মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ৪০১
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
সুদ

দুনিয়ার অন্যান্য দেশ ও জাতির ন্যায় আরবদের মধ্যেও সুদী লেন-দেনের প্রচলন ছিল। আর এখানের সুদখোর মহাজনদের ন্যায় সেখানেও কত পুঁজিপতি এ ব্যবসা করত। যার প্রচলিত প্রসিদ্ধ পন্থা এটাই ছিল যে, অভাবী লোক তাদের নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করত এবং শর্ত আরোপিত হত যে, এ টাকা সে অমুক সময় লাভসহ আদায় করবে। এরপর যদি নির্ধারিত সময়ে ঋণ গ্রহীতা পরিশোধ করতে অক্ষম হয় তবে সময় নিত এবং এ সময়ের হিসাবে সুদের টাকায় আরো অতিরিক্ত আরোপিত হত। এভাবে দরিদ্র ঋণ গ্রহীতার বোঝা বেড়ে যেত আর সুদখোর মহাজন তাদের রক্ত চুষত। একথা সুস্পষ্ট যে, বিষয়টি ইসলামের মূল স্পীরিট ও স্বভাবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। ইসলামের শিক্ষা ও নির্দেশ ইহার একেবারে বিপরীত দরিদ্রদের সাহায্য করা হবে, অসহায়দের সহায়তা দেয়া হবে এবং প্রয়োজনশীলদের প্রয়োজন পূর্ণ করা হবে। আর এগুলো নিজের পার্থিব কোন লাভ ও সংখ্যা সুবিধার জন্য নয় বরং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের পুণ্যের জন্য করা হবে।

আল্লাহ তা'আলা স্বীয় পবিত্র কিতাব কুরআন মজীদে এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর মহান বাণীতে যেভাবে মানুষকে অশ্লীলতাসমূহের মূল-মদ থেকে রক্ষা করতে ক্রমান্বয়ের নীতি গ্রহণ করেছিলেন অনুরূপভাবে সুদের জবরদস্তী ও অভিশপ্ত ব্যবসা-নীতি বিলীন করার জন্যও উক্ত বাস্তব কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। প্রথম দিকে বহু দিন পর্যন্ত কেবল হ্যাঁ মূলক প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন যে, আপন সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, দরিদ্রদের সাহায্য কর, অসহায়দের আশ্রয়দান কর, প্রয়োজনশীলদের প্রয়োজনগুলো পূর্ণ কর, দয়া, বদান্যতা ও অন্যকে প্রাধান্য প্রদানের ন্যায় স্বভাবকে আয়ত্ব কর। বলা হয়েছে, তুমিও ধ্বংসশীল তোমার সম্পদও ধ্বংস হয়ে যাবে। এজন্য এ সম্পদের দ্বারা আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতা ও জান্নাত অর্জন কর, কারূণের মত সম্পদ পূজারীদের পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর।

এ শিক্ষা ও উপদেশ এবং এ অনুযায়ী কার্যক্রম সমাজের স্বভাব এরূপ তৈরি করে এবং পরিবেশ এজন্য গঠিত হয়ে যায় যে, জুলুম ও মানবতাবর্জিত ব্যবসা (রিবা-সুদ)-সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার আইন জারি করা হবে। সুতরাং সূরা বাকারার শেষাংশে ২৭৫ আয়াত হতে ২৮০ আয়াত পর্যন্ত এমন সব আয়াত নাযিল হয়েছে যেগুলোতে রিবা (সুদ) সুস্পষ্টভাবে হারাম করা হয়েছে। (অর্থাৎ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا থেকে وَأَنْ تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ পর্যন্ত) এসব আয়াতে এটাও সুস্পষ্ট করা হয়েছে যে, যদি পূর্বের লেন-দেন পরম্পরায় কারো কোন সুদী টাকা কোন ঋণগ্রহীতার নিকট বাকি থেকে থাকে তবে এখন তাও নেয়া যাবে না। এসব আয়াতেরই শেষে এ ঘোষণাও করা হয়েছে যে, সুদী ব্যবসা হারাম, এ ঘোষণার পরও যে সব লোক বিরত থাকবে না এবং আল্লাহর আইনের অবাধ্যতা করবে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছেঃ
فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ
এ ভীতি প্রদর্শন (অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে যুদ্ধ ঘোষনার ভীতি প্রদর্শন) সুদী ব্যবসা ছাড়া ব্যভিচার, মদ, অন্যায় হত্যা ইত্যাদি বড় বড় পাপের ব্যাপারে কুরআন মজীদে যুদ্ধ ঘোষণার আয়াত নাযিল হয়নি। এতে বুঝা যায় যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দৃষ্টিতে এ পাপ অন্যান্য পাপ থেকে অধিক কঠোর ও ভারী।
সামনে বর্ণিতব্য হাদীসমূহ থেকে জানা যাবে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ খাওয়াকে চূড়ান্ত পর্যায়ের কবীরা গুনাহগুলোর মধ্যে পরিগণিত করেছেন। সুদ গ্রহণকারীর সাথে সুদ প্রদানকারী এমনকি সুদের দলিল লেখক ও এর সাক্ষীগণকেও অভিশাপযোগ্য নির্ধারণ করেছেন। আর কোন কোন বর্ণনায় সুদের গুনাহ ব্যভিচার থেকে সত্তর গুণ অধিক বলা হয়েছে।
৪০১. হযরত আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, সাতটি ধ্বংসকারক গুনাহ হতে বিরত থাক। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ ﷺ সেইগুলো কি কি? তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে (তাঁর ইবাদতে, গুণাবলীতে অথবা কার্যাবলীতে কাউকে) শরীক করা, জাদুকরা, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল খাওয়া, আর (নিজের প্রাণ বাঁচাবার জন্য) যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যকে রেখে পলায়ন করা এবং সতী-সাধ্বী নারীদের প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ রটনা করা। (সহীহ বুখারী, মুসলিম)
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اجْتَنِبُوا السَّبْعَ المُوبِقَاتِ»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: «الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ اليَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ المُحْصَنَاتِ المُؤْمِنَاتِ الغَافِلاَتِ» (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীসে যে সব গুনাহ থেকে বাঁচার তাগিদ করেছেন সেগুলো অত্যন্ত মন্দ ও অশ্লীলতম কবীরা গুনাহ। এগুলোকে রাসূলুল্লাহ ﷺ ধ্বংসকারী বলেছেন। (অর্থাৎ মানুষ ও তার ঈমানের প্রাণ সত্তা ধ্বংসকারক)। এগুলোর মধ্যে তিনি শিরক, জাদু ও অন্যায় হত্যার পর সুদ খাওয়া (সুদ-গ্রহণ ও খাওয়া)-এর উল্লেখ করেছেন। আর এগুলোকে ঈমানের সজীবতা হত্যাকারী ও ধ্বংসকারী বলেছেন। যেভাবে ডাক্তার ও কবিরাজ নিজেদের বিদ্যার আলোকে ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জগতে যমিন হতে উৎপন্ন দ্রব্যাদি, ঔষধ ও খাদ্য ইত্যাদির বিশেষণ বর্ণনা করেন যে, অমুক জিনিসে অমুক গুণ ও প্রভাব রয়েছে আর এটা মানুষের অমুক রোগের জন্য উপকারী কিংবা ক্ষতিকর, অনুরূপভাবে নবীগণ আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক প্রদত্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষের আকীদা ও চিন্তা, আমল ও চরিত্রের বিশেষত্ব ও পরিণাম বর্ণনা করেন যে, অমুক ঈমানী আকীদা, অমুক নেক কর্ম ও অমুক উত্তম স্বভাব-এর পরিণতি হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি, আখিরাতে জান্নাতের নিয়ামত এবং আত্মা ও প্রাণের শান্তিদায়ক। আর অমুক কুফরী ও শিরকী আকীদা, অমুক যুলুম ও অবাধ্যতার পরিনতি হচ্ছে- আল্লাহর লা'নত, দোযখের আযাব ও দুনিয়ায় রকমারী পেরেশানী ও অশান্তি। পার্থক্য এতটুকু যে, কবিরাজ ও ডাক্তারদের গবেষণা ও নিশ্চয়তার মধ্যে ভুলের সম্ভাবনা এবং কখনো কখনো ভুলের শিকার হয়ে যান। কিন্তু আম্বিয়া কিরামের ইলমের ভিত্তি জগত স্রষ্টা, সর্বজ্ঞ আল্লাহ তা'আলার ওহীর প্রেক্ষিতে হয়ে থাকে। এতে কোন প্রকার ভুল-ভ্রান্তি অথবা ভুলের সম্ভাবনা এবং কোন সন্দেহের অবকাশই নেই। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- কবিরাজ ও ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশনকৃত ঔষধগুলোকে সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের প্রতি আস্থার কারণে ব্যবহার করে। নিষেধের ব্যাপারে তারা যে নির্দেশ দেন তাও যথানিয়মে পালন করা অবশ্য কর্তব্য মনে করা হয়। আর এটাকেই বুদ্ধির দাবী মনে করা হয়। কোন রোগীর এ অধিকার সমর্থন করা হয় না যে, সে বলবে, আমি এ ঔষধ তখনই ব্যবহার করব যখন এর প্রভাবের দর্শন আমাকে বুঝান হবে। অথচ আল্লাহ তা'আলার কিতাব কুরআন মজীদ আর তাঁর সত্য রাসূল খাতিমুন্নাবিয়িন ﷺ যেমন সুদের ব্যাপারে বলেছেন, এটা শক্ত গর্হিত কবীরা গুনাহ ও ধ্বংসকারকদের মধ্যে একটি, আল্লাহর অভিশাপ ও ক্রোধের কারণ এবং ঈমানের প্রাণ সংহারক, সুদখোরদের জন্য আখিরাতে ভয়ঙ্কর শাস্তি রয়েছে। তখন বহু বুদ্ধিমান ও ঈমানের দাবিদারদের জন্য এটা যথেষ্ট হয়নি, তারা এ নিষেধের দর্শন জানা আবশ্যক মনে করে বসে। আল্লাহ তা'আলা অন্তরসমূহকে ঈমান ও ইয়াকীন দান করুন।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
মা'আরিফুল হাদীস - হাদীস নং ৪০১ | মুসলিম বাংলা