মা'আরিফুল হাদীস
আখলাক অধ্যায়
হাদীস নং: ১১৩
আখলাক অধ্যায়
নবী করীম ﷺ-এর সংগে উটের আচরণ
১১৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাফর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ জনৈক আনসারের প্রাচীরের কাছে যান। সেখানে একটা উট ছিল। নবী ﷺ-কে দেখার পর উটটি করুণ আওয়াজ করল এবং তার চোখ থেকে পানি ফেলতে লাগল। নবী ﷺ নিকটে এসে তার শরীরে হাত বুলালেন। অতঃপর উটটি চুপ করল। নবী ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, এ উটের মালিক কে? কার এ উট? এক আনসার যুবক এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটা আমার। নবী ﷺ তাকে বললেন: এ জানোয়ারের ব্যাপারে কি তুমি আল্লাহকে ভয় কর না, যিনি তোমাকে তার মালিক বানিয়েছেন? উটটি আমার কাছে নালিশ করেছে তুমি তাকে অভুক্ত রাখ এবং তার কাছ থেকে কঠিন কাজ আদায় কর। আবু দাউদ
کتاب الاخلاق
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَعْفَرٍ ، قَالَ : دَخَلَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَائِطًا لِرَجُلٍ مِنْ الْأَنْصَارِ فَإِذَا فِيْهِ جَمَلٌ ، فَلَمَّا رَأَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَنَّ وَذَرَفَتْ عَيْنَاهُ ، فَأَتَاهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَمَسَحَ ذِفْرَاهُ فَسَكَتَ ، فَقَالَ : « مَنْ رَبُّ هَذَا الْجَمَلِ ، لِمَنْ هَذَا الْجَمَلُ؟ » ، فَجَاءَ فَتًى مِنَ الْأَنْصَارِ فَقَالَ : لِي يَا رَسُولَ اللَّهِ . فَقَالَ : « أَفَلَا تَتَّقِي اللَّهَ فِي هَذِهِ الْبَهِيمَةِ الَّتِي مَلَّكَكَ اللَّهُ إِيَّاهَا؟ ، فَإِنَّهُ شَكَا إِلَيَّ أَنَّكَ تُجِيعُهُ وَتُدْئِبُهُ » (رواه ابو داؤد)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
১. আল্লাহ তাঁর নবীকে পশুপাখির কথাবার্তা উপলব্ধি করার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কিরামের মধ্যে হযরত সুলায়মান (আ)-কেও পাখির কথা বুঝবার শক্তি দান করা হয়েছিল বলে কুরআন শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা আম্বিয়ায়ে কিরামের প্রতি আল্লাহর এক বিশেষ মেহেরবানী। দীনি পরিভাষায় একে মু'জিযা বা অলৌকিক ব্যাপার বলা হয়।
পশুপাখি তাদের দুঃখ-দুর্দশা ও তাদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু মানুষের মত তাদেরও সুখ-দুঃখের অনুভূতি রয়েছে। সুখ পেলে তারা খুশি হয়, দুঃখ পেলে ব্যথিত হয়। তাই জন্তু, জানোয়ারের ব্যাপারেও খুব সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। প্রয়োজন মোতাবিক তাদের খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা উচিত। তাদের উপর কাজের এমন কোন বোঝা চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়, যা তারা বহন করতে সক্ষম নয়। অন্যথায় তারা আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করবে। জন্তু-জানোয়ারের প্রতি যুলম ও নির্যাতন আল্লাহ তা'আলা খুব অপসন্দ করেন। এ ধরনের আচরণ 'সূউল খুলক' বা মন্দ আখলাকের অন্তর্গত এবং মন্দ আখলাক মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে। যারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী, তারা যেন সর্বাবস্থায় জন্তু-জানোয়ারের প্রতি সদয় থাকেন।
২. হাদীছটিতে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তাঁর প্রাকৃতিক প্রয়োজন সমাধার জন্য যাচ্ছিলেন। সঙ্গে হযরত জা'ফর ইবন আবী তালিব রাযি.-এর পুত্র আব্দুল্লাহ রাযি.-কে নিয়ে নেন। আব্দুল্লাহ রাযি. উটের পিঠে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে বসেছিলেন। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কানে কানে একটি কথা বলেন। সে কথাটি কী ছিল? আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-
لَا أَحَدِّثُ بِهِ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ (সে কথা আমি কোনও লোককে বলব না)। হয়তো সে কথাটি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিগত এমন কোনও কথা ছিল, যার ব্যাপক প্রচার তাঁর কাম্য ছিল না। অথবা সে কথাটি হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-এর বিশেষ কোনও ফযীলত বিষয়ক। এমনও হতে পারে যে, সে কথাটি ছিল বিশেষ কোনও ব্যক্তি বা সমষ্টি সম্পর্কিত এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপক প্রচার সমীচীন মনে করছিলেন না। তাই তিনি হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-কে তা প্রকাশ করতে নিষেধ করে দেন। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-ও সে হুকুম যথাযথভাবে পালন করেন। কারও কাছে তিনি তা প্রকাশ করবেন না বলে ব্যক্ত করেছেন এবং তিনি তা-ই করেছেন। ফলে আজও পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না সে কথাটি আসলে কী। এর ভেতর আমাদের শিক্ষা রয়েছে। গুরুজন কর্তৃক যে কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয় কিংবা যে কথার প্রকাশ ক্ষতিকর বলে মনে হয়, তা কোনওক্রমেই প্রকাশ করা যাবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. জানান وَكَانَ أَحَبَّ مَا اسْتَتَرَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِحَاجَتِهِ هَدَفٌ أَوْ حَائِشُ نَخْل (নিজ হাজত সমাধাকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দিয়ে নিজেকে আড়াল করা পছন্দ করতেন, তা হতো কোনও উঁচু বস্তু বা খেজুর বাগানের দেওয়াল)। অর্থাৎ তিনি তাঁর প্রাকৃতিক প্রয়োজন উন্মুক্ত কোনও স্থানে সারতেন না। এর জন্য তিনি কোনও আড়াল খুঁজতেন। আর তাঁর পছন্দ ছিল هدف (উঁচু কোনও বস্তু)। যেমন পাথরের বড় চাঁই, টিলা, পাহাড়, বালুর স্তূপ ইত্যাদি। অথবা তাঁর পছন্দ ছিল حَائِش نخل (খেজুর বাগানের দেওয়াল)। উল্লেখ্য, তখনও পর্যন্ত বাড়ির ভেতর হাম্মাম তৈরির প্রচলন হয়নি। লোকে মলমূত্র ত্যাগের জন্য বাড়ির বাইরে উপযুক্ত কোনও জায়গা খুঁজে নিত।
যা হোক, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রয়োজন সারার জন্য জনৈক আনসারী ব্যক্তির খেজুর বাগানের ভেতর প্রবেশ করলেন। বাগানের ভেতর একটি উট ছিল। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-
فَلَمَّا رَأَى رَسُوْلَ اللهِ ﷺ جَرْجَرَ وَذَرَفَتْ عَيْنَاهُ
(উটটি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, অমনি সেটি আওয়াজ করে উঠল এবং তার দু'চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল)। جرجر এর মূল হলো الْجَرْجَرَةُ এর অর্থ গরগর করা, ঘোঁৎ ঘোঁৎ করা। মূলত শব্দটি উটের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। উট কোনও কারণে গলার ভেতর বার বার যে আওয়াজ করে থাকে, তাকেই الْجَرْجَرَةُ বলা হয়। উটটি এভাবে আওয়াজ করে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল আর সেইসঙ্গে তার চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে পড়ছিল। বোঝা যাচ্ছে সেটি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পেরেছিল। বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা এর সত্যতা মেলে যে, গাছ-পাথর পর্যন্ত তাঁকে চিনত।
যা হোক, উটটির এ অবস্থা দেখে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব মায়া লাগল। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-
فَأَتَاهُ النَّبِيُّ ﷺ فَمَسَحَ سَرَاتَهُ - أَيْ: سِنَامَهُ - وَذِفْرَاهُ فَسَكَنَ (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটির কাছে এসে তার কুঁজ ও মাথার পেছনের অংশে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে উটটি শান্ত হলো)। উটটির প্রতি এ আচরণ ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের গভীর মমতা ও দয়ার প্রকাশ। তাঁর সে মমতার স্পর্শ উটটি ভালোই অনুভব করতে পারল। ফলে সে তার আওয়াজ বন্ধ করে শান্ত হয়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটিকে শান্ত করেই ক্ষান্ত হলেন না: তিনি এর মালিককে সতর্ক করারও প্রয়োজন মনে করলেন। তিনি জানতে চাইলেন এর মালিক কে এবং সে কোথায় আছে। মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বার বর্ণনায় আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-কে বললেন, দেখো তো এই উটটি কার? আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন, আমি মালিকের সন্ধানে বের হয়ে পড়লাম। জানতে পারলাম উটটি জনৈক আনসারী ব্যক্তির। আমি তাকে ডেকে আনলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এ উটটির খবর কী? সে বলল, কী তার খবর? আল্লাহর কসম, আমি জানি না তার কী হয়েছে। আমরা এটিকে দিয়ে কাজ করিয়েছি এবং এর পিঠে করে পানি টেনেছি। পরে এটি পানি বইতে অক্ষম হয়ে যায়। তাই গত রাতে আমরা পরামর্শ করেছি যে, এটি জবাই করে গোশত বিতরণ করে ফেলব। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এরূপ করো না। বরং এটি আমাকে হিবা করে দাও। কিংবা বললেন, আমার কাছে বিক্রি করো। সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি আপনারই। তিনি সেটির উপর সদাকার আলামত লাগিয়ে দিলেন। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৭৫৩)
আলোচ্য বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারী أَفَلَا تَتَّقِي اللهَ فِي هَذِهِ الْبَهِيمَةِ الَّتِي مَلَكَكَ اللهُ إِيَّاهَا؟ (তুমি কি এ পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর না যে, আল্লাহ তোমাকে এটির মালিক বানিয়েছেন)? এ বাক্যটি 'আল্লাহকে ভয় করো' অপেক্ষা বেশি বলিষ্ঠ ও বেশি হৃদয়গ্রাহী। অর্থাৎ তোমাকে এর মালিক বানানো তোমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ। সে অনুগ্রহের দাবি তুমি তাঁর শোকর আদায় করবে। সে শোকরের একটা বড় দিক তো এই যে, তুমি এটিকে ঠিকভাবে দানাপানি দেবে, ভালোভাবে এর যত্ন করবে এবং সদয়ভাবে এটিকে ব্যবহার করবে। কিন্তু তুমি তো তা করছ না। তুমি এর বিপরীতটাই করছ। আর এভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা করছ ও গুনাহগার হচ্ছ। তোমার উচিত আল্লাহকে ভয় করে এরূপ আচরণ থেকে বিরত থাকা। তা করলে তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বৃদ্ধি পাবে, তাঁর নি'আমত স্থায়ী হবে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিককে তার আচরণ সংশোধন করার প্রতি উৎসাহদানের লক্ষ্যে বলছেন- فَإِنَّهُ يَشْكُو إِلَيَّ أَنَّكَ تُجِيعُهُ وَتُدْئِبُهُ (এটি তো আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখ এবং বেশি কাজ করিয়ে ক্লান্ত করে ফেল)। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় আছে, এটি অভিযোগ করছে তুমি একে দিয়ে কাজ বেশি করাও, কিন্তু খাবার কম দাও। উটটির পক্ষে এ অভিযোগ করা অসম্ভব কিছু নয়। যে আল্লাহ মানুষকে বাক্শক্তি দিয়েছেন, তিনি চাইলে পশুপাখিকে দিয়েও কথা বলাতে পারেন। অবলা পশুকে দিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে অভিযোগপূর্ণ কথা বলানোটা আল্লাহ তা'আলার কুদরতেরই প্রকাশ। এটা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মু'জিযা ও অলৌকিকত্বও বটে। তাঁর সঙ্গে উটের পক্ষ হতে মানবসুলভ আচরণের একাধিক ঘটনা হাদীছ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে। যেমন হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-
এক আনসার পরিবারের একটি উট ছিল। সেটি দিয়ে তারা তাদের বাগানে পানির সেচ দিত। একবার এমন হলো যে, উটটি অবাধ্য হয়ে গেল। সেটি আর কাজ করতে রাজি হলো না। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে অভিযোগ জানাল। তারা বলল, আমাদের ফসল ও খেজুরের বাগান শুকিয়ে গেছে।
অথচ উটটিকে দিয়ে আর কাজ করানো যাচ্ছে না। তিনি তাদের সঙ্গে চলে আসলেন এবং তাদের বাগানে প্রবেশ করলেন। উটটি বাগানের এক কোণে অবস্থান করছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটির দিকে এগিয়ে গেলেন। আনসারগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কুকুরের মতো কামড়ানো শুরু করে দিয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি না জানি আপনার উপর হামলা করে বসে। তিনি বললেন, না, সে আমার কোনও ক্ষতি করবে না। ওদিকে উটটি যেই না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, অমনি তাঁর দিকে এগিয়ে আসল এবং একদম সামনে এসে তাঁর সামনে সিজদায় পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটির কপালে হাত রাখলেন। ফলে সেটি এমন বাধ্য হয়ে গেল যে, অতটা বাধ্য আর কখনও হয়নি। তিনি উটটিকে নিয়ে কাজে লাগিয়ে দিলেন। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অবোধ অবলা পশুটি আপনাকে সিজদা করছে। আমরা তো বুঝমান। তাহলে আমাদেরই তো আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে আপনাকে সিজদা করা উচিত? তিনি বললেন, কোনও মানুষের জন্য অপর কোনও মানুষকে সিজদা করা বৈধ নয়। তা যদি বৈধ হতো, তবে আমি নারীকে হুকুম করতাম যেন তার স্বামীকে সিজদা করে। (মুসনাদুল বাযযার: ৬৪৫২)
হযরত জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক সফর থেকে ফিরছিলাম। পথে বনূ নাজ্জারের একটি বাগান পড়ে। সে বাগানটির ভেতর একটি উট ছিল। বাগানে কেউ ঢুকলেই উটটি তার উপর হামলা করত। বিষয়টা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হলো। তিনি বাগানে প্রবেশ করলেন এবং উটটিকে ডাকলেন। উটটি এসে তাঁর সামনে মাটির উপর মুখ রাখল এবং তাঁর সামনে বসে পড়ল।
তিনি একটি লাগাম আনিয়ে উটটিকে পরিয়ে দিলেন এবং মালিকের হাতে সেটি সমর্পণ করলেন। তারপর তিনি উপস্থিত লোকদের দিকে ফিরে বললেন, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে যা-কিছু আছে তাদের সকলেই জানে আমি আল্লাহর রাসূল। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩১৭১৯; সুনানে দারিমী: ১৮)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. প্রাকৃতিক প্রয়োজন লোকচক্ষুর আড়ালে সারা উচিত।
খ. বাহনজন্ত শক্তিশালী হলে তাতে আরোহীর পেছনে সহযাত্রী নেওয়া যেতে পারে।
গ. পালিত জন্তুকে দানাপানির কষ্ট দেওয়া জায়েয নয়।
ঘ. কারও গোপন কথা প্রকাশ করতে নেই।
ঙ. জীবজন্তুর কষ্ট দেখলে তা লাঘব করা উচিত।
চ. কেউ জীবজন্তুকে কষ্ট দিলে তাকে সতর্ক করা বাঞ্ছনীয়।
ছ. গবাদি পশুর মালিক হতে পারাটা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ। এর জন্য শোকর আদায় করা কর্তব্য।
জ. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু'জিযা ও অলৌকিকত্ব সত্য। তাতে বিশ্বাস রাখা জরুরি।
পশুপাখি তাদের দুঃখ-দুর্দশা ও তাদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু মানুষের মত তাদেরও সুখ-দুঃখের অনুভূতি রয়েছে। সুখ পেলে তারা খুশি হয়, দুঃখ পেলে ব্যথিত হয়। তাই জন্তু, জানোয়ারের ব্যাপারেও খুব সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। প্রয়োজন মোতাবিক তাদের খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা উচিত। তাদের উপর কাজের এমন কোন বোঝা চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়, যা তারা বহন করতে সক্ষম নয়। অন্যথায় তারা আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করবে। জন্তু-জানোয়ারের প্রতি যুলম ও নির্যাতন আল্লাহ তা'আলা খুব অপসন্দ করেন। এ ধরনের আচরণ 'সূউল খুলক' বা মন্দ আখলাকের অন্তর্গত এবং মন্দ আখলাক মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে। যারা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী, তারা যেন সর্বাবস্থায় জন্তু-জানোয়ারের প্রতি সদয় থাকেন।
২. হাদীছটিতে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তাঁর প্রাকৃতিক প্রয়োজন সমাধার জন্য যাচ্ছিলেন। সঙ্গে হযরত জা'ফর ইবন আবী তালিব রাযি.-এর পুত্র আব্দুল্লাহ রাযি.-কে নিয়ে নেন। আব্দুল্লাহ রাযি. উটের পিঠে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে বসেছিলেন। এ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কানে কানে একটি কথা বলেন। সে কথাটি কী ছিল? আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-
لَا أَحَدِّثُ بِهِ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ (সে কথা আমি কোনও লোককে বলব না)। হয়তো সে কথাটি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিগত এমন কোনও কথা ছিল, যার ব্যাপক প্রচার তাঁর কাম্য ছিল না। অথবা সে কথাটি হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-এর বিশেষ কোনও ফযীলত বিষয়ক। এমনও হতে পারে যে, সে কথাটি ছিল বিশেষ কোনও ব্যক্তি বা সমষ্টি সম্পর্কিত এবং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ব্যাপক প্রচার সমীচীন মনে করছিলেন না। তাই তিনি হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-কে তা প্রকাশ করতে নিষেধ করে দেন। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-ও সে হুকুম যথাযথভাবে পালন করেন। কারও কাছে তিনি তা প্রকাশ করবেন না বলে ব্যক্ত করেছেন এবং তিনি তা-ই করেছেন। ফলে আজও পর্যন্ত জানা যাচ্ছে না সে কথাটি আসলে কী। এর ভেতর আমাদের শিক্ষা রয়েছে। গুরুজন কর্তৃক যে কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয় কিংবা যে কথার প্রকাশ ক্ষতিকর বলে মনে হয়, তা কোনওক্রমেই প্রকাশ করা যাবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. জানান وَكَانَ أَحَبَّ مَا اسْتَتَرَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِحَاجَتِهِ هَدَفٌ أَوْ حَائِشُ نَخْل (নিজ হাজত সমাধাকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দিয়ে নিজেকে আড়াল করা পছন্দ করতেন, তা হতো কোনও উঁচু বস্তু বা খেজুর বাগানের দেওয়াল)। অর্থাৎ তিনি তাঁর প্রাকৃতিক প্রয়োজন উন্মুক্ত কোনও স্থানে সারতেন না। এর জন্য তিনি কোনও আড়াল খুঁজতেন। আর তাঁর পছন্দ ছিল هدف (উঁচু কোনও বস্তু)। যেমন পাথরের বড় চাঁই, টিলা, পাহাড়, বালুর স্তূপ ইত্যাদি। অথবা তাঁর পছন্দ ছিল حَائِش نخل (খেজুর বাগানের দেওয়াল)। উল্লেখ্য, তখনও পর্যন্ত বাড়ির ভেতর হাম্মাম তৈরির প্রচলন হয়নি। লোকে মলমূত্র ত্যাগের জন্য বাড়ির বাইরে উপযুক্ত কোনও জায়গা খুঁজে নিত।
যা হোক, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রয়োজন সারার জন্য জনৈক আনসারী ব্যক্তির খেজুর বাগানের ভেতর প্রবেশ করলেন। বাগানের ভেতর একটি উট ছিল। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-
فَلَمَّا رَأَى رَسُوْلَ اللهِ ﷺ جَرْجَرَ وَذَرَفَتْ عَيْنَاهُ
(উটটি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, অমনি সেটি আওয়াজ করে উঠল এবং তার দু'চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল)। جرجر এর মূল হলো الْجَرْجَرَةُ এর অর্থ গরগর করা, ঘোঁৎ ঘোঁৎ করা। মূলত শব্দটি উটের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। উট কোনও কারণে গলার ভেতর বার বার যে আওয়াজ করে থাকে, তাকেই الْجَرْجَرَةُ বলা হয়। উটটি এভাবে আওয়াজ করে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল আর সেইসঙ্গে তার চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে পড়ছিল। বোঝা যাচ্ছে সেটি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিনতে পেরেছিল। বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা এর সত্যতা মেলে যে, গাছ-পাথর পর্যন্ত তাঁকে চিনত।
যা হোক, উটটির এ অবস্থা দেখে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খুব মায়া লাগল। হযরত আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন-
فَأَتَاهُ النَّبِيُّ ﷺ فَمَسَحَ سَرَاتَهُ - أَيْ: سِنَامَهُ - وَذِفْرَاهُ فَسَكَنَ (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটির কাছে এসে তার কুঁজ ও মাথার পেছনের অংশে হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে উটটি শান্ত হলো)। উটটির প্রতি এ আচরণ ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের গভীর মমতা ও দয়ার প্রকাশ। তাঁর সে মমতার স্পর্শ উটটি ভালোই অনুভব করতে পারল। ফলে সে তার আওয়াজ বন্ধ করে শান্ত হয়ে গেল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটিকে শান্ত করেই ক্ষান্ত হলেন না: তিনি এর মালিককে সতর্ক করারও প্রয়োজন মনে করলেন। তিনি জানতে চাইলেন এর মালিক কে এবং সে কোথায় আছে। মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বার বর্ণনায় আছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আব্দুল্লাহ রাযি.-কে বললেন, দেখো তো এই উটটি কার? আব্দুল্লাহ রাযি. বলেন, আমি মালিকের সন্ধানে বের হয়ে পড়লাম। জানতে পারলাম উটটি জনৈক আনসারী ব্যক্তির। আমি তাকে ডেকে আনলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার এ উটটির খবর কী? সে বলল, কী তার খবর? আল্লাহর কসম, আমি জানি না তার কী হয়েছে। আমরা এটিকে দিয়ে কাজ করিয়েছি এবং এর পিঠে করে পানি টেনেছি। পরে এটি পানি বইতে অক্ষম হয়ে যায়। তাই গত রাতে আমরা পরামর্শ করেছি যে, এটি জবাই করে গোশত বিতরণ করে ফেলব। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এরূপ করো না। বরং এটি আমাকে হিবা করে দাও। কিংবা বললেন, আমার কাছে বিক্রি করো। সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি আপনারই। তিনি সেটির উপর সদাকার আলামত লাগিয়ে দিলেন। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৩১৭৫৩)
আলোচ্য বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারী أَفَلَا تَتَّقِي اللهَ فِي هَذِهِ الْبَهِيمَةِ الَّتِي مَلَكَكَ اللهُ إِيَّاهَا؟ (তুমি কি এ পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর না যে, আল্লাহ তোমাকে এটির মালিক বানিয়েছেন)? এ বাক্যটি 'আল্লাহকে ভয় করো' অপেক্ষা বেশি বলিষ্ঠ ও বেশি হৃদয়গ্রাহী। অর্থাৎ তোমাকে এর মালিক বানানো তোমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ। সে অনুগ্রহের দাবি তুমি তাঁর শোকর আদায় করবে। সে শোকরের একটা বড় দিক তো এই যে, তুমি এটিকে ঠিকভাবে দানাপানি দেবে, ভালোভাবে এর যত্ন করবে এবং সদয়ভাবে এটিকে ব্যবহার করবে। কিন্তু তুমি তো তা করছ না। তুমি এর বিপরীতটাই করছ। আর এভাবে আল্লাহর অবাধ্যতা করছ ও গুনাহগার হচ্ছ। তোমার উচিত আল্লাহকে ভয় করে এরূপ আচরণ থেকে বিরত থাকা। তা করলে তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ বৃদ্ধি পাবে, তাঁর নি'আমত স্থায়ী হবে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মালিককে তার আচরণ সংশোধন করার প্রতি উৎসাহদানের লক্ষ্যে বলছেন- فَإِنَّهُ يَشْكُو إِلَيَّ أَنَّكَ تُجِيعُهُ وَتُدْئِبُهُ (এটি তো আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি একে ক্ষুধার্ত রাখ এবং বেশি কাজ করিয়ে ক্লান্ত করে ফেল)। মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় আছে, এটি অভিযোগ করছে তুমি একে দিয়ে কাজ বেশি করাও, কিন্তু খাবার কম দাও। উটটির পক্ষে এ অভিযোগ করা অসম্ভব কিছু নয়। যে আল্লাহ মানুষকে বাক্শক্তি দিয়েছেন, তিনি চাইলে পশুপাখিকে দিয়েও কথা বলাতে পারেন। অবলা পশুকে দিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে অভিযোগপূর্ণ কথা বলানোটা আল্লাহ তা'আলার কুদরতেরই প্রকাশ। এটা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি মু'জিযা ও অলৌকিকত্বও বটে। তাঁর সঙ্গে উটের পক্ষ হতে মানবসুলভ আচরণের একাধিক ঘটনা হাদীছ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত আছে। যেমন হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-
এক আনসার পরিবারের একটি উট ছিল। সেটি দিয়ে তারা তাদের বাগানে পানির সেচ দিত। একবার এমন হলো যে, উটটি অবাধ্য হয়ে গেল। সেটি আর কাজ করতে রাজি হলো না। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে অভিযোগ জানাল। তারা বলল, আমাদের ফসল ও খেজুরের বাগান শুকিয়ে গেছে।
অথচ উটটিকে দিয়ে আর কাজ করানো যাচ্ছে না। তিনি তাদের সঙ্গে চলে আসলেন এবং তাদের বাগানে প্রবেশ করলেন। উটটি বাগানের এক কোণে অবস্থান করছিল। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটির দিকে এগিয়ে গেলেন। আনসারগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটি কুকুরের মতো কামড়ানো শুরু করে দিয়েছে। আমরা ভয় পাচ্ছি না জানি আপনার উপর হামলা করে বসে। তিনি বললেন, না, সে আমার কোনও ক্ষতি করবে না। ওদিকে উটটি যেই না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, অমনি তাঁর দিকে এগিয়ে আসল এবং একদম সামনে এসে তাঁর সামনে সিজদায় পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উটটির কপালে হাত রাখলেন। ফলে সেটি এমন বাধ্য হয়ে গেল যে, অতটা বাধ্য আর কখনও হয়নি। তিনি উটটিকে নিয়ে কাজে লাগিয়ে দিলেন। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই অবোধ অবলা পশুটি আপনাকে সিজদা করছে। আমরা তো বুঝমান। তাহলে আমাদেরই তো আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে আপনাকে সিজদা করা উচিত? তিনি বললেন, কোনও মানুষের জন্য অপর কোনও মানুষকে সিজদা করা বৈধ নয়। তা যদি বৈধ হতো, তবে আমি নারীকে হুকুম করতাম যেন তার স্বামীকে সিজদা করে। (মুসনাদুল বাযযার: ৬৪৫২)
হযরত জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রাযি. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এক সফর থেকে ফিরছিলাম। পথে বনূ নাজ্জারের একটি বাগান পড়ে। সে বাগানটির ভেতর একটি উট ছিল। বাগানে কেউ ঢুকলেই উটটি তার উপর হামলা করত। বিষয়টা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানানো হলো। তিনি বাগানে প্রবেশ করলেন এবং উটটিকে ডাকলেন। উটটি এসে তাঁর সামনে মাটির উপর মুখ রাখল এবং তাঁর সামনে বসে পড়ল।
তিনি একটি লাগাম আনিয়ে উটটিকে পরিয়ে দিলেন এবং মালিকের হাতে সেটি সমর্পণ করলেন। তারপর তিনি উপস্থিত লোকদের দিকে ফিরে বললেন, আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে যা-কিছু আছে তাদের সকলেই জানে আমি আল্লাহর রাসূল। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ৩১৭১৯; সুনানে দারিমী: ১৮)
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. প্রাকৃতিক প্রয়োজন লোকচক্ষুর আড়ালে সারা উচিত।
খ. বাহনজন্ত শক্তিশালী হলে তাতে আরোহীর পেছনে সহযাত্রী নেওয়া যেতে পারে।
গ. পালিত জন্তুকে দানাপানির কষ্ট দেওয়া জায়েয নয়।
ঘ. কারও গোপন কথা প্রকাশ করতে নেই।
ঙ. জীবজন্তুর কষ্ট দেখলে তা লাঘব করা উচিত।
চ. কেউ জীবজন্তুকে কষ্ট দিলে তাকে সতর্ক করা বাঞ্ছনীয়।
ছ. গবাদি পশুর মালিক হতে পারাটা আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ। এর জন্য শোকর আদায় করা কর্তব্য।
জ. নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মু'জিযা ও অলৌকিকত্ব সত্য। তাতে বিশ্বাস রাখা জরুরি।
১. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.) ২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)