আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২২. অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার

হাদীস নং: ৪৬০০
অধ্যায়ঃ শিষ্টাচার
আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টিকল্পে ভালবাসার প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং দুষ্টলোক ও বিদ'আতপন্থীদের সাথে ভালবাসা রাখার ব্যাপারে সতর্কীকরণ:
কেননা, মানুষ যাকে ভালবাসে তারই সঙ্গী হবে
৪৬০০. হযরত আবূ ইদ্‌রীস খাওলানী (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি দামেশকের মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম উজ্জ্বল দণ্ডবিশিষ্ট এক যুবক, তাঁর পাশে আরও লোকজন রয়েছে। তাঁরা কোন বিষয়ে মতানৈক্য করলে সে বিষয়টি তাঁর উপর ন্যস্ত করে এবং তাঁর অভিমত অনুযায়ী তারা কাজ করে। আমি লোকটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে (আমাকে) জানানো হল যে, তিনি মু'আয ইবন জাবাল (রা)। পরদিন খুব ভোরে আমি (মসজিদে) গিয়ে তাঁকে দেখতে পেলাম যে, তিনি আমার পূর্বেই এসে গেছেন এবং দেখতে পেলাম যে, তিনি সালাত আদায় করছেন। তাই আমি তাঁর সালাত শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। তারপর তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সালাম করলাম। তারপর তাঁকে বললাম, আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ভালবাসি। তিনি বললেন, সত্যি কি তাই? আমি বললাম, সত্যি তাই। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, সত্যি কি তাই? আমি পুনরায় বললাম, সত্যি তাই। অতঃপর তিনি আমার চাদরের আঁচল ধরে আমাকে তাঁর কাছে টেনে নিয়ে বললেন, তুমি সুসংবাদ নাও, আমি রাসূলুল্লাহ্-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ যারা আমার উদ্দেশ্যে পরস্পরের ভালবাসে, আমার উদ্দেশ্যে একত্রে মিলিত হয় এবং আমারই উদ্দেশ্যে সাদাসিধেভাবে ইবাদতে তৎপর থাকে, তাদের জন্য আমার ভালবাসা অবধারিত হয়ে গেছে।
(মালিক সহীহ্ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইবন হিব্বানও তাঁর 'সহীহ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।)
كتاب الأدب
التَّرْغِيب فِي الْحبّ فِي الله تَعَالَى والترهيب من حب الأشرار وَأهل الْبدع لِأَن الْمَرْء مَعَ من أحب
4600- وَعَن أبي إِدْرِيس الْخَولَانِيّ قَالَ دخلت مَسْجِد دمشق فَإِذا فَتى براق الثنايا وَإِذا النَّاس مَعَه فَإِذا اخْتلفُوا فِي شَيْء أسندوه إِلَيْهِ وصدروا عَن رَأْيه فَسَأَلت عَنهُ فَقيل هَذَا معَاذ بن جبل فَلَمَّا كَانَ من الْغَد هجرت فَوَجَدته قد سبقني بالتهجير وَوَجَدته يُصَلِّي فانتظرته حَتَّى قضى صلَاته ثمَّ جِئْته من قبل وَجهه فَسلمت عَلَيْهِ ثمَّ قلت لَهُ وَالله إِنِّي لَأحبك لله فَقَالَ آللَّهُ
فَقلت آللَّهُ فَقَالَ آللَّهُ فَقلت الله
فَأخذ بحبوة رِدَائي فجذبني إِلَيْهِ فَقَالَ أبشر فَإِنِّي سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول قَالَ الله تبَارك وَتَعَالَى وَجَبت محبتي للمتحابين فِي وللمتجالسين فِي وللمتباذلين فِي

رَوَاهُ مَالك بِإِسْنَاد صَحِيح وَابْن حبَان فِي صَحِيحه

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আবু ইদরীস খাওলানী রহ. শামের খাওলান গোত্রীয় একজন প্রবীণ ও বিখ্যাত তাবি‘ঈ। তিনি দামেশকের মসজিদে হযরত মুআয ইবন জাবাল রাযি-এর সঙ্গে সাক্ষাত করে বলেছিলেন 'আমি আপনাকে ভালোবাসি', যেমনটা এ হাদীছের বর্ণনায় আছে। হযরত মু'আয ইবন জাবাল রাযি, ছিলেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একজন বিশিষ্ট আলেম সাহাবী। তাঁর সম্পর্কে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, আমার উম্মতের মধ্যে হালাল-হারাম সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা বেশি জানে মু'আয। অতি বড় জ্ঞানীজন হওয়ায় তাঁর কাছে লোকজনের ভিড় লেগে থাকত। কারও কিছু জানার থাকলে তাঁর কাছেই জিজ্ঞেস করত। কোনও বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিলে তাঁর কাছেই সমাধান চাইত। খুব ইবাদতগুযারও ছিলেন। এসব গুণ ও বিশেষত্ব দেখে আবূ ইদরীস খাওলানী রহ.-এর অন্তরে তাঁর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা সৃষ্টি হয়ে যায়। তাতে আপ্লুত হয়েই তিনি এ অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন যে, আমি আপনাকে ভালোবাসি।
ইনি তো হযরত মু'আয ইবন জাবাল রাযি.। উচ্চস্তরের আলেম সাহাবী। পারস্পরিক ভালোবাসার কী মর্যাদা, ভালোভাবেই জানেন। এ উক্তির গভীরতাও যথেষ্ট বোঝেন। তাই তিনি আবূ ইদরীস খাওলানী রহ.-কে কসম দিয়ে তার উক্তির সত্যতা পরিষ্কার করে নেন। তারপর তাকে এ সম্পর্কে সুসংবাদ দান করেন। প্রথমে সুসংবাদটির মূল্য ও মাহাত্ম্যের প্রতি সচেতন করে তোলার জন্য তার চাদর ধরে নিজের দিকে টেনে নেন। অথবা তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়েছিলেন ভালোবাসার কারণে তাকে সম্বর্ধিত করার জন্য। তিনি তাকে বললেন, তুমি সুসংবাদ নাও। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَجَبَتْ مَحَبَّتِي لِلْمُتَحَابِّينَ فِيَّ، وَالْمُتَجَالِسِينَ فِيَّ، وَالْمُتَزَاوِرِينَ فِيَّ، وَالْمُتَبَاذِلِينَ فِيَّ.

(ওই সকল লোকের জন্য আমার ভালোবাসা অবধারিত, যারা আমারই জন্য একে অন্যকে ভালোবাসে; আমারই জন্য পরস্পরে ওঠাবসা করে; আমারই জন্য পরস্পরে দেখা-সাক্ষাত করে এবং আমারই জন্য খরচ করে)। অর্থাৎ যাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, যাদের পারস্পরিক ওঠাবসা, যাদের পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাত এবং যাদের পারস্পরিক অর্থব্যয় হয় কেবল আমারই জন্য, আমারই সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে, দুনিয়ার নশ্বর কোনও সম্পদের জন্যও নয় এবং নয় অন্য কোনও পার্থিব স্বার্থে, তারা নিশ্চিত থাকুক যে, আমি অবশ্যই তাদের মহব্বত করি, তাদের ভালোবাসি। আল্লাহু আকবার! কী বিশাল পুরস্কার! এটা আল্লাহ তাআলারই মহত্ত্ব ও মহানুভবতা যে, বান্দার তুচ্ছ কাজের বিনিময়েও তিনি নিজের পক্ষ থেকে অনেক বড় পুরস্কার দিয়ে থাকেন। বান্দাই বা কী আর তার ভালোবাসাই বা কী! এক বান্দা আরেক বান্দাকে ভালোবাসলে কতটুকুই বা বাসতে পারে? একজন আরেকজনের জন্য কী পরিমাণই বা খরচ করতে পারে? অথচ এর বিপরীতে তিনি বান্দাকে নিজ ভালোবাসার নিশ্চয়তা দান করেছেন। এ মহা নি'আমতের কারণে আমরা তাঁর কী শোকর আদায় করব?
প্রকাশ থাকে যে, পারস্পরিক মহব্বত, ওঠাবসা, দেখা-সাক্ষাত ও অর্থব্যয় যদি আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তাতে কোনওরকম সীমালঙ্ঘন হতে পারে না। তা হয় শরীআতের নির্দেশনা মোতাবেক। কাজেই এ বিষয়গুলো যাতে নিখুঁতভাবে কেবল আল্লাহ তাআলার জন্যই নিবেদিত থাকে, সে লক্ষ্যে শরীআতের সীমারেখা রক্ষা করে চলা অবশ্যকর্তব্য। খুব সাবধান থাকতে হবে যাতে এর কোনওটিতেই শরীআতের বরখেলাফ না হয়।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কাছাকাছি কোথাও কোনও বুযুর্গ ব্যক্তি ও আল্লাহওয়ালার উপস্থিতি জানতে পারলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাওয়া উচিত। এটা নিজ ঈমান-আমলে উন্নতি লাভের পক্ষে সহায়ক।

খ. নিজেদের মধ্যে কোনও বিষয়ে মতভিন্নতা সৃষ্টি হলে সে ব্যাপারে কর্তব্য বিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে সমাধান নেওয়া।

গ. আল্লাহপ্রেমের এক দাবি হলো আল্লাহওয়ালা ও আল্লাহর প্রেমিক বান্দাদের মহব্বত করা।

ঘ. কারও প্রতি অন্তরে মহব্বত ও ভালোবাসা থাকলে তাকে তা জানানো উচিত।

ঙ. যাকে মহব্বত করা হয় তার উচিত সে মহব্বতের কদর করা এবং যারা মহব্বত করে তাদের মূল্যায়ন করা।

চ. মহব্বত ও ভালোবাসা এবং দেখা-সাক্ষাত করা, ওঠাবসা করা ও টাকাপয়সা খরচ করার কাজগুলো কেবলই আল্লাহ তাআলার জন্য হওয়া উচিত, পার্থিব কোনও স্বার্থে নয়।

ছ. এসব কাজ আল্লাহর জন্য হলে পুরস্কারস্বরূপ আল্লাহ তাআলার মহব্বত লাভ করা যায়। এরচে' বড় কোনও পুরস্কার হতে পারে না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান