আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৩. অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ

হাদীস নং: ৪৮৩২
অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ
দারিদ্র্যও স্বল্পসামগ্রীর প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং ফকীর-মিসকীন ও দুর্বলদের মর্যাদা এবং তাদেরকে ভালবাসা ও তাদের সাথে উঠাবসা করা
৪৮৩২. হযরত উম্মে দারদা (রা)-এর সূত্রে আবু দারদা (রা)-এর থেকে বর্ণিত। উম্মে দারদা বলেন, আমি আবু দারদাকে বললাম, তোমার কি হল যে, অমুক অমুক যেমন আয়-উপার্জনের চেষ্টা করে, তুমি যে তেমনটি কর না? তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তোমাদের সম্মুখে রয়েছে এক কঠিন ঘাঁটি, যা অধিক সামগ্রীর অধিকারী লোকেরা অতিক্রম করতে পারবে না। অতএব এটাই ভালবাসি যে, সেই ঘাঁটিতে আমি হাল্কা বোঝা বহনকারী হই।
(তাবারানী (র) হাদীসটি সহীহ্ সনদে বর্ণনা করেছেন।)
كتاب التوبة والزهد
التَّرْغِيب فِي الْفقر وَقلة ذَات الْيَد وَمَا جَاءَ فِي فضل الْفُقَرَاء وَالْمَسَاكِين وَالْمُسْتَضْعَفِينَ وحبهم ومجالستهم
4832- وَعَن أم الدَّرْدَاء عَن أبي الدَّرْدَاء رَضِي الله عَنْهُمَا قَالَ قلت لَهُ مَا لَك لَا تطلب مَا يطْلب فلَان وَفُلَان قَالَ إِنِّي سَمِعت رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم يَقُول إِن وراءكم عقبَة كؤودا لَا يجوزها المثقلون فَأَنا أحب أَن أتخفف لتِلْك الْعقبَة

رَوَاهُ الطَّبَرَانِيّ بِإِسْنَاد صَحِيح
الكؤود بِفَتْح الْكَاف وَبعدهَا همزَة مَضْمُومَة هِيَ الْعقبَة الصعبة

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এই হাদীসে যে দুর্গম গিরিপথের দিকে ইশারা করা হয়েছে, তা হলো আখিরাতের বিভিন্ন মনযিল। বান্দার মৃত্যুর সাথে সাথে তার আখিরাতের মনযিল শুরু হয়। দুনিয়ার ধন-দৌলতের মধ্যে লিপ্ত ব্যক্তি আখিরাতের প্রত্যেক মনযিলে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হবে। কঠিন অবস্থা এজন্য সৃষ্টি হয় যে, দুনিয়াপ্রার্থীকে তার ধন-দৌলত আখিরাত সম্পর্কে গাফিল করে দেয়ার কারণে সে আখিরাতের স্থায়ী সুখ হাসিল করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে না। বরং দুনিয়ার অস্থায়ী সুখের জন্য দিন-রাত চিন্তা করে, কঠিন পরিশ্রম করে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে নিজের মূল্যবান জীবন বিসর্জন দেয়। যারা আখিরাতের অনন্ত আরামের তুলনায় দু'দিনের অস্থায়ী দুনিয়ার আরামকে বেশি মূল্যবান মনে করে, তারা বস্তুত সে সব নির্বোধ শিশুর মত আচরণ করে যারা পিতামাতার শত আদেশ-উপদেশ সত্ত্বেও নিজেদের প্রধান খাদ্য না খেয়ে শুধু টফি-লজেন্স বা কোনরূপ মিষ্টিদ্রব্য খায় বা খেতে চায় এবং যার ফল হিসেবে শারীরিক দুর্বলতা বা বিভিন্ন রোগে ভুগতে থাকে।

আলমে বরযখ থেকে শুরু করে পুলসিরাত, আমলের ওযন প্রভৃতি মনযিলে কি অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে তার খবর ওলী-দরবেশ-কুতুব কারও জানা নেই। এসব মনযিলে মানুষ 'ইয়া নাফসি! ইয়া নাফসি!' করতে থাকবে। বন্ধু বন্ধুকে সাহায্য করবে না। মা ছেলেকে, ছেলে মাকে সাহায্য করবে না। প্রত্যেক মানুষ স্বীয় চিন্তায় অস্থির থাকবে। ছোট-খাট প্রত্যেক নিয়ামত সম্পর্কে আল্লাহর বান্দাদের জিজ্ঞেস করা হবে। সম্পদের আহরণ ও ব্যয় সম্পর্কে কড়ায়-গন্ডায় হিসাব দিতে হবে। দুনিয়ার জীবনে ঘুষ-রিশওয়াতের মাধ্যমে দেশ, জাতি ও গরীবের হক নষ্ট করে বড় বড় কন্ট্রাক্ট হাসিল করে লাখ লাখ টাকা লাভ করা সম্ভব হলেও আখিরাতের আদালতে আল্লাহর বাহিনীকে অনুরূপ ঘুষ-রিশওয়াত দিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করা যাবে না। দুনিয়ার বড় বড় চালবাজ আখিরাতের এ অবস্থা দেখে দিশেহারা হয়ে পড়বে। পার্থিব জীবনের কোন তথ্য গোপন করার চেষ্টা করলে অপরাধীদের মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে। আল্লাহর হুকুমে হাত-পা কথা বলতে শুরু করবে। অপরাধীরা হয়রান পেরেশান হয়ে দেখবে নিজের হাত-পা নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছে। দুনিয়ার বড় বড় অহঙ্কারিগণ, যারা ধন-দৌলত ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীকে হেয় চোখে দেখত, দীন ইসলামের প্রচারকারীদের মন্দ বলত এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করত, তারা আখিরাতের অবস্থা অবলোকন করে মাথানত করে ফেলবে এবং দুনিয়াতে যে বোকামী করেছে তার জন্য আফসোস করবে। যেহেতু ইনসান ও জিন্নের হিসাব হবে ও তাদের আমলনামা ওযন করা হবে, সেহেতু ধনীদের হিসাব খুব লম্বা এবং গরীবদের হিসাব খুব অল্প হবে। তাই গরীব ব্যক্তিগণ ধনীদের পূর্বে বেহেশতে প্রবেশ করবেন। ধনীদের ছোট অংশ ও গরীবদের বড় অংশ জান্নাতে স্থান পাবেন। এ জন্য নবী করীম ﷺ তাঁর উম্মতকে দুনিয়ার জীবনে অপ্রয়োজনীয় জিনিসের জঞ্জাল সংগ্রহ করে আখিরাতকে নষ্ট করতে বারণ করেছেন। তাই আবু দারদা (রা) তাঁর বিবি উম্মে দারদাকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশের ফিকির না করে আখিরাতের কঠিন মনযিল কিভাবে অতিক্রম করা যাবে তার চিন্তা করার জন্য উপদেশ দিয়েছেন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান