মা'আরিফুল হাদীস

হজ্ব অধ্যায়

হাদীস নং: ১৬৪
হজ্ব অধ্যায়
হজ্ব ফরয হওয়ার বিধানটি কোন্ সালে এসেছে, এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের বিভিন্ন মতের কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং একথাও লিখা হয়েছে যে, প্রবল মত এটাই যে, ৮ম হিজরীতে মক্কায় ইসলামী শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর ৯ম হিজরীতে হজ্ব ফরয হওয়ার বিধান এসেছে। ঐ বছর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে তো হজ্ব পালন করেন নাই; কিন্তু হযরত আবু বকর রাযি.-কে আমীরুল হজ্ব বানিয়ে পাঠালেন এবং তারই নেতৃত্বে ঐ বছর হজ্ব আদায় হল। সেখানে আগামী দিনগুলোর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাও দেওয়া হল, যেগুলোর মধ্যে একটি ঘোষণা এও ছিল যে, ভবিষ্যতে কোন মুশরিক ও কাফের হজ্বে অংশ গ্রহণ করতে পারবে না এবং জাহিলিয়্যাতের নোংরা ও মুশরিকসুলভ কোন কাজের অনুমতি কাউকে দেওয়া হবে না।
সম্ভবত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ঐ বছর হজ্ব না করার একটি বিশেষ হেকমত এও ছিল যে, তিনি চাইতেন যে, তাঁর হজ্বটি যেন এমন আদর্শ ও অনুকরণীয় হজ্ব হয়, যার মধ্যে কোন একজন মানুষও শিরক ও জাহিলিয়্যাতের রীতি-পদ্ধতি দ্বারা হজ্বকে কলুষিত না করে; বরং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেবল নূরই নূর ও কল্যাণই কল্যাণ থাকে এবং তাঁর দাওয়াত, হেদায়াত, শিক্ষা ও সংস্কারজনিত সুপ্রভাবের সঠিক দর্পণ হয়ে থাকে। এভাবে যেন ৯ম হিজরীর হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত হজ্বটি পরবর্তী বছর অনুষ্ঠেয় তাঁর হজ্বের পটভূমি ও এর প্রস্তুতিরই একটি পদক্ষেপ ছিল।

তারপর পরবর্তী বছর- যা তাঁর জীবনের শেষ বছর ছিল- তিনি হজ্বের সংকল্প করলেন। আর যেহেতু তাঁকে এ ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, দুনিয়াতে এখন আর অল্প দিনই তিনি অবস্থান করবেন এবং কাজের সুযোগ পাবেন, তাই তিনি নিজের এ ইচ্ছার (হজ্বের) কথা খুব গুরুত্ব সহকারে প্রচার করলেন। যাতে সর্বাধিক সংখ্যক মুসলমান এই মুবারক সফরে তাঁর সাথে থেকে হজ্বের বিধি-বিধান ও দ্বীনের অন্যান্য মাসায়েল শিখে নিতে পারে এবং হজ্বের সফরের সংসর্গ ও সান্নিধ্যের বিশেষ বরকত হাসিল করে নিতে পারে। ফলে দূর ও নিকটের হাজার হাজার মুসলমান- যারা এ সংবাদ শুনতে পেল এবং তাদের বিশেষ কোন অপারগতাও ছিল না, তারা মদীনা তৈয়্যেবায় এসে হাজির হল। ২৪শে যিলকদ শুক্রবার ছিল। এদিন তিনি জুমু'আর খুতবায় হজ্ব ও হজ্বের সফর সম্পর্কে বিশেষ দিকনির্দেশনা দিলেন এবং পরের দিন ২৫শে যিলকদ ১০ হিজরী শনিবার যুহরের নামাযের পর মদীনা শরীফ থেকে এ বিরাট কাফেলা রওয়ানা হল। আসরের নামায তিনি যুল হুলায়ফায় গিয়ে পড়লেন- যেখানে তিনি প্রথম মনযিল করবেন এবং এখান থেকেই ইহরাম বাঁধবেন। তিনি রাতও এখানেই কাটালেন এবং পরের দিন রোববার যুহরের নামাযের পর নিজে সাহাবায়ে কেরামসহ ইহরাম বাঁধলেন এবং মক্কা শরীফের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। এভাবে ৯ম দিন অর্থাৎ, ৪ঠা যিলহজ্ব তিনি মক্কা শরীফে প্রবেশ করলেন। সফরসঙ্গীদের সংখ্যা পথিমধ্যে আরও বাড়তেই থাকল।

এ সফরে হুযুর (ﷺ)-এর সাথে হজ্ব পালনকারীদের সংখ্যা নিয়ে রেওয়ায়াতে ভিন্নমত রয়েছে। চল্লিশ হাজার থেকে নিয়ে এক লাখ বিশ হাজার ও এক লাখ ত্রিশ হাজারের বর্ণনা বিভিন্ন রেওয়ায়াতে পাওয়া যায়। এ অধমের নিকট এ মতবিরোধটি এমনই, যেমন, বিরাট সমাবেশ ও মেলায় যোগদানকারীদের সংখ্যার ব্যাপারে মানুষের অনুমান আজও বিভিন্ন হয়ে থাকে। তাই যিনি যে সংখ্যা বলেছেন, তার অনুমানের ভিত্তিতেই বলেছেন। একেবারে হিসাব করে ও গণনা করে কেউ এ সংখ্যা বলেননি। এতদসত্ত্বেও এতটুকু কথা সবগুলো বর্ণনায়ই রয়েছে যে, সমাবেশটি সীমা-সংখ্যার বাইরে ছিল, যেদিকেই দৃষ্টি যেত কেবল মানুষই মানুষ চোখে পড়ত।

এ হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিভিন্ন স্থানে ভাষণ দিয়েছেন এবং ঠিক এভাবে; বরং পরিষ্কার এ কথা বলে দিয়ে ভাষণ দিয়েছেন যে, এখন আমার প্রতিশ্রুত সময় ঘনিয়ে এসেছে, আর আমার নিকট থেকে তোমাদের দ্বীনি শিক্ষা ও দীক্ষা গ্রহণের সুযোগ এর পর আর মিলবে না। যাহোক, এ সম্পূর্ণ সফরে তিনি শিক্ষা-দীক্ষা, উম্মতের পথ নির্দেশ ও উপদেশের প্রতি খুবই যত্নবান ছিলেন।

বিদায় হজ্ব সম্পর্কে যেসব রেওয়ায়াত হাদীসগ্রন্থসমূহে রয়েছে, (যেগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি এখানেও লিখা হবে।) এগুলোর দ্বারা হজ্বের বিধি-বিধান ও এর বিস্তারিত নিয়ম-নীতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া ছাড়া দ্বীন ও শরী‘আতের অন্যান্য অধ্যায় ও শাখা-প্রশাখাসমূহের ব্যাপারেও উম্মত অনেক গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক বিষয় জানতে পারে। বাস্তব কথা এই যে, প্রায় এক মাসের এ সফরে দ্বীনের তালীম, তাবলীগ ও হেদায়াতের এত কাজ হয়েছে এবং এমন ব্যাপক ও বৃহত্তর পরিসরে হয়েছে যে, এটা ছাড়া অনেক বছরেও তা হওয়া সম্ভব ছিল না। এ থেকেই উন্মতের কোন কোন ভাগ্যবান মনীষী এ কথা বুঝেছেন যে, দ্বীন ও দ্বীনের বরকত ও হেদায়াত লাভের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হচ্ছে দ্বীনি সফরে নেক লোকদের সান্নিধ্য ও সাহচর্য।

এ ভূমিকার পর এবার বিদায় হজ্ব সম্পর্কে হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি.-এর হাদীসটি মুসলিম শরীফ থেকে উদ্ধৃত করা হচ্ছে।
১৬৪. জাফর ইবনে মুহাম্মদ (যিনি হযরত হুসাইন ইবনে আলী রাযিঃ-এর প্রপৌত্র ও ইমাম জাফর সাদিক নামে প্রসিদ্ধ।) নিজের পিতা মুহাম্মদ ইবনে আলী (ইমাম বাকের নামে যিনি সমধিক পরিচিত।) থেকে বর্ণনা করেন যে, আমরা কয়েকজন সাথী হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাযি.-এর খেদমতে হাজির হলাম। তিনি আমাদেরকে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন (এবং সবাই নিজেদের পরিচয় পেশ করল।) শেষে যখন আমার পালা আসল, তখন আমি বললাম, আমি হলাম মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন। (তিনি সে সময় খুব বুড়ো হয়ে গিয়েছিলেন এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আদর করে) তাঁর হাতটি আমার মাথার উপর রাখলেন। তারপর আমার জামার উপরের বোতামটি খুললেন এবং তারপর নিচের বোতামটিও খুলে ফেললেন। তারপর নিজের হাতটি (জামার ভিতরে নিয়ে) আমার বুকের মাঝে রাখলেন। আমি তখন যুবক ছিলাম। তিনি (আমার আগমনে আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে) বললেন, স্বাগতম! হে আমার ভাতিজা! তুমি আমার কাছে যা জিজ্ঞাসা করতে চাও নিঃসংকোচে জিজ্ঞাসা করতে পার। (ইমাম বাকের বলেন,) ইতিমধ্যে নামাযের সময় হয়ে গেল, হযরত জাবের একটি ছোট চাদর গায়ে দিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। চাদরটি এমন ছোট ছিল যে, তিনি যখন এটা কাঁদের উপর রাখতেন, তখন এর দু'প্রান্ত উপরে উঠে তার দিকে এসে যেত। অথচ তার বড় চাদরটি তার নিকটেই আলনায় লটকানো ছিল। (কিন্তু তিনি এটা গায়ে দিয়ে নামায পড়া জরুরী মনে করলেন না; বরং ঐ ছোট চাদরটি গায়ে দিয়েই নামায পড়িয়ে দিলেন।) নামায শেষ করার পর আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বিদায় হজ্ব সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত বলুন। তিনি হাতের আঙ্গুল দ্বারা ৯ সংখ্যার দিকে ইশারা করে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মদীনায় এসে ৯ বছর পর্যন্ত কোন হজ্ব পালন করেন নি। তার পর দশম হিজরীতে তিনি ঘোষণা করলেন যে, এ বছর তিনি হজ্ব করবেন। এ ঘোষণা শুনে মদীনায় প্রচুর লোকের সমাগম হল। তাদের সবারই আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সাথী হয়ে তাঁকে অনুসরণ করবে এবং তাঁর কাজের মতই কাজ করে যাবে। হযরত জাবের রাযি. বলেন, আমরা তাঁর সাথে রওয়ানা হলাম এবং যুল হুলায়ফায় এসে পৌঁছলাম। এখানে এসে আসমা বিনতে উমাইস (যিনি হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের স্ত্রী ছিলেন এবং এ কাফেলায় শরীক ছিলেন।) মুহাম্মদ ইবনে আবূ বকরকে প্রসব করলেন। আসমা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এখন আমি কি করব? তিনি বললেন: এ অবস্থায়ই ইহরামের জন্য গোসল করে নাও এবং এ অবস্থায় মহিলারা যেভাবে কাপড়ের লেঙ্গুট পরে থাকে, তুমিও তাই করে নাও, তারপর ইহরাম বেঁধে নাও। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুল হুলায়ফার মসজিদে নামায পড়লেন এরপর নিজের উটনী কাসওয়ায় সওয়ার হলেন। উটনী যখন বায়দা নামক স্থানে পৌঁছল, তখন আমি ঐ উঁচু ভূমি থেকে চেয়ে দেখলাম যে, তাঁর ডানে, বায়ে, সামনে ও পেছনে আমার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত আরোহী ও পদচারী লোকে লোকারণ্য হয়ে আছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদের মাঝে ছিলেন এবং তাঁর উপর কুরআন নাযিল হত, আর তিনিই এর প্রকৃত মর্ম ও দাবী জনাতেন। আর আমাদের রীতি এই ছিল যে, আমরা তাঁকে যা করতে দেখতাম, আমরা নিজেরাও তাই করতাম। (তাঁর উটনী যখন বায়দায় পৌঁছল, তখন) তিনি তওহীদ সম্বলিত এ তালবিয়া পাঠ করলেন: لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ আর তাঁর সঙ্গী সাহাবীগণ যে তালবিয়া পড়ছিলেন (যার মধ্যে কিছু বাড়তি শব্দমালার সংযোজনও ছিল,) তিনি এর কোন প্রতিবাদ করেন নাই; বরং নিজে নিজের তালবিয়া পাঠ করতে থাকলেন, (মর্ম এই যে, হুযুর (ﷺ)-এর কোন কোন সাহাবী তালবিয়ার মধ্যে আল্লাহর মহিমা ও সম্মানসূচক কিছু শব্দমালা সংযোজন করতেন, আর যেহেতু এর অবকাশ রয়েছে। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে এ কাজ থেকে নিষেধ করেননি; কিন্তু তিনি নিজের তালবিয়ার মধ্যে কোন হ্রাস-বৃদ্ধি করেন নি।)

হযরত জাবের রাযি. বলেন, এ সফরে আমাদের নিয়ত (মূলত) কেবল হজ্বেরই ছিল, উমরাকে আমরা (সফরের উদ্দেশ্য হিসাবে) জানতামই না। অবশেষে আমরা যখন তাঁর সাথে বায়তুল্লাহ শরীফ পৌঁছে গেলাম, তখন তিনি সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলেন। (অর্থাৎ, নিয়ম অনুযায়ী এর উপর হাত রেখে চুমু দিলেন এবং তারপর তওয়াফ শুরু করলেন।) এর তিন চত্তরে তিনি রমল করলেন (অর্থাৎ, জোর কদমে চললেন,) আর বাকী চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে চললেন। তারপর (তাওয়াফের সাত চক্কর পূর্ণ করে) তিনি মাকামে ইব্‌রাহীমের দিকে অগ্রসর হলেন এবং এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: وَاتَّخِذُوۡا مِنۡ مَّقَامِ اِبۡرٰہٖمَ مُصَلًّی মাকামে ইবরাহীমকে তোমরা নামাযের স্থান বানাও। তারপর তিনি এভাবে দাঁড়ালেন যে, মাকামে ইব্‌রাহীম তাঁর ও বায়তুল্লাহর মাঝে ছিল এবং তিনি (তাওয়াফ পরবর্তী দু'রাকআত) নামায আদায় করলেন।
হাদীসের বর্ণনাকারী ইমাম জাফর সাদিক বলেন, আমার পিতা বলতেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এ দু'রাকাআত নামাযে সূরা এখলাছ ও সূরা কাফিরুন পাঠ করলেন।
তারপর তিনি হাজরে আসওয়াদের কাছে আসলেন এবং এতে চুম্বন করলেন। তারপর একটি দরওয়াজা দিয়ে (সায়ী করার জন্য) সাফা পর্বতের দিকে গেলেন। তিনি যখন সাফা পর্বতের একেবারে নিকটে পৌঁছলেন, তখন এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: اِنَّ الصَّفَا وَالۡمَرۡوَۃَ مِنۡ شَعَآئِرِ اللّٰہِ "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্গত।") তারপর বললেন: আমি এই সাফা থেকেই সায়ী শুরু করছি, যার উল্লেখ আল্লাহ্ তা'আলা প্রথমে করেছেন। তারপর তিনি প্রথমে সাফার কাছে আসলেন এবং এর এতটুকু উপরে উঠলেন যে, বায়তুল্লাহ্ তিনি দেখতে পেলেন। এ সময় তিনি কেবলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর তওহীদ ও মহিমা ঘোষণা করলেন। তিনি বলেন: «لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ» (আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব ও শাসন তাঁরই এবং সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য, তিনি সর্বশক্তিমান। আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই, তিনি অদ্বিতীয়। তিনি (মক্কা ও সারা আরব ভূখণ্ডে শাসন ক্ষমতা দান ও নিজের দ্বীনকে বিজয়ী করার) প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছেন, নিজের বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং একাই সম্মিলিত শক্তিকে পরাভূত করেছেন।) এ বাক্যগুলোই তিনি তিনবার উচ্চারণ করলেন এবং এগুলোর মাঝখানে দু‘আ করলেন। তারপর সাফা থেকে অবতরণ করে দ্রুত মারওয়া অভিমুখে হেঁটে চললেন। যখন তাঁর পা মুবারক উপত্যকা সমতলে গিয়ে ঠেকল, তখন তিনি কিছুটা দৌড়ে অগ্রসর হলেন। তারপর যখন সমতল স্থান থেকে উপরে এসে গেলেন, তখন নিজের স্বাভাবিক গতিতে চলতে লাগলেন এবং এভাবে মারওয়া পর্বতে এসে গেলেন। এখানে তিনি সেরূপই করলেন, যেরূপ সাফায় করেছিলেন। এভাবে তিনি যখন শেষ চত্তর পূর্ণ করে মারওয়ায় পৌছলেন, তখন মারওয়ার উপর দাঁড়িয়ে সফরসঙ্গী সাহাবীদেরকে সম্বোধন করলেন, আর তখন সফর সঙ্গীরা ছিল নীচে। তিনি বললেন: আমি যদি আমার ব্যাপারে ঐ বিষয়টি আগে বুঝতে পারতাম, যা পরে বুঝেছি, তাহলে কুরবানীর পশু মদীনা থেকে আমার সাথে নিয়ে আসতাম না এবং এ তাওয়াফ ও সায়ীকে আমি উমরার রূপ দান করতাম। সুতরাং তোমাদের যার সাথে কুরবানীর পশু নেই সে যেন ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যায় এবং এটাকে উমরা বানিয়ে নেয়। এ কথা শুনে সুরাকা ইবনে মালেক ইবনে জুশাম রাযি. নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এটা কি কেবল আমাদের এ বছরের জন্য, না চিরকালের জন্য। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তখন আপন হাতের অঙ্গুলীসমূহ একটি আরেকটির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন: دخلت العمرة في الحج لا بل لأبد أبد উমরা কেবল হজ্বের মধ্যে প্রবেশই করল না; বরং তা চিরকালের জন্য।

হযরত আলী রাযি. (যিনি যাকাত আদায় ইত্যাদির জন্য ইয়ামান গিয়েছিলেন।) ইয়ামান থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কুরবানীর জন্য আরও বাড়তি কিছু পশু নিয়ে মক্কায় আসলেন। তিনি এসে তাঁর স্ত্রী ফাতেমাকে দেখলেন যে, তিনি ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গিয়েছেন, রঙ্গীন কাপড় পরিধান করে নিয়েছেন এবং সুরমাও ব্যবহার করে ফেলেছেন। তিনি তার এ কাজকে খুব ভুল মনে করলেন এবং অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। (আবূ দাউদ শরীফের বর্ণনায় রয়েছে যে, হযরত আলী রাযি. তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাকে এমন করতে কে বলেছে ?) হযরত ফাতেমা রাযি. বললেন, আমাকে আব্বাজান (রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এইরূপ করতে বলেছেন। (তাই আমি তাঁর হুকুম পালন করেছি।) তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হযরত আলী রাযি. কে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি যখন তালবিয়া পড়ে ইহরাম বেঁধেছিলে তখন কি বলেছিলে? (অর্থাৎ, ইফরাদের নিয়মে শুধু হজ্বের নিয়ত করেছিলে, না তামাত্তুর নিয়মে কেবল উমরার নিয়ত করেছিলে, না কেরানের নিয়মে এক সাথে উভয়টির নিয়ত করেছিলে?) তিনি উত্তর দিলেন, আমি এভাবে নিয়ত করেছিলাম: اللهُمَّ إِنِّي أُهِلُّ بِمَا أَهَلَّ بِهِ رَسُولُكَ (হে আল্লাহ! আমি ঐ জিনিসের ইহরাম বাঁধছি, যে জিনিসের ইহরাম বেঁধেছেন তোমার রাসূল।) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, আমি যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছি, (আর এ কারণে হজ্বের আগে আমি ইহরাম খুলতে পারব না, আর তুমি আমার মতই ইহরামের নিয়ত করেছ,) তাই তুমিও আমার মতই ইহরাম অবস্থায় থাক। হযরত জাবের বলেন, হযরত আলী রাযি. ইয়ামান থেকে কুরবানীর যেসব পশু নিয়ে এসেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের সাথে (মদীনা থেকে) যা নিয়ে এসেছিলেন, এগুলোর মোট সংখ্যা ছিল একশ। (কোন কোন রেওয়ায়াত দ্বারা জানা যায় যে, ৬৩টি উট হুযুর (ﷺ) নিজের সাথে এনেছিলেন, আর ৩৭টি হযরত আলী রাযি. ইয়ামান থেকে এনেছিলেন। হযরত জাবের বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নির্দেশমতে ঐসকল সাহাবায়ে কেরাম- যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেননি, তারা সবাই (সাফা-মারওয়ার সায়ী করে এবং মাথার চুল কেটে হালাল হয়ে গেলেন।) কেবল রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং ঐসব সাহাবীগণ ইহরাম অবস্থায় থেকে গেলেন, যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন।

তারপর যখন তারবিয়ার দিন (৮ই যিলহজ্ব) আসল, তখন সবাই মিনার দিকে রওয়ানা হয়ে গেল। (আর যারা উমরা করে হালাল হয়ে গিয়েছিল, তারা হজ্বের ইহরাম বাঁধল। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) নিজের উটনীর উপর সওয়ার হয়ে মিনায় পৌঁছলেন। সেখানে গিয়ে তিনি (এবং সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে খাইফে) যুহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর এই পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করলেন। ফজরের নামাযের পর আরও কিছু সময় তিনি মিনায় অবস্থান করলেন এবং এখানেই সূর্যোদয় হয়ে গেল। এ সময় তিনি (আরাফার) নামিরায় তাঁর জন্য একটি পশমের তাবু খাটানোর নির্দেশ দিলেন এবং তিনি আরাফার দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন, কুরাইশদের ধারণা ছিল এবং এ ব্যাপারে তারা নিশ্চিত ছিল যে, তিনি মাশ'আরুল হারামের কাছে অবস্থান করবেন, যেমন, জাহিলিয়্যাত যুগে কুরাইশরা এমনই করত। (কিন্তু তিনি এমন করলেন না); বরং মাশ'আরুল হারামের সীমানা অতিক্রম করে আরাফায় পৌঁছে গেলেন এবং দেখলেন যে, নির্দেশমত নামিরায় তাঁর জন্য তাবু খাটানো হয়ে গিয়েছে। অতএব, তিনি সেখানে অবতরণ করলেন।

অবশেষে যখন সূর্য ঢলে গেল, তখন তিনি নিজের উটনী কাসওয়ার উপর হাওদা স্থাপনের নির্দেশ দিলেন এবং নির্দেশমত তা করা হল। তিনি এর উপর সওয়ার হয়ে ওয়াদীয়ে উরনার মাঝে আসলেন এবং উটনীর পিঠে বসা অবস্থায়ই লোকদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিলেন এবং বললেন: "তোমাদের একের জান-মাল অন্যের উপর হারাম। (অর্থাৎ, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা ও অবৈধভাবে কারও সম্পদ গ্রাস করা তোমাদের জন্য সব সময়ই হারাম।) ঠিক সেভাবে, যেভাবে আজ এ আরাফার দিনে, যিলহজ্বের এ মুবারক মাসে ও তোমাদের এ পবিত্র নগরী মক্কায় (তোমরা অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা ও তার সম্পদ গ্রাস করাকে হারাম মনে করে থাক)। শুনে রাখ, মূর্খতার যুগের সকল অপকর্ম আমার পায়ের নীচে দাফন করে দিলাম।
(আমি এগুলোর সমাপ্তি ও রহিতকরণের ঘোষণা দিচ্ছি।) জাহিলিয়্যাত যুগের রক্তের দাবীও রহিত করা হল। (অর্থাৎ, জাহিল্যিায়ত যুগের কোন রক্তের দাবী আর কোন মুসলমান করবে না।) আর সর্বপ্রথম আমি আমাদের একটি রক্তের দাবী প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। সেটা হচ্ছে রবী'আ ইবনুল হারেছের পুত্রের রক্তের দাবী। সে বনূ সা'দ গোত্রে দুগ্ধপান অবস্থায় ছিল, তাকে হুযাইল গোত্রের লোকেরা হত্যা করে ফেলেছিল। (হুযাইল গোত্র থেকে এ রক্তের বদলা নেওয়া বাকী ছিল। কিন্তু আমি আমার গোত্রের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দিচ্ছি যে, এখন এ ব্যাপার শেষ, কোন বদলা নেওয়া হবে না।) জাহিলিয়্যাত যুগের সকল সুদের দাবী রহিত করা হল। (এখন আর কোন মুসলমান কারও কাছে নিজের সুদের দাবী করতে পারবে না।) আর এ ক্ষেত্রেও আমি সর্বপ্রথম আমার খান্দানের সুদের দাবী থেকে আমার চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালেবের সুদের দাবী রহিত ঘোষণা করছি। তার সকল সুদের দাবী আজ শেষ করে দেওয়া হল। তোমরা নারীদের অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কেননা, তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসাবে গ্রহণ করেছ এবং তাদের সাথে দৈহিক সম্পর্কের বিষয়টি আল্লাহর বিধানে হালাল করে নিয়েছ। তাদের উপর তোমাদের বিশেষ হক হচ্ছে এই যে, তারা যেন তোমাদের অন্দর মহলে এমন কাউকে যেতে না দেয়, যার আগমন তোমরা অপছন্দ কর। কিন্তু তারা যদি এমন করে ফেলে, তাহলে তোমরা (তাদেরকে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার জন্য) কিছুটা হালকা শাস্তি দিতে পার। আর তোমাদের উপর তাদের বিশেষ অধিকার ও দাবী হচ্ছে এই যে, তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে ও সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের অন্ন ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করে দিবে। আমি তোমাদের কাছে এমন হেদায়াতের উপকরণ রেখে যাচ্ছি যে, এটা শক্তভাবে ধরে থাকলে তোমরা আমার পর কখনও বিপথগামী হবে না। আর সেটা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে (যে, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পয়গাম ও তাঁর বিধান পৌঁছে দিয়েছি কি-না।) তাই বল, তোমরা সেখানে কি বলবে? উপস্থিত সবাই বলল, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং কিয়ামতের দিনও সাক্ষ্য দিব যে, আপনি আল্লাহ্ তা'আলার পয়গাম আমাদেরকে পৌঁছে দিয়েছেন, আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং উম্মতের কল্যাণ কামনা করেছেন। এরপর তিনি নিজের শাহাদত অঙ্গুলী আসমানের দিকে উঠিয়ে এবং উপস্থিত লোকদের দিকে এর দ্বারা ইশারা করে তিনবার বললেন, اللَّهُمَّ اشْهَدْ اللَّهُمَّ اشْهَد اللَّهُمَّ اشْهَدْ অর্থাৎ, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক যে, আমি তোমার পয়গাম তোমার বান্দাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছি, তোমার এ বান্দারা একথা স্বীকার করছে। তারপর বিলাল রাযি. আযান দিলেন, তারপর একামত বললেন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যুহরের নামায পড়ালেন। তারপর বিলাল একামত বললেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) আসরের নামায পড়ালেন।

তারপর তিনি (যুহর ও আসরের নামায এক সাথে আদায় করে) নিজের উটনীর উপর সওয়ার হয়ে আরাফার ময়দানের ওকূফস্থলে আসলেন। এখানে তিনি নিজের উটনীর রুখ ঐদিকে করে দিলেন, যে দিকে পাথরের বিরাট বিরাট প্রান্তর রয়েছে, আর পদচারী জনতাকে তিনি নিজের সামনে করে নিলেন এবং নিজে কেবলামুখী হয়ে গেলেন এবং সেখানে দাঁড়িয়ে থাকলেন- যে পর্যন্ত না সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসল এবং (সন্ধ্যার শেষ সময়ে আকাশ যে পিতবর্ণ ধারণ করে, ঐ) পিতাভ বর্ণও শেষ হয়ে গেল। অবশেষে সূর্য গোলক সম্পূর্ণ নীচে চলে গেলে তিনি (আরাফা থেকে মুযদালিফার উদ্দেশ্যে) রওয়ানা হলেন এবং উসামা ইবনে যায়েদকে নিজের উটনীর পেছনে বসালেন। এভাবে তিনি মুযদালিফায় পৌঁছলেন। এখানে পৌঁছে তিনি মাগরিব ও ইশার নামায একসাথে এক আযান ও দুই একামতে পড়লেন। (অর্থাৎ, আযান একবারই দেওয়া হল; কিন্তু একামত মাগরিবের জন্য পৃথক দেওয়া হল এবং ইশার জন্যও পৃথক দেওয়া হল।) আর এ দু'নামাযের মাঝে তিনি কোন সুন্নত ও নফল পড়লেন না। তারপর তিনি শুয়ে গেলেন এবং সুবহে সাদিক পর্যন্ত শুয়েই থাকলেন। সুবহে সাদিক হতেই তিনি আযান ও একামতের সাথে ফজরের নামায আদায় করলেন। তারপর মাশ'আরুল হারামের কাছে আসলেন। (অধিক সমর্থিত মত অনুযায়ী এটা একটা টিলা ছিল-মুযদালিফার সীমার মধ্যে। এখনও এ অবস্থাই রয়েছে এবং সেখানে চিহ্ন হিসাবে একটি ইমারত তৈরী করে দেওয়া হয়েছে।) এখানে এসে তিনি কেবলা অভিমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্ র কাছে দু‘আ করলেন, তাঁর মহিমা ঘোষণা করলেন, কালেমায়ে তাওহীদ পড়লেন এবং তাঁর একত্ববাদ ঘোষণা করলেন। তিনি আকাশ খুব ফর্সা না হওয়া পর্যন্ত এভাবে দাঁড়িয়ে এরূপ করতে থাকলেন। তারপর সূর্যোদয়ের সামান্য পূর্বে তিনি মিনার উদ্দেশ্যে সেখান থেকে রওয়ানা দিলেন এবং ফযল ইবনে আব্বাসকে নিজের সওয়ারীর পেছনে বসিয়ে নিলেন। এভাবে তিনি যখন "বতনে মুহাস্সারে" পৌঁছলেন, তখন নিজের উটনীর চলার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিলেন। তারপর এখান থেকে বের হয়ে তিনি ঐ মাঝের পথ ধরলেন, যা বড় জামরার নিকট গিয়ে পৌঁছে। তারপর ঐ জামরার নিকট পৌছে যা গাছের সন্নিকটে সাতটি কংকর মারলেন এবং প্রতিটি কংকর মারার সময় 'আল্লাহু আকবার' বললেন। কংকরগুলো ছিল মটর দানার মত। আর তিনি এগুলো নিক্ষেপ করেছিলেন বনে ওয়াদী (অর্থাৎ, জামরার নিকটবর্তী নীচু ভূমি) থেকে। কংকর মারা শেষ করে তিনি কুরবানীস্থলে আসলেন এবং নিজ হাতে তেষট্রিটি উট কুরবানী করলেন। বাকীগুলো হযরত আলীর হাওয়ালা করলেন এবং এগুলো হযরত আলীই কুরবানী করলেন। তিনি নিজের কুরবানীর পশুতে হযরত আলীকেও শরীক রাখলেন। তারপর নির্দেশ দিলেন, যেন প্রতিটি কুরবানীর পশু থেকে এক একটি টুকরা নেওয়া হয় এবং একত্রে পাক করা হয়। সেমতে একটি বড় ডেকে এটা রান্না করা হল এবং রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) ও হযরত আলী এগুলোর গোশত আহার করলেন এবং শুরবাও পান করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজের উটনীর উপর সওয়ার হয়ে তাওয়াফে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহর দিকে রওয়ানা করলেন এবং যুহরের নামায মক্কায় গিয়ে পড়লেন। নামায শেষে তিনি (আপন গোত্র) বনী আব্দুল মুত্তালিবের কাছে পৌঁছলেন, যারা যমযমের পানি উঠিয়ে লোকদেরকে পান করাচ্ছিল। তিনি তাদেরকে বললেন, হে বনী আব্দুল মুত্তালিব! তোমরা পানি টান, আমার যদি এ আশংকা না হত যে, অন্য লোকেরা তোমাদের উপর প্রবল হয়ে তোমাদের এ খেদমত ছিনিয়ে নিবে, তাহলে আমিও তোমাদের সাথে পানি টানতাম। এ সময় তারা তাঁকে এক বালতি পানি দিল, আর তিনি সেখান থেকে কিছু পান করে নিলেন। -মুসলিম
کتاب الحج
عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : دَخَلْنَا عَلَى جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ ، فَسَأَلَ عَنِ الْقَوْمِ حَتَّى انْتَهَى إِلَيَّ ، فَقُلْتُ : أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَلِيِّ بْنِ حُسَيْنٍ ، فَأَهْوَى بِيَدِهِ إِلَى رَأْسِي فَنَزَعَ زِرِّي الْأَعْلَى ، ثُمَّ نَزَعَ زِرِّي الْأَسْفَلَ ، ثُمَّ وَضَعَ كَفَّهُ بَيْنَ ثَدْيَيَّ وَأَنَا يَوْمَئِذٍ غُلَامٌ شَابٌّ ، فَقَالَ : مَرْحَبًا بِكَ ، يَا ابْنَ أَخِي ، سَلْ عَمَّا شِئْتَ ، فَسَأَلْتُهُ ، وَهُوَ أَعْمَى ، وَحَضَرَ وَقْتُ الصَّلَاةِ ، فَقَامَ فِي نِسَاجَةٍ مُلْتَحِفًا بِهَا ، كُلَّمَا وَضَعَهَا عَلَى مَنْكِبَيْهِ رَجَعَ طَرَفَاهَا إِلَيْهِ مِنْ صِغَرِهَا ، وَرِدَاؤُهُ عَلَى جَنْبِهِ ، عَلَى الْمِشْجَبِ ، فَصَلَّى بِنَا ، فَقُلْتُ : أَخْبِرْنِي عَنْ حَجَّةِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَقَالَ : بِيَدِهِ فَعَقَدَ تِسْعًا ، فَقَالَ : إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكَثَ تِسْعَ سِنِينَ لَمْ يَحُجَّ ، ثُمَّ أَذَّنَ فِي النَّاسِ فِي الْعَاشِرَةِ ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَاجٌّ ، فَقَدِمَ الْمَدِينَةَ بَشَرٌ كَثِيرٌ ، كُلُّهُمْ يَلْتَمِسُ أَنْ يَأْتَمَّ بِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، وَيَعْمَلَ مِثْلَ عَمَلِهِ ، فَخَرَجْنَا مَعَهُ ، حَتَّى أَتَيْنَا ذَا الْحُلَيْفَةِ ، فَوَلَدَتْ أَسْمَاءُ بِنْتُ عُمَيْسٍ مُحَمَّدَ بْنَ أَبِي بَكْرٍ ، فَأَرْسَلَتْ إِلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : كَيْفَ أَصْنَعُ؟ قَالَ : « اغْتَسِلِي ، وَاسْتَثْفِرِي بِثَوْبٍ وَأَحْرِمِي » فَصَلَّى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَسْجِدِ ، ثُمَّ رَكِبَ الْقَصْوَاءَ ، حَتَّى إِذَا اسْتَوَتْ بِهِ نَاقَتُهُ عَلَى الْبَيْدَاءِ ، نَظَرْتُ إِلَى مَدِّ بَصَرِي بَيْنَ يَدَيْهِ ، مِنْ رَاكِبٍ وَمَاشٍ ، وَعَنْ يَمِينِهِ مِثْلَ ذَلِكَ ، وَعَنْ يَسَارِهِ مِثْلَ ذَلِكَ ، وَمِنْ خَلْفِهِ مِثْلَ ذَلِكَ ، وَرَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَ أَظْهُرِنَا ، وَعَلَيْهِ يَنْزِلُ الْقُرْآنُ ، وَهُوَ يَعْرِفُ تَأْوِيلَهُ ، وَمَا عَمِلَ مِنْ شَيْءٍ عَمِلْنَا بِهِ ، فَأَهَلَّ بِالتَّوْحِيدِ « لَبَّيْكَ اللهُمَّ ، لَبَّيْكَ ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ ، وَالْمُلْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ » وَأَهَلَّ النَّاسُ بِهَذَا الَّذِي يُهِلُّونَ بِهِ ، فَلَمْ يَرُدَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ شَيْئًا مِنْهُ ، وَلَزِمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَلْبِيَتَهُ.

قَالَ جَابِرٌ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ : لَسْنَا نَنْوِي إِلَّا الْحَجَّ ، لَسْنَا نَعْرِفُ الْعُمْرَةَ ، حَتَّى إِذَا أَتَيْنَا الْبَيْتَ مَعَهُ ، اسْتَلَمَ الرُّكْنَ فَرَمَلَ ثَلَاثًا وَمَشَى أَرْبَعًا ، ثُمَّ تَقَدَّمَ إِلَى مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ فَقَرَأَ : {وَاتَّخِذُوا مِنْ مَقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى} فَجَعَلَ الْمَقَامَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْبَيْتِ ، فَكَانَ أَبِي يَقُولُ وَلَا أَعْلَمُهُ ذَكَرَهُ إِلَّا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقْرَأُ فِي الرَّكْعَتَيْنِ قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ وَقُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ ، ثُمَّ رَجَعَ إِلَى الرُّكْنِ فَاسْتَلَمَهُ ، ثُمَّ خَرَجَ مِنَ الْبَابِ إِلَى الصَّفَا ، فَلَمَّا دَنَا مِنَ الصَّفَا قَرَأَ : {إِنَّ الصَّفَا والْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللهِ} « أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللهُ بِهِ » فَبَدَأَ بِالصَّفَا ، فَرَقِيَ عَلَيْهِ ، حَتَّى رَأَى الْبَيْتَ فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ ، فَوَحَّدَ اللهَ وَكَبَّرَهُ ، وَقَالَ : « لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ ، أَنْجَزَ وَعْدَهُ ، وَنَصَرَ عَبْدَهُ ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ » ثُمَّ دَعَا بَيْنَ ذَلِكَ ، قَالَ : مِثْلَ هَذَا ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ، ثُمَّ نَزَلَ إِلَى الْمَرْوَةِ ، فَفَعَلَ عَلَى الْمَرْوَةِ كَمَا فَعَلَ عَلَى الصَّفَا ، حَتَّى إِذَا كَانَ آخِرُ طَوَافِهِ عَلَى الْمَرْوَةِ ، نَادَى وَهُوَ عَلَى الْمَرْوَةِ وَالنَّاسُ تَحْتَهُ فَقَالَ : « لَوْ أَنِّي اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِي مَا اسْتَدْبَرْتُ لَمْ أَسُقِ الْهَدْيَ ، وَجَعَلْتُهَا عُمْرَةً ، فَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ لَيْسَ مَعَهُ هَدْيٌ فَلْيَحِلَّ ، وَلْيَجْعَلْهَا عُمْرَةً » ، فَقَامَ سُرَاقَةُ بْنُ مَالِكِ بْنِ جُعْشُمٍ ، فَقَالَ : يَا رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، أَلِعَامِنَا هَذَا أَمْ لِأَبَدٍ؟ فَشَبَّكَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَصَابِعَهُ وَاحِدَةً فِي الْأُخْرَى ، وَقَالَ : « دَخَلَتِ الْعُمْرَةُ فِي الْحَجِّ » مَرَّتَيْنِ « لَا بَلْ لِأَبَدِ أَبَدٍ »

وَقَدِمَ عَلِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ بِبُدْنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَوَجَدَ فَاطِمَةَ مِمَّنْ حَلَّ ، وَلَبِسَتْ ثِيَابًا صَبِيغًا ، وَاكْتَحَلَتْ ، فَأَنْكَرَ ذَلِكَ عَلَيْهَا ، فَقَالَتْ : إِنَّ أَبِي أَمَرَنِي بِهَذَا ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِهَذَا مَاذَا قُلْتَ حِينَ فَرَضْتَ الْحَجَّ؟ » قَالَ قُلْتُ : اللهُمَّ ، إِنِّي أُهِلُّ بِمَا أَهَلَّ بِهِ رَسُولُكَ ، قَالَ : « فَإِنَّ مَعِيَ الْهَدْيَ فَلَا تَحِلُّ » قَالَ : فَكَانَ جَمَاعَةُ الْهَدْيِ الَّذِي قَدِمَ بِهِ عَلِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ وَالَّذِي أَتَى بِهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِائَةً ، قَالَ : فَحَلَّ النَّاسُ كُلُّهُمْ وَقَصَّرُوا ، إِلَّا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَمَنْ كَانَ مَعَهُ هَدْيٌ،

فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ التَّرْوِيَةِ تَوَجَّهُوا إِلَى مِنًى ، فَأَهَلُّوا بِالْحَجِّ ، وَرَكِبَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَصَلَّى بِهَا الظُّهْرَ وَالْعَصْرَ وَالْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ وَالْفَجْرَ ، ثُمَّ مَكَثَ قَلِيلًا حَتَّى طَلَعَتِ الشَّمْسُ ، وَأَمَرَ بِقُبَّةٍ مِنْ شَعَرٍ تُضْرَبُ لَهُ بِنَمِرَةَ ، فَسَارَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا تَشُكُّ قُرَيْشٌ إِلَّا أَنَّهُ وَاقِفٌ عِنْدَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ ، كَمَا كَانَتْ قُرَيْشٌ تَصْنَعُ فِي الْجَاهِلِيَّةِ ، فَأَجَازَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى أَتَى عَرَفَةَ ، فَوَجَدَ الْقُبَّةَ قَدْ ضُرِبَتْ لَهُ بِنَمِرَةَ ، فَنَزَلَ بِهَا.

حَتَّى إِذَا زَاغَتِ الشَّمْسُ أَمَرَ بِالْقَصْوَاءِ ، فَرُحِلَتْ لَهُ ، فَأَتَى بَطْنَ الْوَادِي ، فَخَطَبَ النَّاسَ وَقَالَ : « إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا ، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا ، أَلَا كُلُّ شَيْءٍ مِنْ أَمْرِ الْجَاهِلِيَّةِ تَحْتَ قَدَمَيَّ مَوْضُوعٌ ، وَدِمَاءُ الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعَةٌ ، وَإِنَّ أَوَّلَ دَمٍ أَضَعُ مِنْ دِمَائِنَا دَمُ ابْنِ رَبِيعَةَ بْنِ الْحَارِثِ ، كَانَ مُسْتَرْضِعًا فِي بَنِي سَعْدٍ فَقَتَلَتْهُ هُذَيْلٌ ، وَرِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ ، وَأَوَّلُ رِبًا أَضَعُ رِبَانَا رِبَا عَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ ، فَإِنَّهُ مَوْضُوعٌ كُلُّهُ ، فَاتَّقُوا اللهَ فِي النِّسَاءِ ، فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانِ اللهِ ، وَاسْتَحْلَلْتُمْ فُرُوجَهُنَّ بِكَلِمَةِ اللهِ [ص : 890] ، وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لَا يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُونَهُ ، فَإِنْ فَعَلْنَ ذَلِكَ فَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ ، وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ، وَقَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ ، كِتَابُ اللهِ ، وَأَنْتُمْ تُسْأَلُونَ عَنِّي ، فَمَا أَنْتُمْ قَائِلُونَ؟ » قَالُوا : نَشْهَدُ أَنَّكَ قَدْ بَلَّغْتَ وَأَدَّيْتَ وَنَصَحْتَ ، فَقَالَ : بِإِصْبَعِهِ السَّبَّابَةِ ، يَرْفَعُهَا إِلَى السَّمَاءِ وَيَنْكُتُهَا إِلَى النَّاسِ « اللهُمَّ ، اشْهَدْ ، اللهُمَّ ، اشْهَدْ » ثَلَاثَ مَرَّاتٍ ، ثُمَّ أَذَّنَ ، ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الظُّهْرَ ، ثُمَّ أَقَامَ فَصَلَّى الْعَصْرَ ، وَلَمْ يُصَلِّ بَيْنَهُمَا شَيْئًا

ثُمَّ رَكِبَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، حَتَّى أَتَى الْمَوْقِفَ ، فَجَعَلَ بَطْنَ نَاقَتِهِ الْقَصْوَاءِ إِلَى الصَّخَرَاتِ ، وَجَعَلَ حَبْلَ الْمُشَاةِ بَيْنَ يَدَيْهِ ، وَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ ، فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا حَتَّى غَرَبَتِ الشَّمْسُ ، وَذَهَبَتِ الصُّفْرَةُ قَلِيلًا ، حَتَّى غَابَ الْقُرْصُ ، وَأَرْدَفَ أُسَامَةَ خَلْفَهُ ، وَدَفَعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ شَنَقَ لِلْقَصْوَاءِ الزِّمَامَ ، حَتَّى إِنَّ رَأْسَهَا لَيُصِيبُ مَوْرِكَ رَحْلِهِ ، وَيَقُولُ بِيَدِهِ الْيُمْنَى « أَيُّهَا النَّاسُ ، السَّكِينَةَ السَّكِينَةَ » كُلَّمَا أَتَى حَبْلًا مِنَ الْحِبَالِ أَرْخَى لَهَا قَلِيلًا ، حَتَّى تَصْعَدَ ، حَتَّى أَتَى الْمُزْدَلِفَةَ ، فَصَلَّى بِهَا الْمَغْرِبَ وَالْعِشَاءَ بِأَذَانٍ وَاحِدٍ وَإِقَامَتَيْنِ ، وَلَمْ يُسَبِّحْ بَيْنَهُمَا شَيْئًا ، ثُمَّ اضْطَجَعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى طَلَعَ الْفَجْرُ ، وَصَلَّى الْفَجْرَ ، حِينَ تَبَيَّنَ لَهُ الصُّبْحُ ، بِأَذَانٍ وَإِقَامَةٍ ، ثُمَّ رَكِبَ الْقَصْوَاءَ ، حَتَّى أَتَى الْمَشْعَرَ الْحَرَامَ ، فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ ، فَدَعَاهُ وَكَبَّرَهُ وَهَلَّلَهُ وَوَحَّدَهُ ، فَلَمْ يَزَلْ وَاقِفًا حَتَّى أَسْفَرَ جِدًّا ، فَدَفَعَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ ، وَأَرْدَفَ الْفَضْلَ بْنَ عَبَّاسٍ ، وَكَانَ رَجُلًا حَسَنَ الشَّعْرِ أَبْيَضَ وَسِيمًا ، فَلَمَّا دَفَعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّتْ بِهِ ظُعُنٌ يَجْرِينَ ، فَطَفِقَ الْفَضْلُ يَنْظُرُ إِلَيْهِنَّ ، فَوَضَعَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَهُ عَلَى وَجْهِ الْفَضْلِ ، فَحَوَّلَ الْفَضْلُ وَجْهَهُ إِلَى الشِّقِّ الْآخَرِ يَنْظُرُ ، فَحَوَّلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَدَهُ مِنَ الشِّقِّ الْآخَرِ عَلَى وَجْهِ الْفَضْلِ ، يَصْرِفُ وَجْهَهُ مِنَ الشِّقِّ الْآخَرِ يَنْظُرُ ، حَتَّى أَتَى بَطْنَ مُحَسِّرٍ ، فَحَرَّكَ قَلِيلًا ، ثُمَّ سَلَكَ الطَّرِيقَ الْوُسْطَى الَّتِي تَخْرُجُ عَلَى الْجَمْرَةِ الْكُبْرَى ، حَتَّى أَتَى الْجَمْرَةَ الَّتِي عِنْدَ الشَّجَرَةِ ، فَرَمَاهَا بِسَبْعِ حَصَيَاتٍ ، يُكَبِّرُ مَعَ كُلِّ حَصَاةٍ مِنْهَا ، مِثْلِ حَصَى الْخَذْفِ ، رَمَى مِنْ بَطْنِ الْوَادِي ، ثُمَّ انْصَرَفَ إِلَى الْمَنْحَرِ ، فَنَحَرَ ثَلَاثًا وَسِتِّينَ بِيَدِهِ ، ثُمَّ أَعْطَى عَلِيًّا ، فَنَحَرَ مَا غَبَرَ ، وَأَشْرَكَهُ فِي هَدْيِهِ ، ثُمَّ أَمَرَ مِنْ كُلِّ بَدَنَةٍ بِبَضْعَةٍ ، فَجُعِلَتْ فِي قِدْرٍ ، فَطُبِخَتْ ، فَأَكَلَا مِنْ لَحْمِهَا وَشَرِبَا مِنْ مَرَقِهَا ، ثُمَّ رَكِبَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَفَاضَ إِلَى الْبَيْتِ ، فَصَلَّى بِمَكَّةَ الظُّهْرَ ، فَأَتَى بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ ، يَسْقُونَ عَلَى زَمْزَمَ ، فَقَالَ : « انْزِعُوا ، بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ ، فَلَوْلَا أَنْ يَغْلِبَكُمُ النَّاسُ عَلَى سِقَايَتِكُمْ لَنَزَعْتُ مَعَكُمْ » فَنَاوَلُوهُ دَلْوًا فَشَرِبَ مِنْهُ. (رواه مسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হুযুর (ﷺ) মারওয়ায় সায়ী শেষ করে এই যে কথাটি বলেছিলেন, "যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেনি, তারা যেন নিজেদের তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয়। আর আমিও যদি কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে না আসতাম, তাহলে আমিও এমনই করতাম।" এর মর্ম ও স্বরূপ বুঝার আগে একথাটি জেনে নিতে হবে যে, জাহিলিয়্যাত যুগে হজ্ব ও উমরার ক্ষেত্রে যেসব বিশ্বাসগত ও কর্মগত ভ্রান্তি প্রচলিত হয়ে অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল, এগুলোর মধ্যে একটি ভ্রান্তি এও ছিল যে, শাওয়াল, যিলকদ ও যিলহজ্ব যেগুলোকে হজ্বের মাস বলা হয়, (কেননা, হজ্বের সফর এ মাসগুলোতেই হয়ে থাকে।) এসব মাসে উমরা পালন করাকে কঠিন গুনাহ্ মনে করা হত। অথচ এ বিষয়টি ভুল ও মনগড়া ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সফরের শুরুতেই স্পষ্টভাবে লোকদেরকে এ কথা বলে দিয়েছিলেন যে, যার মন চায় সে কেবল হজ্বের ইহরাম বাঁধতে পারে, (যাকে পরিভাষায় ইফরাদ বলা হয়।) আর যার মন চায় সে শুরুতে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধতে পারে এবং মক্কা শরীফ গিয়ে উমরা থেকে ফারেগ হয়ে হজ্বের জন্য আরেকটি ইহরাম বাঁধবে। (যাকে তামাত্তু বলা হয়।) আর যার মন চায় সে হজ্ব ও উমরার একই সঙ্গে ইহরাম বাঁধবে এবং একই ইহরামে উভয়টি আদায় করার নিয়ত করবে, (যাকে কেরান বলা হয়।)
হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শোনার পর সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে অল্প সংখ্যক লোকই নিজেদের বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তামাত্তু হজ্বের ইচ্ছা করলেন এবং যুল হুলায়ফায় গিয়ে কেবল উমরার ইহরাম বাঁধলেন। তাদের মধ্যে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি.ও ছিলেন। অপর দিকে অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম শুধু হজ্বের অথবা এক সাথে হজ্ব ও উমরার ইহরাম বাঁধলেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উভয়টির ইহরাম বাঁধলেন, অর্থাৎ, কেরান পদ্ধতি অবলম্বন করলেন। তাছাড়া নিজের কুরবানীর পশু (উট) ও তিনি মদীনা শরীফ থেকেই সাথে নিয়ে রওয়ানা হলেন। আর শরী‘আতের বিধান হচ্ছে, যে হাজী কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে হজ্ব করতে যায়, সে ঐ পর্যন্ত ইহরাম শেষ করতে পারে না, যে পর্যন্ত সে ১০ই যিলহজ্ব কুরবানী করে না নেয়। এজন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং ঐসব সাহাবায়ে কেরাম যারা তাঁর মতই কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা হজ্বের পূর্বে (অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর আগে) ইহরাম থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিলেন না। কিন্তু যারা কুরবানীর পশু সাথে করে নিয়ে আসেননি, তাদের জন্য এ ধরনের কোন অপারগতা ছিল না।
মক্কা শরীফে পৌঁছে হুযুর (ﷺ) তীব্রভাবে অনুভব করলেন যে, এই যে জাহিলিয়্যাত সুলভ একটি কথা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ- এর প্রতিবাদ ও মূলোৎপাটনের জন্য এবং মানুষের মন-মস্তিষ্ক থেকে এর সূক্ষ্ম জীবাণু দূর করার জন্য এটা খুবই জরুরী যে, ব্যাপকভাবে এর বিপরীত কাজ করে দেখানো হোক। আর এর সম্ভাব্য পন্থা এটাই ছিল যে, তাঁর সাথীদের মধ্যে থেকে বেশী সংখ্যক লোক যারা তাঁর সাথে তাওয়াফ ও সায়ী করে নিয়েছিল, তারা এ তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরায় রূপান্তরিত করে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যাবে এবং হজ্বের জন্য নির্ধারিত সময়ে আবার ইহরাম বেঁধে নিবে। আর তিনি নিজে যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, এজন্য তাঁর বেলায় এর অবকাশ ও সুযোগ ছিল না। এজন্যই তিনি বললেনঃ "যদি প্রথমেই আমি ঐ বিষয়টি অনুভব করতাম, যা পরে অনুভব করেছি, তাহলে আমি কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসতাম না এবং এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে দিয়ে ইহরাম শেষ করে দিতাম। (কিন্তু আমি যেহেতু কুরবানীর পশু সাথে আনার কারণে এমন করতে অপারগ, তাই তোমাদেরকে বলছি যে.) তোমাদের মধ্য থেকে যারা কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে আসেনি, তারা যেন এই তাওয়াফ ও সায়ীকে উমরা বানিয়ে নেয় এবং নিজেদের ইহরাম খুলে হালাল হয়ে যায়।" হুযুর (ﷺ)-এর এ কথা শুনে সুরাকা ইবনে মালেক দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তিনি যেহেতু এখন পর্যন্ত এ কথাই জানতেন যে, হজ্বের মাসগুলোতে উমরা করা কঠিন গুনাহ, এ জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এ দিনগুলোতে পৃথক উমরা করার এ বিধান কি কেবল এ বছরের জন্য, না এখন থেকে সবসময়ই হজ্বের মাসগুলোতে এমন করা যাবে? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে ভালভাবে বুঝানোর জন্য নিজের এক হাতের আঙ্গুলগুলো অপর হাতের আঙ্গুলগুলোর মধ্যে ঢুকিয়ে বললেন: دخلت العمرة في الحج হজ্বের মধ্যে উমরা এভাবে দাখিল হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, হজ্বের মাসগুলোতে এবং হজ্বের একেবারে নিকটবর্তী দিনগুলোতেও উমরা করা যায়। এটাকে গুনাহ্ মনে করা সম্পূর্ণ ভুল ও জাহেলী বিশ্বাস, আর এ বিধানটি সব সময়ের জন্য।

যেসব সাহাবায়ে কেরাম হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ মোতাবেক ইহরাম খুলে হালাল হয়ে গিয়েছিলেন, তারা এ ক্ষেত্রে মাথা মুন্ডন করেননি; বরং কেবল ছেঁটে নিয়েছিলেন। এরূপ তারা সম্ভবত এ কারণে করেছিলেন, যাতে মাথা মুন্ডানোর ফযীলতটি হজ্বের ইহরাম খোলার সময় লাভ করতে পারেন।

হজ্বের বিশেষ কার্যক্রম ৮ই যিলহজ্ব থেকে শুরু হয়- যাকে "তারবিয়ার দিন" বলা হয়। এ দিন প্রভাতে হাজী সাহেবান মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ইফরাদ অথবা কেরানকারীগণ তো আগে থেকেই ইহরাম অবস্থায় থাকেন। তাদের ছাড়া অন্য হাজীগণ এ দিনই অর্থাৎ, ৮ই যিলহজ্ব ইহরাম বেঁধে মিনার দিকে যান এবং ৯ই যিলহজ্ব সকাল পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করেন।
রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এবং তাঁর সাথে কিছু সাহাবায়ে কেরাম- যারা নিজেদের কুরবানীর পশু সাথে নিয়ে এসেছিলেন, তারা তো ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। অবশিষ্ট সাহাবীগণ- যারা উমরা আদায় করে ইহরাম খুলে নিয়েছিলেন, তারা সবাই ৮ তারিখের সকালে হজ্বের ইহরাম বাঁধলেন এবং হজ্বের এ কাফেলা মিনা রওয়ানা হয়ে গেল এবং এ দিন তারা সেখানেই অবস্থান করলেন। তারপর ৯ তারিখ সকালে সূর্যোদয়ের পর আরাফার দিকে যাত্রা শুরু হল। আরাফা মিনা থেকে প্রায় ৬ মাইল এবং মক্কা শরীফ থেকে ১ মাইল দূরে অবস্থিত এবং এটা হরমের সীমানার বাইরে; বরং এ দিকে হারামের সীমানা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই আরাফার এলাকা শুরু হয়।
আরবের সাধারণ গোত্রসমূহ- যারা হজ্বের জন্য আসত, তারা সবাই ৯ই যিলহজ্ব হারামের সীমানা থেকে বাইরে গিয়ে আরাফায় অবস্থান গ্রহণ করত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর গোত্রের লোকেরা অর্থাৎ, কুরাইশগণ যারা নিজেদেরকে কাবার প্রতিবেশী ও মুতাওয়াল্লী এবং আল্লাহর হারামের অধিবাসী বলত, তারা ওকূফের জন্যও হারামের বাইরে যেত না; বরং এর সীমানার ভিতরেই মুযদালিফা অঞ্চলের মাশ'আরুল হারাম পর্বতের কাছে অবস্থান করত এবং এটাকে নিজেদের বৈশিষ্ট্য মনে করত। নিজেদের এ গোত্রীয় সনাতন প্রথার কারণে কুরাইশদের এ বিশ্বাস ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও মাশ'আরুল হারামের নিকটই অবস্থান করবেন। কিন্তু যেহেতু তাদের এ রীতিটি ভুল ছিল এবং ওকূফের সঠিক স্থান আরাফাই ছিল, এজন্য তিনি মিনা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময়ই লোকদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, আমার জন্য নামিরায় যেন তাঁবুর ব্যবস্থা করা হয়। এ নির্দেশের ভিত্তিতেই নামিরা উপত্যকায়ই হুযুর (ﷺ)-এর জন্য তাঁবু খাটানো হয়। তিনি সেখানে গিয়েই অবতরণ করেন এবং ঐ তাঁবুতেই অবস্থান গ্রহণ করেন।

এটা জানা কথা যে, ঐ দিনটি অর্থাৎ, ঐ বছরের ওকূফে আরাফার দিনটি শুক্রবার ছিল। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেদিন সূর্য চলার পর প্রথমে পূর্বে উল্লেখিত খুতবা প্রদান করলেন। তারপর যুহর ও আসরের উভয় নামায যুহরের ওয়াক্তে একই সাথে পড়লেন। হাদীসে স্পষ্টভাবে যুহরের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তিনি ঐ দিন জুমু'আর নামায পড়েননি; বরং এর স্থলে যুহর পড়েছেন। আর তিনি যে খুতবা দিয়েছিলেন এটা জুমু'আর ছিল না; বরং আরাফা দিবসের খুতবা ছিল। সেখানে জুমু'আ না পড়ার কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, আরাফা কোন জনবসতি নয়; বরং একটি মরুপ্রান্তর। আর জুমু'আ জনবসতিতে পড়া হয়।
আরাফার দিনের এ খুতবায় তিনি যেসব বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, ঐ সময়ে ও ঐ সমাবেশে এসব জিনিসেরই ঘোষণা ও প্রচার সবচেয়ে জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। খুতবার পর তিনি যুহর ও আসরের নামায একসাথে যুহরের ওয়াক্তেই আদায় করেছেন এবং মাঝে কোন সুন্নত অথবা নফলের দু'রাকআতও আদায় করেননি। উম্মত এ কথায় একমত যে, ওকূফে আরাফার এ দিনে এ দু'টি নামায এভাবেই পড়তে হবে। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার নামাযও এ দিন মুযদালিফায় পৌঁছে ইশার ওয়াক্তে এক সাথে পড়তে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) এমনই করেছিলেন- যেমন সামনে গিয়ে জানা যাবে। ঐ দিন এ নামাযগুলোর সঠিক নিয়ম ও সঠিক সময় এটাই। এর একটি রহস্যপূর্ণ কারণ তো এই হতে পারে যে, ঐ দিনটির এ বৈশিষ্ট্য সবার সামনে যেন ফুটে উঠে যে, আজকের এ দিনে আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে নামাযের ওয়াক্তগুলোতেও এ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ এটাও হতে পারে যে, এ দিনের মূল ওযীফা ও কাজ হচ্ছে আল্লাহর যিকির ও দু‘আ। তাই আল্লাহর বান্দারা যাতে একাগ্রচিত্তে এতে লিপ্ত থাকতে পারে এবং যুহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত; বরং ইশা পর্যন্ত যেন কোন নামাযের চিন্তাও করতে না হয়, এজন্য এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হুযুর (ﷺ) আরাফার দিনের এ খুতবায় যাকে নিজের ক্ষেত্র ও স্থান বিবেচনায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খুতবা ও ভাষণ বলা যায়- তিনি নিজের ওফাত ও বিচ্ছেদের সময় নিকটবর্তী হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে শেষ কথাটি এই বলেছিলেন: "আমি তোমাদের জন্য হেদায়াত ও আলোর ঐ পরিপূর্ণ উপকরণ রেখে যাচ্ছি, যার পর তোমরা কখনও বিপথগামী হবে না- যদি তোমরা একে আঁকড়ে থাক এবং এর আলোতে পথ চল। আর সেটা হচ্ছে আল্লাহর পবিত্র কিতাব কুরআন মজীদ।" এর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, মৃত্যুশয্যার শেষ দিনগুলোতে যখন প্রচণ্ড রোগের কারণে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল, এ সময় ওসিয়ত হিসাবে তিনি যে কিছু লেখাতে চেয়েছিলেন এবং যার ব্যাপারে বলেছিলেন: "তোমরা এরপর বিপথগামী হবে না", তিনি এতে কি লেখাতে চেয়েছিলেন। বিদায় হজ্বের এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তিনি আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে থাকার ও এর অনুসরণ করার ওসিয়ত লিখাতে চেয়েছিলেন। তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণেও বলে দিয়েছিলেন যে, এ মর্যাদা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব কুরআন শরীফের। আর যেহেতু হযরত উমর রাযি. এ বাস্তব কথাটি জানতেন এবং আল্লাহ্ তা'আলা তাকে ক্ষেত্রমত কথা বলার সাহসও দান করেছিলেন, এজন্য তিনি এ ক্ষেত্রে এ অভিমত প্রকাশ করলেন যে, হুযুর (ﷺ)-এর সারা জীবনের শিক্ষা দ্বারা আমাদের জানা হয়ে গিয়েছে যে, এ মর্যাদা আল্লাহর কিতাবেরই। তাই এ কঠিন অবস্থায় ওসিয়ত লেখা ও লেখানোর বিষয়টির তেমন প্রয়োজনও ছিল না।

হজ্বের সবচেয়ে বড় কাজ ও রুকন হচ্ছে ওকূফে আরাফা। অর্থাৎ, ৯ই যিলহজ্ব দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার পর যুহর ও আসরের নামায একসাথে আদায় করে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। এ হাদীস দ্বারা জানা গেল যে, হুযুর (ﷺ) এ অবস্থানকে কত দীর্ঘ করেছিলেন। যুহর ও আসরের নামায তিনি যুহরের শুরু ওয়াক্তেই পড়ে নিয়েছিলেন এবং এ সময় থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি ওকূফ করেছিলেন। তারপর সোজা মুযদালিফায় রওয়ানা হয়ে গেলেন এবং মাগরিব ও ইশার নামায সেখানে পৌঁছে এক সাথে আদায় করলেন। আর উপরে বলা হয়েছে যে, এটাই হচ্ছে এ দিনের জন্য আল্লাহর হুকুম।
মুযদালিফার এ রাতে হুযুর (ﷺ) ইশার নামায শেষ করে ফজর পর্যন্ত আরাম করলেন এবং এ রাতে তাহাজ্জুদের নামায দু'রাকআতও পড়লেন না। (অথচ তাহাজ্জুদের নামায তিনি সফরের অবস্থাতেও বাদ দিতেন না।) এর কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, ৯ই যিলহজ্বের সারাটি দিন তিনি খুবই কর্মব্যস্ত ছিলেন। সকালে মিনা থেকে রওয়ানা হয়ে আরাফায় পৌঁছলেন এবং সেখানে প্রথম ভাষণ দিলেন। তারপর যুহর ও আসরের নামায পড়লেন এবং এরপর থেকে মাগরিব পর্যন্ত একাধারে ওকূফ করলেন। তারপর এ সময়েই আরাফা থেকে মুযদালিফার পথ অতিক্রম করলেন। মনে হয়, তিনি যেন ফজর থেকে নিয়ে ইশা পর্যন্ত একাধারে বিভিন্ন কর্মব্যস্ততা ও পরিশ্রমের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তা'ছাড়া পরের দিন অর্থাৎ, ১০ই যিলহজ্বও তাঁকে এমন কর্মব্যস্ত দিন কাটাতে হবে। অর্থাৎ, সকালে মুযদালিফা থেকে রওয়ানা হয়ে মিনা পৌঁছা, সেখানে গিয়ে প্রথমে শয়তানকে পাথর মারা, তারপর একটি-দু'টি অথবা দশ-বিশটি নয়; বরং ষাটের অধিক উট নিজ হাতে কুরবানী করা, তারপর তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মিনা থেকে মক্কা যাওয়া এবং সেখান থেকে আবার মিনায় ফিরে আসা। তাই দেখা গেল যে, যেহেতু ৯ই ও ১০ই যিলহজ্বের এ দু'টি দিন খুবই কর্মব্যস্ততার ও পরিশ্রমের দিন ছিল, এজন্য এ দু'দিনের মাঝের রাতটিতে (অর্থাৎ, মুযদালিফার রাতে) পূর্ণ বিশ্রাম গ্রহণ করা জরুরী ছিল। দেহ ও দৈহিক শক্তিগুলোরও কিছু দাবী ও হক থাকে এবং এগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা এ ধরনের সমাবেশগুলোতে বেশী জরুরী হয়- যাতে সাধারণ মানুষ ইসলামের সহজীকরণের নীতি এবং বিশেষ অবস্থায় রেয়ায়াতের রীতিটি বুঝে নিতে পারে।
এ হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজ হাতে তেষট্টিটি উট কুরবানী করে ছিলেন। এগুলো খুব সম্ভব ঐ তেষট্টিটিই, যেগুলো তিনি মদীনা শরীফ থেকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন। বাকী সাঁইত্রিশটি যা হযরত আলী ইয়ামান থেকে এনেছিলেন, এগুলো তিনি তার হাতেই কুরবানী করালেন। তেষট্টি সংখ্যাটির হেকমত একেবারে স্পষ্ট যে, হুযুর (ﷺ)-এর বয়স তেষট্টি বছর ছিল। তাই তিনি যেন জীবনের প্রতিটি বছরের শুকরিয়া হিসাবে একটি করে উট কুরবানী করলেন।
হুযুর (ﷺ) ও আলী রাযি. নিজের কুরবানীর উটের গোশত রান্না করে খেয়েছেন এবং শুরবাও পান করেছেন। এর দ্বারা সবার একথা জানা হয়ে গেল যে, কুরবানীদাতা নিজের কুরবানীর গোশত নিজেও খেতে পারে এবং নিজের বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকে খাওয়াতে পারে।
১০ই যিলহজ্ব কুরবানীর কাজ শেষ করে হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারতের জন্য মক্কা শরীফ তশরীফ নিয়ে গেলেন। সুন্নত নিয়ম ও উত্তম এটাই যে, তওয়াফে যিয়ারত কুরবানী থেকে অবসর হয়ে ১০ই যিলহজ্বেই করে নেওয়া হবে- যদিও বিলম্বেরও অবকাশ রয়েছে।
যমযমের পানি উঠিয়ে হাজীদেরকে পান করানো-এ খেদমত ও সৌভাগ্যের কাজটি প্রাচীনকাল থেকেই হুযুর (ﷺ)-এর খান্দান বনী আব্দুল মুত্তালিবের ভাগে ছিল। হুযুর (ﷺ) তাওয়াফে যিয়ারত শেষ করে যমযমের কাছে আসলেন। সে সময় তাঁর খান্দানের লোকেরা বালতি দিয়ে পানি উঠিয়ে উঠিয়ে লোকদেরকে পান করাচ্ছিল। তাঁর মনেও এ কাজে অংশ গ্রহণ করার বাসনা জাগ্রত হল। কিন্তু তিনি একেবারে সঠিক চিন্তা করলেন যে, আমি যদি এমন করি, তাহলে আমার অনুসরণ ও অনুকরণ করতে গিয়ে সকল সাথীরাই এ সৌভাগ্যে অংশ গ্রহণ করতে চাইবে। এর ফলে বনী আব্দুল মুত্তালিব তাদের দীর্ঘকালের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এজন্য তিনি নিজের বংশের লোকদের মন রক্ষা করার জন্য এবং তাদের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য অন্তরের আকাঙ্ক্ষা তো প্রকাশ করলেন, কিন্তু সাথে সাথে ঐ পরিণামদর্শিতার কথাটিও বলে দিলেন, যার কারণে তিনি নিজের এ আন্তরিক বাসনা বিসর্জন দিয়েছিলেন।
শুরুতে যেমন বলে আসা হয়েছে যে, হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসটি বিদায় হজ্বের বর্ণনায় সবচেয়ে দীর্ঘ ও সবিস্তার বর্ণনা সমৃদ্ধ হাদীস। কিন্তু এতদসত্ত্বেও অনেক ঘটনার উল্লেখ এতে বাদ পড়ে গিয়েছে। এমনকি মাথা মুড়ানো এবং দশ তারিখের খুতবার উল্লেখও এতে আসেনি, যা অন্যান্য হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে।
হযরত জাবের রাযি.-এর এ হাদীসের কোন কোন রাবী এ হাদীসেই এ অতিরিক্ত বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এ ঘোষণাও করেছিলেন:

" نَحَرْتُ هَا هُنَا وَمِنًى كُلُّهَا مَنْحَرٌ فَانْحَرُوا فِي رِحَالِكُمْ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَعَرَفَةُ كُلُّهَا مَوْقِفٌ وَوَقَفْتُ هَا هُنَا وَجَمْعٌ كُلُّهَا مَوْقِفٌ "

অর্থাৎ, আমি কুরবানী এখানে করেছি; কিন্তু মিনার সমস্ত এলাকাই কুরবানীস্থল। তাই তোমরা নিজ নিজ জায়গায় কুরবানী করতে পার। আমি আরাফায় এখানে (বড় বড় পাথরের প্রান্তরে) ওকূফ করেছি; কিন্তু সমস্ত আরাফার ময়দানই ওকূফস্থল। (তাই এর যে কোন অংশেই ওকূফ করা যায়।) আমি মুযদালিফায় এখানে (মাশ'আরুল হারামের নিকটে) অবস্থান করেছি; কিন্তু সারা মুযদালিফাই ওকূফ তথা অবস্থানস্থল। (এর যে কোন অংশেই অবস্থান করা যায়।)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান