আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৩. অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ

হাদীস নং: ৫০৭৮
অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ
মৃত্যুর স্মরণ, উচ্চাভিলাষ নিয়ন্ত্রণ ও আমলের প্রতি ধাবিত হওয়ার জন্য উৎসাহ প্রদান, নেক আমলকারীর দীঘায়ুর ফযীলত এবং মৃত্যু কামনার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা
৫০৭৮. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁর সালাত স্থলে প্রবেশ করলেন। তখন তিনি সেখানে কিছু লোক দেখতে পেলেন, যেন তারা খিলখিলিয়ে হাসছেন। এদেখে তিনি বললেন, যদি তোমরা ভোগ-বিলাসের স্পৃহা নির্মূলকারী মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করতে, তবে তা তোমাদেরকে এরূপ আচরণ থেকে বিরত রাখত, যা আমি দেখছি। সুতরাং তোমরা ভোগ-বিলাসের স্পৃহা
নির্মূলকারী মৃত্যুকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর। কেননা কবর প্রতিদিনই বলতে থাকে, আমি বিচ্ছেদের ঘর, আমি একাকিত্বের ঘর, আমি কীট-পতঙ্গের ঘর। যখন একজন মু'মিন বান্দাকে দাফন করা হয়, তখন কবর তাকে বলে, মারহাবা। স্বাগতম! জেনে রাখ, যারা আমার বিচরণ করত, তুমি ছিলে আমার কাছে তাদের মধ্যে প্রিয়তম ব্যক্তি। যখন আজ আমি তোমার উপর ক্ষমতাবান হয়েছি, অচিরেই তুমি তোমার সাথে আমার আচরণ করবে। তিনি বলেনঃ তারপর তার দৃষ্টি সীমা পর্যন্ত তার কবর প্রশস্ত হয়ে যাবে এবং জান্নাতের দিকে তার জন্য একটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। পক্ষান্তরে, যখন কোন পাপাচারী অথবা কাফির ব্যক্তিকে দাফন করা হয়, তখন কবর তাকে বলে, তোমার জন্য কোন মারহাবা বা স্বাগতবাণী নেই। যারা আমার পৃষ্ঠের বিচরণ করত তুমি ছিলে তাদের মধ্যে আমার কাছে ঘৃণ্যতম ব্যক্তি। যখন আজ আমি তোমার উপর ক্ষমতাবান হয়েছি এবং তুমি আমার আয়ত্তে এসেছ, অচিরেই তোমার সাথে আমার আচরণ প্রত্যক্ষ করবে। তিনি বলেন, অতঃপর তার গায়ের সাথে কবর মিশে যাবে, তাকে চেপে ধরবে এবং তার পাঁজরের- হাঁড়গুলো একটা অপরটার ফাঁকে ঢুকে পড়বে। রাবী বলেন, এ বলে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের আঙ্গুলগুলো তুলে ধরলেন এবং একটাকে অপরটার ফাঁকে প্রবেশ করালেন। তিনি বলেন: এবং তার জন্য সত্তরটি অজগর নিযুক্ত করা হবে। তন্মধ্যে একটি যদি পৃথিবীতে শ্বাস ফেলত তবে পৃথিবী কিয়ামত পর্যন্ত কিছুই উৎপন্ন করত না। সেই অজগরগুলো তাকে দংশন করতে থাকবে এবং তাকে ছোবল মারতে থাকবে। এভাবে হিসাব-নিকাশের দিন পর্যন্ত চলতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, নিশ্চয় কবর হয়ত জান্নাতের একটি বাগান নতুবা জাহান্নামের একটি গহ্বর।
(তিরমিযী (র) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসের উল্লিখিত পাঠ তাঁরই বর্ণিত। বায়হাকীও হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। তাঁরা উভয়ে উবায়দুল্লাহ ইব্‌ন ওয়লীদ ওয়াস্সাফী থেকে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি আতিয়‍্যা আওফীর সূত্রে আবু সাঈদ (রা) থেকে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অনির্ভরযোগ্য। তিরমিযী (র) বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। হাদীসটির উল্লিখিত সনদ ব্যতীত অন্য কোন সনদ আমাদের জানা নেই।)
كتاب التوبة والزهد
التَّرْغِيب فِي ذكر الْمَوْت وَقصر الأمل والمبادرة بِالْعَمَلِ وَفضل طول الْعُمر لمن حسن عمله وَالنَّهْي عَن تمني الْمَوْت
5078- وَعَن أبي سعيد الْخُدْرِيّ رَضِي الله عَنهُ قَالَ دخل رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم مُصَلَّاهُ فَرَأى نَاسا كَأَنَّهُمْ يكتشرون فَقَالَ أما إِنَّكُم لَو أَكثرْتُم ذكر هاذم اللَّذَّات أشغلكم عَمَّا أرى الْمَوْت فَأَكْثرُوا ذكر هاذم اللَّذَّات الْمَوْت فَإِنَّهُ لم يَأْتِ على الْقَبْر يَوْم إِلَّا تكلم فِيهِ فَيَقُول أَنا بَيت الغربة وَأَنا بَيت الْوحدَة وَأَنا بَيت التُّرَاب وَأَنا بَيت الدُّود فَإِذا دفن العَبْد الْمُؤمن قَالَ لَهُ الْقَبْر مرْحَبًا وَأهلا أما إِن كنت أحب من يمشي على ظَهْري إِلَيّ فَإذْ وليتك الْيَوْم فسترى صنيعي بك
قَالَ فيتسع لَهُ مد بَصَره وَيفتح لَهُ بَاب إِلَى الْجنَّة وَإِذا دفن العَبْد الْفَاجِر أَو الْكَافِر فَقَالَ لَهُ الْقَبْر لَا مرْحَبًا وَلَا أَهلا أما إِن كنت لأبغض من يمشي على ظَهْري إِلَيّ فَإِذا وليتك الْيَوْم وصرت إِلَيّ فسترى صنيعي بك قَالَ فيلتئم عَلَيْهِ حَتَّى يلتقي عَلَيْهِ وتختلف أضلاعه قَالَ فَأخذ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بأصابعه فَأدْخل بَعْضهَا فِي جَوف بعض قَالَ ويقيض لَهُ سَبْعُونَ تنينا لَو أَن وَاحِدًا مِنْهَا نفخ فِي الأَرْض مَا أنبتت شَيْئا مَا بقيت الدُّنْيَا فتنهشه وتخدشه حَتَّى يفضى بِهِ إِلَى الْحساب
قَالَ رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم إِنَّمَا الْقَبْر رَوْضَة من رياض الْجنَّة أَو حُفْرَة من حفر النَّار

رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ وَاللَّفْظ لَهُ وَالْبَيْهَقِيّ كِلَاهُمَا من طَرِيق عبيد الله بن الْوَلِيد الْوَصَّافِي وَهُوَ واه عَن عَطِيَّة وَهُوَ الْعَوْفِيّ عَن أبي سعيد وَقَالَ التِّرْمِذِيّ حَدِيث حسن غَرِيب لَا نعرفه إِلَّا من هَذَا الْوَجْه

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছে মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করতে বলা হয়েছে। মৃত্যুকে বলা হয়েছে স্বাদ-আহ্লাদ বিনাশকারী। অতিরিক্ত আনন্দ-ফুর্তি ও স্বাদ-আহ্লাদ ঈমান-আমলের পক্ষে নেহাৎ ক্ষতিকর। তাই ঈমান-আমল রক্ষার তাগিদে এর থেকে বাঁচা দরকার। তা বাঁচা সম্ভব মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করার দ্বারা।

কেউ যখন আনন্দ-ফুর্তিতে থাকে, তখন যদি কারও মৃত্যুসংবাদ আসে, তবে মুহূর্তের মধ্যে অন্তর থেকে আনন্দ-ফুর্তি উবে যায়। আর তা যদি কোনও প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ হয়, তবে আনন্দের স্থানে বিষাদ ছেয়ে যায়। মানুষের কাছে নিজ প্রাণই সর্বাপেক্ষা বেশি প্রিয়। ফুর্তির সময় যদি সেই প্রাণ মালাকুল মাওতের কবজায় চলে যাওয়ার কথা স্মরণ হয়ে যায়, তবে এক মুহূর্তও সে ফুর্তি বাকি থাকতে পারে না।

বেশি আনন্দ-ফুর্তি মানুষের মন শক্ত করে দেয়। শক্ত মন ফুর্তিভরে পাপকর্মে লিপ্ত হয়। নরম মনের মানুষ পাপ করলেও ভয়-ভীতির সঙ্গে করে। কিন্তু শক্ত মনের মানুষ তা করে স্পর্ধার সঙ্গে। তাই মন যাতে শক্ত না হতে পারে, সে লক্ষ্যে ফুর্তিনাশা মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করা চাই। তা স্মরণ করতে হবে মনে মনেও এবং মুখেও। মুখে পরস্পরে মৃত্যুর আলোচনা করলে তার সুফল বেশি পাওয়া যায়। যে অন্তরে মৃত্যুচিন্তা জাগ্রত থাকে, সে অন্তর সহজে পাপকর্মের দিকে ঝুঁকবে না; বরং ইবাদত-আনুগত্য করতেই বেশি আগ্রহী হবে।

একদিন আয়ু ফুরিয়ে যাবে। মালাকুল মাওত এসে প্রাণ সংহার করবে। আমার চেয়ে অল্প বয়সেরও বহু লোককে ইহজগৎ ত্যাগ করতে হয়েছে। আমার সমবয়সী অনেকেও এ জগৎ ছেড়ে চলে গেছে। আমাকেও একদিন চলে যেতে হবে। মৃত্যু থেকে রেহাই নেই কারও। মৃত্যুর যন্ত্রণা বড় কঠিন যন্ত্রণা। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ
মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যিই আসবে।(সূরা কাফ (৫০), আয়াত ১৯)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّ لِلْمَوْتِ سَكَرَات
নিশ্চয়ই মৃত্যুর আছে অনেক যন্ত্রণা।(সহীহ বুখারী: ৪৪৪৯)

কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, মৃত্যুর সর্বাপেক্ষা লঘু যন্ত্রণা তরবারির একশটি আঘাতের সমান। এ যদি হয় লঘু যন্ত্রণা, তবে কঠিন যন্ত্রণা কেমন! হযরত উমর রাযি. মৃত্যুযন্ত্রণা সম্পর্কে হযরত কা'ব ইবন উবাঈ রাযি.-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি উত্তরে বলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! মৃত্যু হল আদমসন্তানের উদরে বিপুল কাঁটাযুক্ত একটা গাছের মতো। যে কাঁটাগুলো তার প্রতিটি শিরা ও প্রতিটি জোড়ায় বিদ্ধ হয়ে আছে। এ অবস্থায় প্রচণ্ড বাহুবলসম্পন্ন এক ব্যক্তি সেই গাছটি ধরে টেনে বের করছে (এবার ভাবুন এতে সে ব্যক্তির কেমন কষ্ট হবে? মৃত্যুযন্ত্রণা এরকমই)। এ কথা শুনে হযরত উমর রাযি. কাঁদতে থাকলেন (আল্লাহ তা'আলা আমাদের সে যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করুন)।

সুস্থ-অসুস্থ প্রত্যেকের মৃত্যু সম্পর্কে এসব কথা নিয়মিত ভাবা উচিত। নিয়মিত ভাবতে থাকলে অন্তরে এ চিন্তা বসে যাবে। ফলে প্রতিটি কথা ও কাজ এ চিন্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। মৃত্যুচিন্তা ধনীর ধনের দর্প চূর্ণ করে। মৃত্যুর পাশে বিপুল ধনকেও বড় অল্প মনে হয়, বড় তুচ্ছ মনে হয়। মৃত্যুচিন্তা দরিদ্রকে তার দারিদ্র্যে তুষ্ট রাখে। তাকে লোভী হতে দেয় না। মৃত্যুচিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে সর্বস্তরের মানুষকে। সুতরাং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও শরী'আতের অনুসরণ করার পক্ষে মৃত্যুচিন্তা সর্বাপেক্ষা বেশি সহায়ক। সে কারণেই এ হাদীছ আমাদেরকে মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করতে বলেছে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এ হাদীছের উপর আমল করার তাওফীক দান করুন।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. অতিরিক্ত আনন্দ-ফুর্তি ঈমান-আমলের পক্ষে ক্ষতিকর।

খ. আনন্দ-ফুর্তির সীমালঙ্ঘন রোধে মৃত্যুচিন্তা খুব কার্যকর।

গ. কখনও-সখনও নয়; বরং বেশি বেশি পরিমাণে মৃত্যুর কথা চিন্তা করতে হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান