মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ৭০
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
আলে ইমরান সূরার শেষ আয়াত
৭০. হযরত উছমান ইব্‌ন আফ্ফান (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সূরা আলে ইমরানের শেষ আয়াতগুলো কোন রাতে তিলাওয়াত করবে তার জন্য পূর্ণ রাত্রি জাগরণ করে সালাত আদায়ের ছাওয়াব লিখিত হবে। (মুসনাদে দারিমী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ، قَالَ: «مَنْ قَرَأَ آخِرَ آلِ عِمْرَانَ فِي لَيْلَةٍ، كُتِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَةٍ» (رواه الدارمى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলে ইমরানের শেষ আয়াতসমূহ বলতে إِنَّ فِيْ خَلْقِ السَّمٰوَاتِ وَالْأَرْضِ সূরার শেষাবধি বিস্তৃত আয়াতসমূহ বুঝানো হয়েছে। সহীহ রিওয়ায়াতসমূহ দ্বারা জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ রাতে যখন তাহাজ্জুদের উদ্দেশ্যে উঠতেন, তখন সর্বপ্রথম (ওযুরও পূর্বে) এ আয়াওগুলো পাঠ করতেন।

আলে ইমরানের এই আখেরী রুকুও সূরা বাকারার আখেরী রুকুর মত অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক দু'আ সম্বলিত। সম্ভবত এর ফযীলতের রহস্য এর মধ্যে নিহিত রয়েছে। সৃষ্টিজগতের সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে চিন্তাকারী এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকিরকারী বান্দাদের মুখে এ ব্যাপক দু'আ এ রুকুতে এভাবে বিধৃত হয়েছে:

{رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلًا سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ (191) رَبَّنَا إِنَّكَ مَنْ تُدْخِلِ النَّارَ فَقَدْ أَخْزَيْتَهُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ (192) رَبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ آمِنُوا بِرَبِّكُمْ فَآمَنَّا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ (193) رَبَّنَا وَآتِنَا مَا وَعَدْتَنَا عَلَى رُسُلِكَ وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ } [آل عمران: 191 - 194]

হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এটা নিরর্থক সৃষ্টি করনি। তুমি পবিত্র। তুমি আমাদেরকে অগ্নি শাস্তি থেকে রক্ষা কর। হে আমাদের প্রতিপালক! কাউকে তুমি আগুনে নিক্ষেপ করলে তাকে তো তুমি নিশ্চয় হেয় করলে এবং সীমা লঙ্ঘনকারীদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।

হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা এক আহ্বায়ককে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি। তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আন। সুতরাং আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা কর আমাদের মন্দ কার্যগুলি দূরীভূত কর এবং আমাদেরকে সৎকর্ম পরায়ণদের মৃত্যুর মত মৃত্যু দাও।

হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার রসূলগণের মাধ্যমে আমাদেরকে যা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছ তা আমাদেরকে দাও এবং কিয়ামতের দিন আমাদেরকে হেয় করো না। তুমি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম কর না।

সূরা আলে ইমরানের শেষ রুকুর এ দু'আ কুরআন শরীফের সবচেয়ে ব্যাপক অর্থবোধক তিনটি দু'আর অন্যতম। ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে এ রুকুর বিশেষ ফযীলত ও বৈশিষ্ট্যের কারণ এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে, যে, এ আয়াতসমূহে দু'আগুলো সুন্দরভাবে বিবৃত হয়েছে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

হযরত উছমান (রা) এর এরূপ বলা, যে ব্যক্তি রাত্রে এ আয়াগুলো পাঠ করবে, তার জন্য পুরো রাত জেগে নফল নামায পড়ার ছাওয়াব রয়েছে। বলা বাহুল্য, তিনি একথা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট শুনে থাকবেন। হুযূর ﷺ থেকে শুনা ব্যতিরেক কোন সাহাবী নিজের পক্ষ থেকে এমন কথা বলতে পারেন না, এই জন্যে হযরত উছমানের এ উক্তি মারফু (حديث مرفوع) এর পর্যায়ভুক্ত।

ফায়দা: মুসলিম উম্মাতের উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত সমূহের অন্যতম হলো এই যে, আল্লাহ তা'আলা এ উম্মাতকে সামান্য সামান্য ও ছোট ছোট কাজে অনেক বড় ও বেশি ছাওয়াব দানের অনেক পথ খোলা রাখতেন, যা তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মাধ্যমে উম্মতকে বাৎলিয়ে দিয়েছেন, যাতে করে যারা তাদের বিশেষ অবস্থার জন্য বড় বড় আমল করার সুযোগ পান না, তারাও যেন এ ছোট ছোট আমলগুলো করে আল্লাহ তা'আলার বিশেষ দান ও অনুগ্রহের যোগ্য হতে পারেন।

উপরে বর্ণিত যে হাদীস সমূহে রাসূলুল্লাহ ﷺ খাস খাস সূরা ও বিশেষ বিশেষ আয়াতসমূহের ফযীলত বর্ণনা করেছেন তা এ সিলসিলারই কয়েকটি কাঠি। এ গুলোর উদ্দেশ্য হলো যারা অত্যন্ত ব্যস্ততার জন্য কুরআন তিলাওয়াতের খুব একটা সময় করে উঠতে পারেন না তারা যেন ঐ বিশেষ বিশেষ সূরা ও আয়াত সমূহ পাঠ করে বড় বড় ছওয়াব ও পুরস্কার লাভ করে আল্লাহ তা'আলার বিশেষ অনুগ্রহের যোগ্য হতে পারেন। এজন্য এ হাদীসগুলোর হক হলো এগুলোর উপর বিশ্বাস রেখে বিশেষত এ সূরা ও আয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করা, যাতে করে আল্লাহ তা'আলার খাস খাস অনুগ্রহে আমাদেরও একটা ভাগ থাকে। যদি এতটুকুও না করতে পারি, তা হলে নিঃসন্দেহে এটা আমাদের দুর্ভাগ্য ও বঞ্চনারই প্রমাণবহ।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান