আত্-তারগীব ওয়াত্-তারহীব- ইমাম মুনযিরী রহঃ

২৫. অধ্যায়ঃ পুনরুত্থান ও কিয়ামাত

হাদীস নং: ৫৫০৬
অধ্যায়ঃ পুনরুত্থান ও কিয়ামাত
পরিচ্ছেদ: হাওযে কাওসার, পাল্লা ও পুলসিরাত সম্পর্কে আলোচনা
৫৫০৬. হযরত সাওবান (রা) থেকে বর্ণিত। বলেছেন, নিশ্চয় আমি আমার হাওযে কাওসারের পশ্চাদভাগে থাকব, ইয়ামানবাসীদের পানি পান করার জন্য মানুষ সরিয়ে দেব। আমি আমার লাঠি দ্বারা (পানিতে) আঘাত করব, যার ফলে তাদের গায়ে পানির ছিটা পড়বে। এরপর তাঁকে হাওযে কাওসারের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমার অবস্থানের জায়গা থেকে আম্মান পর্যন্ত এবং তার পানীয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, দুধের চেয়ে অধিক সাদা এবং মধুর চেয়ে অধিক মিষ্টি। তা থেকে দু'টি নালী প্রবাহিত হবে। নালীদ্বয় হাওযটিকে জান্নাত পর্যন্ত বইয়ে নিয়ে যাবে। একটি নালী হবে স্বর্ণের, অপরটি রূপার।
(মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী, ইবন মাজাহ ও হাকিম আবূ সালাম হাবশীর সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হাকিম হাদীসটিকে সহীহ্ সাব্যস্ত করেছেন। আবু সালাম হাবশী বলেন, উমার ইবন আব্দুল আযীয (র) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তাঁর কাছে পৌঁছার পর তাঁকে বললাম, হে আমীরুল মু'মিনীন। আমার আসতে অনেক কষ্ট হয়েছে। তিনি বললেন, হে আবু সালাম, আপনাকে কষ্ট দেওয়া উদ্দেশ্য নয়, তবে আপনার সূত্রে আমার কাছে একটি হাদীস এসেছে, যা আপনি হাওযে কাওসার সম্পর্কে সাওবান (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন। সুতরাং আমার ইচ্ছা হল, হাদীসটি আপনি সরাসরি নিজ মুখে আমাকে বলবেন। তখন আমি বললাম, সাওবান (রা) আমাকে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, আমার হাওযে কাওসার আদন থেকে আম্মান আল-বালকা'র মধ্যবর্তী জায়গার সমান। তার পানি বরফের চেয়ে অধিক সাদা, মধুর চেয়ে অধিক মিষ্টি এবং তার পানপাত্র রাশি সংখ্যায় আকাশের তারকারাজির সমান। যে তা থেকে এক ঢোক পানি পান করবে সে এরপর কখনও তৃষ্ণার্ত হবে না। হাওযে কাওসারে পানি পানের জন্য সর্বপ্রথম আগমনকারী মানুষ হবে দরিদ্র মুহাজিরগণ। তাদের মাথার চুল হবে উসকো খুসকো, কাপড় হবে জীর্ণ মলিন, যারা প্রাচুর্য মণ্ডিতাদেরকে বিবাহ করে না এবং যাদের জন্যে সাধারণত দরজা খোলা হয় না। উমর (রা) বললেন, আমার কাছে তো প্রাচুর্যমণ্ডিতা নারী ফাতিমা বিনতে আবদুল মালিককে বিবাহ দেওয়া হয়েছে এবং আমার জন্য দরজাও খোলা হয়ে থাকে। কাজেই আমি আমার চুল উসকো খুসকো না হওয়া আমার মাথা ধৌত করব না, এবং যে কাপড় আমার দেহ রয়েছে তা ময়লা না হওয়া পর্যন্ত ধৌত করব না।)
كتاب البعث
فصل فِي الْحَوْض وَالْمِيزَان والصراط
5506- وَعَن ثَوْبَان رَضِي الله عَنهُ أَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ إِنِّي لبعقر حَوْضِي أذود النَّاس لأهل الْيمن أضْرب بعصاي حَتَّى يرفض عَلَيْهِم فَسئلَ عَن عرضه فَقَالَ من مقَامي إِلَى عمان وَسُئِلَ عَن شرابه فَقَالَ أَشد بَيَاضًا من اللَّبن وَأحلى من الْعَسَل يغت فِيهِ مِيزَابَانِ يمدانه من الْجنَّة أَحدهمَا من ذهب وَالْآخر من ورق
رَوَاهُ مُسلم وروى التِّرْمِذِيّ وَابْن مَاجَه وَالْحَاكِم وَصَححهُ عَن أبي سَلام الحبشي قَالَ بعث إِلَيّ عمر بن عبد الْعَزِيز فَحملت على الْبَرِيد فَلَمَّا دخلت إِلَيْهِ قلت يَا أَمِير الْمُؤمنِينَ لقد شقّ عَليّ مركبي الْبَرِيد فَقَالَ يَا أَبَا سَلام مَا أردْت أَن أشق عَلَيْك وَلَكِن بَلغنِي عَنْك حَدِيث تحدثه عَن ثَوْبَان عَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم فِي الْحَوْض فَأَحْبَبْت أَن تشافهني بِهِ فَقلت حَدثنِي ثَوْبَان أَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم قَالَ حَوْضِي مثل مَا بَين عدن إِلَى عمان البلقاء مَاؤُهُ أَشد بَيَاضًا من الثَّلج وَأحلى من الْعَسَل وأكوابه عدد نُجُوم السَّمَاء من شرب مِنْهُ شربة لم يظمأ بعْدهَا أبدا وَأول النَّاس ورودا عَلَيْهِ فُقَرَاء الْمُهَاجِرين الشعث رؤوسا الدنس ثيابًا الَّذين لَا ينْكحُونَ الْمُنَعَّمَاتِ وَلَا تفتح لَهُم أَبْوَاب السدد فَقَالَ عمر قد أنكحت الْمُنَعَّمَاتِ فَاطِمَة بنت عبد الْملك وَفتحت لي أَبْوَاب السدد لَا جرم لَا أغسل رَأْسِي حَتَّى يشعث وَلَا ثوبي الَّذِي يَلِي جَسَدِي حَتَّى يتسخ

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

عقر الْحَوْض بِضَم الْعين وَإِسْكَان الْقَاف هُوَ مؤخره
أذود النَّاس لأهل الْيمن أَي أطردهم وأدفعهم ليرد أهل الْيمن
يرفض بتَشْديد الضَّاد الْمُعْجَمَة أَي يسيل ويترشش
يغت فِيهِ مِيزَابَانِ هُوَ بغين مُعْجمَة مَضْمُومَة ثمَّ تَاء مثناة فَوق أَي يجريان فِيهِ جَريا لَهُ صَوت وَقيل يدفقان فِيهِ المَاء دفقا مُتَتَابِعًا دَائِما من قَوْلك غت الشَّارِب المَاء جرعا بعد جرع
الشعث بِضَم الشين الْمُعْجَمَة جمع أَشْعَث وَهُوَ الْبعيد الْعَهْد بدهن رَأسه وَغسل وتسريح شعره
الدنس بِضَم الدَّال وَالنُّون جمع دنس وَهُوَ الْوَسخ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আদন (এডেন) ইয়েমেনের একটি মশহুর শহর। আম্মানও (আম্মান বর্তমানে জর্দানের রাজধানী) সিরিয়ার অন্তর্গত একটি প্রসিদ্ধ শহর। বালাকাআ আম্মানের নিকটবর্তী একটি জনপদ। বৈশিষ্ট এবং নিশানী হিসেবে আম্মানের বলাকাআ এর উল্লেখ করা হয়েছে। তার অর্থ হল আমাদের দুনিয়াতে আদন এবং বলাকাআ-এর নিকটবর্তী আম্মানের দূরত্ব যতটুকু আখিরাতে হাওযে কাওসারের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত দূরত্ব ততটুকু হবে। বলাবাহুল্য মাপতোল করে এ দূরত্ব নির্ণয় করে বলা হয়নি যে, এটা এত মাইল বা এত ফার্লং বা এত ফুটের ব্যবধান হবে। বরং তার প্রশস্ততা বুঝানোর জন্য আনুমানিক ভাবে বলা হয়েছে বস্তুতঃ অসংখ্য মাইলব্যাপী প্রশস্ত হবে হাওযে কাওসার।

অবশেষে বলা হয়েছে, হাওযে যারা সর্বপ্রথম পৌঁছবেন এবং পানি পান করার সৌভাগ্য হাসিল করবেন তারা হবেন গরীব মুহাজির যারা নিজেদের দৈন্যতা এবং দুনিয়া বিমুখতার কারণে চুল পরিপাটি করতেন না বরং চুল এলোমেলো থাকত। তারা পেরেশান থাকবেন, জামা কাপড় ময়লা থাকত, যাদেরকে কোন বিত্তবান নিজের মেয়ে বিয়ে দিত না এবং অগত্যা কোন স্থানে গমন করলে জামাকাপড়ের দৈন্যতার কারণে যাদেরকে স্বাগতম জানান হত না।

এটা অনুমিত হয় যে, দুনিয়া বিমুখতা, দীনের প্রতি ঐকান্তিকতা এবং আখিরাতের চিন্তার আধিক্যের কারণে যারা দুনিয়ার যিন্দেগীতে নিজেদের আরাম-আয়েশ কুরবান করেছেন এবং নিজেদের চুল পরিপাটি করতে পারেন নি এবং লেবাস-পোশাক সুন্দর রাখতে পারেন নি কিয়ামতের দিন তারা আখিরাতের পুরস্কার লাভ করার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হাসিল করবেন। যারা হাল যামানায় এ অবস্থাকে 'তাকাস্বাফ' বা 'রুহবানিয়াত' বা 'দীনের গলদ ধারণার পরিণতি' জ্ঞান করেন তাদের এ সংক্রান্ত হাদীস সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা উচিত।

প্রত্যেক যুগের বিশেষ ব্যধি থাকে। যেরূপ এককালে রুহবানিয়াত এবং 'তরকে দুনিয়ার' অনৈসলামী চিন্তাধারা এবং আচরণকে অনেক লোক খালেস ইসলামী চেষ্টা সাধনা মনে করতেন ঠিক সেরূপ অনেকে হাল যামানার বিত্ত ও নফস পরস্তির দাবির সাথে ইসলামী চিন্তা ও তালিমের সামঞ্জস্য বিধান করার উপর মাত্রাধিক গুরুত্ব আরোপ করে থাকেন।

وَاللّٰہُ یَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ

যখন পিপাসা পিপাসা বলে চিৎকার শোনা যাবে, তখন এক ধরনের লোককে হাওযে কাওসারের পানি সর্বাগ্রে পান করান হবে। তারা অশেষ মর্যাদার অধিকারী হবে এবং এই পানি পান করার পর পিপাসা তাদের কখনো স্পর্শ করবে না।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান