মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ১০২
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
দু'আ কবুল হওয়ার অর্থ এবং তার সূরতসমূহ

অনেকে অজ্ঞতা বশত দু'আ কবুল হওয়া বলতে কেবল এ কথাই বুঝে থাকে যে, বান্দা আল্লাহর কাছে যাই চাইবে নগদ নগদ হুবহু তাই সে পেয়ে যাবে। যদি তা না পায় তখন তারা মনে করে তাদের দু'আ বুঝি কবুলই হলো না। এটা অত্যন্ত ভুল ধারণা। বান্দার ইলম্ বা জ্ঞানের পরিধি অত্যন্ত সীমিত। বরং সৃষ্টিগত দিক থেকে সে যালুম-জাহুল-অত্যন্ত গোঁয়ার ও অজ্ঞ। অনেক বান্দা এমন রয়েছে, যাদের জন্যে বিত্ত-বিভব নিয়ামত স্বরূপ। আবার অনেকের জন্যে তা বিপদও বটে। অনেক বান্দার জন্যে হুকুমত বা শাসন ক্ষমতা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বড় ওসীলা স্বরূপ। পক্ষান্তরে হাজ্জাজ ও ইবনে যিয়াদের মত অনেকের জন্যে শাসনক্ষমতা আল্লাহ থেকে দূরত্ব ও তাঁর গযবের কারণ স্বরূপ হয়ে যায়। বান্দা জানেনা যে, কী তার জন্যে উত্তম আর কী তার জন্যে ফিৎনা বা বিষস্বরূপ। তাই অনেক সময় আল্লাহর দরবারে সে এমন বস্তু প্রার্থনা করে, যা তার জন্যে উত্তম নয় বা তা দান করা আল্লাহর হিকমতের পরিপন্থী। এ জন্যে পরম জ্ঞানী ও কুশলী আল্লাহ তা'আলার ইলম ও হিকমতের খেলাফ হয় যে বান্দা অজ্ঞতা বশত, যা চেয়ে বসেছে, তাই তাকে দিয়ে দেবেন। আবার এটাও তাঁর পরম বদান্যতার পরিপন্থী যে, বান্দা কাঙাল ও মিসকীনের মতো তাঁর কাছে হাত পাতবে আর তিনি তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন। তাই আল্লাহ তা'আলার নিয়ম হলো, তিনি তার দরবারে প্রার্থনাকারীকে খালি হাতে ফিরান না কখনো তিনি তাকে তার প্রার্থিত বস্তুই দান করেন। আবার কখনো তার পরিবর্তে পারলৌকিক বিরাট কোন নিয়ামত দানের ফয়সালা করেন। এভাবে বান্দার এ দু'আ তার আখিরাতের সম্বল হয়ে যায়। আবার কখনো এমন হয় যে, এ পৃথিবীর কার্যকারণের হিসাবে এ দু'আকারী ব্যক্তির উপর কোন বিপদ আপতিত হওয়ার মত থাকলে এ দু'আর কল্যাণে আল্লাহ তা'আলা সে বিপদ আপদ তার উপর পতিত হতে দেন না।

সর্বাবস্থায় দু'আ কবুল হওয়ার অর্থ হচ্ছে দু'আ কোন মতেই নিষ্ফলে যায় না। এবং দু'আকারী কখনো মাহরূম বা বঞ্চিত হয় না। আল্লাহ তা'আলা তাঁর ইলম ও হিকমত অনুসারে কোন না কোন দানে তাকে ধন্য করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত খুলাসা করে তা বর্ণনা করেছেন।
১০২. হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে মু'মিন বান্দা এমন কোন দু'আ করে, যাতে কোন গুনাহর বা আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা থাকে না, আল্লাহ তা'আলা তাকে তিনটি বস্তুর কোন একটি এর বিনিময়ে দান করেন।
১. হয়, সে যা প্রার্থনা করে তাই তিনি তাকে নগদ নগদ দান করেন।
২. নতুবা তার এ দু'আকে তার আখিরাতের সম্বল বানিয়ে দেন।
৩. নতুবা এ দু'আ অনুপাতে তার উপর পতিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল এমন কোন আপদ থেকে তিনি রহিত করে দেন।

তখন সাহাবীগণ বললেন: ব্যাপারটা যখন এরূপই (যে দু'আ সর্বাবস্থায়ই কবুল হয়ে থাকে এবং এর বিনিময়ে কিছু না কিছু পাওয়াই যায়), তা হলে আমরা বেশি বেশি দু'আ করবো।
জবাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহর কাছে তার চাইতেও অনেক বেশি আছে।
-(মুসনাদে আহমদ)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: " مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللهُ إِحْدَى ثَلَاثٍ، إِمَّا يُعَجِّلُ لَهُ دَعْوَتَهُ، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ، وَإِمَّا أَنْ يَدْفَعَ عَنْهُ مِنَ السَّوْءِ مِثْلَهَا "قَالُوْا اِذَا نُكْثِرُ قَالَ اللهُ اَكْثَرُ. (رواه احمد)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর কাছে রক্ষিত সম্পদ ভাণ্ডার অনন্ত অসীম এবং চিরস্থায়ী। যদি সকল বান্দা অহরহ তার দরবারে প্রার্থনা করতে থাকে আর তিনি প্রত্যেককেই দানের ফয়সালা করেন, তবুও তাঁর নিয়ামত রাশিতে সামান্যও ঘাটতি পড়বে না। মুস্তাদরকে হাকিমে হযরত জাবির (রা) বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, আল্লাহ তা'আলা যখন সেই বান্দাকে পরকালের জন্যে সঞ্চিত তার দুনিয়ার প্রার্থনা সমূহের বিনিময়ে রক্ষিত নিয়ামতরাশি দেখাবেন- যে দুনিয়াতে অনেক বেশি দু'আ করেছে অথচ বাহ্যত: দুনিয়ায় তা কবুল হয়নি তখন ঐ বান্দা বলে উঠবে:

يَا لَيْتَهُ لَمْ يُعَجِّلْ لَهُ شَيْءٌ مِنْ دُعَائِهِ (كنز العمال)
হায়, যদি দুনিয়ায় আমার কোন দু'আই কবুল না হতো আর এখানেই আমি সবগুলি দু'আর বিনিময় পেতাম তা হলে কতই না উত্তম হতো।
-(কানযুল উম্মাল পৃ: ৫৭ জিলদ-২)
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান