মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ৩৬৭
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
মু'আমালাত বা লেন-দেন পর্ব

মানুষের অর্থনৈতিক প্রয়োজন

এ অধ্যায়ে রয়েছে আল্লাহ প্রদত্ত হিদায়াত ও এর মৌলিক নীতি

আল্লাহ তা'আলা মানুষকে মিলে-মিশে বসবাসের স্বভাব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ মানুষের স্বভাবগত প্রকৃতি এরূপ যে, সে তার এই জীবনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ব্যবহারিক লেন-দেনের মুখাপেক্ষী। প্রত্যেক ব্যক্তি ও শ্রেণীর প্রয়োজনসমূহ খুবই সীমিত যে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রম করে কেবল দিন কাটাবার পয়সা উপার্জন করে, তারও প্রয়োজন রয়েছে ঐ ব্যক্তির যার থেকে সে নিজের ও সন্তানদের উদরপূর্তির জন্য খাদ্যশস্য ইত্যাদি ক্রয় করতে পারে। আর শস্য উৎপন্নকারী কৃষকের সেই শ্রমিক প্রয়োজন যার থেকে সে তার কৃষি ভূমির কাজে সাহায্য নিতে পারে। এভাবে শ্রমিক ও কৃষক উভয়ের প্রয়োজন সেই লোকের যে তাদের পোশাকের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য কাপড় তৈরী করে এবং এরা তার থেকে সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে কাপড় ক্রয় করতে পারে। আর কাপড় প্রস্তুতকারীর, সেই ব্যক্তি বা এজেন্সির প্রয়োজন যার থেকে সে সুতা কিংবা রেশম ও কাপড় তৈরীর অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য নগদ বা বাকীতে ক্রয় করতে পারে। এরপর তাদের মধ্য থেকে যদি কারো বসবাসের জন্য দালান তৈরী করতে হয় তবে তার প্রয়োজন হবে কারো থেকে ইট, সিমেন্ট ইত্যাদি নির্মাণ সামগ্রী ক্রয় করার। আর তা তৈরীর জন্য রাজমিস্ত্রী ও শ্রমিকের প্রয়োজন। আল্লাহ না করুন এদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে তখন প্রয়োজন হবে ডাক্তার-কবিরাজের নিকট যাবার এবং ওষুধ ক্রয়ের জন্য ডিসপেন্সারীর। বস্তুত জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসায়িক বিনিময়, শ্রম ও শিল্প, কৃষি, কর্জ, ধার ইত্যাদি সামাজিক কার্যাবলী এ জগতে মনুষ্য জীবনের অত্যাবশ্যকীয় জিনিস। এই কার্যাবলীর মধ্যে কখনো কখনো কলহ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। এর মীমাংসার জন্য প্রয়োজন ন্যায় ইনসাফের কোন শাসন ও আইন কানুন। এসব যা বলা হল কোন দর্শন বা যুক্তিবিদ্যার তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। সবই প্রত্যক্ষ দর্শনীয় এবং আমাদের সবার প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা।

আল্লাহ তা'আলা নবীগণের মাধ্যমে এবং সর্বশেষে খাতিমুল আম্বিয়া সায়্যিদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর মাধ্যমে যে ভাবে মানুষকে এ পথ প্রদর্শন করেছেন যে, তারা নিজেদের জন্ম-মৃত্যু সম্বন্ধে, নিজেদের সৃষ্টিকর্তা মালিক ও মাবুদের সত্তা ও গুণাবলী এবং তাওহীদ ও আখিরাত ইত্যাদি সম্বন্ধে কি আকীদা বিশ্বাস পোষণ করবে এবং কিভাবে তাঁর ইবাদত করবে, কোন কোন কার্যাবলী তাদের আত্মীক ও মনুষ্য মর্যাদার জন্য ধংসাত্মক ও ক্ষতিকর যা থেকে তারা বেঁচে থাকবে এবং চারিত্রিক সামাজিক বিষয়ে তাদের রীতি কি হবে। অনুরূপভাবে তিনি ক্রয়-বিক্রয়, শিল্প ব্যবসায় এবং শ্রম ইত্যাদি সামাজিক কার্যাবলী যা বাহ্যত মানুষের নিরেট পার্থিব প্রয়োজনাদি সম্বন্ধেও সেই মূলনীতি ও পন্থাসমূহের পথপ্রদর্শন করেছেন যা মনুষ্য সম্মান ও মর্যাদার সাথে সংগতিশীল এবং যাতে রয়েছে মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা।

এর ফলশ্রুতিতে ইহাই হয়েছে যে, আল্লাহর এই নির্দেশ ও এ শাখা সম্বন্ধে শরীয়তের আহকামের অনুসরণ করে এ সব কাজ করা এখন দুনিয়া নয়, বরং সত্যিকার দীন ও অর্থপূর্ণ এক ইবাদত। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে এ জন্য ঐরূপ সওয়াব ও পুরস্কার এবং জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যেরূপ নামায়, রোযা ও যিকর তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদত ও উত্তম চরিত্রের জন্য রয়েছে। আর যেভাবে রয়েছে দিনের দাওয়াত ও আল্লাহর পথে জান-মাল কুরবানির ওপর। মনুষ্য জীবনের এ শাখা অর্থাৎ, পারস্পরিক লেন-দেন সম্বন্ধে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মাধ্যমে যে দিক-নির্দেশনা ও নির্দেশাবলী উন্মতের নিকট পৌঁছেছে তার ভিত্তি, আমি যা বুঝেছি চারটি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১. আল্লাহর সৃষ্টির উপকার করা, ২. ন্যায় বিচার, ৩. সততা ও বিশ্বস্ততা ও ৪. নম্রতা অর্থাৎ এক দল অন্য দলের সাথে শুভাকাংখীর আচরণ করবে। বিশেষ করে দুর্বল ও অভাবগ্রস্ত-শ্রেণীকে যথাসম্ভব সুযোগ দেয়া হবে।

এ ভূমিকার পর সম্মানিত পাঠকগণ আর্থিক লেন-দেন সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপদেশাবলী ও শিক্ষা নিম্নে পাঠ করুন।

আল্লাহ তা'আলা তাঁর লিখক বান্দাকে, উপরোক্ত পাঠকবর্গ ও শ্রোতামন্ডলীকে উপদেশাবলী ও বাণীসমূহের যথাযথ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন। সর্বপ্রথম হুজুর ﷺ-এর কতিপয় বাণী লিপিবদ্ধ করা যাচ্ছে, যেগুলোতে আর্থিক লেন-দেনকে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে এবং সেগুলোর জন্য পুরস্কার ও সওয়াবের সুসংবাদ শুনান হয়েছে।

হালাল উপার্জনের চিন্তা ও চেষ্টা ফরযসমূহের অন্তর্ভুক্ত
৩৬৭. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, হালাল উপার্জনের চেষ্টা ফরযসমূহের পর ফরয। (বায়হাকীর শু‘আবুল ঈমান)
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ عَبْدِ اللهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " طَلَبُ كَسْبِ الْحَلَالِ فَرِيضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ " (رواه البيهقى فى شعب الايمان)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারগণ হাদীসের উদ্দেশ্য এই বর্ণনা করেছেন এবং বাহ্যত এটাই যে, আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান, নামায, যাকাত ইত্যাদি যা ইসলামের প্রাথমিক ও মৌলিক রুকন ও ফরজসমূহ রয়েছে, শ্রেণী ও মর্যাদার দিক থেকে এ সবের পর হালাল রুজি উপার্জনের চিন্তা ও চেষ্টা ইসলামে ফরজ। বান্দা যদি এ বিষয়ে অমনোযোগী হয় ও চেষ্টায় ত্রুটি করে তবে হারাম উপার্জনে পেট ভরার আশঙ্কা রয়েছে। আর আখিরাতে তার পরিণতি তাই হবে বা হারাম ভক্ষণকারীদের জন্য বলা হয়েছে। আল্লাহর পানাহ চাই।

একথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহ তা'আলার নির্ধারিত কোন ফরয পূর্ণ করা স্ত্রীর বন্দেণী ও ইবাদত হিসাবে গণ্য এবং বান্দা এ জন্য সেই সওয়াব পুরস্কারের উপযুক্ত যা ফরযসমূহ পূর্ণ করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া চাই। সুতরাং হালাল উপার্জনের চিন্তা ও চেষ্টা এবং এতে ব্যস্ত হওয়া নিশ্চিত দীন ও ইবাদত এবং পুরস্কার ও সওয়াবের কারণ। আলোচ্য হাদীসে হালাল উপার্জন অন্বেষণকারী ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, কুঠির শিল্পী সবার জন্য কত বিরাট সুসংবাদ রয়েছে। তবে সর্বাবস্থায় এ কথার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে যে, এ হাদীলে কেবল উপার্জন করাকে নয় বরং হালাল উপার্জনের অন্বেষণ ও চিন্তাকে অবশ্য কর্তব্য বলা হয়েছে। এ বাণীর বিশেষ উদ্দেশ্য হারাম থেকে বাঁচানো।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান