মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)

বিবাহ অধ্যায়

হাদীস নং: ২৭৫
বিবাহ অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: সদ্ভাবে জীবন যাপন ও উত্তম আচার-ব্যবহার।
২৭৫। এ হাদীসটিও তাঁর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে আমার কামরার দরজায় দাঁড়াতে দেখেছি। যখন হাবশার লোকেরা ছোট বর্শা দিয়ে খেলা করছিল। তিনি তাঁর চাদর দিয়ে আমাকে পর্দা করেছেন যেন আমি তাদের খেলা দেখতে পারি। অতঃপর আমি নিজে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন।
(বুখারী, মুসলিম, এবং অন্যরা। দু' ঈদের পর্বে 'ঈদের দিন তাম্বুরা বাজান এবং খেলা করা' শীর্ষক পরিচ্ছেদে এর সমর্থক হাদীস বর্ণিত আছে।)
كتاب النكاح
باب فضل احسان العشرة وحسن العشرة وحسن الخلق مع الزوجة
وعنها أيضا (9) قالت لقد رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقوم على باب حجرتى والحبشة يلعبون بحرابهم يسترنى بردائه لكى أنظر الى لعبهم ثم يقوم حتى أكون أنا التى أنصرف

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ ঘটনাটিও স্ত্রীদের সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উত্তম আচরণ ও তাদের মনস্তুষ্টির চূড়ান্ত উদাহরণ। আর এর মধ্যে উম্মতের জন্য বিরাট শিক্ষা রয়েছে।

ঈদের মধ্যে খেলা ও আমোদ ফুর্তিরও অবকাশ রয়েছে
এখানে এ বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এটা ঈদের দিন ছিল- যেমন বুখারী ও মুসলিমের এক বর্ণনায় এর স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। আর ঈদের মধ্যে খেলা ও আমোদ-ফুর্তিরও এক পর্যায় পর্যন্ত অবকাশ রয়েছে। কেননা, সার্বজনীন উৎসব ও আনন্দের এটাও একটি প্রাকৃতিক চাহিদা। বুখারী মুসলিম ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থে হযরত আয়েশা রাযি. থেকে এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, একবার ঈদের দিনে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কাপড় মুড়ি দিয়ে আরাম করছিলেন। এর মধ্যে দু'টি বালিকা এসে দফ বাজিয়ে বুআছ যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল। ইতিমধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. এসে গেলেন। তিনি তাদেরকে শাসিয়ে ভাগিয়ে দিতে চাইলেন। হুযুর (ﷺ) মুখ খুলে বললেন: «دعهما يا أبا بكر؛ فإنها أيام عيد» অর্থাৎ, হে আবু বকর! এদেরকে ছেড়ে দাও, তারা যা করছে করতে দাও। কেননা, এটা ঈদের দিন। এর অর্থ এই ছিল যে, ঈদের দিনে এরূপ আনন্দ-উৎসবের এক পর্যায় পর্যন্ত অবকাশ রাখা হয়েছে। সারকথা, ব্যাখ্যাধীন হাদীসে হাবশীদের যে খেলার এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ খেলা দেখার যে উল্লেখ রয়েছে, এ ব্যাপারে একটি কথা তো এই স্মরণ রাখতে হবে যে, এটা ছিল ঈদের দিন। আর ঈদের মধ্যে এ ধরনের কিছু আনন্দ-ফুর্তির অবকাশ রয়েছে।

এটা একটা উদ্দেশ্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয় খেলা ছিল, এ জন্যই স্বয়ং হুযুর (ﷺ)-এর প্রতি আকর্ষণ দেখিয়েছেন
তাছাড়া বর্শা নিক্ষেপের এই খেলাটি একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ খেলা ছিল- যা যুদ্ধবিদ্যার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণেরও একটি মাধ্যম ছিল। সম্ভবতঃ এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বয়ং এর প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। বুখারী-মুসলিমের এ হাদীসেরই কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, হুযুর (ﷺ) এই খেলোয়াড়দেরকে دونكم يا بني أرفدة বলে ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন এবং তাদেরকে সাহস প্রদান করছিলেন। এ ঘটনা প্রসঙ্গেই বুখারী মুসলিমের কোন কোন বর্ণনায় একথাও রয়েছে যে, হযরত উমর রাযি. এই হাবশী খেলোয়াড়দেরকে মসজিদ থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়ে ছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত উমরকে বললেন: دعهم অর্থাৎ, এদেরকে খেলতে দাও। আর খেলোয়াড়দেরকে বললেন: أَمْنًا بني أَرْفِدَة অর্থাৎ, তোমরা নির্ভয়ে ও নিশ্চিন্তমনে খেল।

পর্দার প্রশ্ন
এই হাদীস প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই উত্থাপিত হয় যে, এই হাবশী লোকগুলো হযরত আয়েশা রাযি.-এর জন্য নিশ্চিতভাবে গায়র মাহরাম ও পরপুরুষ ছিল। এরপরও তিনি কেন তাদের খেলা দেখলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কেন দেখালেন?
কোন কোন হাদীস ব্যাখ্যাতা এর এই উত্তর দিয়েছেন যে, এটা ঐ সময়কার ঘটনা, যখন পর্দার বিধান নাযিলই হয়নি। কিন্তু রেওয়ায়তের আলোকে একথা সঠিক প্রমাণিত হয় না। ফাতহুল বারী গ্রন্থে হাফেয ইবনে হাজার (রহ) ইবনে হিব্বানের বরাতে উল্লেখ করেছেন যে, এ ঘটনাটি সপ্তম হিজরীর, যখন হাবশার অধিবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর খেদমতে উপস্থিত হয়েছিল। আর পর্দার বিধান নিশ্চিতই এর পূর্বে এসে গিয়েছিল।

তাছাড়া হযরত আয়েশার ব্যাখ্যাধীন এ হাদীসে একথাও উল্লেখিত রয়েছে যে, যখন তিনি এ খেলা দেখছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের চাদর দিয়ে তার জন্য পর্দার ব্যবস্থা করেছিলেন। এ ঘটনাটি যদি পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পূর্বের হত, তাহলে এর কোন প্রয়োজন হত না।

এ প্রশ্নের উত্তরে আরেকটি কথা এই বলা হয়েছে যে, যেহেতু এর আদৌ কোন আশংকা ছিল না যে, এসব হাবশীদের খেলা দেখে হযরত আয়েশার অন্তরে কোন মন্দ খেয়াল ও ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি হয়ে যাবে, এজন্য তাঁর জন্য এটা দেখা জায়েয ছিল। আর যখনই কোন মহিলার জন্য এমন অবস্থা ও পরিবেশ থাকে যে, সে নিজেকে ফিতনা ও অনিষ্ট থেকে নিরাপদ মনে করে, তখন তার জন্য কোন ভিন্ন পুরুষকে দেখা নাজায়েয হবে না। ইমাম বুখারী (রহ) বুখারী শরীফের নিকাহ অধ্যায়ে এই হাদীসের উপর باب النظر إلى الحبشة ونحوهم من غيرريبة এর শিরোনাম কায়েম করে এই উত্তরের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। আর নিঃসন্দেহে এ উত্তরটি অধিক স্বস্তিকারক।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান