতে মাখালেন। তারপর সেটি একটি দেয়ালের ফাঁকে রেখে দিলেন। সেই রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন কেউ তাকে লক্ষ্য করে বলছে, হে বিশর! তুমি আমার নাম সুরভিত করেছ। আমিও তোমার নামের সুরভি দুনিয়া ও আখিরাতে ছড়িয়ে দেব। ঘুম থেকে জাগার পর তিনি অতীত জীবনের জন্য তাওবা করেন এবং নতুন জীবন শুরু করেন। সে জীবন তাকওয়া-পরহেযগারীর জীবন, যুহদ ও ইবাদত-বন্দেগীর জীবন। এ জীবনে তিনি কতদূর উন্নতি লাভ করেছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্যের কোন্ পর্যায়ে পৌছেছিলেন তা ওলী-বুযুর্গদের পক্ষেই অনুমান করা সম্ভব। আমরা কেবল এতটুকুই জানি- তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বুযুর্গদের একজন।

তাঁর জীবনের এ মহাপরিবর্তন ঘটেছিল আপাতদৃষ্টিতে একটি মামুলি কাজের বদৌলতে। সুতরাং কোনও ভালো কাজকেই তুচ্ছ মনে করতে নেই, যেমনটা এ হাদীছে বলা হয়েছে।

হাদীছটির দ্বিতীয় বাক্যে জানানো হয়েছে, নিজ ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও একটি নেক কাজ। অপর এক হাদীছে আছে
وَتَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ صَدَقَةٌ
‘তোমার ভাইয়ের চেহারার দিকে ফিরে তোমার হাসি দেওয়া এক সদাকা।’(শু'আবুল ঈমান: ৩১০৫)

সুতরাং একেও তুচ্ছ মনে করবে না। কেননা এমনিতে একটি অতি সাধারণ কাজ হলেও এর সুফল অনেক বেশি। হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার দ্বারা মানুষের মন জয় করা যায়। গোমরামুখো মানুষকে কেউ পসন্দ করে না। এরূপ মানুষের সঙ্গে কেউ সহজে মিশতে চায় না। ফলে তার সৎগুণ দ্বারাও লোকে তেমন একটা উপকৃত হতে পারে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি হাসিমুখে কথা বলে, মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেলামেশা করে, মানুষ তার সঙ্গলাভে প্রীতিবোধ করে। এরূপ লোক অতি সহজে শোকাগ্রস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। তার হাসিমুখ দেখলে শত্রুর শত্রুতায়ও ভাটা পড়ে। তার অন্তরে বন্ধুত্বের বীজ বুনে যায়। একপর্যায়ে সে পরম বন্ধুই হয়ে যায়।

মুহাম্মাদ ইবনুন নাযর হারিছী রহ. বলেন, ভদ্রতার প্রথম প্রকাশ হল হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা।

ইমাম আওযা'ঈ রহ. বলেন, অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শন হল মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা।
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِنَّكُمْ لَا تَسَعُونَ اَلنَّاسَ بِأَمْوَالِكُمْ, وَلَكِنْ لِيَسَعْهُمْ بَسْطُ اَلْوَجْهِ, وَحُسْنُ اَلْخُلُقِ
‘তোমরা অর্থ-সম্পদ দিয়ে মানুষের মন ভরতে পারবে না। কিন্তু তোমাদের চেহারার প্রফুল্লতা ও উত্তম চরিত্র তাদের মন ভরাতে পারবে।’ (শু'আবুল ঈমান: ৭৬৯৫)

যারা মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকে ও দীনের কাজ করে, এই গুণটি তাদের বিশেষ প্রয়োজন। এর মাধ্যমে মানুষকে কাছে আনা বেশি সহজ হয়। হাসিমুখের কথা মানুষের মনে সহজেই আছর করে। এতে দা'ওয়াত বেশি ফলপ্রসূ হয়। এরূপ ব্যক্তির পারিবারিক জীবন বেশি সুখের হয়। সমাজজীবনে তারা বেশি কীর্তিমান হতে পারে। মানুষের মধ্যে ঐক্য-সম্প্রীতি সৃষ্টিতে তারা বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো এমনই ছিলেন। কেউ সাক্ষাৎ করতে আসলে মুচকি হাসি দিয়ে স্বাগত জানাতেন। হাসিমুখে তার সঙ্গে কথা বলতেন। আগন্তুকের অন্তরে তা দারুণ প্রভাব বিস্তার করত। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছ রাযি. বলেন-
مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَكْثَرَ تَبَسُّمًا مِنْ رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ
‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে বেশি মুচকি হাসির লোক কাউকে দেখিনি।' (শু'আবুল ঈমান: ৭৬৮৭)

মোটকথা হাসিমুখের সাক্ষাৎ একটি বহুবিচিত্র সুফলদায়ী আচরণ। তাই আপাতদৃষ্টিতে মামুলি হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সহীহ নিয়তের সঙ্গে ব্যবহার করলে এর মাধ্যমে অকল্পনীয় ছাওয়াব অর্জন করা যেতে পারে। কাজেই একে মামুলি মনে করে উপেক্ষা করা উচিত নয়; বরং প্রত্যেকের উচিত এ গুণ অর্জন করা অর্থাৎ হাসিমুখে সাক্ষাৎ করতে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করা।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. মানবজীবনের যত অনুষঙ্গ আছে, সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তার প্রত্যেকটি দ্বারাই ছাওয়াব অর্জন করা যায়।

খ. হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা যেহেতু একটা নেক কাজ, তাই এতে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

গ. কোনও নেককাজকেই তুচ্ছ মনে করতে নেই। আখিরাতে নাজাত লাভে সাধারণ সাধারণ নেককাজও অনেক কাজে আসবে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-
فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ
‘যে ব্যক্তি বিন্দু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা (অর্থাৎ তার ছাওয়াব) দেখতে পাবে।’ (সূরা যিলযাল (৯৯) আয়াত ৭)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান