মা'আরিফুল হাদীস

পবিত্রতা অধ্যায়

হাদীস নং: ১৮
পবিত্রতা অধ্যায়
কিয়ামতের দিন উযূর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে জ্যোতি চমকাবে
১৮. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: কিয়ামতের দিন আমার উম্মাতকে আহবান করা হবে, উযূর চিহ্নের দরূন। তাদের চেহারা, হাত ও পা হতে জ্যোতি চমকাবে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঔজ্জ্বল্যকে বাড়াতে চায়, সে যেন তাই করে। (বুখারী ও মুসলিম)
کتاب الطہارت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : « إِنَّ أُمَّتِي يُدْعَوْنَ يَوْمَ القِيَامَةِ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنْ آثَارِ الوُضُوءِ ، فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُطِيلَ غُرَّتَهُ فَلْيَفْعَلْ » (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

১. দুনিয়ায় উযূর প্রভাব কেবল এতটুকু পরিদৃষ্ট হয় যে, চেহারা ও হাত-পা পরিষ্কার হয়ে যায়। অধিকন্তু আধ্যাত্মিক মনন সম্পন্ন নিষ্ঠাবান লোকেরা আত্মিক সজীবতা ও আনন্দ অনুভব করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এ হাদীসে এবং অন্যান্য হাদীসে ইরশাদ করেছেন যে, উযূর বরকতে কিয়ামতের দিন উযূকারীর চেহারায় প্রোজ্জল আভা ও দীপ্তি শোভা পাবে এবং অন্যান্যদের মধ্য থেকে বেছে নেয়ার চিহ্নও হবে। যার উযূ যত উত্তম ও পূর্ণরূপে সম্পন্ন হবে তার জ্যোতিও ততবেশী দীপ্তিময় হবে। তাই তো নবী কারীম ﷺ হাদীসের শেষাংশে বলেছেন: যে পারে সে যেন তার জ্যোতি বৃদ্ধির আপ্রাণ চেষ্টা করে। এর পদ্ধতি হচ্ছে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে উযূর নিয়ম-কানুনের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে উযূ করা।

২.
غُرَّةٌ এর অর্থ চেহারার উজ্জ্বলতা। কোনও কোনও ঘোড়ার কপালে যে সাদা ছাপ থাকে, তাকেও غُرَّةٌ বলা হয়। গবাদি পশুর কপালে এরকম ছাপ থাকলে তাকে। চাঁদকপালে বলা হয়ে থাকে। অন্যান্য পশুর তুলনায় এরূপ পশু বেশি সুন্দর দেখা যায়। তাই এর প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে। ফলে মূল্যও বেশি হয়। ওযূ করার দ্বারা মুসলিম ব্যক্তির চেহারা দুনিয়ায়ও উজ্জ্বল হয়ে যায়। আখিরাতে এ উজ্জ্বলতা অনেক বেশি হবে। আর এভাবে অন্যসব জাতির উপর তারা অধিকতর মর্যাদাবানরূপে পরিদৃষ্ট হবে।

محجلين শব্দটির উৎপত্তি تَحْجِيلٌ থেকে। এর অর্থ হাত-পায়ের উজ্জ্বলতা। ঘোড়ার চার পায়ের শুভ্রতা বোঝানোর জন্যও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বারবার ওযূ করার দ্বারা মুসলিম ব্যক্তির হাত-পা উজ্জ্বল হয়ে যায়। কিয়ামতে সে উজ্জ্বলতা সবার চোখেই ধরা পড়বে। এটা তার মর্যাদার নিদর্শন হবে।

হাদীছটিতে বলা হচ্ছে, কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতকে যখন ডাকা হবে, তখন তাদের চেহারা ও হাত-পা উজ্জ্বল থাকবে। এটা হবে ওযূর প্রভাবে। অর্থাৎ ওযূ যেসকল অঙ্গে করা হয়, কিয়ামতের দিন সে অঙ্গগুলো উজ্জ্বল দেখা যাবে। এ উম্মতের প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ এক মেহেরবানী এই যে, কেবল তাদেরই মধ্যকার ওযূকারীদের চেহারা ও হাত-পা উজ্জ্বল দেখা যাবে। এটা তাদের জন্য ওযূর পুরস্কার। এ পুরস্কার ওযূর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণও বটে। কেননা ওযূ শব্দের অর্থ উজ্জ্বলতা। ওযূ দ্বারা জাহিরী ও বাতেনী মলিনতা দূর হয়। ফলে অঙ্গসমূহ বাহ্যিকভাবেও উজ্জ্বল হয় এবং অভ্যন্তরীণ দিক থেকেও হয় নূরানী। সুতরাং আখিরাতে এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ পুরস্কার তাদের দেওয়া হবে। তাদের ওযূর অঙ্গসমূহ করা হবে সমুজ্জ্বল।

হাদীছটির অন্য অর্থ অনুযায়ী এ উম্মতকে ডাকাই হবে “গুরুন মুহাজ্জালুন” বলে। যেমন বলা হবে, হে গুরুন মুহাজ্জালুন! তোমরা সামনে এসো। অর্থাৎ তাদেরকে উম্মতে মুহাম্মাদী না বলে গুরুন মুহাজ্জালুন বলে ডাকা হবে। এটা তাদের বিশেষ সম্মাননা।

কিয়ামতের মাঠে হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্তকার সমগ্র মানুষ উপস্থিত থাকবে। দুনিয়ায় তারা ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে বিভক্ত ও ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন ইহুদী, নাসারা ইত্যাদি। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত মুসলিম নামে পরিচিত। কিয়ামতের ময়দানে এ সমুদয় মানুষের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ পরিচিত হবে গুরুন মুহাজ্জালুন নামে। অর্থাৎ শুভ্র-সমুজ্জ্বল চেহারা ও শুভ্র-সমুজ্জ্বল হাত-পা বিশিষ্ট জাতি। এটা যেন হবে তাদের প্রতীকচিহ্ন বা লোগো। এর দ্বারা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে আলাদাভাবে চিনতে পারবেন। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীছে আছে যে, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন, তোমরা হলে আমার আসহাব। আর আমার ভাই হলো তারা, যারা এখনও পর্যন্ত আসেনি। তারা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার উম্মতের যারা এখনও আসেনি, আপনি তাদের কীভাবে চিনবেন? তিনি বললেন-

أَرَأَيْتَ لَوْ أَنَّ رَجُلًا لَهُ خَيْلٌ غُرٌّ مُحَجَّلَةٌ بَيْنَ ظَهْرَيْ خَيْلٍ دُهْمٍ بُهْمٍ أَلَا يَعْرِفُ خَيْلَهُ قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ فَإِنَّهُمْ يَأْتُونَ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنَ الْوُضُوءِ وَأَنَا فَرَطُهُمْ عَلَى الْحَوْض

'তুমি কী মনে কর যদি কোনও ব্যক্তির ঘোর কালো এক পাল ঘোড়ার মধ্যে চাঁদকপালে ও সাদা পায়ের একটি ঘোড়া থাকে, সে কি তাও ওই ঘোড়াটি চিনতে পারবে না? তারা বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন তারা এভাবে উপস্থিত হবে যে, তাদের চেহারা ও হাত-পা ওযূর কারণে উজ্জ্বল থাকবে। আমি হাউযে কাউছারে তাদের অপেক্ষায় থাকব। (সহীহ মুসলিম: ২৪৯; মুসনাদে আহমাদ: ৭৯৮১; মুসনাদুল বাযযার: ৮৩২২; মুসনাদে আবূ ইয়া'লা: ৬৫০২; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৭২০৯)

مِنْ آثَارِ الْوُضُوءِ (ওযূর আছরে)। অর্থাৎ তাদের চেহারা ও হাত-পায়ের এ উজ্জ্বলতা হবে ওযূর কারণে। ওযূ যেন এক নূর, এক সমুজ্জ্বল আলো। যে অঙ্গসমূহে এর স্পর্শ লাগবে, তা আলোকিত হয়ে যাবে। দুনিয়ায় দেখা না গেলেও আখিরাতে ঠিকই সকলের সামনে তা চমকাতে থাকবে। চেহারার এ চমক দেখা যাবে সিজদার কারণেও। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-

سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ

'তাদের আলামত তাদের চেহারায় পরিস্ফুট, সিজদার ফলে। (সূরা ফাতহ, আয়াত ২৯)

ওযূ, নামায, সিজদা- এসব পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। ওযূ ছাড়া নামায হয় না। সিজদা নামাযের এক প্রধান অঙ্গ। যারা নামায পড়ে, তারা অবশ্যই ওযূ করে। এসব আমলের কারণে কিয়ামতের দিন তারা সবার সামনে শুভ্র-সমুজ্জ্বলরূপে উপস্থিত থাকবে। ফলে অন্যসব জাতি থেকে তাদেরকে আলাদাভাবে চেনা যাবে।

এবার ভাবুন, মুসলিম হয়েও যারা ওযূ করে না, নামায পড়ে না, কিয়ামতের ময়দানে তারা অন্যদের থেকে কীভাবে আলাদারূপে পরিচিত হবে? কীভাবে তাদের আলাদাভাবে চেনা যাবে? যেই ছাপ দেখে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিনবেন বলে জানিয়েছেন, সেই ছাপ যখন তাদের চেহারায় থাকবে না, তখন হাউযে কাউছারে উপস্থিত হয়ে কীভাবে তারা তাঁর হাতে পানি পান করতে পারবে? এ হাদীছ দ্বারা তাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে সত্যিকারের ওযূকারী ও সত্যিকারের নামাযী বানিয়ে দিন।

فمَنِ استطاعَ منكُم أن يطيلَ غُرَّتَهُ فلْيَفْعلْ (সুতরাং যার পক্ষে নিজ উজ্জ্বলতা বাড়ানো সম্ভব হয়, সে যেন তা করে)। এটা হযরত আবূ হুরায়রা রাযি.-এর কথা। তিনি নিজে এ কথার উপর আমল করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাযি, সম্পর্কেও এরূপ আমল করার কথা বর্ণিত আছে। এর অর্থ হলো, ওযূর ফরয পরিমাণ আদায়ের পর বাড়তি কিছু করা। সম্পূর্ণ চেহারা ধোওয়ার পর কপালের উপর দিক থেকে মাথার কিছু অংশও এবং চোয়াল ও থুতনির নিচে বাড়তি কিছুটা ধোওয়া। কনুই পর্যন্ত হাত ধোওয়ার পর কনুইয়ের উপরও খানিকটা ধুয়ে নেওয়া। এমনিভাবে টাখনু পর্যন্ত পা ধোওয়ার পর টাখনুর উপরও খানিকটা ধোওয়া। এটা মুস্তাহাব।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. ওযূ অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ আমল। তাই ফরয তো বটেই, সুন্নত ও মুস্তাহাবের দিকে লক্ষ রেখেও নিয়মিত সুন্দরভাবে ওযূ করা উচিত।

খ. ওযূর কারণে কিয়ামতে মুসলিম উম্মাহ বিশেষ সম্মান লাভ করবে।
১. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.) ২. ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান