মা'আরিফুল হাদীস

মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়

হাদীস নং: ৪৬৮
মু‘আশারাত ও মু‘আমালাত অধ্যায়
ওসীয়ত
৪৬৮. হযরত সা'দ ইবনে আবি ওক্কাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মক্কায় (ভীষণ রোগাক্রান্ত হই) রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে দেখতে এলেন। এটা আমি খুবই অপসন্দ করতাম যে, আমার মৃত্যু মক্কার জমীনে হোক, যে জমীন থেকে আমি হিজরত করেছি। (যা সর্বদার জন্য আমি পরিত্যাগ করেছি)। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ (দু'আ স্বরূপ আমাকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য) বললেন, আল্লাহ, আফরার ছেলে (সা'দ)-এর প্রতি (সা'দের মা'র নাম অথবা উপাধী আফরা ছিল) রহম করুন, আমি তাকে (ফাতওয়া হিসাবে জিজ্ঞাসা করলাম, হুজুরের কি অভিমত) আমার সম্পদ (আল্লাহর রাস্তায় এবং উত্তম খাতে) ব্যয়ের ওসীয়ত করে দেব? তিনি বললেন, না (এরূপ করো না)। আমি বললাম, তবে অর্ধেক সম্পদের ব্যাপারে। তিনি বললেন, না (এত না)। আমি বললাম, তবে এক তৃতীয়াংশের ব্যাপারে ওসীয়ত করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, এক তৃতীয়াংশের ব্যাপারে অসীয়ত কর। আর এক তৃতীয়াংশ অনেক। (এরপর তিনি বললেন), তোমার জন্য নিজের উত্তরাধিকারীদেরকে সুখী অবস্থায় রেখে যাওয়া, দরিদ্র অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। যারা (নিজেদের প্রয়োজনের জন্য) অন্যের সামনে হাত পাতবে। আর তুমি যা (আল্লাহর রাস্তায় পুণ্য লাভের আশায়) ব্যয় করবে (যদিও সে ব্যয় নিজের প্রিয়জন, আত্মীয় ও উত্তরাধিকারীদের জন্য হয়) তা তোমার পক্ষ হতে সাদকা হবে। এমনকি যে লোকমা তুমি স্বীয় স্ত্রীর মুখে তুলে দাও (তাও তোমার সাদকা হবে)।

(পরিশেষে তিনি বলেন,) আল্লাহর নিকট আশা করা যায় যে, এ রোগ থেকে তোমাকে শিফা দান করবেন। ভবিষ্যতে তোমাকে উন্নত মর্যাদা দান করবেন। এরপর তোমার দ্বারা আল্লাহর বহু বান্দা উপকৃত হবে এবং বহু লোকের ক্ষতি হবে।

সা’দ থেকে এ হাদীস বর্ণনাকারী (তার ছেলে আমর ইবনে সা'দ) বলেন, যে সময় এটা ঘটেছিল তখন হযরত সা'দ-এর কেবল এক কন্যা ছিল। (সে ছাড়া অন্য কোন সন্তান ছিল না)। (বুখারী, মুসলিম)
کتاب المعاشرت والمعاملات
عَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ قَالَ جَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعُودُنِي وَأَنَا بِمَكَّةَ، وَهْوَ يَكْرَهُ أَنْ يَمُوتَ بِالأَرْضِ الَّتِي هَاجَرَ مِنْهَا قَالَ: يَرْحَمُ اللَّهُ ابْنَ عَفْرَاءَ. قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أُوصِي بِمَالِي كُلِّهِ؟ قَالَ: لاَ. قُلْتُ فَالشَّطْرُ؟ قَالَ: لاَ. قُلْتُ الثُّلُثُ؟ قَالَ: فَالثُّلُثُ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ، إِنَّكَ أَنْ تَدَعَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَدَعَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ فِي أَيْدِيهِمْ، وَإِنَّكَ مَهْمَا أَنْفَقْتَ مِنْ نَفَقَةٍ فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ، حَتَّى اللُّقْمَةُ الَّتِي تَرْفَعُهَا إِلَى فِي امْرَأَتِكَ، وَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَرْفَعَكَ فَيَنْتَفِعَ بِكَ نَاسٌ وَيُضَرَّ بِكَ آخَرُونَ. وَلَمْ يَكُنْ لَهُ يَوْمَئِذٍ إِلاَّ ابْنَتَهُ. (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা) আশারা মুবাশশারার অন্যতম ছিলেন। বিদায় হজের সফরে তিনিও তাঁর সাথে ছিলেন। মক্কা মুআযযামায় তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আলোচ্য হ্যদীসেরই কোন কোন বর্ণনায় এ শব্দগুলো أشفيت على الموت অর্থাৎ আমি যেন মৃত্যুর কিনারায় পৌছে গিয়েছিলাম। আর যেহেতু তিনি মুহাজিরগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এজন্য তিনি এটা পসন্দ করবেন না যে, যে মক্কাকে আল্লাহর জন্য ছেড়েছিলেন এবং হিজরত করেছিলেন, সেখানে তাঁর ইনতিকাল হোক। আর তথাকার মাটিতে তাঁর কবর হোক।

রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন তাঁকে (রোগী) দেখতে গেলেন এবং তাঁর এ চিন্তা ও পেরেশানী অবগত হলেন তখন তিনি يرحم الله ابن عفراء বলে তাঁকে দু'আ ও সান্ত্বনা দেন।

এরপর হযরত সা'দ (যিনি সম্পদশালী সাহাবীগণের মধ্যে ছিলেন) তার সম্পদের ওসীয়তের ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন। (এ হাদীসের কোন বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বিস্তারিতভাবে হুজুর ﷺ-কে বললেন, আমার নিকট আল্লাহর দেওয়া বহু সম্পদ রয়েছে। আর আমার এক কন্যা)। আমি আমার আখিরাত ভাল করার চিন্তা করছি। সব সম্পদ ওসীয়ত করে যাব যেন এগুলো আল্লাহর ওয়াস্তে উত্তম খাতে ব্যয় হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এবিষয়ে অনুমতি দেননি। কেবল এক তৃতীয়াংশের অনুমতি দিলেন এবং বললেন এক তৃতীয়াংশ অনেক। এরপর তিনি তাকে এও বললেন, আল্লাহর নিকট এক এবং তোমার আখিরাতের জন্যও এক তৃতীয়াংশই উত্তম। এর বেশি ওসীয়ত করো না।
প্রিয়জন, আত্মীয়স্বজনের জন্য ব্যয় করা এবং উত্তরাধিকারীদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়া আল্লাহর নিকট সাদকার ন্যায়। (শর্ত হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও সাওয়াবের নিয়ত হতে হবে। এ হাদীসের কোন কোন বর্ণনায় এই শর্তের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে)। এ ধারাবাহিকতায় তিনি বললেন, এমন কি এই নিয়তে নিজের স্ত্রীর মুখে লোকমা তুলে দেওয়াতেও তোমাদের জন্য পুণ্য রয়েছে। অথচ এতে আত্মতৃপ্তিও আছে।

সর্বশেষে তিনি যে বললেন, عسى الله أن يرفعك إلخ এটা হযরত সা’দ (রা)-এর জন্য এমন এক ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, তখন যার কল্পনাও করা যেত না। তাঁর বাণীর উদ্দেশ্য ছিল, এখনো তোমার থেকে আল্লাহ তা'আলার অনেক কাজ নেয়ার আছে। ইনশাআল্লাহ তুমি এ রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করবে। আল্লাহ তা'আলা তোমাকে এমন উন্নত মর্যাদায় উপনীত করবেন যে, তোমার হাতে বহু জাতির ভাগ্য ফিরবে আর বহু জাতি লাঞ্ছিত হবে। একথা রাসুলুল্লাহ ﷺ দশম হিজরীর বিদায় হজ্জে এমন সময় বলেছিলেন যে, হযরত সা'দ নিজেকে মৃত্যুর দুয়ারে মনে করছিলেন। কিন্তু হজুর ﷺ-এর এ ভবিষ্যদ্বাণী এভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল যে, এরপর হযরত সা'দ (রা) প্রায় অর্ধ শতাব্দি এ দুনিয়াতে ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে এত উন্নত মর্যাদা দান করেন যে, পারস্য রাজ্যের প্রায় গোটা এলাকা তাঁরই নেতৃত্বে বিজিত হয়ে ইসলামী হুকুমতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে আল্লাহর লক্ষ লক্ষ বান্দা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ লাভ করে। এরপর তিনি ইরাকের গভর্নরও ছিলেন। ৫৫ হিজরী ভিন্ন বর্ণনায় ৫৮ হিজরীতে তিনি ইনতিকাল করেন।

হযরত সা'দ (রা)-এর ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এ ভবিষ্যদ্বাবাণী এবং তা এভাবে আত্মপ্রকাশ করা নিঃসন্দেহে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এক মু'জিযা।

আলোচ্য হাদীস থেকে 'ওসীয়ত'-এর বিষয়ে এ মূলনীতি জানা গেল যে, যে ব্যক্তির উত্তরাধিকারী রয়েছে, তার জন্য আল্লাহর রাস্তায় ও উত্তম খাতের জন্যও নিজের মালের এক তৃতীয়াংশের বেশি ওসীয়ত করা জায়িয নয়। এ বিষয়ে উম্মতের উলামা প্রায় একমত।

তবে নিজ জীবনে আল্লাহর রাস্তায় এবং উত্তম খাতে যা ব্যয় করতে মন চায় তাই করতে পারবে। তৃতীয়াংশের এই বাধ্যবাধকতা মৃত্যু পরবর্তী ওসীয়তের সাথেই।

যেরূপ উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ ঘটনা বিদায় হজ্জের সফরে দশম হিজরীর শেষ দিকে ঘটেছিল। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এর অনেক বর্ণনায় এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তবে তিরমিযীর এক বর্ণনায় একে মক্কা বিজয়কালীন সফরের ঘটনা বলা হয়েছে, যা ৮ম হিজরীতে হয়েছিল। এ বিষয়ে মুহাদ্দিসীন প্রায় একমত যে, তিরমিযীর বর্ণনায় এক বর্ণনাকারীর ভুল হয়েছিল। মুহাদ্দিসীনের পরিভাষায় একে 'অহম' (وهم) বলা হয়।১

১. এর বিস্তারিত বিবরণ বুখারীর শরাহ ফতহুল বারীর 'কিতাবুল ওসায়া'তে দেখা যেতে পারে। এখানে একথা উল্লেখ করা অসংগত হবে না যে, হয়রত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা)-এর হাদীস সম্পর্কে 'মিশকাতুল মাসাবিহতেও এক ভুল হয়েছে। এটা এই যে, তিরমিযীর সেই বর্ণনা, যাতে এ ঘটনা মক্কাবিজয়ের সফরকালীন বলা হয়েছে- প্রথম অনুচ্ছেদে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং একে বুখারী মুসলিমের বর্ণনা বলা হয়েছে। অথচ যেমন বলা হয়েছে, এটা সহীহাইনের বর্ণনা নয়, জামে তিরমিযীর বর্ণনা।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান