মা'আরিফুল হাদীস

হজ্ব অধ্যায়

হাদীস নং: ২০০
হজ্ব অধ্যায়
মক্কার হারামের সম্মান ও মর্যাদা
২০০. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা বিজয়ের দিন বলেছেন: এখন আর হিজরতের হুকুম নেই, কিন্তু জেহাদ ও এর সংকল্প। আর যখন তোমাদেরকে আল্লাহর পথে বের হওয়ার জন্য বলা হয়, তখন বেরিয়ে পড়। আর ফাতহে মক্কার দিন তিনি এ ঘোষণাও করেছেন: আল্লাহ্ এ মক্কা শহরকে সেদিন থেকেই সম্মানিত সাব্যস্ত করেছেন, যেদিন তিনি আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন। অতএব, এটা আল্লাহর সম্মানে কিয়ামত পর্যন্তই সম্মানার্হ। আল্লাহ্ তা'আলা আমার পূর্বে কাউকে এখানে জেহাদের অনুমতিও দেননি, আর আমাকেও কেবল দিনের সামান্য সময়ের জন্য সাময়িক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই ঐ সময় পার হয়ে যাওয়ার পর এখন কিয়ামত পর্যন্তই এটা সম্মানার্হ। এখানকার কোন কাঁটাযুক্ত গাছও কাটা যাবে না, এখানকার কোন শিকারযোগ্য প্রাণীকেও উত্যক্ত করা যাবে না, এখানের রাস্তায় পড়া কোন জিনিসও কেউ কুড়িয়ে উঠাতে পারবে না- তবে কেউ যদি ঘোষণা ও প্রচারের নিয়তে এমন করে- এখানের সবুজ ঘাসও কাটা যাবে না। এ কথা শুনে হযরত আব্বাস বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইযখিরকে এর বাইরে রাখুন। কেননা, এখানকার কামাররা এটা ব্যবহার করে এবং ঘরের চালেও এটা কাজে লাগে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: আচ্ছা, ইযখির বাদ। বুখারী, মুসলিম
کتاب الحج
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ : قَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ : « لاَ هِجْرَةَ ، وَلَكِنْ جِهَادٌ وَنِيَّةٌ وَإِذَا اسْتُنْفِرْتُمْ ، فَانْفِرُوا » وَقَالَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ : « إِنَّ هَذَا البَلَدَ حَرَّمَهُ اللَّهُ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ ، فَهُوَ حَرَامٌ بِحُرْمَةِ اللَّهِ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ ، وَإِنَّهُ لَمْ يَحِلَّ القِتَالُ فِيهِ لِأَحَدٍ قَبْلِي ، وَلَمْ يَحِلَّ لِي إِلَّا سَاعَةً مِنْ نَهَارٍ ، فَهُوَ حَرَامٌ بِحُرْمَةِ اللَّهِ إِلَى يَوْمِ القِيَامَةِ ، لاَ يُعْضَدُ شَوْكُهُ ، وَلاَ يُنَفَّرُ صَيْدُهُ ، وَلاَ يَلْتَقِطُ لُقَطَتَهُ إِلَّا مَنْ عَرَّفَهَا ، وَلاَ يُخْتَلَى خَلاَهُ » قَالَ العَبَّاسُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِلَّا الإِذْخِرَ فَإِنَّهُ لِقَيْنِهِمْ وَلِبُيُوتِهِمْ ، فَقَالَ : « إِلَّا الإِذْخِرَ » (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দু'টি ঘোষণার উল্লেখ রয়েছে, যা তিনি মক্কা বিজয়ের দিন বিশেষভাবে করেছিলেন। প্রথম ঘোষণাটি এই ছিল, "এখন আর হিজরতের হুকুম নেই।" এর মর্ম বুঝার আগে এ কথা জানা জরুরী যে, মক্কা বিজয়ের পূর্বে যখন মক্কায় কাফের ও মুশরিকদের কর্তৃত্ব ছিল- যারা ইসলাম ও মুসলমানদের চরম শত্রু ছিল এবং তখন মক্কায় থেকে কোন মুসলমানের পক্ষে ইসলামী জীবন-যাপন করা প্রায় অসম্ভব ছিল, তখন নির্দেশ ছিল যে, আল্লাহর যে বান্দারা ইসলাম গ্রহণ করবে, তাদের জন্য যদি সম্ভব হয়, তাহলে তারা যেন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় চলে যায়- যা তৎকালে ইসলামের কেন্দ্রভূমি ও সারা পৃথিবীতে ইসলামী শিক্ষা দীক্ষার একমাত্র প্রাণকেন্দ্র ছিল। যাহোক, এ ধরনের বিশেষ অবস্থায় এ হিজরত ফরয ছিল এবং এর বিরাট ফযীলত ও গুরুত্ব ছিল। কিন্তু ৮ম হিজরীতে যখন আল্লাহ্ তা'আলা মক্কা মুকাররমায়ও ইসলামী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দিলেন, তখন হিজরতের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেল। এ জন্য তিনি মক্কা বিজয়ের দিনই ঘোষণা করে দিলেন যে, এখন হিজরতের ঐ হুকুম উঠিয়ে নেওয়া হল। এর দ্বারা স্বাভাবিকভাবেই ঐসব লোকদের মনে খুবই আক্ষেপ ও নৈরাশ্য এসে গিয়ে থাকবে, যারা এখন ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং হিজরতের বিরাট ফযীলতের দরওয়াজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এ সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলেন। তাদের এ আক্ষেপ ও আফসোস দূর করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন: হিজরতের ফযীলত ও সৌভাগ্যের দরওয়াজা যদিও বন্ধ হয়ে গিয়েছে; কিন্তু জেহাদের পথ এবং আল্লাহ্ তা'আলার সকল নির্দেশ পালনের নিয়ত ও আল্লাহর দ্বীনকে উচ্চে ধারণ করার পথে সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকারের দৃঢ় সংকল্পের দরওয়াজা এখনও খোলা রয়েছে। আর যে কোন বড় ধরনের সৌভাগ্য ও ফযীলত এসব পথ অবলম্বন করে আল্লাহর যে কোন বান্দাই লাভ করতে পারে।

মক্কা বিজয়ের দিন হুযুর (ﷺ) দ্বিতীয় ঘোষণাটি এ দিয়েছিলেন যে, এ মক্কা নগরীর মর্যাদা ও সম্মান যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এবং যা সর্বজন স্বীকৃত- এটা কেবল রসম ও প্রথা অথবা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটা আল্লাহ্ তা'আলার অনাদি নির্দেশে চলছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্যই আল্লাহ্ তা'আলার এ হুকুম যে, এর বিশেষ আদব ও সম্মান বজায় রাখতে হবে। এমনকি আল্লাহর জন্য জেহাদ ও যুদ্ধ যা একটি উঁচু স্তরের ইবাদত ও বিরাট সৌভাগ্যের বিষয় এখানে এরও অনুমতি নেই। আমার পূর্বে কাউকে সাময়িক ভাবেও এর অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমাকেও কেবল অল্প সময়ের জন্য এর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, আর এটাও ঐ সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত কোন বান্দার জন্য এখানে যুদ্ধ করার অনুমতি নেই। যেভাবে বিশেষ সরকারী এলাকার জন্য বিশেষ বিধান ও আইন থাকে, সেভাবে এখানের জন্যও বিশেষ আদব ও আইন রয়েছে। আর এগুলো তাই, যা এ ক্ষেত্রে তিনি ঘোষণা করেছেন। প্রায় এ বিষয়বস্তুর একটি হাদীস হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ২০০ | মুসলিম বাংলা