মুসনাদে আহমদ- ইমাম আহমদ রহঃ (আল-ফাতহুর রব্বানী)
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনচরিত অধ্যায়
হাদীস নং: ২১৪
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনচরিত অধ্যায়
পরিচ্ছেদ: উশায়রার যুদ্ধ
২১৪. আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উশায়রার যুদ্ধে আমি এবং আলী (রা) সহযোদ্ধা ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যখন সেখানে গিয়ে তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান করছিলেন তখন আমরা বানু মুদলিজ গোত্রের কতক লোককে তাদের বাগানের কূপে কাজ করতে দেখলাম। হযরত আলী (রা) আমাকে ডেকে বললেন, হে আবূ ইয়াকযান, আপনি কি সম্মত হবেন যে, আমরা ওই লোকগুলোর নিকট যাব এবং তারা কীভাবে কাজ করে তা দেখব? বস্তুতঃ আমরা সেখানে গেলাম এবং কিছুক্ষণ তাদের কাজ দেখলাম। এরপর আমাদের চোখ জুড়ে ঘুম এল। আমি এবং আলী (রা) গিয়ে খেজুর বাগানের মধ্যে একটি মাটির কূপের নিকট ঘুমিয়ে পড়লাম। আমরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। একপর্যায়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর পায়ের নাড়া অনুভব করলাম। আমরা তখন মাটিমাখা অবস্থায়। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত আলীর (রা) দেহে মাটি দেখে তাঁকে বললেন, হে আবা তুরাব (মাটিমাখা মানুষ), আমি কি তোমাদের দুজনকে সর্বাধিক দুর্ভাগা দুজন লোকের পরিচয় বলে দিব? আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ (ﷺ)। হাঁ, তা বলুন। তিনি বললেন, একজন হল ছামূদ গোত্রের সেই লাল বর্ণ লোক যে হযরত সালিহ (আ) এর উষ্ট্রীকে হত্যা করেছিল। আর দ্বিতীয়জন হলো হে আলী যে ব্যক্তি তোমার এই স্থানে অর্থাৎ কপালে আঘাত করবে। যে আঘাতের ফলে চোয়াল পর্যন্ত রক্ত গড়িয়ে পড়বে।
كتاب سيرة أول النبيين وخاتم المرسلين نبينا محمد بن عبد الله صلى الله عليه وسلم
باب ماجاء في غزوة العشيرة
عن عمار بن ياسر (2) قال كنت أنا وعلى (رضى الله عنه) رفيقين في غزوة ذات العشيرة فلما نزلها - صلى الله عليه وسلم - وأقام بها رأينا ناسا من بنى مدلج يعملون؟ في عين لهم في نخل، فقال لى على يا أبا اليقظان هل لك أن نأتى هولاء فننظر كيف يعملون فجئناهم فنظرنا إلى عملهم ساعة ثم غشينا النوم: فإنطلقت أنا وعلى فاضطجعنا في صور من النخل في دقعاء (3) من التراب فنمنا فو الله ما أهبنا (4) إلا رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يحركنا برجله وقد تتربنا من تلك الدقعاء فيومئذ قال رسول - صلى الله عليه وسلم - لعلى يا أبا تراب لما يرى عليه من التراب قال ألا أحدثكما بأشقى الناس رجلين؟ قلنا بلى يارسول الله، قال أحيمر (1) ثمود الذى عقر الناقة والذى يضربك ياعلى (2) على هذه يعنى قرنه (3) حتى تبل منه هذه يعنى لحيته
হাদীসের ব্যাখ্যা:
কুরআন মজীদের শেষ পারার সূরা 'ওয়াশ শামস'-এর শেষ দিকে হযরত সালেহ (আ.)-এর সম্প্রদায় 'কওমে সামূদ' এর নিকৃষ্টতম কাফের সুলভ অপরাধের আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে کَذَّبَتۡ ثَمُوۡدُ بِطَغۡوٰىہَاۤ . اِذِ انۡۢبَعَثَ اَشۡقٰہَا এ আয়াতসমূহে ঐ ব্যক্তিকে اَشۡقٰى তথা চরম হতভাগা ও কমবখত বলা হযেছে, যে ঐ উটনীটি মেরে ফেলেছিল-যাকে আল্লাহ্ তা'আলা হযরত সালেহ (আ.)-এর মু'জেযা হিসাবে সৃষ্টি করেছিলেন। হযরত আলী রাযি. হুযুর (ﷺ)-এর প্রশ্নের উত্তরে ঐসব আয়াতের আলোকে নিবেদন করেছিলেন যে, পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের মধ্যে সবচেয়ে হতভাগা ও কমবখত ঐ ব্যক্তি ছিল, যে ঐ উটনীটি হত্যা করে ফেলেছিল।
এ অধম লেখকের ধারণা যে, হযরত আলী রাযি.-এর নিকট হুযুর (ﷺ)-এর এ প্রশ্নটি একটি ভূমিকা ছিল ঐ ভবিষ্যদ্বাণীর, যা তিনি হযরত আলী রাযি. এর ব্যাপারে স্বয়ং তাঁরই নিকট ব্যক্ত করেছিলেন। হুযুর (ﷺ) নিজের এ বক্তব্য দ্বারা হযরত আলী রাযি.-এর শাহাদাতের ভবিষ্যদ্বাণী এমন বিস্তারিতরূপে করলেন যে, হতভাগা হত্যাকারী তোমার মাথার অগ্রভাগে তরবারী দ্বারা আঘাত করবে। যার ফলে তোমার এ দাড়ি রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে। সাথে সাথে এ কথাও বলে দিলেন যে, এ হত্যাকারী পরবর্তীকালে আগত সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে হতভাগা ও চরম পর্যায়ের বদবখত হবে।
হযরত সুহাইব রাযি.-এর বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত আলী রাযি. নিজের শাহাদতের ব্যাপারে হুযুর (ﷺ)-এর এ ভবিষ্যদ্বাণীকে নিজের বেলা একটি বড় সুসংবাদ মনে করতেন এবং ইরাকের কুফা শহরে বলতেন, হে ইরাকবাসী! আমি এর আকাঙ্খী এবং আগ্রহের সাথে ঐ দিনের প্রতীক্ষা করছি, যখন তোমাদের মধ্যকার হতভাগা ও কমবখত লোকটি আমার মাথার রক্ত দ্বারা আমার দাড়ি রঙ্গীন করে দিবে। বস্তুত: হুযুর (ﷺ) যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তাঁর ওফাতের প্রায় ত্রিশ বছর পর এভাবেই হযরত আলী রাযি. এর শাহাদতের ঘটনা ঘটে। رضى اللهُ عَنْهُ وأرضاه নিঃসন্দেহে এ ভবিষ্যদ্বাণী এবং ঠিক এভাবেই এর প্রতিফলন হুযুর (ﷺ)-এর অন্যসব মু'জেযার মতই একটি মু'জেযা।
صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَبَارَكَ وَسَلَّمَ
হযরত আলী রাযি.-এর শাহাদত
মাজমাউল ফাওয়ায়েদের প্রণেতা হযরত সুহাইব রাযি.-এর উপরে বর্ণিত রেওয়ায়েতের পরই তাবরানীর 'মু'জামে কবীর' এর বরাতে হযরত আলী রাযি.-এর শাহাদতের ঘটনা কিছুটা বিস্তারিতভাবে ইসমাঈল ইবনে রাশেদের বাচনিক বর্ণনা করেছেন। নিম্নে এর সংক্ষিপ্তসার পাঠকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। তবে এর জন্য খারেজী ফেরকার কিছুটা পরিচয় তুলে ধরাও জরুরী মনে হচ্ছে। খারেজীগণ হযরত আলী রাযি.-এর সেনাবাহিনীরই একটা বিশেষ দল ছিল- যারা নিজেদের নির্বুদ্ধিতা ও চিন্তাগত বক্রতার কারণে হযরত আলী রাযি.-এর একটি সিদ্ধান্তকে ভুল ও কুরআন মজীদের স্পষ্ট বিরোধী মনে করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারী ও বিদ্রোহী হয়ে গিয়েছিল। এদের সংখ্যা কয়েক হাজারের মত ছিল। তারপর হযরত আলী রাযি.-এর বুঝানোর ফলে তাদের মধ্য থেকে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা সঠিক পথে ফিরে আসল। কিন্তু তাদের একটি বিরাট সংখ্যা নিজেদের গোমরাহীর উপরই কায়েম থাকল এবং যুদ্ধ ও হানাহানির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করল। শেষ পর্যন্ত হযরত আলী রাযি. তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে বাধ্য হলেন। (ইতিহাসে এ ঘটনাটি 'নাহরওয়ান' যুদ্ধ নামে পরিচিত।) এর ফলে তাদের অধিকাংশই মারা গেল। কিছু অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল। এ অবশিষ্টদের মধ্য থেকে তিন ব্যক্তি ১. বারক ইবনে আব্দুল্লাহ, ২. আমর ইবনে বকর তামীমী ও ৩. আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম মক্কা শরীফে একত্রিত হল। তারা পরিস্থিতি নিয়ে মত বিনিময় করল এবং এ সিদ্ধান্তে পৌছল যে, সকল ফিতনা ও বিপর্যয় ঐসব লোকের কারণে, যাদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তাই তাদেরকে যে কোনভাবে শেষ করে দিতে হবে। এ ব্যাপারে তারা তিন ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করল। ১. হযরত মু'আবিয়া, ২. হযরত আমর ইবনুল আস ও ৩. হযরত আলী রাযি.। বারক বলল, মু'আবিয়াকে হত্যা করার দায়িত্ব আমি নিলাম। আমর তামীমী বলল, আমর ইবনুল আসকে খতম করে দেওয়ার দায়িত্ব আমি গ্রহণ করলাম। আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম বলল, আলীকে হত্যা করার যিম্মাদারী আমি নিচ্ছি। তারপর তারা এ ব্যাপারে পরস্পর শপথ ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করল এবং এর জন্য এ পরিকল্পনা গ্রহণ করল যে, আমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেকেই ১৭ই রমযানুল মুবারক যখন তারা ফজরের নামাযের ইমামতির জন্য বের হবে, তখনই আক্রমণ করে আমাদের কার্যসিদ্ধি করে নিব। ঐ যুগে নামাযের ইমামতি যুগের খলীফা অথবা তাদের নির্ধারিত আমীরগণই করত।
নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বারক ইবনে আব্দুল্লাহ হযরত মু'আবিয়া রাযি.-এর কর্মস্থল দামেশক রওয়ানা হয়ে গেল। আমর তামীমী মিসরের দিকে যাত্রা করল- যেখানকার আমীর ও শাসক ছিলেন হযরত আমর ইবনুল আস রাযি.। অপরদিকে আব্দুর রহমান ইবনে মূলজিম হযরত আলী রাযি.-এর দারুল হুকুমত কুফার দিকে রওয়ানা হয়ে গেল।
১৭ ই রমযান সকাল বেলা ফজরের নামায পড়ানোর জন্য হযরত মু'আবিয়া রাযি. যাচ্ছিলেন। এমন সময় বারক ইবনে আব্দুল্লাহ তরবারী দ্বারা আঘাত করল। হযরত মু'আবিয়া রাযি. কিছুটা টের পেয়ে গেলেন এবং দৌড়ে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। তারপরও বারকের তরবারীর আঘাতে তাঁর নিতম্বে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়ে গেল। বারককে গ্রেফতার করা হল, (এবং পরে হত্যা করা হল।) ক্ষতের চিকিৎসার জন্য ডাক্তার ডাকা হল। চিকিৎসক ক্ষত দেখে বলল যে, এটা যে তরবারীর আঘাত, সেটা বিষমাখানো ছিল। এর চিকিৎসার একটি পদ্ধতি এই যে, গরম লোহা দ্বারা ক্ষতস্থানে দাগ দিতে হবে। এমন করলে আশা করা যায় যে, বিষ সারা শরীরে অনুপ্রবেশ করতে পারবে না। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি এই যে, আমি আপনাকে একটি ঔষধ তৈরী করে দেব, কিন্তু এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এই হবে যে, এর পর আপনার আর কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে না। হযরত মু'আবিয়া রাযি. বললেন, গরম লোহার দাগ দেওয়াতে আমি সহ্য করতে পারব না। এ জন্য আমাকে ঐ ঔষধই বানিয়ে পান করিয়ে দেওয়া হোক। আমার জন্য দু'পুত্র ইয়াযীদ ও আব্দুল্লাহই যথেষ্ট। তারপর তাই করা হল এবং হযরত মু'আবিয়া রাযি. সুস্থ হয়ে উঠলেন।
আমর তামীমী স্বীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী হযরত আমর ইবনুল আসকে খতম করে দেওয়ার জন্য মিসর পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা যে, ১৭ই রমযান রাতে হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. এমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে, তিনি ফজরের নামায পড়ানোর জন্য মসজিদে আসতে পারলেন না। তিনি অন্য এক ব্যক্তি খারেজা ইবনে হাবীবকে তাঁর স্থলে নামায পড়িয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আসলেন এবং নামায পড়ানোর জন্য ইমামের জায়নামাযে দাঁড়ালেন। আমর তামীমী তাকেই আমর ইবনুল আস মনে করে তরবারী দ্বারা আঘাত করল এবং তিনি সেখানেই শহীদ হয়ে গেলেন। আমর তামীমীকে গ্রেফতার করা হল এবং লোকেরা তাকে ধরে মিসরের আমীর ও শাসক হযরত আমর ইবনুল আসের নিকট নিয়ে গেল। আমীর তামীমী লক্ষ্য করে দেখল যে, লোকেরা তাকে আমীর নামে সম্বোধন করছে। তাই সে জিজ্ঞাসা করল, ইনি কে? উত্তরে বলা হল যে, ইনি মিসরের আমীর ও শাসক হযরত আমর ইবনুল আস রাযি.। সে জিজ্ঞাসা করল, যাকে আমি হত্যা করেছি সে কে ছিল? উত্তরে বলা হল, তিনি ছিলেন খারেজা ইবনে হাবীব। ঐ হতভাগা তখন হযরত আমর ইবনুল আসকে সম্বোধন করে বলল, হে ফাসেক! আমি তোমাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিলাম। হযরত আমর ইবনুল আস বললেন, তুমি এ ইচ্ছা করেছিলে, কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা ঐ ছিল, যা হয়ে গিয়েছে।
এরপর খারেজা ইবনে হাবীবের হত্যার বদলায় আমর তামীমীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হল। এদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত ও হতভাগা আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম স্বীয় পকিল্পনা অনুযায়ী কুফা পৌঁছে গিয়েছিল। সে ১৭ই রমযান ফজরের আগে মসজিদের পথে ওঁৎ পেতে বসে গেল। হযরত আলী রাযি.-এর অভ্যাস ছিল যে, তিনি বাড়ী থেকে বের হয়ে 'আস সালাত, আস সালাত' বলতে বলতে এবং লোকদেরকে নামাযের প্রতি আহ্বান জানাতে জানাতে মসজিদে গমন করতেন। ঐ দিনও তিনি এ অভ্যাস অনুযায়ী মসজিদে আসছিলেন। এ সময় ঐ কমবখত ইবনে মুলজিম সামনের দিক থেকে এসে হঠাৎ তাঁর কপালে তরবারি দ্বারা আঘাত করল এবং পালিয়ে যাবার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকেরা পিছনে ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেলল এবং হযরত আলী রাযি.-এর সামনে উপস্থিত করল। তিনি তাঁর বড় ছেলে হযরত হাসান রাযি.-কে বললেন, আমি যদি বেঁচে থাকি, তাহলে এ ঘাতক ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিব। আমি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারি, আর ইচ্ছা করলে প্রাণদণ্ডও দিতে পারি। আর আমি যদি মারা যাই, তাহলে শরী‘আতের কেসাসের বিধান অনুযায়ী তাকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু 'মুসলা' অর্থাৎ, হাত, পা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে দেহ বিকৃতি করা যাবে না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বলতে শুনেছি যে, কোন দংশনকারী কুকুরকেও যদি হত্যা করা হয়, তাহলে তাকেও মুসলা করা যাবে না।
হযরত আলী রাযি. পাপিষ্ঠ ইবনে মুলজিমের এ আঘাতের ফলে যখন শহীদ হলেন, তখন হযরত হাসান রাযি.-এর নির্দেশে তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হল এবং বিক্ষুদ্ধ জনতা তার লাশকে জালিয়ে দিল।
এ অধম লেখকের ধারণা যে, হযরত আলী রাযি.-এর নিকট হুযুর (ﷺ)-এর এ প্রশ্নটি একটি ভূমিকা ছিল ঐ ভবিষ্যদ্বাণীর, যা তিনি হযরত আলী রাযি. এর ব্যাপারে স্বয়ং তাঁরই নিকট ব্যক্ত করেছিলেন। হুযুর (ﷺ) নিজের এ বক্তব্য দ্বারা হযরত আলী রাযি.-এর শাহাদাতের ভবিষ্যদ্বাণী এমন বিস্তারিতরূপে করলেন যে, হতভাগা হত্যাকারী তোমার মাথার অগ্রভাগে তরবারী দ্বারা আঘাত করবে। যার ফলে তোমার এ দাড়ি রক্তে রঞ্জিত হয়ে যাবে। সাথে সাথে এ কথাও বলে দিলেন যে, এ হত্যাকারী পরবর্তীকালে আগত সকল মানুষের মধ্যে সবচেয়ে হতভাগা ও চরম পর্যায়ের বদবখত হবে।
হযরত সুহাইব রাযি.-এর বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত আলী রাযি. নিজের শাহাদতের ব্যাপারে হুযুর (ﷺ)-এর এ ভবিষ্যদ্বাণীকে নিজের বেলা একটি বড় সুসংবাদ মনে করতেন এবং ইরাকের কুফা শহরে বলতেন, হে ইরাকবাসী! আমি এর আকাঙ্খী এবং আগ্রহের সাথে ঐ দিনের প্রতীক্ষা করছি, যখন তোমাদের মধ্যকার হতভাগা ও কমবখত লোকটি আমার মাথার রক্ত দ্বারা আমার দাড়ি রঙ্গীন করে দিবে। বস্তুত: হুযুর (ﷺ) যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তাঁর ওফাতের প্রায় ত্রিশ বছর পর এভাবেই হযরত আলী রাযি. এর শাহাদতের ঘটনা ঘটে। رضى اللهُ عَنْهُ وأرضاه নিঃসন্দেহে এ ভবিষ্যদ্বাণী এবং ঠিক এভাবেই এর প্রতিফলন হুযুর (ﷺ)-এর অন্যসব মু'জেযার মতই একটি মু'জেযা।
صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَبَارَكَ وَسَلَّمَ
হযরত আলী রাযি.-এর শাহাদত
মাজমাউল ফাওয়ায়েদের প্রণেতা হযরত সুহাইব রাযি.-এর উপরে বর্ণিত রেওয়ায়েতের পরই তাবরানীর 'মু'জামে কবীর' এর বরাতে হযরত আলী রাযি.-এর শাহাদতের ঘটনা কিছুটা বিস্তারিতভাবে ইসমাঈল ইবনে রাশেদের বাচনিক বর্ণনা করেছেন। নিম্নে এর সংক্ষিপ্তসার পাঠকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। তবে এর জন্য খারেজী ফেরকার কিছুটা পরিচয় তুলে ধরাও জরুরী মনে হচ্ছে। খারেজীগণ হযরত আলী রাযি.-এর সেনাবাহিনীরই একটা বিশেষ দল ছিল- যারা নিজেদের নির্বুদ্ধিতা ও চিন্তাগত বক্রতার কারণে হযরত আলী রাযি.-এর একটি সিদ্ধান্তকে ভুল ও কুরআন মজীদের স্পষ্ট বিরোধী মনে করে তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারী ও বিদ্রোহী হয়ে গিয়েছিল। এদের সংখ্যা কয়েক হাজারের মত ছিল। তারপর হযরত আলী রাযি.-এর বুঝানোর ফলে তাদের মধ্য থেকে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা সঠিক পথে ফিরে আসল। কিন্তু তাদের একটি বিরাট সংখ্যা নিজেদের গোমরাহীর উপরই কায়েম থাকল এবং যুদ্ধ ও হানাহানির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করল। শেষ পর্যন্ত হযরত আলী রাযি. তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে বাধ্য হলেন। (ইতিহাসে এ ঘটনাটি 'নাহরওয়ান' যুদ্ধ নামে পরিচিত।) এর ফলে তাদের অধিকাংশই মারা গেল। কিছু অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল। এ অবশিষ্টদের মধ্য থেকে তিন ব্যক্তি ১. বারক ইবনে আব্দুল্লাহ, ২. আমর ইবনে বকর তামীমী ও ৩. আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম মক্কা শরীফে একত্রিত হল। তারা পরিস্থিতি নিয়ে মত বিনিময় করল এবং এ সিদ্ধান্তে পৌছল যে, সকল ফিতনা ও বিপর্যয় ঐসব লোকের কারণে, যাদের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তাই তাদেরকে যে কোনভাবে শেষ করে দিতে হবে। এ ব্যাপারে তারা তিন ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করল। ১. হযরত মু'আবিয়া, ২. হযরত আমর ইবনুল আস ও ৩. হযরত আলী রাযি.। বারক বলল, মু'আবিয়াকে হত্যা করার দায়িত্ব আমি নিলাম। আমর তামীমী বলল, আমর ইবনুল আসকে খতম করে দেওয়ার দায়িত্ব আমি গ্রহণ করলাম। আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম বলল, আলীকে হত্যা করার যিম্মাদারী আমি নিচ্ছি। তারপর তারা এ ব্যাপারে পরস্পর শপথ ও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করল এবং এর জন্য এ পরিকল্পনা গ্রহণ করল যে, আমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেকেই ১৭ই রমযানুল মুবারক যখন তারা ফজরের নামাযের ইমামতির জন্য বের হবে, তখনই আক্রমণ করে আমাদের কার্যসিদ্ধি করে নিব। ঐ যুগে নামাযের ইমামতি যুগের খলীফা অথবা তাদের নির্ধারিত আমীরগণই করত।
নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বারক ইবনে আব্দুল্লাহ হযরত মু'আবিয়া রাযি.-এর কর্মস্থল দামেশক রওয়ানা হয়ে গেল। আমর তামীমী মিসরের দিকে যাত্রা করল- যেখানকার আমীর ও শাসক ছিলেন হযরত আমর ইবনুল আস রাযি.। অপরদিকে আব্দুর রহমান ইবনে মূলজিম হযরত আলী রাযি.-এর দারুল হুকুমত কুফার দিকে রওয়ানা হয়ে গেল।
১৭ ই রমযান সকাল বেলা ফজরের নামায পড়ানোর জন্য হযরত মু'আবিয়া রাযি. যাচ্ছিলেন। এমন সময় বারক ইবনে আব্দুল্লাহ তরবারী দ্বারা আঘাত করল। হযরত মু'আবিয়া রাযি. কিছুটা টের পেয়ে গেলেন এবং দৌড়ে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। তারপরও বারকের তরবারীর আঘাতে তাঁর নিতম্বে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়ে গেল। বারককে গ্রেফতার করা হল, (এবং পরে হত্যা করা হল।) ক্ষতের চিকিৎসার জন্য ডাক্তার ডাকা হল। চিকিৎসক ক্ষত দেখে বলল যে, এটা যে তরবারীর আঘাত, সেটা বিষমাখানো ছিল। এর চিকিৎসার একটি পদ্ধতি এই যে, গরম লোহা দ্বারা ক্ষতস্থানে দাগ দিতে হবে। এমন করলে আশা করা যায় যে, বিষ সারা শরীরে অনুপ্রবেশ করতে পারবে না। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি এই যে, আমি আপনাকে একটি ঔষধ তৈরী করে দেব, কিন্তু এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এই হবে যে, এর পর আপনার আর কোন সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে না। হযরত মু'আবিয়া রাযি. বললেন, গরম লোহার দাগ দেওয়াতে আমি সহ্য করতে পারব না। এ জন্য আমাকে ঐ ঔষধই বানিয়ে পান করিয়ে দেওয়া হোক। আমার জন্য দু'পুত্র ইয়াযীদ ও আব্দুল্লাহই যথেষ্ট। তারপর তাই করা হল এবং হযরত মু'আবিয়া রাযি. সুস্থ হয়ে উঠলেন।
আমর তামীমী স্বীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী হযরত আমর ইবনুল আসকে খতম করে দেওয়ার জন্য মিসর পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা যে, ১৭ই রমযান রাতে হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. এমন অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে, তিনি ফজরের নামায পড়ানোর জন্য মসজিদে আসতে পারলেন না। তিনি অন্য এক ব্যক্তি খারেজা ইবনে হাবীবকে তাঁর স্থলে নামায পড়িয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুযায়ী তিনি আসলেন এবং নামায পড়ানোর জন্য ইমামের জায়নামাযে দাঁড়ালেন। আমর তামীমী তাকেই আমর ইবনুল আস মনে করে তরবারী দ্বারা আঘাত করল এবং তিনি সেখানেই শহীদ হয়ে গেলেন। আমর তামীমীকে গ্রেফতার করা হল এবং লোকেরা তাকে ধরে মিসরের আমীর ও শাসক হযরত আমর ইবনুল আসের নিকট নিয়ে গেল। আমীর তামীমী লক্ষ্য করে দেখল যে, লোকেরা তাকে আমীর নামে সম্বোধন করছে। তাই সে জিজ্ঞাসা করল, ইনি কে? উত্তরে বলা হল যে, ইনি মিসরের আমীর ও শাসক হযরত আমর ইবনুল আস রাযি.। সে জিজ্ঞাসা করল, যাকে আমি হত্যা করেছি সে কে ছিল? উত্তরে বলা হল, তিনি ছিলেন খারেজা ইবনে হাবীব। ঐ হতভাগা তখন হযরত আমর ইবনুল আসকে সম্বোধন করে বলল, হে ফাসেক! আমি তোমাকে হত্যা করার ইচ্ছা করেছিলাম। হযরত আমর ইবনুল আস বললেন, তুমি এ ইচ্ছা করেছিলে, কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা ঐ ছিল, যা হয়ে গিয়েছে।
এরপর খারেজা ইবনে হাবীবের হত্যার বদলায় আমর তামীমীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হল। এদের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত ও হতভাগা আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম স্বীয় পকিল্পনা অনুযায়ী কুফা পৌঁছে গিয়েছিল। সে ১৭ই রমযান ফজরের আগে মসজিদের পথে ওঁৎ পেতে বসে গেল। হযরত আলী রাযি.-এর অভ্যাস ছিল যে, তিনি বাড়ী থেকে বের হয়ে 'আস সালাত, আস সালাত' বলতে বলতে এবং লোকদেরকে নামাযের প্রতি আহ্বান জানাতে জানাতে মসজিদে গমন করতেন। ঐ দিনও তিনি এ অভ্যাস অনুযায়ী মসজিদে আসছিলেন। এ সময় ঐ কমবখত ইবনে মুলজিম সামনের দিক থেকে এসে হঠাৎ তাঁর কপালে তরবারি দ্বারা আঘাত করল এবং পালিয়ে যাবার চেষ্টা করল। কিন্তু লোকেরা পিছনে ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেলল এবং হযরত আলী রাযি.-এর সামনে উপস্থিত করল। তিনি তাঁর বড় ছেলে হযরত হাসান রাযি.-কে বললেন, আমি যদি বেঁচে থাকি, তাহলে এ ঘাতক ইবনে মুলজিমের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিব। আমি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারি, আর ইচ্ছা করলে প্রাণদণ্ডও দিতে পারি। আর আমি যদি মারা যাই, তাহলে শরী‘আতের কেসাসের বিধান অনুযায়ী তাকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু 'মুসলা' অর্থাৎ, হাত, পা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে দেহ বিকৃতি করা যাবে না। কেননা, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে বলতে শুনেছি যে, কোন দংশনকারী কুকুরকেও যদি হত্যা করা হয়, তাহলে তাকেও মুসলা করা যাবে না।
হযরত আলী রাযি. পাপিষ্ঠ ইবনে মুলজিমের এ আঘাতের ফলে যখন শহীদ হলেন, তখন হযরত হাসান রাযি.-এর নির্দেশে তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হল এবং বিক্ষুদ্ধ জনতা তার লাশকে জালিয়ে দিল।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)