আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৩. অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ

হাদীস নং: ৫১৪১
অধ্যায়ঃ তাওবা ও যুহদ
আল্লাহ ভীতির প্রতি উৎসাহ প্রদান ও তার ফযীলত
৫১৪১. হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আল্লাহর কাছে যে কঠোর শাস্তি রয়েছে তা যদি মু'মিন বান্দা জানত, তবে কেউ তাঁর জান্নাত পাওয়ার লোভ করত না এবং আল্লাহর কাছে যে রহমত রয়েছে তা যদি কাফির ব্যক্তি জানত তবে তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হত না।
(মুসলিম (র) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।)
كتاب التوبة والزهد
التَّرْغِيب فِي الْخَوْف وفضله
5141- وَعَن أبي هُرَيْرَة رَضِي الله عَنهُ أَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ لَو يعلم الْمُؤمن مَا عِنْد الله من الْعقُوبَة مَا طمع بجنته أحد وَلَو يعلم الْكَافِر مَا عِنْد الله من الرَّحْمَة مَا قنط من رَحمته

رَوَاهُ مُسلم

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীছে আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ ও দয়ার গভীরতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার প্রতিটি গুণই অসীম অন্তহীন। তাঁর কোনও গুণ সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা লাভ করা কোনও মাখলুকের পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর ক্রোধ ও দয়ার গুণও সেরকমই। যদি ধরে নেওয়া যায় কোনও মুমিন ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার ক্রোধগুণ সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা লাভে সক্ষম হয়েছে, তবে সে ব্যক্তি তাঁর ক্রোধের যে বিভীষিকা দেখতে পাবে, তার বিপরীতে সে নিজে মুমিন হওয়া সত্ত্বেও কোনওকিছুর উপর বিন্দুমাত্র ভরসা রাখতে পারবে না। সে নিজ মুক্তিলাভের ব্যাপারে সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে পড়বে। জান্নাতলাভের কোনও আশাই তার অন্তরে থাকবে না। অনুরূপ আল্লাহ তা'আলার রহমতও এত বিপুল ও বিস্তৃত যে, কোনও ব্যক্তির সে সম্পর্কে যথাযথ ধারণা থাকলে কাফের হওয়া সত্ত্বেও সে আশাবাদী থাকবে। কঠিন কঠিন পাপ করা সত্ত্বেও সে রহমত থেকে নিরাশ হবে না। তার মনে আশা থাকবে যে, এত বিপুল রহমত থেকে সে কিছুতেই বঞ্চিত হতে পারে না। নিশ্চয়ই সে তাঁর রহমত পেয়ে মুক্তিলাভে সক্ষম হবে। অপর এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ اللهَ خَلَقَ الرَّحْمَةَ يَوْمَ خَلَقَهَا مِائَةَ رَحْمَةٍ، فَأَمْسَكَ عِنْدَهُ تِسْعًا وَتِسْعِيْنَ رَحْمَةً، وَأَرْسَلْ فِي خَلْقِهِ كُلِّهِمْ رَحْمَةً وَاحِدَةً، فَلَوْ يَعْلَمُ الْكَافِرُ بِكُلِّ الَّذِي عِنْدَ اللَّهِ مِنَ الرَّحْمَةِ يئس مِنَ الْجَنَّةِ، وَلَوْ يَعْلَمُ الْمُؤْمِنُ بِكُلِّ الَّذِي عِندَ اللهِ مِنَ الْعَذَابِ لَمْ يَأْمَنْ مِنَ النَّارِ.
"আল্লাহ তা'আলা যেদিন তাঁর রহমতগুণের প্রকাশ করেন, সেদিন তিনি একে একশ' ভাগে ভাগ করেন। নিজের কাছে রেখে দেন নিরানব্বই ভাগ রহমত এবং সমস্ত মাখলুকের কাছে পাঠান একভাগ রহমত। কোনও কাফের যদি আল্লাহর কাছে রেখে দেওয়া রহমতের সবটা সম্পর্কে জানত, তবে সে জান্নাত পাওয়ার ব্যাপারে হতাশ হতো না। আর কোনও মুমিন যদি আল্লাহর কাছে থাকা আযাবের সবটা জানত, তবে সে জাহান্নাম থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করত না।

প্রকাশ থাকে যে, এ জাতীয় হাদীছ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় উৎসাহ দেওয়া। ভয়বিহীন আশা ও আশাবিহীন ভয় কোনওটিই কল্যাণকর নয়। তাই যখন আল্লাহ তা'আলার রহমতের প্রতি লক্ষ করা হবে, তখন একান্তভাবে তাতেই বিভোর না থেকে তাঁর আযাব ও গযবের প্রতিও দৃষ্টিপাত করা চাই। এমনিভাবে যখন আল্লাহ তা'আলার আযাব ও গযবের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হবে, তখন কেবল তাতেই নিমগ্ন না থেকে তাঁর রহমতের প্রতিও লক্ষ করা চাই। এতে অন্তরে ভারসাম্য পয়দা হবে। না অতি আশার কারণে পাপ-প্রবণতা উস্কানি পাবে, আর না মাত্রাতিরিক্ত ভীতির কারণে অন্তরে হতাশা জন্ম নেবে। অতি আশা ও অতি ভয়ের কারণে ভালো-মন্দের বিচার-বুদ্ধি ঘুচে যায় আর তাতে জীবনাচার সম্পূর্ণ বেলাগাম হয়ে পড়ে। এ কারণেই হাদীছে আল্লাহর শাস্তি ও ক্রোধের পাশাপাশি তাঁর রহমতের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। কুরআন মাজীদেও ইরশাদ হয়েছে-
عِبَادِى اني أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيْمُ
'আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দাও, নিশ্চয় আমিই অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। এবং এটাও জানিয়ে দাও যে, আমার শাস্তিই অতি মৰ্মস্তুদ শাস্তি।
অপর এক আয়াতে মুমিনদের বিশেষত্ব বলা হয়েছে-
وَيَرْجُوْنَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ
এবং তারা তাঁর রহমতের আশা করে ও তাঁর আযাবকে ভয় করে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কোনও অবস্থায়ই আল্লাহ তা'আলার রহমত থেকে হতাশ হতে নেই। তাঁর রহমত অসীম।

খ. আল্লাহর আযাব সুকঠিন। নিজ আমলের ভরসায় কখনওই তাঁর আযাব হতে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়া উচিত নয়।

গ. নেক আমলে যত্নবান থেকে আল্লাহর রহমতের আশা রাখার পাশাপাশি তাঁর আযাব সম্পর্কে ভীত থাকাই হচ্ছে ভারসাম্যমাণ পন্থা। এটাই কল্যাণকর।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান