মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনচরিত অধ্যায়
হাদীস নং: ৩৪
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনচরিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদ : ওহীর সূচনা ও কীভাবে জিব্রাইল (আ) রাসূলের (ﷺ) কাছে আসতেন এবং কীরূপে তিনি তাঁকে দেখতেন?
(৩৪) আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলের (ﷺ) প্রতি ওহীর সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন, তা ভোরের আলোকরশ্মির ন্যয় সত্যরূপে উদ্বাসিত হয়ে উঠতো। অতঃপর নির্জনতা বা একাকী জীবন যাপনের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। তিনি হেরা গুহাতে এসে একাধারে কয়েক রাত ইবাদতে মগ্ন থাকতেন এবং এর জন্য তিনি সাথে পাথেয় (খাবার ও পানীয়) নিয়ে যেতেন। (খাবার সামগ্রী ফুরিয়ে গেলে) পুনরায় তিনি খাদীজার (রা) কাছে ফিরে আসতেন এবং খাদ্য-সামগ্রী নিয়ে গুহাতে ফিরে যেতেন। (অবশেষে) একদিন তাঁর কাছে সত্য সমাগত হলো। রাসূল (ﷺ) তখন হেরা গুহায় অবস্থান করছিলেন। এমন সময় ফেরেশতা (জিব্রীল আ.) আগমন করে বললেন, পড়ুন। রাসূল (ﷺ) বলেন, আমি বললাম, আমি তো পাঠ করতে পারি না। অতঃপর তিনি আমাকে কাছে টেনে নিলেন এবং এত জোরে আলিঙ্গন করলেন যে, আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম; তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করে বললেন, পড়ুন। উত্তরে আমি বললাম, আমি পড়তে পারি না। পুনরায় দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে কাছে টেনে খুব জোরে চেপে ধরলেন, ফলে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। এরপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, পড়ুন। আমি বললাম, আমি পড়তে জানি না। অতঃপর ফেরেশতা আমাকে তৃতীয় বার তাঁর কাছে টেনে দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গন করলেন, ফলে আমি আরও ক্লান্ত হয়ে উঠলাম। এরপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করে বললেন,
اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ .
পাঠ করুন, আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন...
এমনিভাবে তিনি مَا لَمْ يَعْلَمُ পর্যন্ত পাঠ করে শোনান। রাবী বলেন, অতঃপর রাসূল (ﷺ) তা নিয়ে ফিরে আসলেন। (ভয়ে) তাঁর কাঁধের পেশি কাঁপছিল। তিনি খাদীজার গৃহে প্রবেশ করে বললেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তারা তখন তাঁকে বস্ত্রাবৃত করেন। যখন তাঁর ভয়-ভীতি বিদূরিত হয়ে গেল, তখন তিনি খাদীজাকে (রা) বললেন, আমার এ কী হলো খাদীজা! অতঃপর সমস্ত ঘটনা বিবৃত করলেন এবং বললেন, আমি আমার শঙ্কাবোধ করছি। খাদীজা (রা) বললেন, কখনও না। সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর শপথ, তিনি কখনও আপনাকে অপমানিত করবেন না। নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন, সদা সত্য বলেন, অসহায়দের অভাব দূর করেন, অতিন্দ্রিয় সেবা করেন। অপরের বিপদে সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহকে (ﷺ) সাথে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইব্ন নওফাল ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যা ইবন্ কুসাই-এর কাছে গেলেন। ওয়ারাকা জাহেলী যুগে ঈসায়ী ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তিনি আরবী ভাষায় পুস্তকাদি লিখতেন। এমনকি তিনি আরবী ভাষায় ইঞ্জিলের কিছু অংশ, যা আল্লাহর ইচ্ছা হয়েছিল, লিখেছিলেন। তাঁর বয়সও হয়েছিল অনেক এবং দৃষ্টিশক্তিও লোপ পেয়েছিল। খাদীজা (রা) তাঁকে বললেন, ভাই (চাচাত), আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের কাছ থেকে (ঘটনার বিবরণ) শুনুন। ওয়ারাকা বললেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি কী দেখেছ? তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যা দেখেছিলেন, সব খুলে বর্ণনা করলেন। (ঘটনা শুনে) ওয়ারাকা বললেন, ইনি হচ্ছেন 'নামুস' (জিব্রীল আ.), যাঁকে মূসার (আ) কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। হায় আফসোস! আমি যদি সেই সময় বেঁচে থাকতাম, যখন তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা তোমাকে বহিষ্কার করে দেবে! রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন- তারা কি আমাকে বিতাড়িত করবে? ওয়ারাকা বললেন, হ্যাঁ, যিনিই তোমার ন্যায় এইরূপ সত্য নিয়ে আগমন করেছেন (অতীতে), তাঁকেই দেশ থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে। তোমার জীবনের ঐ দিনগুলোতে যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে আমি সর্বশক্তি দিয়ে তোমাকে সাহায্য করবো। কিন্তু এরপর ওয়ারাকা বেশী দিন বেঁচে থাকেননি এবং কিছুদিনের জন ওহী আসা বন্ধ হয়ে যায়। ওহীর এই বিরতির একপর্যায়ে আল্লাহর রাসূল খুব পেরেশান ও চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে পড়েন। এমনকি তিনি কয়েকবার পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে সেখান থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহননের ইচ্ছা করেন। কিন্তু যখনই তিনি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতেন, সেখান থেকে নীচে পড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে, তখনই জিব্রীল (আ) তাঁর সম্মুখে ভেসে উঠতেন এবং সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, হে মুহাম্মদ, সত্যি আপনি আল্লাহর রাসূল। এতে তাঁর মনের অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূরীভূত হয়ে যেত এবং তিনি ফিরে আসতেন। এরপরও যখন ওহীর বিরতিমাত্রা দীর্ঘায়িত হতো, তিনি আবারো বিচলিত হয়ে পড়তেন। যখনই পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতেন, তখনই জিব্রীল (আ) তাঁর সম্মুখে প্রতিভাত হয়ে পূর্বের ন্যায় সান্ত্বনা বাণী শুনতেন। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ও নাসাঈ)
اِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ .
পাঠ করুন, আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন...
এমনিভাবে তিনি مَا لَمْ يَعْلَمُ পর্যন্ত পাঠ করে শোনান। রাবী বলেন, অতঃপর রাসূল (ﷺ) তা নিয়ে ফিরে আসলেন। (ভয়ে) তাঁর কাঁধের পেশি কাঁপছিল। তিনি খাদীজার গৃহে প্রবেশ করে বললেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তারা তখন তাঁকে বস্ত্রাবৃত করেন। যখন তাঁর ভয়-ভীতি বিদূরিত হয়ে গেল, তখন তিনি খাদীজাকে (রা) বললেন, আমার এ কী হলো খাদীজা! অতঃপর সমস্ত ঘটনা বিবৃত করলেন এবং বললেন, আমি আমার শঙ্কাবোধ করছি। খাদীজা (রা) বললেন, কখনও না। সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহর শপথ, তিনি কখনও আপনাকে অপমানিত করবেন না। নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন, সদা সত্য বলেন, অসহায়দের অভাব দূর করেন, অতিন্দ্রিয় সেবা করেন। অপরের বিপদে সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহকে (ﷺ) সাথে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইব্ন নওফাল ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যা ইবন্ কুসাই-এর কাছে গেলেন। ওয়ারাকা জাহেলী যুগে ঈসায়ী ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তিনি আরবী ভাষায় পুস্তকাদি লিখতেন। এমনকি তিনি আরবী ভাষায় ইঞ্জিলের কিছু অংশ, যা আল্লাহর ইচ্ছা হয়েছিল, লিখেছিলেন। তাঁর বয়সও হয়েছিল অনেক এবং দৃষ্টিশক্তিও লোপ পেয়েছিল। খাদীজা (রা) তাঁকে বললেন, ভাই (চাচাত), আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের কাছ থেকে (ঘটনার বিবরণ) শুনুন। ওয়ারাকা বললেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি কী দেখেছ? তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যা দেখেছিলেন, সব খুলে বর্ণনা করলেন। (ঘটনা শুনে) ওয়ারাকা বললেন, ইনি হচ্ছেন 'নামুস' (জিব্রীল আ.), যাঁকে মূসার (আ) কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। হায় আফসোস! আমি যদি সেই সময় বেঁচে থাকতাম, যখন তোমার সম্প্রদায়ের লোকেরা তোমাকে বহিষ্কার করে দেবে! রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন- তারা কি আমাকে বিতাড়িত করবে? ওয়ারাকা বললেন, হ্যাঁ, যিনিই তোমার ন্যায় এইরূপ সত্য নিয়ে আগমন করেছেন (অতীতে), তাঁকেই দেশ থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে। তোমার জীবনের ঐ দিনগুলোতে যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে আমি সর্বশক্তি দিয়ে তোমাকে সাহায্য করবো। কিন্তু এরপর ওয়ারাকা বেশী দিন বেঁচে থাকেননি এবং কিছুদিনের জন ওহী আসা বন্ধ হয়ে যায়। ওহীর এই বিরতির একপর্যায়ে আল্লাহর রাসূল খুব পেরেশান ও চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে পড়েন। এমনকি তিনি কয়েকবার পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে সেখান থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহননের ইচ্ছা করেন। কিন্তু যখনই তিনি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতেন, সেখান থেকে নীচে পড়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে, তখনই জিব্রীল (আ) তাঁর সম্মুখে ভেসে উঠতেন এবং সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন, হে মুহাম্মদ, সত্যি আপনি আল্লাহর রাসূল। এতে তাঁর মনের অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূরীভূত হয়ে যেত এবং তিনি ফিরে আসতেন। এরপরও যখন ওহীর বিরতিমাত্রা দীর্ঘায়িত হতো, তিনি আবারো বিচলিত হয়ে পড়তেন। যখনই পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করতেন, তখনই জিব্রীল (আ) তাঁর সম্মুখে প্রতিভাত হয়ে পূর্বের ন্যায় সান্ত্বনা বাণী শুনতেন। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ও নাসাঈ)
كتاب سيرة أول النبيين وخاتم المرسلين نبينا محمد بن عبد الله صلى الله عليه وسلم
باب في بدء الوحي وكيف كان يأتيه ورؤيته صلى الله عليه وسلم لجبريل عليه السلام
عن عائشة رضي الله عنها قالت أول ما بدئ به رسول الله صلى الله عليه وسلم من الوحى الرؤيا الصادقة فى النوم، وكان لا يرى رؤيا الا جاءت مثل فلق الصبح ثم حبب اليه الخلاء فكان يأتى غار حراء فيتحنث فيه وهو التعبد الليالى ذوات العدد ويتزود لذلك ثم يرجع الى خديحة فتزوده لمثلها حتى فجأه الحق وهو فى غار حراء فجاءه الملك فيه فقال اقرأ، فقال رسول الله صلى الله عليه وآله وصحبه وسلم فقلت ما أنا بقارئ قال فأخذني فغطني حتى بلغ منى الجهد ثم أرسلنى فقال اقرأ، فقلت ما أنا بقارئ فأخذنى فغطنى الثانية حتى بلغ منى الجهد، ثم أرسلنى فقال اقرأ، فقلت ما أنا بقارئ، فأخذنى فغطنى الثالثة حتى بلغ منى الجهد، ثم أرسلنى فقال اقرأ باسم ربك الذى خلق حتى بلغ ما لم يعلم: قال فرجع بها ترجف بواد حتى دخل على خديجة فقال زملونى زملونى فزملوه حتى ذهب عنه الروع فقال يا خديجة مالى فأخبرها الخبر، قال وقد خشيت على نفسى فقالت له كلا: ابشر فوالله لا يخزيك الله أبدا انك لتصل الرحم وتصدق الحديث وتحمل الكل وتقرى الضيف وتعين على نوائب الخق ثم انطلقت به خديجة حتى أتت به ورقة بن نوفل بن أسد بن عبد العزى بن قصى وهو ابن عم خديجة أخى أبيها وكان امرأ تنصر فى الجاهلية وكان يكتب الكتاب العربى فكتب بالعربية من الانجيل ما شاء الله أن يكتب، وكان شيخأ كبيرا قد عمى، فقالت خديجة اى ابن عم اسمع من ابن أخيك، فقال ورقة ابن أخى ما ترى؟ فأخبره رسول الله صلى الله عليه وسلم ما رأى، فقلا ورقة هذا الناموس الذى أنزل على موسى عليه السلام ياليتنى فيها جذعا أكون حيًا حين يخرجك قومك فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أو مخرجى هم؟ فقال ورقة نعم، لم يأت رجل قط بما جئت به الا عودى وإن يدركنى يومك انصرك نصرا مؤزرا ثم لم ينشب ورقة أن توفي وفتر الوحي فترة حتى حزن رسول الله صلى الله عليه وسلم فيما بلغنا حزنا غدا منه مرارا كى يتردى من رءوس شواهق الجبال فكلما أوفى بذروة جبل لكى يلقى نفسه منه تبدّى له جبريل عليه السلام فقال يا محمد انك رسول الله حقا فيسكن ذلك جأشه وتقر نفسه عليه الصلاة والسلام فيرجع فاذا طالبت عليه وفتر الوحى غدا لمثل ذلك، فاذا أوفى بذروة جبل تبدّى له جبريل فقال له مثل ذلك
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নবুওয়াতের প্রারম্ভ ও ওহী নাযিলের সূচনার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এ হাদীসের রাবী হলেন, উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি., যিনি তখন জন্মই গ্রহণ করেননি। কিন্তু হাদীসটির নির্ভরযোগ্যতার উপর এর কোন প্রভাব পড়ে না। কেননা, হয়ত তিনি এ ঘটনা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শুনে থাকবেন। (আর প্রবল ধারণা এটাই।) অথবা নিজ পিতা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. থেকে কিংবা অন্য কোন সাহাবী থেকে শুনেছেন- যারা স্বয়ং হুযুর (ﷺ) থেকে ঘটনা শুনেছিলেন। আর আহলে সুন্নতের স্বীকৃত নীতি হল: الصحابة كلهم عدول (অর্থাৎ, সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম ন্যায়নিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য।) তাই হযরত আয়েশা সিদ্দীকা এ কথার প্রয়োজন মনে করলেন না যে, এটা বলে দিতে হবে, তিনি কার নিকট থেকে শুনেছেন। আমাদের বিশ্বাসের জন্য তাঁর বর্ণনাই যথেষ্ট। যদি এ ব্যাপারে তাঁর পূর্ণ আস্থা না থাকত, তাহলে তিনি কখনো এভাবে বর্ণনা করতেন না। নিশ্চয়ই হুযুর (ﷺ)-এর তরবিয়ত ও দীক্ষার ফলে তিনি একথা জানতেন যে, হুযুর (ﷺ) সম্পর্কে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বর্ণনা কত বড় দায়িত্ব ও যিম্মাদারীর বিষয়।
হাদীসটিতে সর্বপ্রথম বিষয় এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি ওহীর ধারা এভাবে শুরু হয় যে, তিনি সত্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সামনে স্বয়ং হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, তিনি নিদ্রিত অবস্থায় যে স্বপ্ন দেখতেন, সেটা প্রভাতের আলোর ন্যায় জাগ্রত অবস্থায় চোখের সামনে এসে যেত। এখানে বুঝতে হবে যে, নবুওয়াতের ওহীর জন্য তাঁর আত্মিক পরিচর্যার ধারা এ জাতীয় স্বপ্নের মাধ্যমেই শুরু হয়। এটা ছিল প্রথম ধাপ।
তারপর তাঁর অন্তরে সবার থেকে পৃথক থাকার ও নির্জনবাসের ভালবাসা ও এর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়। সামনে হাদীসে যা বর্ণনা করা হয়েছে, এর দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর অন্তরে একান্ত নির্জনবাস ও সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার আকর্ষণই কেবল সৃষ্টি করে দেওয়া হয়নি; বরং সবার থেকে পৃথক থেকে নির্জনে ইবাদতের (এক ধরনের এ'তেকাফের) আবেগ ও আগ্রহ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছিল। এর জন্য তিনি হেরাগুহাকে নির্বাচন করলেন। হেরা একটি পর্বতের নাম। মক্কা শরীফের চতুর্দিকে বিভিন্ন পর্বতমালা রয়েছে। কোনটি কম উঁচু কোনটি খুবই উঁচ। (যতটুকু ধারণা) এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু হচ্ছে এই হেরা, যাকে বর্তমানে 'জাবালে নূর' বলা হয়। এটা মক্কা মুকাররমার জনবসতি থেকে দুই আড়াই মাইল দূরে অবস্থিত। এর চূড়ায় বিরাট বিরাট পাথর খণ্ড এভাবে মিলে গিয়েছে যে, এগুলোর মাঝখানে একটি ছোট ত্রিভূজ হুজরার মত হয়ে গিয়েছে। এটাকেই গারে হেরা বলা হয়। এর মধ্যে কেবল এতটুকু জায়গা যে, একজন মানুষ কোন রকমে সেখানে প্রবেশ করে অবস্থান করতে পারে। যেহেতু এ পাহাড়টি খুবই উঁচু এবং গুহাটি এর চূড়ায় অবস্থিত এবং এ পর্যন্ত আরোহণ করতে খুবই কষ্ট স্বীকার করতে হয়, এ জন্য একজন ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী ও শক্তিশালী মানুষও খুব কষ্টেই সেখানে পৌঁছতে পারে। এখন তো হাদীসে বর্ণিত এ ঘটনার কারণে প্রতিটি মুসলমানের মন চায় যে, যদি সেখানে পৌঁছা যেত, তাহলে এর দর্শনের সৌভাগ্য লাভ করা যেত। কিন্তু যখন হুযুর (ﷺ) নির্জনে একাগ্রতার সাথে ইবাদত করার জন্য এ স্থানটি নির্বাচন করেছিলেন, তখন কোন মানুষের জন্য এ গুহার প্রতি এমন কোন আকর্ষণ ছিল না যে, সেখানে পৌঁছার জন্য এত দীর্ঘ পথ পরিক্রমার কষ্ট স্বীকার করবে। এ জন্য নির্জনে একাগ্রতার সাথে ইবাদতের জন্য এর চেয়ে কোন উত্তম স্থান নির্বাচন করা যেত না। আর সামনে যা প্রকাশ হওয়ার ছিল, (যার উল্লেখও হাদীসে রয়েছে।) এর জন্য অনাদিকাল থেকে এ গুহাটিই নিয়তির লিখন ছিল।
সামনে হাদীসে যা বলা হয়েছে, এর মর্ম এই যে, হেরা গুহার এ নির্জনবাস ও ইবাদতের বেলায় হুযুর (ﷺ)-এর অভ্যাস এই ছিল যে, কয়েক দিনের জন্য পানাহারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে তিনি হেরা গুহায় যেতেন এবং সেখানে পূর্ণ একাগ্রতার সাথে ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন। তারপর যখন তাঁর অন্তরে পরিবারের লোকদের খোঁজ-খবর নেওয়ার ও তাদের সাথে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হত, তখন বাড়ীতে স্ত্রী হযরত খাদীজা রাযি.-এর নিকট তাশরীফ আনতেন। তারপর আবার কয়েকদিনের জন্য প্রয়োজনীয় পানাহার সামগ্রী সাথে নিয়ে আবার হেরা গুহায় চলে যেতেন এবং সেখানে ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন।
হযরত আয়েশা রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর হেরা গুহায় ইবাদত নিমগ্নতার জন্য فيتحنث শব্দ ব্যবহার করেছেন। হাদীসের একজন রাবী ইমাম যুহরী تعبد শব্দ দ্বারা এর সারমর্ম বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কোন বর্ণনা দ্বারা এ কথা জানা যায় না যে, গারে হেরার এ অবস্থানকালে হুযুর (ﷺ)-এর ইবাদতের পদ্ধতি কি ছিল। হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের বিভিন্ন উক্তি উদ্ধৃত করেছেন কিন্তু এগুলো সবই অনুমান নির্ভর। অধমের ধারণা যে, নবুওয়াত ও রেসালাতের পদমর্যাদার জন্য আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে হুযুর (ﷺ)-এর অব্যাহত তরবিয়ত ও আত্মিক পরিচর্যার কাজ চলছিল, যার প্রথম ধাপ ছিল সত্য স্বপ্নের ধারা। এটাও এক ধরনের ইলহাম ছিল। এরপর নির্জনবাস ও নির্জনে ইবাদতের আকাঙ্ক্ষা তাঁর অন্তরে পয়দা করে দেওয়া হয়। এটাও ঐশী প্রেরণা ও এক ধরনের ইলহামের ফল ছিল। তারপর হেরা গুহায় তিনি যে ইবাদত করতেন, যেটাকে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. فيتحنث শব্দ দ্বারা প্রকাশ করেছেন, বুঝতে হবে যে, এটাও ইলহামে রাব্বানীর পথনির্দেশনায় ছিল। হতে পারে যে, তিনি নিজের জন্য হেদায়াতের আলোর দু‘আ করতেন আর নিজের সম্প্রদায় শিরক, মূর্তিপূজা, মারাত্মক জুলুম ও পাপাচারের যে অপবিত্রতায় নিমজ্জিত ছিল, এগুলো তিনি আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে নিজের অসন্তুষ্টির প্রকাশ ও নিজ সম্প্রদায়ের জন্যও হেদায়াতের দু‘আ করতেন। (দু‘আকে হুযুর (ﷺ) ইবাদতের সারবস্তু ও প্রাণ বলেছেন।) যাহোক, সংকলকের ধারণা এই যে, হুযুর (ﷺ)-এর এ ইবাদত- লিপ্ততায় আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের দিকনির্দেশনা অর্জিত ছিল এবং এর মাধ্যমে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তিকে সামনের মনযিলসমূহের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল।
সামনে হাদীসটিতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, হেরা গুহায় যখন হুযুর (ﷺ)-এর নির্জনবাস ও ইবাদতের ধারা অব্যাহত ছিল, তখন হঠাৎ এক রাতে (শবে কদরে) ফিরিশতা তাঁর নিকট ওহী নিয়ে এসে গেল এবং তাঁকে বলল, إقرأ (পড়ুন) তিনি বলেন, আমি বললাম, ما أنا بقارئ (আমি পড়ুয়া নই, এজন্য পড়তে পারি না।) তিনি বলেন, আমার এ উত্তরের পর ঐ ফিরিশতা আমাকে ধরে এমন জোরে চাপ দিল যে, তার চাপ আমার সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেল অর্থাৎ, এমন সীমায় যে, এর চেয়ে বেশী আমি সহ্য করতে পারতাম না। (কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, ঐ ফিরিশতা তাঁর গলা ধরে এমন শক্ত চাপ দিয়েছিল। (ফতহুল বারী)
হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনবার এমন হয়েছে যে, সে বলেছে: إقرأ (পড়ুন) আর আমি বলেছি, ما أنا بقارئ (আমি পড়ুয়া নই, এ জন্য পড়তে পারি না।) আমার এ উত্তরের পর প্রতিবার সে আমাকে ধরে এমন সজোরে চাপ দিয়েছে যে, আমার সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে। তৃতীয়বারের পর সে সূরা আলাকের প্রথম দিকের পাঁচটি আয়াত পড়ল।
اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ. خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ. اِقۡرَاۡ وَرَبُّکَ الۡاَکۡرَمُ. الَّذِیۡ عَلَّمَ بِالۡقَلَمِ. عَلَّمَ الۡاِنۡسَانَ مَا لَمۡ یَعۡلَمۡ
হাদীসে সুস্পষ্টভাবে একথা উল্লেখ করা হয়নি যে, ফিরিশতা থেকে এ আয়াতগুলো শুনে তিনি নিজেও তিলাওয়াত করেছিলেন। কিন্তু সামনে যা বর্ণনা করা হয়েছে, এর দ্বারা জানা যায় যে, তিনি এ আয়াতগুলো মুখস্থ করে নিয়েছিলেন এবং তিনি এগুলো তিলাওয়াত করতে করতে হেরা গুহা থেকে বাড়ীতে ফিরে এসেছিলেন। আর তখন হুযুর (ﷺ)-এর অবস্থা কেমন ছিল তা হাদীসে সামনে বর্ণনা করা হয়েছে।
এখানে এ কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এমনিতেও তো সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ মু'জেযা; কিন্তু এটা এক বাস্তবতা যে, এর কোন কোন ছোট সূরা ও ছোট ছোট আয়াতে মু'জেযার শান এমন সুস্পষ্ট যে, আরবী ভাষার জ্ঞান ও রুচিবোধ সম্পন্ন প্রতিটি ব্যক্তি এগুলো কেবল শুনে একথা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়ে যায় যে, এটা মানুষের কালাম নয়; বরং মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কালাম। এ সংকলক কোন প্রকার বিনয় ছাড়া সত্যিসত্যি নিবেদন করছে যে, আমি আরবী ভাষার কোন পণ্ডিত ও সাহিত্যিক নই, কেবল এতটুকু যে, আল্লাহ তা'আলার মেহেরবানী ও অনুগ্রহে আল্লাহ্ তা'আলার এ পবিত্র কালাম এবং তাঁর রাসূলে পাক (ﷺ) এর হাদীস পাঠ করতে ও কিছুটা বুঝে নিতে পারি। নিজের এ অবস্থা সত্ত্বেও আমি সূরা আলাকের প্রথম দিকের এ পাঁচটি আয়াতের ব্যাপারে মধ্য গগণের সূর্যের আলোর ন্যায় বিশ্বাস রাখি যে, এটা মানুষের কথা হতে পারে না; নিঃসন্দেহে এটা মহান আল্লাহর কালাম। ছোট ছোট এ পাঁচটি আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার পরিচয় ও মা'রেফাতের যে ভাণ্ডার, জ্ঞানের যে সমুদ্র, তাঁর রবুবিয়্যাত, কুদরত ও মহিমা, হেকমত ও প্রজ্ঞা, অনুগ্রহ ও ইহসান এবং তাঁর গুণাবলী ও কর্মকুশলতার যে বর্ণনা রয়েছে, এর উপর একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ; বরং একটি গ্রন্থ রচনা করা যেতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মাতৃভাষা আরবী ছিল- কেবল এতটুকুই নয়; বরং তিনি আরবের সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধভাষী এবং ভাষাতত্ত্বজ্ঞানী ছিলেন। এ জন্য এতে সন্দেহ-শোবার কোন অবকাশ নেই যে, যখনই তিনি ফিরিশতা জিবরাঈল থেকে এ আয়াতগুলো শুনে ছিলেন তখনই বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন যে, এটা আমার খালেক, মালেক ও দয়াময় প্রভুর কালাম। তিনি আমাকে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে ভূষিত করেছেন।
এ হাদীসে হেরাগুহার উল্লিখিত ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সূরা আলাকের প্রথম দিকের এ পাঁচটি আয়াত নিয়ে হেরাগুহা থেকে এ অবস্থায় বাড়ীতে ফিরে আসলেন যে, তিনি ভীতিগ্রস্ত ছিলেন, তাঁর অন্তর কাঁপছিল এবং দেহেও এর প্রভাব পড়েছিল। তাই তিনি এসেই বাড়ীর লোকদেরকে বললেন, আমার গায়ে চাদর জড়িয়ে দাও। (এমন অবস্থায় কাপড় গায়ে দেওয়ার স্বাভাবিক চাহিদা হয় এবং এর দ্বারা মনে স্থিরতা ও প্রশান্তি আসে।) নির্দেশ অনুযায়ী বাড়ীর লোকেরা তাঁকে কাপড় পরিয়ে দিল। ফলে ঐ ভীতি ও কম্পন দূর হয়ে গেল এবং অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেল। হুযুর (ﷺ) তখন স্ত্রী হযরত খাদীজাকে সবকিছু খুলে বললেন- যা হেরাগুহায় ঘটেছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি একথাও বললেন: لقد خشيت على نفسي (হে খাদীজা! আমার তো জীবননাশের আশংকা সৃষ্টি হচ্ছিল।) মর্ম এই যে, ফিরিশতা আমার গলা ধরে এমন জোরে চাপ দিয়েছিল যে, আমার আশংকা হচ্ছিল যে, আমার প্রাণই বের হয়ে যাবে।
সামনে হাদীসে যা বর্ণনা করা হয়েছে, এর মর্ম এই যে, হযরত খাদীজা রাযি. হেরা গুহার সমস্ত ঘটনা হুযুর (ﷺ)-এর মুখে শুনে তাঁকে সান্ত্বনা ও সুসংবাদ দেওয়ার জন্য খুবই আস্থার সাথে নিজের এ বিশ্বাস ও প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন যে, কোন আশংকা ও ভয়ের ব্যাপার ছিল না এবং এখনও নেই। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে উঁচু স্তরের চারিত্রিক গুণাবলী ও সুন্দর আমল ও কর্ম দ্বারা ভূষিত করেছেন। আপনি আত্মীয়তার হক আদায় করেন ও তাদের সাথে উত্তম আচরণ করেন। সর্বদা সঠিক ও সত্য কথা বলেন, আপনি এমন দুর্বল ও পঙ্গুদের বোঝা বহন করেন, যারা নিজেরা নিজেদের বোঝা বহন করতে পারে না, অর্থাৎ, আপনি তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। আর আপনার অবস্থা এই যে, নিজে পরিশ্রম করে উপার্জন করেন, (যাতে গরীব ও অভাবীদের সাহায্য করতে পারেন।) আর আপনি মেহমানের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন এবং যেসব লোক কোন অন্যায় অপরাধ ছাড়া কোন বিপদ ও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যায়, আপনি তাদের সাহায্য করেন।
হযরত খাদীজা রাযি.-এর উদ্দেশ্য এসব কথাবার্তা দ্বারা এটাই ছিল যে, আপনার এসব চারিত্রিক গুণাবলী ও মুবারক অবস্থা এ কথার আলামত ও দলীল যে, আপনি আল্লাহ্ তা'আলার নির্বাচিত বান্দা এবং আপনার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ রয়েছে। এ জন্য আমার পূর্ণ বিশ্বাস যে, এসব যা কিছু হয়েছে এটা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহেরই প্রকাশ।
সামনে হাদীসে বলা হয়েছে যে, তারপর হযরত খাদীজা রাযি. হুযুর (ﷺ)কে সাথে নিয়ে তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের কাছে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ হাদীসের বুখারী শরীফেরই অন্য এক বর্ণনায় ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের পরিচয়ে এ বাক্যমালাও রয়েছে:
وَكَانَ امْرَأً تَنَصَّرَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، وَكَانَ يَكْتُبُ الْكِتَابَ الْعِبْرَانِيَّ، فَيَكْتُبُ مِنَ الْإِنْجِيلِ بِالْعِبْرَانِيَّةِ، وَكَانَ شَيْخًا كَبِيرًا قَدْ عَمِيَ
(ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল জাহেলী যুগে (অর্থাৎ, হুযুর (ﷺ)-এর আবির্ভাবের পূর্বে) খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর তিনি ইবরানী (হিব্রু) ভাষা লিখতে পারতেন। তাই তিনি ইঞ্জিলকে ইবরানী ভাষায় লিখতেন। তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ এবং (শেষ জীবনে) অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।) মুসলিম শরীফে ইবরানীর স্থলে আরবী বলা হয়েছে। এর অর্থ এই হবে যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল ইঞ্জিলের বিষয়বস্তুসমূহ আরবী ভাষায় লিখতেন। আর এটাই বেশী যুক্তিযুক্ত।
ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের অবস্থা সম্পর্কে লিখা হয়েছে যে, তিনি শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত ছিলেন। সত্য ও সঠিক দ্বীনের সন্ধানে বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন। পরিশেষে শামদেশে আল্লাহর তাওফীকে খ্রীষ্টধর্মের এক যাজক অর্থাৎ, এ ধর্মের একজন দরবেশ পণ্ডিতের সাথে সাক্ষাত হয়ে গেল, যিনি সঠিক খ্রীষ্টধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। (অর্থাৎ খ্রীষ্টধর্মের ত্রিত্ববাদ, প্রায়শ্চিত্ত ইত্যাদির মত শিরকী ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস যেগুলো পরবর্তী সময়ে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়- তিনি এগুলো থেকে মুক্ত ও পবিত্র ছিলেন এবং হযরত ঈসা আ. এর আনীত সঠিক শিক্ষা ও হেদায়াতের উপর কায়েম ছিলেন।) ওয়ারাকা তার হাতে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করে নিলেন এবং এর শিক্ষাও অর্জন করে নিলেন, ইবরানী তথা হিব্রু ভাষাও আয়ত্ত করে নিলেন- যে ভাষায় তাওরাত নাযিল হয়েছিল। (কোন কোন গবেষকের অনুসন্ধান অনুযায়ী ইঞ্জিলও ইবরানী ভাষায়ই ছিল।) বস্তুতঃ ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল সঠিক খ্রীষ্টধর্মের উপর ছিলেন এবং প্রাচীন কিতাবসমূহের অভিজ্ঞ পণ্ডিত ও আলেম ছিলেন।
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী স্বীয় কিতাব 'আল ইছাবায়' ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল সম্পর্কে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন:
وَكَانَ وَرَقَةُ قَدْ كَرِهَ عِبَادَةَ الْأَوْثَانِ، وَطَلَبَ الدِّينَ فِي الْآفَاقِ، وَقَرَأَ الْكُتُبَ، وَكَانَتْ خَدِيجَةُ تَسْأَلُهُ عَنْ أَمْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَيَقُولُ: مَا أَرَاهُ إِلَّا نَبِيَّ هَذِهِ الْأُمَّةِ الَّذِي بَشَّرَ بِهِ مُوسَى وَعِيسَى
(অর্থাৎ, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল মূর্তিপূজাকে অপছন্দ করতেন। তিনি সত্য দ্বীনের সন্ধানে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং ঐসব কিতাব (যেগুলোকে আসমানী গ্রন্থ মনে করা হত) অধ্যয়ন করতেন। আর হযরত খাদীজা রাযি. তার কাছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে ওয়ারাকা বলতেন যে, আমার ধারণায়, তিনি এ উম্মতের ঐ নবী, যাঁর সুসংবাদ হযরত মুসা ও ঈসা (আঃ) দিয়ে গিয়েছেন।
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল নিজের এ বৈশিষ্ট্যের কারণে আপন সম্প্রদায়ের শিরক ও মূর্তিপূজার ধর্ম থেকে মুক্ত হয়ে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছিলেন (এবং এভাবে নবুওয়াতের পূর্ণ ধারার প্রতি তিনি ঈমান নিয়ে এসেছিলেন।) তাছাড়া তিনি তাওরাত, ইঞ্জিল ইত্যাদি আসমানী গ্রন্থসমূহের আলেম ছিলেন। আর এ কথা সুস্পষ্ট যে, তার জীবনধারাও সাধারণ মক্কাবাসীদের জীবন পদ্ধতি থেকে ভিন্ন ধরনের আবেদ, যাহেদ ও দরবেশসুলভ জীবন ছিল। সারকথা, তার এসব গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের কারণে তার চাচাতো বোন হযরত খাদীজা- যিনি একজন সুস্থ বিবেকের অধিকারিণী ও বুদ্ধিমতী নারী ছিলেন-তাকে একজন আধ্যাত্মিক বুযুর্গ মনে করতেন এবং তার প্রতি এক ধরনের ভক্তি পোষণ করতেন এবং হেরাগুহার এ ঘটনার পূর্বেও হুযুর (ﷺ)-এর অসাধারণ অবস্থাসমূহের আলোচনা করে তাঁর সম্পর্কে তার ধারণা ও মতামত জিজ্ঞাসা করতেন আর ওয়ারাকা উত্তরে বলতেন:
مَا أَرَاهُ إِلَّا نَبِيَّ هَذِهِ الأُمَّةِ الَّذِي بَشَّرَ بِهِ مُوسَى وَعِيسَى
(অর্থাৎ, আমার ধারণায়, ইনি এ উম্মতের ঐ নবী, যাঁর আগমনের সুসংবাদ হযরত মূসা ও ঈসা (আঃ) দিয়ে গিয়েছিলেন।)
তারপর যখন হেরাগুহার এ ঘটনা প্রকাশ পেল- যাঁর উল্লেখ এ হাদীসে করা হয়েছে এবং যা হুযুর (ﷺ) হযরত খাদীজাকে অবহিত করেছিলেন, তখন তাঁর অন্তরে এ আগ্রহ সৃষ্টি হল যে, সম্পূর্ণ ঘটনা হুযুর (ﷺ)-এর মুখে ওয়ারাকাকে শুনানো হোক- যিনি পূর্ব থেকেই হুযুর (ﷺ)-এর নবী ও রাসূল হওয়ার ধারণা প্রকাশ করতেন। এখানে এ বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, কোন রিওয়ায়াতে এর উল্লেখ বরং ইঙ্গিতও নেই যে, হুযুর (ﷺ) নিজে ওয়ারাকার নিকট যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন; বরং খাদীজাই তাঁকে ওয়ারাকার নিকট নিয়ে গিয়েছিলেন, যেমন এ হাদীসে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সামনে হাদীসে বলা হয়েছে যে, ওয়ারাকার নিকট গিয়ে হযরত খাদীজাই তাকে বলেছিলেন যে, আপনি আপনার ভাতিজার কথা ও ঘটনা শুনুন। ওয়ারাকা তখন হুযুর (ﷺ)কে সম্বোধন করে বললেন, হে ভাতিজা! আমাকে বল, তুমি কি দেখ? হুযুর (ﷺ) তখন ঐসব বিষয় বর্ণনা করলেন- যা তিনি হেরাগুহায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং যা কিছু তাঁর উপর দিয়ে ঘটে গিয়েছিল। ওয়ারাকা তখন দ্বিধাহীনচিত্তে বলে দিলেন, এ ফিরিশতা- যিনি হেরাগুহায় তোমার নিকট এসেছেন এবং যার সম্পূর্ণ ঘটনা তুমি বর্ণনা করেছ, তিনি হচ্ছেন ঐ 'নামূস' (অর্থাৎ, ওহী বহনকারী বিশেষ ফিরিশতা) যাকে আল্লাহ্ তা'আলা নিজের কালাম ও পয়গাম দিয়ে স্বীয় পয়গাম্বর মুসা (আঃ)-এর নিকটও প্রেরণ করেছিলেন।
এখানে কারো মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল তো খ্রীষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। এতদসত্ত্বেও এখানে তিনি হযরত ঈসা (আঃ)-এর নাম বাদ দিয়ে মুসা (আঃ)-এর নাম কেন উল্লেখ করলেন, অথচ জিবরাঈল (আঃ) যেভাবে মূসা (আঃ)-এর প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, তেমনিভাবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতিও প্রেরিত হয়েছিলেন? হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ এর উত্তরে লিখেছেন যে, ঈসা (আঃ) নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলার মহান পয়গাম্বর ছিলেন, কিন্তু তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র কোন শরী‘আত নিয়ে আসেননি। তাঁর শরী‘আত তাই ছিল, যা মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে এসেছিল। ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা এর কোন কোন বিধানে সামান্য পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। এ দিকে 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ শরী‘আত নিয়ে আগমনকারী রাসূল ছিলেন। এ জন্য মূসা (আঃ)-এর সাথে তাঁর অধিক সাদৃশ্য ও মিল ছিল। কুরআন মজীদের সূরা মুযযাম্মিলেও বলা হয়েছে:
اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنَاۤ اِلَیۡکُمۡ رَسُوۡلًا شَاہِدًا عَلَیۡکُمۡ کَمَاۤ اَرۡسَلۡنَاۤ اِلٰی فِرۡعَوۡنَ رَسُوۡلًا
যাহোক, এ বিশেষ কারণে ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল এ ক্ষেত্রে জিবরাঈল (আঃ)-এর পরিচয় দিতে গিয়ে হযরত মূসা (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করেছেন।
সামনে হাদীসে রয়েছে যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল পূর্ণ আস্থার সাথে এ কথা বলেন যে, হেরাগুহায় আগমনকারী এ ফিরিশতা জিবরাঈল আমীন ছিলেন- যিনি আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে মূসা (আঃ) এবং অন্যান্য নবী-রাসূলদের নিকট আসতেন। হুযুর (ﷺ)-এর নবুওয়াতের প্রতি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন এবং বড়ই আক্ষেপের সাথে বললেন, হায়! আমি যদি তখন শক্তিমান যুবক থাকতাম, আমি যদি সে সময় জীবিত থাকতাম, যখন আপনার স্বগোত্রীয় লোকেরা আপনাকে এ মক্কা শহর থেকে বের করে দিবে, (তাহলে আমি আপনার সঙ্গী হতাম এবং জীবনবাজি রেখে আপনার সাহায্য করতাম।) হুযুর (ﷺ) ওয়ারাকার মুখে এ কথা শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাকে এ শহর থেকে বিতাড়িত করে দিবে? (হুযুর (ﷺ)-এর আশ্চর্য হওয়ার কারণ এই ছিল যে, এ পর্যন্ত নিজের উত্তম চরিত্র ও নিষ্কলুষ জীবনের জন্য তিনি সমাজে সবার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাঁকে সাদেক ও আলআমীন উপাধিতে ডাকা হত। এজন্য বাস্তবে এ বিষয়টি খুবই আশ্চর্যের ছিল যে, এ সম্প্রদায়ের লোকেরা একদিন তাঁকে এ শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করবে।) ওয়ারাকা হুযূর (ﷺ)-এর এ প্রশ্নের উত্তরে বললেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নবীই ঐ দাওয়াত ও শিক্ষা নিয়ে এসেছে, যা আপনি নিয়ে এসেছেন, তখনই তার সম্প্রদায় তার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। আপনার সাথেও এমনটাই করা হবে, আপনার সম্প্রদায় আপনার প্রাণের শত্রু হয়ে যাবে এবং আপনাকে এ শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে। প্রবল ধারণা এই যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল এসব যাকিছু বলেছেন, প্রাচীন আসমানী গ্রন্থসমূহের ভবিষ্যদ্বাণী এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত নবী-রাসূলদের ইতিহাসের আলোকে বলেছেন। কুরআন মজীদে আম্বিয়ায়ে কেরামের যেসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, এ গুলোর সাক্ষ্যও তাই।
হাদীসটির শেষে বলা হয়েছে যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল নিজের কথা শেষ করতে গিয়ে পুনরায় বললেন যে, আমি যদি আপনার ঐ যুগটি পাই, যখন আপনি নিজ সম্প্রদায়কে সত্য দ্বীনের দাওয়াত দিবেন আর আপনার সম্প্রদায় আপনার বিরোধী ও শত্রু হয়ে যাবে, তাহলে আমি আমার এ বার্ধক্য ও অচলাবস্থা সত্ত্বেও আপনার যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করব। তারপর রিওয়ায়াতে রয়েছে যে, এর অল্প দিনের মধ্যেই ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল মারা যান এবং হেরাগুহার এ ঘটনার পর কিছুকাল পর্যন্ত ওহী আগমনের ধারা বন্ধ থাকে। (হাদীসটির আসল বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এখানে শেষ হল।)
এ হাদীসের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ের ব্যাখ্যা
(১) এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াতের প্রতি সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারী ও ঈমান আনয়নকারী হচ্ছেন ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল ও হযরত খাদীজা রাযি.। কিন্তু এটা তখন হয়েছে, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে সত্য দ্বীনের প্রতি দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল ঐ সময়েই এ অবস্থায় ইন্তিকাল করে যান যে, তিনি খাঁটি খ্রীষ্টধর্মের উপর কায়েম ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে সত্য নবী স্বীকার করে তাঁর প্রতিও ঈমান এনেছিলেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে এ উম্মতের প্রথম মু'মিনও বলা যেতে পারে। তারপর যখন হুযুর (ﷺ)কে দ্বীনের দাওয়াতের হুকুম দেওয়া হল, তখন সর্বপ্রথম হযরত আবু বকর সিদ্দীক, হযরত আলী মুরতাযা, হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা ও হযরত খাদীজা রাযি. তাঁর দাওয়াত কবুল করেন, যিনি হুযুর (ﷺ)-এর নবুওয়াতের প্রতি আগেও ঈমান এনেছিলেন।
(২) হাদীসটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, (হেরা গুহায়) হযরত জিবরাঈল (আঃ) তিনবার অত্যন্ত জোরে হুযুর (ﷺ)-এর গলদেশে চাপ দিয়েছিলেন। হাদীস ব্যাখ্যাতা, ও অন্যান্য আলেমগণ এর বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। অধম সংকলকের নিকট সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত কথা এই যে, এভাবে চরম শক্তিতে গলা টিপে ধরার দ্বারা উদ্দেশ্য এই ছিল, যেন কিছু সময়ের জন্য হুযুর (ﷺ)-এর মনোযোগ সবদিক থেকে এমনকি নিজের সত্তার দিক থেকেও সরে গিয়ে কেবল দয়াময় পরওয়ারদিগারের প্রতি নিবদ্ধ হয়ে যায়। যখন কোন আরেফবিল্লাহ ও খোদার পরিচয়েধন্য বান্দার এভাবে গলা টিপে ধরা হবে, তখন নিঃসন্দেহে তার পূর্ণ মনোযোগ আপন প্রতিপালকের দিকে হয়ে যাবে এবং তার অনুভূতি-উপলব্ধি অনেকটা এ জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উর্ধ্বজগতের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। ঐ সময় যখন হুযুর (ﷺ)-এর প্রতি প্রথম ওহী নাযিল করা হবে, তখন এর প্রয়োজন ছিল। অন্য শব্দমালায় বলা যায় যে, এ প্রক্রিয়া দ্বারা হুযুর (ﷺ)-এর রূহ ও কলবে ঐ শক্তি পয়দা করা উদ্দেশ্য ছিল, যা আল্লাহর ওহী বহন করতে পারে- যাকে কুরআনে কারীম বলা হয়েছে। পরবর্তীতেও ওহী নাযিল হওয়ার সময় হুযুর (ﷺ)-এর যে অবস্থা হত, সেটা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। প্রচণ্ড শীত মৌসুমে যখন হুযুর (ﷺ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হত, তখন তাঁর শরীরে ঘাম এসে যেত। হাদীসে একথাও বলা হয়েছে যে, উটনীতে সওয়ার অবস্থায় যদি ওহী আসত, তখন উটনী মাটিতে বসে যেত। সারকথা, এ অধমের নিকট এটাই অধিক যুক্তিযুক্ত যে, এ কঠিন চাপের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে, তিনি যেন ঐ ওহী বহন করতে পারেন, যা প্রথমবার নাযিল করা হচ্ছিল।
(৩) হাদীসটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুযুর (ﷺ) যখন হেরাগুহা থেকে বাড়ীতে ফিরে আসলেন, তখন তাঁর অন্তর কাঁপছিল এবং শরীরের উপরও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছিল। তিনি হযরত খাদীজাকে একথাও বলেছিলেন قد خشيتُ على نفسي (অর্থাৎ, আমার তো জীবনের আশংকা দেখা দিয়েছিল।) হুযুর (ﷺ)-এর এ অবস্থাটাও হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর গলায় চাপ দেওয়ার এবং কালামে এলাহীর বোঝারই ফল ছিল। এটা আল্লাহ্ তা'আলার রহমত ও হেকমত যে, আমাদের উপর কুরআন মজীদ তিলাওয়াতের কোন বোঝা পড়ে না। অন্যথায় এর শান তো স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলা এই বর্ণনা করেছেনঃ
لَوۡ اَنۡزَلۡنَا ہٰذَا الۡقُرۡاٰنَ عَلٰی جَبَلٍ لَّرَاَیۡتَہٗ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنۡ خَشۡیَۃِ اللّٰہِ
(আমি যদি এ কুরআনকে অবতীর্ণ করতাম কোন পাহাড়ের উপর, তবে তুমি দেখতে তা আল্লাহর ভয়ে অবনত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে।)-সূরা হাশরঃ আয়াত-২১
হাদীসটিতে সর্বপ্রথম বিষয় এই বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর প্রতি ওহীর ধারা এভাবে শুরু হয় যে, তিনি সত্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সামনে স্বয়ং হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, তিনি নিদ্রিত অবস্থায় যে স্বপ্ন দেখতেন, সেটা প্রভাতের আলোর ন্যায় জাগ্রত অবস্থায় চোখের সামনে এসে যেত। এখানে বুঝতে হবে যে, নবুওয়াতের ওহীর জন্য তাঁর আত্মিক পরিচর্যার ধারা এ জাতীয় স্বপ্নের মাধ্যমেই শুরু হয়। এটা ছিল প্রথম ধাপ।
তারপর তাঁর অন্তরে সবার থেকে পৃথক থাকার ও নির্জনবাসের ভালবাসা ও এর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়। সামনে হাদীসে যা বর্ণনা করা হয়েছে, এর দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে তাঁর অন্তরে একান্ত নির্জনবাস ও সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার আকর্ষণই কেবল সৃষ্টি করে দেওয়া হয়নি; বরং সবার থেকে পৃথক থেকে নির্জনে ইবাদতের (এক ধরনের এ'তেকাফের) আবেগ ও আগ্রহ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছিল। এর জন্য তিনি হেরাগুহাকে নির্বাচন করলেন। হেরা একটি পর্বতের নাম। মক্কা শরীফের চতুর্দিকে বিভিন্ন পর্বতমালা রয়েছে। কোনটি কম উঁচু কোনটি খুবই উঁচ। (যতটুকু ধারণা) এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু হচ্ছে এই হেরা, যাকে বর্তমানে 'জাবালে নূর' বলা হয়। এটা মক্কা মুকাররমার জনবসতি থেকে দুই আড়াই মাইল দূরে অবস্থিত। এর চূড়ায় বিরাট বিরাট পাথর খণ্ড এভাবে মিলে গিয়েছে যে, এগুলোর মাঝখানে একটি ছোট ত্রিভূজ হুজরার মত হয়ে গিয়েছে। এটাকেই গারে হেরা বলা হয়। এর মধ্যে কেবল এতটুকু জায়গা যে, একজন মানুষ কোন রকমে সেখানে প্রবেশ করে অবস্থান করতে পারে। যেহেতু এ পাহাড়টি খুবই উঁচু এবং গুহাটি এর চূড়ায় অবস্থিত এবং এ পর্যন্ত আরোহণ করতে খুবই কষ্ট স্বীকার করতে হয়, এ জন্য একজন ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী ও শক্তিশালী মানুষও খুব কষ্টেই সেখানে পৌঁছতে পারে। এখন তো হাদীসে বর্ণিত এ ঘটনার কারণে প্রতিটি মুসলমানের মন চায় যে, যদি সেখানে পৌঁছা যেত, তাহলে এর দর্শনের সৌভাগ্য লাভ করা যেত। কিন্তু যখন হুযুর (ﷺ) নির্জনে একাগ্রতার সাথে ইবাদত করার জন্য এ স্থানটি নির্বাচন করেছিলেন, তখন কোন মানুষের জন্য এ গুহার প্রতি এমন কোন আকর্ষণ ছিল না যে, সেখানে পৌঁছার জন্য এত দীর্ঘ পথ পরিক্রমার কষ্ট স্বীকার করবে। এ জন্য নির্জনে একাগ্রতার সাথে ইবাদতের জন্য এর চেয়ে কোন উত্তম স্থান নির্বাচন করা যেত না। আর সামনে যা প্রকাশ হওয়ার ছিল, (যার উল্লেখও হাদীসে রয়েছে।) এর জন্য অনাদিকাল থেকে এ গুহাটিই নিয়তির লিখন ছিল।
সামনে হাদীসে যা বলা হয়েছে, এর মর্ম এই যে, হেরা গুহার এ নির্জনবাস ও ইবাদতের বেলায় হুযুর (ﷺ)-এর অভ্যাস এই ছিল যে, কয়েক দিনের জন্য পানাহারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে তিনি হেরা গুহায় যেতেন এবং সেখানে পূর্ণ একাগ্রতার সাথে ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন। তারপর যখন তাঁর অন্তরে পরিবারের লোকদের খোঁজ-খবর নেওয়ার ও তাদের সাথে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হত, তখন বাড়ীতে স্ত্রী হযরত খাদীজা রাযি.-এর নিকট তাশরীফ আনতেন। তারপর আবার কয়েকদিনের জন্য প্রয়োজনীয় পানাহার সামগ্রী সাথে নিয়ে আবার হেরা গুহায় চলে যেতেন এবং সেখানে ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন।
হযরত আয়েশা রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর হেরা গুহায় ইবাদত নিমগ্নতার জন্য فيتحنث শব্দ ব্যবহার করেছেন। হাদীসের একজন রাবী ইমাম যুহরী تعبد শব্দ দ্বারা এর সারমর্ম বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কোন বর্ণনা দ্বারা এ কথা জানা যায় না যে, গারে হেরার এ অবস্থানকালে হুযুর (ﷺ)-এর ইবাদতের পদ্ধতি কি ছিল। হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের বিভিন্ন উক্তি উদ্ধৃত করেছেন কিন্তু এগুলো সবই অনুমান নির্ভর। অধমের ধারণা যে, নবুওয়াত ও রেসালাতের পদমর্যাদার জন্য আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে হুযুর (ﷺ)-এর অব্যাহত তরবিয়ত ও আত্মিক পরিচর্যার কাজ চলছিল, যার প্রথম ধাপ ছিল সত্য স্বপ্নের ধারা। এটাও এক ধরনের ইলহাম ছিল। এরপর নির্জনবাস ও নির্জনে ইবাদতের আকাঙ্ক্ষা তাঁর অন্তরে পয়দা করে দেওয়া হয়। এটাও ঐশী প্রেরণা ও এক ধরনের ইলহামের ফল ছিল। তারপর হেরা গুহায় তিনি যে ইবাদত করতেন, যেটাকে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. فيتحنث শব্দ দ্বারা প্রকাশ করেছেন, বুঝতে হবে যে, এটাও ইলহামে রাব্বানীর পথনির্দেশনায় ছিল। হতে পারে যে, তিনি নিজের জন্য হেদায়াতের আলোর দু‘আ করতেন আর নিজের সম্প্রদায় শিরক, মূর্তিপূজা, মারাত্মক জুলুম ও পাপাচারের যে অপবিত্রতায় নিমজ্জিত ছিল, এগুলো তিনি আল্লাহ্ তা'আলার দরবারে নিজের অসন্তুষ্টির প্রকাশ ও নিজ সম্প্রদায়ের জন্যও হেদায়াতের দু‘আ করতেন। (দু‘আকে হুযুর (ﷺ) ইবাদতের সারবস্তু ও প্রাণ বলেছেন।) যাহোক, সংকলকের ধারণা এই যে, হুযুর (ﷺ)-এর এ ইবাদত- লিপ্ততায় আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের দিকনির্দেশনা অর্জিত ছিল এবং এর মাধ্যমে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তিকে সামনের মনযিলসমূহের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল।
সামনে হাদীসটিতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, হেরা গুহায় যখন হুযুর (ﷺ)-এর নির্জনবাস ও ইবাদতের ধারা অব্যাহত ছিল, তখন হঠাৎ এক রাতে (শবে কদরে) ফিরিশতা তাঁর নিকট ওহী নিয়ে এসে গেল এবং তাঁকে বলল, إقرأ (পড়ুন) তিনি বলেন, আমি বললাম, ما أنا بقارئ (আমি পড়ুয়া নই, এজন্য পড়তে পারি না।) তিনি বলেন, আমার এ উত্তরের পর ঐ ফিরিশতা আমাকে ধরে এমন জোরে চাপ দিল যে, তার চাপ আমার সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেল অর্থাৎ, এমন সীমায় যে, এর চেয়ে বেশী আমি সহ্য করতে পারতাম না। (কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, ঐ ফিরিশতা তাঁর গলা ধরে এমন শক্ত চাপ দিয়েছিল। (ফতহুল বারী)
হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তিনবার এমন হয়েছে যে, সে বলেছে: إقرأ (পড়ুন) আর আমি বলেছি, ما أنا بقارئ (আমি পড়ুয়া নই, এ জন্য পড়তে পারি না।) আমার এ উত্তরের পর প্রতিবার সে আমাকে ধরে এমন সজোরে চাপ দিয়েছে যে, আমার সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছে। তৃতীয়বারের পর সে সূরা আলাকের প্রথম দিকের পাঁচটি আয়াত পড়ল।
اِقۡرَاۡ بِاسۡمِ رَبِّکَ الَّذِیۡ خَلَقَ. خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ عَلَقٍ. اِقۡرَاۡ وَرَبُّکَ الۡاَکۡرَمُ. الَّذِیۡ عَلَّمَ بِالۡقَلَمِ. عَلَّمَ الۡاِنۡسَانَ مَا لَمۡ یَعۡلَمۡ
হাদীসে সুস্পষ্টভাবে একথা উল্লেখ করা হয়নি যে, ফিরিশতা থেকে এ আয়াতগুলো শুনে তিনি নিজেও তিলাওয়াত করেছিলেন। কিন্তু সামনে যা বর্ণনা করা হয়েছে, এর দ্বারা জানা যায় যে, তিনি এ আয়াতগুলো মুখস্থ করে নিয়েছিলেন এবং তিনি এগুলো তিলাওয়াত করতে করতে হেরা গুহা থেকে বাড়ীতে ফিরে এসেছিলেন। আর তখন হুযুর (ﷺ)-এর অবস্থা কেমন ছিল তা হাদীসে সামনে বর্ণনা করা হয়েছে।
এখানে এ কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এমনিতেও তো সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ মু'জেযা; কিন্তু এটা এক বাস্তবতা যে, এর কোন কোন ছোট সূরা ও ছোট ছোট আয়াতে মু'জেযার শান এমন সুস্পষ্ট যে, আরবী ভাষার জ্ঞান ও রুচিবোধ সম্পন্ন প্রতিটি ব্যক্তি এগুলো কেবল শুনে একথা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়ে যায় যে, এটা মানুষের কালাম নয়; বরং মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর কালাম। এ সংকলক কোন প্রকার বিনয় ছাড়া সত্যিসত্যি নিবেদন করছে যে, আমি আরবী ভাষার কোন পণ্ডিত ও সাহিত্যিক নই, কেবল এতটুকু যে, আল্লাহ তা'আলার মেহেরবানী ও অনুগ্রহে আল্লাহ্ তা'আলার এ পবিত্র কালাম এবং তাঁর রাসূলে পাক (ﷺ) এর হাদীস পাঠ করতে ও কিছুটা বুঝে নিতে পারি। নিজের এ অবস্থা সত্ত্বেও আমি সূরা আলাকের প্রথম দিকের এ পাঁচটি আয়াতের ব্যাপারে মধ্য গগণের সূর্যের আলোর ন্যায় বিশ্বাস রাখি যে, এটা মানুষের কথা হতে পারে না; নিঃসন্দেহে এটা মহান আল্লাহর কালাম। ছোট ছোট এ পাঁচটি আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলার পরিচয় ও মা'রেফাতের যে ভাণ্ডার, জ্ঞানের যে সমুদ্র, তাঁর রবুবিয়্যাত, কুদরত ও মহিমা, হেকমত ও প্রজ্ঞা, অনুগ্রহ ও ইহসান এবং তাঁর গুণাবলী ও কর্মকুশলতার যে বর্ণনা রয়েছে, এর উপর একটি স্বতন্ত্র প্রবন্ধ; বরং একটি গ্রন্থ রচনা করা যেতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মাতৃভাষা আরবী ছিল- কেবল এতটুকুই নয়; বরং তিনি আরবের সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধভাষী এবং ভাষাতত্ত্বজ্ঞানী ছিলেন। এ জন্য এতে সন্দেহ-শোবার কোন অবকাশ নেই যে, যখনই তিনি ফিরিশতা জিবরাঈল থেকে এ আয়াতগুলো শুনে ছিলেন তখনই বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন যে, এটা আমার খালেক, মালেক ও দয়াময় প্রভুর কালাম। তিনি আমাকে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে ভূষিত করেছেন।
এ হাদীসে হেরাগুহার উল্লিখিত ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সূরা আলাকের প্রথম দিকের এ পাঁচটি আয়াত নিয়ে হেরাগুহা থেকে এ অবস্থায় বাড়ীতে ফিরে আসলেন যে, তিনি ভীতিগ্রস্ত ছিলেন, তাঁর অন্তর কাঁপছিল এবং দেহেও এর প্রভাব পড়েছিল। তাই তিনি এসেই বাড়ীর লোকদেরকে বললেন, আমার গায়ে চাদর জড়িয়ে দাও। (এমন অবস্থায় কাপড় গায়ে দেওয়ার স্বাভাবিক চাহিদা হয় এবং এর দ্বারা মনে স্থিরতা ও প্রশান্তি আসে।) নির্দেশ অনুযায়ী বাড়ীর লোকেরা তাঁকে কাপড় পরিয়ে দিল। ফলে ঐ ভীতি ও কম্পন দূর হয়ে গেল এবং অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেল। হুযুর (ﷺ) তখন স্ত্রী হযরত খাদীজাকে সবকিছু খুলে বললেন- যা হেরাগুহায় ঘটেছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি একথাও বললেন: لقد خشيت على نفسي (হে খাদীজা! আমার তো জীবননাশের আশংকা সৃষ্টি হচ্ছিল।) মর্ম এই যে, ফিরিশতা আমার গলা ধরে এমন জোরে চাপ দিয়েছিল যে, আমার আশংকা হচ্ছিল যে, আমার প্রাণই বের হয়ে যাবে।
সামনে হাদীসে যা বর্ণনা করা হয়েছে, এর মর্ম এই যে, হযরত খাদীজা রাযি. হেরা গুহার সমস্ত ঘটনা হুযুর (ﷺ)-এর মুখে শুনে তাঁকে সান্ত্বনা ও সুসংবাদ দেওয়ার জন্য খুবই আস্থার সাথে নিজের এ বিশ্বাস ও প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন যে, কোন আশংকা ও ভয়ের ব্যাপার ছিল না এবং এখনও নেই। আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে উঁচু স্তরের চারিত্রিক গুণাবলী ও সুন্দর আমল ও কর্ম দ্বারা ভূষিত করেছেন। আপনি আত্মীয়তার হক আদায় করেন ও তাদের সাথে উত্তম আচরণ করেন। সর্বদা সঠিক ও সত্য কথা বলেন, আপনি এমন দুর্বল ও পঙ্গুদের বোঝা বহন করেন, যারা নিজেরা নিজেদের বোঝা বহন করতে পারে না, অর্থাৎ, আপনি তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। আর আপনার অবস্থা এই যে, নিজে পরিশ্রম করে উপার্জন করেন, (যাতে গরীব ও অভাবীদের সাহায্য করতে পারেন।) আর আপনি মেহমানের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন এবং যেসব লোক কোন অন্যায় অপরাধ ছাড়া কোন বিপদ ও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে যায়, আপনি তাদের সাহায্য করেন।
হযরত খাদীজা রাযি.-এর উদ্দেশ্য এসব কথাবার্তা দ্বারা এটাই ছিল যে, আপনার এসব চারিত্রিক গুণাবলী ও মুবারক অবস্থা এ কথার আলামত ও দলীল যে, আপনি আল্লাহ্ তা'আলার নির্বাচিত বান্দা এবং আপনার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ রয়েছে। এ জন্য আমার পূর্ণ বিশ্বাস যে, এসব যা কিছু হয়েছে এটা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহেরই প্রকাশ।
সামনে হাদীসে বলা হয়েছে যে, তারপর হযরত খাদীজা রাযি. হুযুর (ﷺ)কে সাথে নিয়ে তার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের কাছে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ হাদীসের বুখারী শরীফেরই অন্য এক বর্ণনায় ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের পরিচয়ে এ বাক্যমালাও রয়েছে:
وَكَانَ امْرَأً تَنَصَّرَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ، وَكَانَ يَكْتُبُ الْكِتَابَ الْعِبْرَانِيَّ، فَيَكْتُبُ مِنَ الْإِنْجِيلِ بِالْعِبْرَانِيَّةِ، وَكَانَ شَيْخًا كَبِيرًا قَدْ عَمِيَ
(ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল জাহেলী যুগে (অর্থাৎ, হুযুর (ﷺ)-এর আবির্ভাবের পূর্বে) খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর তিনি ইবরানী (হিব্রু) ভাষা লিখতে পারতেন। তাই তিনি ইঞ্জিলকে ইবরানী ভাষায় লিখতেন। তিনি ছিলেন অতি বৃদ্ধ এবং (শেষ জীবনে) অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।) মুসলিম শরীফে ইবরানীর স্থলে আরবী বলা হয়েছে। এর অর্থ এই হবে যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল ইঞ্জিলের বিষয়বস্তুসমূহ আরবী ভাষায় লিখতেন। আর এটাই বেশী যুক্তিযুক্ত।
ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের অবস্থা সম্পর্কে লিখা হয়েছে যে, তিনি শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত ছিলেন। সত্য ও সঠিক দ্বীনের সন্ধানে বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন। পরিশেষে শামদেশে আল্লাহর তাওফীকে খ্রীষ্টধর্মের এক যাজক অর্থাৎ, এ ধর্মের একজন দরবেশ পণ্ডিতের সাথে সাক্ষাত হয়ে গেল, যিনি সঠিক খ্রীষ্টধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। (অর্থাৎ খ্রীষ্টধর্মের ত্রিত্ববাদ, প্রায়শ্চিত্ত ইত্যাদির মত শিরকী ও ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস যেগুলো পরবর্তী সময়ে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়- তিনি এগুলো থেকে মুক্ত ও পবিত্র ছিলেন এবং হযরত ঈসা আ. এর আনীত সঠিক শিক্ষা ও হেদায়াতের উপর কায়েম ছিলেন।) ওয়ারাকা তার হাতে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করে নিলেন এবং এর শিক্ষাও অর্জন করে নিলেন, ইবরানী তথা হিব্রু ভাষাও আয়ত্ত করে নিলেন- যে ভাষায় তাওরাত নাযিল হয়েছিল। (কোন কোন গবেষকের অনুসন্ধান অনুযায়ী ইঞ্জিলও ইবরানী ভাষায়ই ছিল।) বস্তুতঃ ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল সঠিক খ্রীষ্টধর্মের উপর ছিলেন এবং প্রাচীন কিতাবসমূহের অভিজ্ঞ পণ্ডিত ও আলেম ছিলেন।
হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী স্বীয় কিতাব 'আল ইছাবায়' ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল সম্পর্কে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন:
وَكَانَ وَرَقَةُ قَدْ كَرِهَ عِبَادَةَ الْأَوْثَانِ، وَطَلَبَ الدِّينَ فِي الْآفَاقِ، وَقَرَأَ الْكُتُبَ، وَكَانَتْ خَدِيجَةُ تَسْأَلُهُ عَنْ أَمْرِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَيَقُولُ: مَا أَرَاهُ إِلَّا نَبِيَّ هَذِهِ الْأُمَّةِ الَّذِي بَشَّرَ بِهِ مُوسَى وَعِيسَى
(অর্থাৎ, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল মূর্তিপূজাকে অপছন্দ করতেন। তিনি সত্য দ্বীনের সন্ধানে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং ঐসব কিতাব (যেগুলোকে আসমানী গ্রন্থ মনে করা হত) অধ্যয়ন করতেন। আর হযরত খাদীজা রাযি. তার কাছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে ওয়ারাকা বলতেন যে, আমার ধারণায়, তিনি এ উম্মতের ঐ নবী, যাঁর সুসংবাদ হযরত মুসা ও ঈসা (আঃ) দিয়ে গিয়েছেন।
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল নিজের এ বৈশিষ্ট্যের কারণে আপন সম্প্রদায়ের শিরক ও মূর্তিপূজার ধর্ম থেকে মুক্ত হয়ে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছিলেন (এবং এভাবে নবুওয়াতের পূর্ণ ধারার প্রতি তিনি ঈমান নিয়ে এসেছিলেন।) তাছাড়া তিনি তাওরাত, ইঞ্জিল ইত্যাদি আসমানী গ্রন্থসমূহের আলেম ছিলেন। আর এ কথা সুস্পষ্ট যে, তার জীবনধারাও সাধারণ মক্কাবাসীদের জীবন পদ্ধতি থেকে ভিন্ন ধরনের আবেদ, যাহেদ ও দরবেশসুলভ জীবন ছিল। সারকথা, তার এসব গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের কারণে তার চাচাতো বোন হযরত খাদীজা- যিনি একজন সুস্থ বিবেকের অধিকারিণী ও বুদ্ধিমতী নারী ছিলেন-তাকে একজন আধ্যাত্মিক বুযুর্গ মনে করতেন এবং তার প্রতি এক ধরনের ভক্তি পোষণ করতেন এবং হেরাগুহার এ ঘটনার পূর্বেও হুযুর (ﷺ)-এর অসাধারণ অবস্থাসমূহের আলোচনা করে তাঁর সম্পর্কে তার ধারণা ও মতামত জিজ্ঞাসা করতেন আর ওয়ারাকা উত্তরে বলতেন:
مَا أَرَاهُ إِلَّا نَبِيَّ هَذِهِ الأُمَّةِ الَّذِي بَشَّرَ بِهِ مُوسَى وَعِيسَى
(অর্থাৎ, আমার ধারণায়, ইনি এ উম্মতের ঐ নবী, যাঁর আগমনের সুসংবাদ হযরত মূসা ও ঈসা (আঃ) দিয়ে গিয়েছিলেন।)
তারপর যখন হেরাগুহার এ ঘটনা প্রকাশ পেল- যাঁর উল্লেখ এ হাদীসে করা হয়েছে এবং যা হুযুর (ﷺ) হযরত খাদীজাকে অবহিত করেছিলেন, তখন তাঁর অন্তরে এ আগ্রহ সৃষ্টি হল যে, সম্পূর্ণ ঘটনা হুযুর (ﷺ)-এর মুখে ওয়ারাকাকে শুনানো হোক- যিনি পূর্ব থেকেই হুযুর (ﷺ)-এর নবী ও রাসূল হওয়ার ধারণা প্রকাশ করতেন। এখানে এ বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, কোন রিওয়ায়াতে এর উল্লেখ বরং ইঙ্গিতও নেই যে, হুযুর (ﷺ) নিজে ওয়ারাকার নিকট যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন; বরং খাদীজাই তাঁকে ওয়ারাকার নিকট নিয়ে গিয়েছিলেন, যেমন এ হাদীসে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সামনে হাদীসে বলা হয়েছে যে, ওয়ারাকার নিকট গিয়ে হযরত খাদীজাই তাকে বলেছিলেন যে, আপনি আপনার ভাতিজার কথা ও ঘটনা শুনুন। ওয়ারাকা তখন হুযুর (ﷺ)কে সম্বোধন করে বললেন, হে ভাতিজা! আমাকে বল, তুমি কি দেখ? হুযুর (ﷺ) তখন ঐসব বিষয় বর্ণনা করলেন- যা তিনি হেরাগুহায় প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং যা কিছু তাঁর উপর দিয়ে ঘটে গিয়েছিল। ওয়ারাকা তখন দ্বিধাহীনচিত্তে বলে দিলেন, এ ফিরিশতা- যিনি হেরাগুহায় তোমার নিকট এসেছেন এবং যার সম্পূর্ণ ঘটনা তুমি বর্ণনা করেছ, তিনি হচ্ছেন ঐ 'নামূস' (অর্থাৎ, ওহী বহনকারী বিশেষ ফিরিশতা) যাকে আল্লাহ্ তা'আলা নিজের কালাম ও পয়গাম দিয়ে স্বীয় পয়গাম্বর মুসা (আঃ)-এর নিকটও প্রেরণ করেছিলেন।
এখানে কারো মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল তো খ্রীষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। এতদসত্ত্বেও এখানে তিনি হযরত ঈসা (আঃ)-এর নাম বাদ দিয়ে মুসা (আঃ)-এর নাম কেন উল্লেখ করলেন, অথচ জিবরাঈল (আঃ) যেভাবে মূসা (আঃ)-এর প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, তেমনিভাবে হযরত ঈসা (আঃ)-এর প্রতিও প্রেরিত হয়েছিলেন? হাদীস ব্যাখ্যাতাগণ এর উত্তরে লিখেছেন যে, ঈসা (আঃ) নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলার মহান পয়গাম্বর ছিলেন, কিন্তু তিনি আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র কোন শরী‘আত নিয়ে আসেননি। তাঁর শরী‘আত তাই ছিল, যা মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে এসেছিল। ঈসা (আঃ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা এর কোন কোন বিধানে সামান্য পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। এ দিকে 'রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ শরী‘আত নিয়ে আগমনকারী রাসূল ছিলেন। এ জন্য মূসা (আঃ)-এর সাথে তাঁর অধিক সাদৃশ্য ও মিল ছিল। কুরআন মজীদের সূরা মুযযাম্মিলেও বলা হয়েছে:
اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنَاۤ اِلَیۡکُمۡ رَسُوۡلًا شَاہِدًا عَلَیۡکُمۡ کَمَاۤ اَرۡسَلۡنَاۤ اِلٰی فِرۡعَوۡنَ رَسُوۡلًا
যাহোক, এ বিশেষ কারণে ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল এ ক্ষেত্রে জিবরাঈল (আঃ)-এর পরিচয় দিতে গিয়ে হযরত মূসা (আঃ)-এর নাম উল্লেখ করেছেন।
সামনে হাদীসে রয়েছে যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল পূর্ণ আস্থার সাথে এ কথা বলেন যে, হেরাগুহায় আগমনকারী এ ফিরিশতা জিবরাঈল আমীন ছিলেন- যিনি আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে মূসা (আঃ) এবং অন্যান্য নবী-রাসূলদের নিকট আসতেন। হুযুর (ﷺ)-এর নবুওয়াতের প্রতি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন এবং বড়ই আক্ষেপের সাথে বললেন, হায়! আমি যদি তখন শক্তিমান যুবক থাকতাম, আমি যদি সে সময় জীবিত থাকতাম, যখন আপনার স্বগোত্রীয় লোকেরা আপনাকে এ মক্কা শহর থেকে বের করে দিবে, (তাহলে আমি আপনার সঙ্গী হতাম এবং জীবনবাজি রেখে আপনার সাহায্য করতাম।) হুযুর (ﷺ) ওয়ারাকার মুখে এ কথা শুনে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাকে এ শহর থেকে বিতাড়িত করে দিবে? (হুযুর (ﷺ)-এর আশ্চর্য হওয়ার কারণ এই ছিল যে, এ পর্যন্ত নিজের উত্তম চরিত্র ও নিষ্কলুষ জীবনের জন্য তিনি সমাজে সবার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাঁকে সাদেক ও আলআমীন উপাধিতে ডাকা হত। এজন্য বাস্তবে এ বিষয়টি খুবই আশ্চর্যের ছিল যে, এ সম্প্রদায়ের লোকেরা একদিন তাঁকে এ শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য করবে।) ওয়ারাকা হুযূর (ﷺ)-এর এ প্রশ্নের উত্তরে বললেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নবীই ঐ দাওয়াত ও শিক্ষা নিয়ে এসেছে, যা আপনি নিয়ে এসেছেন, তখনই তার সম্প্রদায় তার শত্রুতে পরিণত হয়েছে। আপনার সাথেও এমনটাই করা হবে, আপনার সম্প্রদায় আপনার প্রাণের শত্রু হয়ে যাবে এবং আপনাকে এ শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে। প্রবল ধারণা এই যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল এসব যাকিছু বলেছেন, প্রাচীন আসমানী গ্রন্থসমূহের ভবিষ্যদ্বাণী এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত নবী-রাসূলদের ইতিহাসের আলোকে বলেছেন। কুরআন মজীদে আম্বিয়ায়ে কেরামের যেসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে, এ গুলোর সাক্ষ্যও তাই।
হাদীসটির শেষে বলা হয়েছে যে, ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল নিজের কথা শেষ করতে গিয়ে পুনরায় বললেন যে, আমি যদি আপনার ঐ যুগটি পাই, যখন আপনি নিজ সম্প্রদায়কে সত্য দ্বীনের দাওয়াত দিবেন আর আপনার সম্প্রদায় আপনার বিরোধী ও শত্রু হয়ে যাবে, তাহলে আমি আমার এ বার্ধক্য ও অচলাবস্থা সত্ত্বেও আপনার যথাসাধ্য সাহায্য-সহযোগিতা করব। তারপর রিওয়ায়াতে রয়েছে যে, এর অল্প দিনের মধ্যেই ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল মারা যান এবং হেরাগুহার এ ঘটনার পর কিছুকাল পর্যন্ত ওহী আগমনের ধারা বন্ধ থাকে। (হাদীসটির আসল বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এখানে শেষ হল।)
এ হাদীসের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ের ব্যাখ্যা
(১) এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নবুওয়াতের প্রতি সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপনকারী ও ঈমান আনয়নকারী হচ্ছেন ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল ও হযরত খাদীজা রাযি.। কিন্তু এটা তখন হয়েছে, যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে সত্য দ্বীনের প্রতি দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। ওয়ারাকা ইবনে নাওফেল ঐ সময়েই এ অবস্থায় ইন্তিকাল করে যান যে, তিনি খাঁটি খ্রীষ্টধর্মের উপর কায়েম ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে সত্য নবী স্বীকার করে তাঁর প্রতিও ঈমান এনেছিলেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে এ উম্মতের প্রথম মু'মিনও বলা যেতে পারে। তারপর যখন হুযুর (ﷺ)কে দ্বীনের দাওয়াতের হুকুম দেওয়া হল, তখন সর্বপ্রথম হযরত আবু বকর সিদ্দীক, হযরত আলী মুরতাযা, হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা ও হযরত খাদীজা রাযি. তাঁর দাওয়াত কবুল করেন, যিনি হুযুর (ﷺ)-এর নবুওয়াতের প্রতি আগেও ঈমান এনেছিলেন।
(২) হাদীসটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, (হেরা গুহায়) হযরত জিবরাঈল (আঃ) তিনবার অত্যন্ত জোরে হুযুর (ﷺ)-এর গলদেশে চাপ দিয়েছিলেন। হাদীস ব্যাখ্যাতা, ও অন্যান্য আলেমগণ এর বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। অধম সংকলকের নিকট সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত কথা এই যে, এভাবে চরম শক্তিতে গলা টিপে ধরার দ্বারা উদ্দেশ্য এই ছিল, যেন কিছু সময়ের জন্য হুযুর (ﷺ)-এর মনোযোগ সবদিক থেকে এমনকি নিজের সত্তার দিক থেকেও সরে গিয়ে কেবল দয়াময় পরওয়ারদিগারের প্রতি নিবদ্ধ হয়ে যায়। যখন কোন আরেফবিল্লাহ ও খোদার পরিচয়েধন্য বান্দার এভাবে গলা টিপে ধরা হবে, তখন নিঃসন্দেহে তার পূর্ণ মনোযোগ আপন প্রতিপালকের দিকে হয়ে যাবে এবং তার অনুভূতি-উপলব্ধি অনেকটা এ জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উর্ধ্বজগতের সাথে যুক্ত হয়ে যাবে। ঐ সময় যখন হুযুর (ﷺ)-এর প্রতি প্রথম ওহী নাযিল করা হবে, তখন এর প্রয়োজন ছিল। অন্য শব্দমালায় বলা যায় যে, এ প্রক্রিয়া দ্বারা হুযুর (ﷺ)-এর রূহ ও কলবে ঐ শক্তি পয়দা করা উদ্দেশ্য ছিল, যা আল্লাহর ওহী বহন করতে পারে- যাকে কুরআনে কারীম বলা হয়েছে। পরবর্তীতেও ওহী নাযিল হওয়ার সময় হুযুর (ﷺ)-এর যে অবস্থা হত, সেটা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। প্রচণ্ড শীত মৌসুমে যখন হুযুর (ﷺ)-এর উপর ওহী অবতীর্ণ হত, তখন তাঁর শরীরে ঘাম এসে যেত। হাদীসে একথাও বলা হয়েছে যে, উটনীতে সওয়ার অবস্থায় যদি ওহী আসত, তখন উটনী মাটিতে বসে যেত। সারকথা, এ অধমের নিকট এটাই অধিক যুক্তিযুক্ত যে, এ কঠিন চাপের উদ্দেশ্য এটাই ছিল যে, তিনি যেন ঐ ওহী বহন করতে পারেন, যা প্রথমবার নাযিল করা হচ্ছিল।
(৩) হাদীসটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুযুর (ﷺ) যখন হেরাগুহা থেকে বাড়ীতে ফিরে আসলেন, তখন তাঁর অন্তর কাঁপছিল এবং শরীরের উপরও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছিল। তিনি হযরত খাদীজাকে একথাও বলেছিলেন قد خشيتُ على نفسي (অর্থাৎ, আমার তো জীবনের আশংকা দেখা দিয়েছিল।) হুযুর (ﷺ)-এর এ অবস্থাটাও হযরত জিবরাঈল (আঃ)-এর গলায় চাপ দেওয়ার এবং কালামে এলাহীর বোঝারই ফল ছিল। এটা আল্লাহ্ তা'আলার রহমত ও হেকমত যে, আমাদের উপর কুরআন মজীদ তিলাওয়াতের কোন বোঝা পড়ে না। অন্যথায় এর শান তো স্বয়ং আল্লাহ্ তা'আলা এই বর্ণনা করেছেনঃ
لَوۡ اَنۡزَلۡنَا ہٰذَا الۡقُرۡاٰنَ عَلٰی جَبَلٍ لَّرَاَیۡتَہٗ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنۡ خَشۡیَۃِ اللّٰہِ
(আমি যদি এ কুরআনকে অবতীর্ণ করতাম কোন পাহাড়ের উপর, তবে তুমি দেখতে তা আল্লাহর ভয়ে অবনত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে।)-সূরা হাশরঃ আয়াত-২১
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)