মা'আরিফুল হাদীস

আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়

হাদীস নং: ৩০৪
আযকার এবং দাওয়াত অধ্যায়
উদ্দেশ্য সিদ্ধি এবং প্রয়োজন পূরণেও দরূদ পাঠ সমধিক কার্যকরী
৩০৪. হযরত উবাই ইব্‌ন কা'আব (রা) থেকে বর্ণিত। আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খিদমতে আরয কলাম, আমি চাই যে, আপনার প্রতি সালাত (দরূদ) অধিক পরিমাণে প্রেরণ করি। তাহলে আমি কী পরিমাণে তা করতে পারি? (অর্থাৎ নিজের জন্য যে পরিমাণ দু'আ কার্যকর, তার অনুপাতে কত অংশ আপনার জন্যে দরূদের উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করবো?) তিনি বললেন: তুমি যতটুকু চাইবে ততটুকু। তখন আমি বললামঃ এক চতুর্থাংশ? জবাবে তিনি বললেন: তুমি যতটুকু চাইবে ততটুকু, তবে ততোধিক করলে তা তোমার জন্যে উত্তম হবে। আমি বললাম: তাহলে তিন ভাগের দু'ভাগ? তিনি বললেন: তুমি যতটুকু চাইবে ততটুকু, তবে ততোধিক হলে তা তোমার জন্যে উত্তম। তখন আমি বললাম: তা হলে আমার গোটা দু'আর সময়টাই সালাতের জন্যে নির্ধারিত করে নিলাম। তখন তিনি বললেন: তাহলে তোমার সকল প্রয়োজন আল্লাহর পক্ষ হতে পূরণ করা হবে (অর্থাৎ তোমার গায়েবী তাবৎ ইহলৌকিক পরলৌকিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারসমূহ আল্লাহর গায়েবী ভান্ডার থেকে পূরণ করে দেওয়া হবে এবং তোমার সকল গুনাহ মার্জনা করে দেওয়া হবে।
- (জামে' তিরমিযী)
کتاب الاذکار والدعوات
عَنِ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، قَالَ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ إِنِّي أُكْثِرُ الصَّلاَةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلاَتِي؟ فَقَالَ: مَا شِئْتَ. قَالَ: قُلْتُ: الرُّبُعَ، قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قُلْتُ: النِّصْفَ، قَالَ: مَا شِئْتَ، فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قَالَ: قُلْتُ: فَالثُّلُثَيْنِ، قَالَ: مَا شِئْتَ، فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قُلْتُ: أَجْعَلُ لَكَ صَلاَتِي كُلَّهَا قَالَ: إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ، وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ. (رواه الترمذى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হাদীসের মর্ম আনুধাবনের জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা অনুবাদের ফাঁকে ফাঁকে (বন্ধনীযোগে) করে দেওয়া হয়েছে। সাধারণভাবে হাদীসের ভাষ্যকারগণ বলেছেন, এ হাদীসে 'সালাত' শব্দটি দু'আ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে- যা তার আসল অর্থও বটে।

হযরত উবাই ইব্‌ন কা'আব (রা) সে সব অতি ভাগ্যবান সাহাবীগণের অন্যতম-যাঁরা অধিক পরিমাণে দু'আ-দরূদ ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটিতে অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করতেন। একদা তাঁর অন্তরে এ চিন্তার উদ্রেক হলো যে, আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি ও দু'আতে যে সময়টা অতিবাহিত করে থাকি, তার মধ্যে একটা নির্দিষ্ট অংশ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সালাত এর উদ্দেশ্যে খাস করে নিলে উত্তম হয়। এ ব্যাপারে তিনি স্বয়ং হুযুর পাক ﷺ-এরই শরণাপন্ন হলেন এবং কতটুকু অংশ তিনি এ জন্যে নির্ধারিত করবেন তার পরামর্শ চাইলেন। হুযুর ﷺ এজন্যে কোন সময় সীমাবদ্ধ করতে পসন্দ করলেন না, বরং তা তাঁর নিজের ইচ্ছার উপরই ছেড়ে দিলেন এবং এদিকে ইঙ্গিত করলেন যে, এ জন্যে তুমি যতবেশি সময় দিতে পারবে, তা তোমার জন্যে ততই মঙ্গলজনক হবে। অবশেষে এক পর্যায়ে এসে তিনি তার দু'আর সমস্ত সময়টাই হুযুর ﷺ-এর প্রতি সালাত ও সালামে ব্যয়িত করার সকল্প ব্যক্ত করলেন। তাঁর এ ফয়সালার প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে এ সুসংবাদ দিলেন যে, তুমি এমনটি করলে তোমার যতপ্রকার কঠিন সমস্যা রয়েছে-যার জন্যে তোমরা দু'আ করে থাকো, আল্লাহ তা'আলার দয়ায় সেগুলোর আপনা-আপনিই সমাধান হয়ে যাবে এবং তোমার পূর্বকৃত গুনাহ রাশি মাফ করে দিবেন এবং সে ব্যাপারে কোনরূপ জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।

'মা'আরিফুল হাদীসের' এ খণ্ডেই কুরআন মজীদ তিলাওয়াতের ফযীলতের বর্ণনা প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীসে কুদসী সংবলিত বাণী উদ্ধৃত করা হয়েছে। যাতে আছে:
مَنْ شَغَلَهُ الْقُرْآنُ عَنْ ذِكْرِى وَمَسْئَلَتِي أَعْطَيْتُهُ أَفْضَلَ مَا أُعْطِي السَّائِلِينَ
যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে, এছাড়া আল্লাহর অন্যান্য যিকর এবং নিজ অভাব-অনটনের জন্যে যাচ্ঞা-প্রার্থনা করার সময়ও সে পায় না, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে যা দেওয়া হবে সে যাচ্ঞাকারীদের তুলনায় অনেক অনেকগুণ বেশি ও উত্তম হবে।

যেভাবে ঐ হাদীসে সবসময় কুরআন মজীদ তিলাওয়াতে ব্যস্ত ব্যক্তির জন্যে আল্লাহ তা'আলার খাস রহমত ও দানের উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এরূপ ব্যক্তিবর্গকে যাচ্ঞাকারীদের তুলনায় এবং যিকর দু'আকারীদের তুলনায় অনেক উত্তম প্রতিদান দেওয়া হবে, ঠিক তেমনি উবাই ইব্‌ন কা'আব (রা) বর্ণিত এ হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এসব মুখলিস ও প্রেমিক উম্মতীদের জন্যে-যারা নিজেদের অভাব অনটনের জন্যে দু'আ করার কথা বিস্মৃত হয়ে সমস্তটা সময় কেবল প্রিয় নবীর প্রতি দরূদ পাঠে-তাকে সালাত ও সালাম প্রেরণের জন্যে ওয়াক্ত করে রেখেছেন এবং নিজেদের অভাব-অনটন সংক্রান্ত দু'আর পরিবর্তে তখনও নবীজীর প্রতি সালাত ও সালামেও অতিবাহিত করেন তাঁদের জন্যে আল্লাহ্ একান্ত খাস রহমতের সুসংবাদ দিয়েছেন এবং আরো বলেছেন যে, তাদের সকল কঠিন ও গুরুতর সমস্যার তিনি অত্যন্ত সহজ সমাধান গায়েব থেকে করে দেবেন এবং তাদের গুনাহ মার্জনা করে দেয়া হবে।

এর রহস্য কথা হলো এই যে, যেভাবে কুরআন মজীদ নিয়ে ব্যস্ততা এবং একেই ওযীফা বা জপমালা বানিয়ে নেওয়াটা আল্লাহর পবিত্র গ্রন্থের প্রতি পরম বিশ্বাস ও চরম আসক্তির নিদর্শন স্বরূপ এবং এজন্যেই এমন ব্যক্তিরা আল্লাহর খাস রহমতের যোগ্যতর পাত্র; অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সালাত ও সালামের এমন নিষ্ঠাপূর্ণ আসক্তি যে, নিজের অভাব অনটনের কথা পর্যন্ত বিস্মৃত হয়ে আল্লাহর রাসূলের প্রতি কেবল সালাত-সালাম প্রেরণ করা আল্লাহর প্রিয় নবীর প্রতি নিখাঁদ ভালবাসা ও সাচ্চা ঈমানেরই পরিচায়ক, এমন মুখলিস বান্দারাও সে অধিকারের হকদার যে, আল্লাহ তা'আলা না চাইতেই তাদের সকল সমস্যার সমাধান ও সকল অভাব-অনটন পূরণ করে দেবেন।

এ ছাড়া সে সব হাদীসও বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোতে বলা হয়েছে যে, যেকোন বান্দা যখন একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সালাত ও সালাম প্রেরণ করে, তখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে দশটি করে রহমত তার প্রতি বর্ষিত হয়ে থাকে, তার আমলনামায় দশটি করে নেকি লিখিত হয়, দশটি গুনাহ মোচন করে দেওয়া হয় এবং দশটি স্তরে তার মর্যাদা উন্নীত হয়। একটু ভেবে দেখুন তো, যে বান্দাটির অবস্থা এমন হবে যে, সে তার ব্যক্তিগত দু'আর সময়টাও কেবলমাত্র প্রিয় নবীর জন্যে সালাতের দু'আয় কাটিয়ে দেয়, নিজের জন্যে কিছু চাওয়ার বা প্রার্থনার সময় পর্যন্ত তার হয়ে উঠে না, তার প্রতি আল্লাহর রহমত কী মুশলধারে বর্ষিত হতে পারে!

তার অপরিহার্য ফল দাঁড়াবে এই যে, সে না চাইতেই আল্লাহর রহমত এসে তার সকল অনটন পূর্ণ করবে, তার সকল অভাব মিটিয়ে দেবে। গুনাহরাশির প্রভাব থেকে সে ব্যক্তি পূর্ণ অব্যাহতি পেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে। আল্লাহ তা'আলা এসব হাকীকতের পূর্ণ প্রত্যয় ও আমল নসীব করুন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান