মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দোয়া অধ্যায়

হাদীস নং: ৯৮
আযকার এবং দোয়া অধ্যায়
দু'আ কবুলের বিশেষ বিশেষ হাল ও ক্ষণ-কাল
৯৮. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে দু'আ প্রত্যাখ্যাত হয় না। -(তিরমিযী ও আবূ দাউদ)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَنَسِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الدُّعَاءُ لَا يُرَدُّ بَيْنَ الْأَذَانِ وَالْإِقَامَةِ» (رواه الترمذى وابوداؤد)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

দুআ অতি মূল্যবান আমল। এটা মুমিনের অস্ত্র। সুখে-দুঃখে, বিপদ-আপদে দুআ তার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। এক হাদীছে দুআকে ইবাদতের সারবস্তু বলা হয়েছে। বিভিন্ন হাদীছে এর প্রতি খুব গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাস্তবে এটা গুরুত্বপূর্ণ বটে। কারণ দুআ অর্থ ডাকা, চাওয়া। আল্লাহ তা'আলা আমাদের মালিক ও মনিব। বান্দা হিসেবে তাঁকে ডাকাই আমাদের কাজ। আমাদের যা-কিছু প্রয়োজন, তা সবই তাঁকে জানানো ও তাঁর কাছে চাওয়া আমাদের কর্তব্য। তাই কুরআন মাজীদে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীছে আমাদেরকে নানারকম দুআ শেখানো হয়েছে। দুআ ইসলামী শিক্ষার এক বিশাল অঙ্গন।

আমাদেরকে যেমন বিভিন্ন দুআ শেখানো হয়েছে, তেমনি বিশেষ বিশেষ সময়ের কথাও বলে দেওয়া হয়েছে, যখন দুআ কবুলের সম্ভাবনা বেশি। এর উদ্দেশ্য আমাদেরকে আশাবাদী করে তোলা, যাতে আমরা কবুল হওয়ার আশা নিয়ে দুআ করি। কেননা কবুল হওয়ার আশার সঙ্গে দুআ করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

আলোচ্য হাদীছে বলা হয়েছে, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়টায় দুআ করলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয় না। তার মানে সে দুআ অবশ্যই কবুল হয়। হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি. বর্ণিত অপর এক হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

الدُّعَاءُ بَيْنَ الْأَذَانِ وَالْإِقَامَةِ مُسْتَجَابٌ فَادْعُوا.

আযান ও ইকামতের মাঝখানের দুআ কবুল করা হয়। সুতরাং তোমরা দুআ করো। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ২৯২৪৭; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ৩৬৭৯; সহীহ ইবন খুযায়মা: ৪২৫; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লা: ১০২)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বললেন তোমরা এ সময় দুআ করো, তখন সাহাবায়ে কেরামের জানার আগ্রহ হলো যে, এ সময়ে তারা কী দুআ করবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন-

سَلُوا اللَّهَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالآخِرَة

তোমরা আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা চাও। (জামে' তিরমিযী: ৩৫৯৪)

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ - (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা চাই)।

এক বর্ণনায় এসেছে-

إِذَا نَادَى الْمُنَادِي فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَاسْتُجِيبَ الدُّعَاءُ، فَمَنْ نَزَلَ بِهِ كَرْبٌ أَوْ شِدَّةٌ فَلْيَتَحَيَّنِ الْمُنَادِي، فَإِذَا كَبَّرَ كَبِّرُوا ...... ثُمَّ يَقُولُ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ الصَّادِقَةِ الْمُسْتَجَابَةِ الْمُسْتَجَابُ لَهَا دَعْوَةِ الْحَقِّ، وَكَلِمَةِ التَّقْوَى، أَحْيِنَا عَلَيْهَا وَأَمِتْنَا عَلَيْهَا، وَابْعَثْنَا عَلَيْهَا ، وَاجْعَلْنَا مِنْ خِيَارِ أَهْلِهَا أَحْيَاءً وَأَمْوَاتًا، ثُمَّ يَسْأَلُ اللهَ حَاجَتَهُ.

ঘোষক (মুআযযিন) যখন ঘোষণা দেয় (আযান দেয়), তখন আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং দুআ কবুল করা হয়। সুতরাং যার কোনও সংকট বা বিপদ দেখা দেয়, সে যেন ঘোষকের ঘোষণার অপেক্ষায় থাকে। তারপর যখন সে তাকবীর বলবে, সেও তাকবীর বলবে।........ শেষে বলবে-

اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ الصَّادِقَةِ الْمُسْتَجَابَةِ الْمُسْتَجَابُ لَهَا دَعْوَةِ الْحَقِّ، وَكَلِمَةِ التَّقْوَى، أَحْيِنَا عَلَيْهَا وَأَمِتْنَا عَلَيْهَا ، وَابْعَثْنَا عَلَيْهَا ، وَاجْعَلْنَا مِنْ خِيَارِ أَهْلِهَا أَحْيَاءً وَأَمْوَاتًا

(হে আল্লাহ! এই সত্য, কবুলকৃত ও মাকবুল দুআর প্রতিপালক! সত্যের ডাক ও তাকওয়ার কালেমার প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে এর উপর জীবিত রাখুন, এর উপর আমাদের মৃত্যুদান করুন, এর উপর আমাদের পুনরুত্থিত করুন এবং আমাদেরকে এর শ্রেষ্ঠ অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন)। তারপর নিজ প্রয়োজনীয় বিষয় আল্লাহ তা'আলার কাছে প্রার্থনা করবে। (হাকিম, আল মুসতাদরাক ২০০৪; ইবনুস সুন্নী, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লায়লা: ৯৮ বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ: ৪২৮)

বোঝা গেল আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়টা অবহেলায় নষ্ট না করে দুআয় রত থাকা উচিত। দুআ যেহেতু একটি ইবাদত, তাই এ সময়টা দুআর মধ্যে কাটালে তা ইবাদতের মধ্যেই কাটানো হলো, সে দুআ কোনও দুনিয়াবী বিষয়েই হোক না কেন। বিষয়টা যেহেতু আল্লাহ তা'আলার কাছে চাওয়া হচ্ছে, তাই তাও ইবাদতের মধ্যেই গণ্য হবে। আমরা এ বিষয়ে খুবই অবহেলা করে থাকি। এখানে অবহেলা দু'টি। এক তো হলো আযানের পর ১৫/২০ মিনিট কিংবা আধা ঘণ্টা পর জামাত শুরু হবে বিবেচনা করে গাফিলতির শিকার হয়ে যাই। জামাতের দেরি আছে বলে যেন সময়টার কোনও গুরুত্ব নেই। অথচ হাদীছ বলছে এ সময়টায় দুআ কবুল হয়।

দ্বিতীয় অবহেলা হলো দুনিয়াবী বিষয়ে চেষ্টা-তদবিরের যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, দুআয় সে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ দুনিয়ারও যে-কোনও বিষয়ে ইচ্ছা পূরণ হওয়া না হওয়াটা আল্লাহ তা'আলারই হাতে। তিনি চাইলে তা পূরণ হবে, না চাইলে পূরণ হবে না, তাতে যতই চেষ্টা করা হোক না কেন। সুতরাং একজন মুমিনের চেষ্টা-তদবির করার পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আল্লাহ তা'আলার কাছে কায়মনোবাক্যে দুআও করা উচিত। তাতে যেমন উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার বেশি আশা থাকে, তেমনি দুনিয়াবী বিষয় হওয়া সত্ত্বেও দুআ করার কারণে একটা ইবাদতও হয়ে গেল।

দুআ কবুলের একটা শর্ত
অনেকে বলে থাকে, হাদীছে তো নিশ্চিতভাবেই বলা হয়েছে দুআ প্রত্যাখ্যান করা হয় না। অর্থাৎ প্রতিটি দুআই কবুল হয়। অথচ এমন কত দুআই তো করা হয়, যা কবুল হতে দেখি না।

তাদের এরূপ বলাটা নিতান্তই ভুল। এরূপ বলা উচিত নয়। কেননা দুআ কবুল হওয়ার জন্য এটাও শর্ত যে, দুআকারী কবুলের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বে না এবং দেরি হচ্ছে বলে আক্ষেপ করবে না। হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. বর্ণিত এক হাদীছে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لاَ يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ " . قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الاِسْتِعْجَالُ قَالَ " يَقُولُ قَدْ دَعَوْتُ وَقَدْ دَعَوْتُ فَلَمْ أَرَ يَسْتَجِيبُ لِي فَيَسْتَحْسِرُ عِنْدَ ذَلِكَ وَيَدَعُ الدُّعَاءَ

বান্দা যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও গুনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার দুআ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার দুআ কবুল হয়, যদি না সে তাড়াহুড়া করে। জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাড়াহুড়া করা কী? তিনি বলেন, এরূপ বলা যে, আমি কত দুআ করেছি, কিন্তু আমার দুআ কবুল হতে দেখছি না। এভাবে সে হতাশ হয়ে দুআ ছেড়ে দেয়। (সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫; জামে' তিরমিযী: ৩৬০৪; মুসনাদে ইসহাক ইবন রাহুয়াহ: ৩০৬: বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ ৬৫৫; মুসনাদুল বাযযার ৬৬৬৬; সহীহ ইবন হিব্বান: ৮৮১; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৫৯২২; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৬৪২৯)

সুতরাং দুআ করতে হবে অবশ্যই কবুল হওয়ার দৃঢ় আশা রেখে। কিন্তু তাড়াহুড়া করা যাবে না কিছুতেই।

দুআ কবুল হওয়ার অর্থ
মনে রাখতে হবে, বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলা বান্দার নিজের চেয়েও বেশি কল্যাণকামী। তাই তিনি বান্দার দুআ কবুল করেন বান্দার কল্যাণ কীসে নিহিত, সে দৃষ্টিকোণ থেকে। সুতরাং দুআ কবুল হওয়ার অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ তা'আলা সর্বদা বান্দা যা চায় তা-ই দেবেন। কখনও তিনি তাও দেন বটে, কিন্তু অনেক সময় তার বদলে অন্য কিছু দেন। সে দেওয়াটা দুনিয়ার অন্য কিছুও হতে পারে কিংবা হতে পারে আখিরাতের কোনও প্রতিদান। সুতরাং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللهُ إِحْدَى ثَلَاثٍ، إِمَّا يُعَجِّلُ لَهُ دَعْوَتَهُ، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ، وَإِمَّا أَنْ يَدْفَعَ عَنْهُ مِنَ السَّوْءِ مِثْلَهَا قَالُوْا اِذَا نُكْثِرُ قَالَ اللهُ اَكْثَر

যে-কোনও মুসলিম এমন কোনও দুআ করে, যাতে কোনও গুনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার বিষয় নেই, আল্লাহ তা'আলা সে দুআর বিনিময়ে তাকে তিনটির কোনও একটি দেন। হয়তো সে যা চায় নগদ তা দিয়ে দেন অথবা তার জন্য আখিরাতে তা জমা করে রাখেন কিংবা তার থেকে তার সে চাওয়ার সমপরিমাণ কোনও অনিষ্ট দূর করেন। সাহাবীগণ বললেন, তবে তো ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা খুব বেশি বেশি দুআ করব। তিনি বললেন, আল্লাহ তা'আলা আরও বড় দাতা। (মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা ২৯১৭০; মুসনাদে ইবনুল জা'দ ৩২৮৩; বুখারী, আল আদাবুল মুফরাদ: ৭১০; মুসনাদে আহমাদ: ১১১৩৩; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ৪৩৬৮; হাকিম, আল মুসতাদরাক: ১৮২৯; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ১০৯০)

সারকথা, বান্দা তার প্রার্থনায় যা চায়, ঠিক তা না পেলেই যে তার দুআ কবুল হলো না, এ ধারণা ঠিক নয়। দুআ ঠিকই কবুল হয়, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তা কবুল করেন নিজ হিকমত অনুযায়ী। অবশ্য দুআ কবুল হওয়ার কিছু শর্তও আছে। যেমন উপার্জন হালাল হওয়া, অন্তরে পরিপূর্ণ ইখলাস থাকা, আল্লাহ তা'আলার প্রতি দুআ কবুল হওয়ার দৃঢ় আশা রাখা, দুআর ভেতর আল্লাহ তা'আলার পরিপূর্ণ অভিমুখী থাকা ও বিনয়-কাতরতা প্রকাশ করা, দুআ কবুলের জন্য তাড়াহুড়া না করা, দুআর সঙ্গে কোনও পাপের বিষয় সম্পৃক্ত না থাকা ইত্যাদি।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়টা দুআ কবুলের সময়।

খ. এ সময়টা কিছুতেই গাফিলতির ভেতর কাটানো উচিত নয়।

গ. এ সময় যত বেশি সম্ভব আল্লাহর দিকে রুজু থাকা ও দুআয় মশগুল থাকা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান