মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ২০৭
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
ব্যাপক অর্থবোধক বিভিন্নমুখী দু'আসমূহ

পূর্বেই বলা হয়েছে, হাদীসের কিতাব সমূহে রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে যে সব দু'আ বর্ণিত হয়েছে, বিষয়বস্তুর দিক থেকে বিচার করলে তা তিন প্রকারের:
১. ঐ সমস্ত দু'আ, যেগুলোর সম্পর্ক সালাতের সাথে।
২. যে গুলো কোন বিশেষ সময় স্থান বা অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত।
৩. ঐ সব দু'আ, যেগুলোর সম্পর্ক সালাত বা কোন বিশেষ স্থান-কাল-পাত্রের সাথে নয়; বরং সেগুলো সাধারণ প্রকৃতির।

প্রথমোক্ত দু'ধরনের দু'আ আমরা ইতিপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি। এবার তৃতীয় ধরনের দু'আ সমূহ পাঠক সমক্ষে পেশ করা হচ্ছে। এগুলোর অধিকাংশই হচ্ছে ব্যাপক অর্থবোধক। এ জন্যে হাদীসের ইমামগণ এসব দু'আকে جامع الدعوات শিরোনামের অধীনে তাঁদের সঙ্কলন সমূহে সঙ্কলিত করেছেন। এ দু'আগুলো উম্মতের জন্যে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ দান এবং অমুল্য উপহার। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে এগুলোর যথার্থ মূল্যায়নের, এগুলোর শুকরিয়া আদায়ের এবং এগুলোকে নিজেদের অন্তরের ধ্বনি এবং নাড়ির স্পন্দনে পরিণত করার তাওফীক দান করুন! যে বান্দাদের এ তাওফীক জুটে গেছে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে সবকিছুই পেয়ে গেছেন। এ ছোট ভূমিকার পর এ সিলসিলার হাদীসগুলো এবার পাঠ করুন:
২০৭. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রায়ই এরূপ দু'আ করতেন:

اَللّٰهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةٌ أَمْرِي وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِي الَّتِي فِيهَا مَعَادِي وَاجْعَلِ الْحَيَوةَ زِيَادَةً لِّي فِي كُلِّ خَيْرٍ وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِّي مِنْ كُلِّ شَرٍ

-"হে আল্লাহ! আমার দীনকে দুরস্ত করে দাও, আমার কল্যাণ ও নিরাপত্তা সবকিছু যার উপর নির্ভর করে, যা আমার সব কিছু এবং আমার দুনিয়াও দুরস্ত করে দাও, যেখানে আমাকে জীবন যাপন করতে হয় এবং আমার আখিরাতকে দুরস্ত করে দাও, যেখানে আমাকে ফিরে যেতে হবে এবং স্থায়ীভাবে থাকতে হবে এবং আমার জীবনকে সমূহ কল্যাণ বৃদ্ধির মাধ্যম বানিয়ে দাও! এবং আমার মরণকে সকল অকল্যাণ থেকে হিফাযত ও আরামের মাধ্যম বানিয়ে দাও!
-(মুসলিম)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: «اللهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي، وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي، وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِي الَّتِي فِيهَا مَعَادِي، وَاجْعَلِ الْحَيَاةَ زِيَادَةً لِي فِي كُلِّ خَيْرٍ، وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِي مِنْ كُلِّ شَرٍّ» (رواه مسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

বলাবাহুল্য, এ দুআটি অত্যন্ত ব্যাপক। তার সর্ব প্রথম বাক্যাটি হচ্ছে:

اَللّٰهُمَّ أَصْلِحْ لِي دِينِي الَّذِي هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِي

-"হে আল্লাহ্! আমার দীনী হালত দুরস্ত করে দাও যা আমার সবকিছু অর্থাৎ এরই উপর আমার সকল কল্যাণ ও নিরাপত্তা নির্ভর করে।"

বস্তুত দীনই হচ্ছে আসল বস্তু; যদি তা দুরস্ত হয়ে যায় তা হলে মানুষ আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও লা'নত-গযব থেকে রক্ষা পেয়ে তাঁর দয়া-দাক্ষিণ্যের পাত্র হয়ে যায় এবং ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে তার জানমাল ইজ্জত আবরূর জন্যে তা রক্ষাকবচ স্বরূপ হয়ে যায়। এজন্যে মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা, কল্যাণ ও সাফল্য মূলত এরই উপর নির্ভরশীল। নবী করীম ﷺ-এর দু'আতে একেই عِصْمَةُ أَمْرِي বলে অভিহিত করা হয়েছে। দীন দুরস্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, বান্দার ঈমান-একীন তথা তার বিশ্বাস ও ধ্যান ধারণা সহীহ এবং তার আমল আখলাক ও চালচলন দুরস্ত হবে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সে প্রবৃত্তির চাহিদার পরিবর্তে আল্লাহর হুকুম ও বিধিনিষেধের অনুসারী হবে। বলা বাহুল্য, তা আল্লাহ প্রদত্ত তাওফীকের উপরই নির্ভরশীল। এজন্যে প্রতিটি মু'মিন বান্দার অন্তরের সবচাইতে বড় চাওয়া-পাওয়া তাই হওয়া উচিত, যা এ দু'আর দ্বিতীয় বাক্যে উচ্চারিত হয়েছে:

وَأَصْلِحْ لِي دُنْيَايَ الَّتِي فِيهَا مَعَاشِي

"আর আমার দুনিয়া দুরস্ত করে দাও, যেখানে আমাকে জীবন ধারণ করতে হয়।"
দুনিয়া দুরস্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে এই যে, এখানকার জীবিকা ইত্যাদি যেন হালাল ও জায়িয পথে আসে। নিঃসন্দেহে প্রতিটি মু'মিন বান্দার দ্বিতীয় কাম্য এটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়।

দু'আর তৃতীয় অংশ হচ্ছে : -وَأَصْلِحْ لِي آخِرَتِي الَّتِي فِيهَا مَعَادِي
-"আর আমার আখিরাতকে দুরস্ত করে দিন, যেখানে আমাকে ফিরে যেতে হবে এবং স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে হবে।"
যদিও দীন দুরস্ত হলেই আখিরাতের মঙ্গল লাভ অনিবার্য; তবুও রাসূলুল্লাহ ﷺ পৃথক ভাবে আখিরাত দুরস্ত হওয়ার দু'আ করেছেন। এর প্রথম কারণ সম্ভবত এই যে, আখিরাতের গুরুত্ব অপরিসীম, তাই এটা তার হক। দ্বিতীয় কারণ এও হতে পারে 'যে, দীনী দিক থেকে উত্তম অবস্থায় থাকলেও মু'মিন বান্দার আখিরাত সম্পর্কে নিরুদ্বেগ থাকা উচিত নয়। কুরআন মজীদে উত্তম বান্দাদের শান বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: ১,

{وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ} [المؤمنون: 60]

দু'আর চতুর্থ ও পঞ্চম অংশ হচ্ছে:

وَاجْعَلِ الْحَيَوةَ زِيَادَةً لِّي فِي كُلِّ خَيْرٍ وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِّي مِنْ كُلِّ شَرٍ

এবং দুনিয়ার জীবনকে আমার জন্যে কল্যাণ ও পুণ্য বৃদ্ধি এবং মৃত্যুকে সমস্ত অকল্যাণ ও পাপতাপ থেকে মুক্তি ও আরামের ওসীলা বানিয়ে দাও!

এ পৃথিবীতে জীবনের মেয়াদ পূর্ণ করে প্রতিটি মানুষকেই নিশ্চিত ভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে। আল্লাহর দেয়া এ আয়ুষ্কাল সে পুণ্যকর্মের মাধ্যমেও অতিবাহিত করতে পারে, আবার পাপকর্মের মাধ্যমেও অতিবাহিত করতে পারে। এ জীবন তার সৌভাগ্য আর তরক্কীর কারণও হতে পারে আবার দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্য বৃদ্ধির কারণও হতে পারে। এ সব কিছুই আল্লাহ তা'আলার হাতে। এজন্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ দীন দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল কামনার সাথে সাথে এ দু'আও করতেন যে, হে আল্লাহ! আমার জীবন কালকে কল্যাণ ও সৌভাগ্য বৃদ্ধির ওসীলা বানিয়ে দাও অর্থাৎ আমাকে তাওফীক দান কর যেন এ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এবং জীবনের প্রতিটি সময় তোমার সন্তুষ্টির কাজে ব্যয় করতে পারি; যাতে আমি সৌভাগ্য ও সফলতার সোপানসমূহ অতিক্রম করে ক্রমশ উন্নতি-অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাই আর আমার মৃত্যুকে নানারূপ অনিষ্ট ও ফিৎনা-ফ্যাসাদের কষ্ট থেকে মুক্তির মাধ্যম বানিয়ে দিন অর্থাৎ ভবিষ্যতে যতরূপ অনিষ্ট ও ফিৎনা-ফ্যাসাদ আমার কষ্টের কারণ হতে পারে
তোমার হুকুমে আগমনকারী যে মৃত্যু, সে সব থেকে আমার মুক্তির মাধ্যম ও আরামের কারণ হোক।
এ দু'আটিও جَوَامِعُ الْكَلِم বা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ব্যাপক অর্থবোধক বাণী সম্পন্ন এবং সমুদ্রকে কৌটায় ভর্তি করার প্রবাদ বাক্যটির উজ্জ্বলতম উদাহরণ। কত সংক্ষেপে কী বিপুল অর্থ এতে প্রকাশ করা হয়েছে।

টিকা ১. এ আয়াতে মু'মিন বান্দাদের গুণাবলী বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, তারা সাদকা-খয়রাত করেন এবং তাদের মনে আমার ভয় থাকে যে, না জানি তা কবুল হয় কি না?
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান