মা'আরিফুল হাদীস

কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সম্পর্কিত অধ্যায়

হাদীস নং: ২০
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সম্পর্কিত অধ্যায়
উম্মতের জন্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কর্ম পদ্ধতিই আদর্শ নমুনা।
২০. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, (সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে) তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীগণের নিকট এসে তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। (অর্থাৎ তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, নামায, রোযা ইত্যাদি ইবাদতের ব্যাপারে) হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অভ্যাস কিরূপ? যখন তাঁদেরকে তা বলা হল, তখন (অনুভূত হল যে) যেন তারা তা খুব কম মনে করলেন। আর পরস্পর বলাবলি করলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে আমাদের কি তুলনা? আল্লাহ্ তা'আলা তো তাঁর পূর্বাপর সব গুনাহ্ মাফ করে দিয়েছেন।(১) (আর কুরআন মজীদে সংবাদও দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তাঁর অধিক ইবাদত ও সাধনার প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ, আমাদের মত গুনাহগারদের প্রয়োজন আছে, যথাসম্ভব অধিক ইবাদত করব) সুতরাং একজন বললেন, এখন তো আমি সারারাত নামায আদায় করতে থাকব। অপরজন বললেন, আমি সর্বদা বিরতিহীনভাবে দিনে রোযা রাখব। আর একজন বললেন, আমি শপথ করছি-সর্বদা স্ত্রীলোক থেকে সম্পর্কহীন ও দূরত্বে থাকব, কখনো বিয়ে করব না। (রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যখন এ সংবাদ পৌঁছল) তখন তিনি এই তিন ব্যক্তির নিকট এসে বললেন, তোমরা এই কথা বলেছ? (আর নিজেদের ব্যাপারে এই এই ফায়সালা করেছ?) শুন, আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের থেকে আল্লাহকে অধিক ভয় করি। আর তাঁর নাফরমানী ও অসন্তুষ্টির বিষয়ে তোমাদের থেকে অধিক বেঁচে থাকি। কিন্তু (এতদসত্ত্বে) আমার অবস্থা হচ্ছে- সর্বদা রোযা রাখি না, বরং রোযাও রাখি আর রোযা ছেড়েও দেই। (আর সারারাত নামায আদায় করি না) বরং নামাযও আদায় করি আর নিদ্রাও যাই। (আর আমি কৌমার্য জীবনও গ্রহণ করি নি) আমি নারীদের বিয়ে করি আর তাদের সাথে দাম্পত্য জীবন যাপন করি (এটা আমার তরীকা) এখন যে কেউ আমার এ তরীকা থেকে সরে চলে সে আমার নয়। (সহীহ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিম)
کتاب الاعتصام بالکتاب والسنۃ
عَنْ أَنَسٍ قَالَ جَاءَ ثَلاَثَةُ رَهْطٍ إِلَى أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْأَلُونَ عَنْ عِبَادَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا أُخْبِرُوا كَأَنَّهُمْ تَقَالُّوهَا فَقَالُوا وَأَيْنَ نَحْنُ مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَدْ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَا تَأَخَّرَ. فَقَالَ أَحَدُهُمْ أَمَّا أَنَا فَأُصَلِّي اللَّيْلَ أَبَدًا. وَقَالَ لْآخَرُ أَنَا أَصُومُ الدَّهْرَ وَلاَ أُفْطِرُ. وَقَالَ لْآخَرُ أَنَا أَعْتَزِلُ النِّسَاءَ فَلاَ أَتَزَوَّجُ أَبَدًا. فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَنْتُمُ الَّذِينَ قُلْتُمْ كَذَا وَكَذَا؟ أَمَا وَاللَّهِ إِنِّي لأَخْشَاكُمْ لِلَّهِ وَأَتْقَاكُمْ لَهُ، لَكِنِّي أَصُومُ وَأُفْطِرُ، وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ، فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي. (رواه البخارى ومسلم)

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

১. কুরআন মজীদে আল্লাহ্ বলেন, لِّیَغۡفِرَ لَکَ اللّٰہُ مَا تَقَدَّمَ مِنۡ ذَنۡۢبِکَ وَمَا تَاَخَّرَ ۙ অর্থঃ যাতে আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যতের সমস্ত ত্রুটি ক্ষমা করেন। (সূরাঃ আল ফাত্‌হ - আয়াত নংঃ 2) অনুবাদক।

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আলোচ্য হাদীসে যে তিন সাহাবীর কথা উল্লিখিত হয়েছে, স্পষ্টত তাঁদের এ ভুল উপলব্ধি ছিল যে, আল্লাহ্ তা'আলার সন্তুষ্টি ও আখিরাতে ক্ষমা ও জান্নাত লাভের পথ এই যে, মানুষ দুনিয়া ও এর স্বাদ থেকে সম্পূর্ণ দূরত্ব গ্রহণ করে কেবল ইবাদতে লেগে থাকবে। নিজেদের এই ভুল উপলব্ধির ভিত্তিতে তাঁরা মনে করতেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অবস্থানও তাই হবে। কিন্তু যখন পবিত্র স্ত্রীগণ থেকে ইবাদত (নামায, রোযা ইত্যাদি)-এর ব্যাপারে হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অভ্যাস তাঁরা অবগত হলেন, তখন তাঁরা নিজেদের ধারণা অনুযায়ী তা খুবই কম মনে করলেন। কিন্তু আকীদা ও আদব হিসাবে তার ব্যাখ্যা এটা করা হয়েছে যে, তাঁর জন্য তো আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাতে উঁচু মর্যাদার ফায়সালা প্রথমে হয়ে গেছে। এজন্য তাঁকে ইবাদতে অধিক ব্যস্ত থাকার প্রয়োজন নেই। আমাদের বিষয় হচ্ছে ভিন্ন। এটা (ইবাদত) আমাদের প্রয়োজন। আর এ ভিত্তিতে তারা নিজেদের জন্য সেই ফায়সালা করেন, যা হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে তাদের ভুল উপলব্ধির সংশোধন ও সতর্ক করেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহর অধিক ভয় ও আখিরাতের চিন্তা তোমাদের চেয়ে আমার অধিক রয়েছে। এতদসত্ত্বেও আমার অবস্থা হচ্ছে, আমি রাতে নামাযও পড়ি নিদ্রাও যাই। দিনগুলোতে রোযাও রাখি, রোযা ছাড়াও থাকি। আর আমার স্ত্রীগণ রয়েছেন এবং তাদের সাথে দাম্পত্য জীবন যাপন করি। এটাই জীবনের সেই তরীকা যা আমি নবী ও রাসূল হিসাবে আল্লাহর পক্ষ হতে নিয়ে এসেছি। এখন যে কেউ এই তরীকা হতে সরে চলে আর এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে আমার নয়।

কেবল ইবাদত এবং যিকির ও তাসবীহতে ব্যস্ত থাকা ফেরেশতাদের কাজ। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে এরূপই সৃষ্টি করেছেন যে, তাদের আত্মার প্রবৃত্তি নেই। তাদের যিকির ও ইবাদত প্রায় এরূপই যেমন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের আগমন নির্গমন। কিন্তু আমরা আদম সন্তানকে পানাহারের ন্যায় বহু প্রয়োজন ও আত্মার বিভিন্ন চাহিদা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর নবী (আ) গণের মাধ্যমে আমাদেরকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, আমরা আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদত করব। তাঁর নির্ধারিত সীমারেখা ও আহ্কাম যথা নিয়মে পালন করে নিজেদের পার্থিব প্রয়োজনাবলি ও আত্মিক চাহিদাসমূহ পূর্ণ করব। পারস্পারিক অধিকারসমূহ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করব। এটা বড় কঠিন পরীক্ষা। নবী (আ) গণের তরীকা এটাই। এতেই রয়েছে পূর্ণতা। এজন্য তাঁরা ফেরেশতাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ।

মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম নমুনা-খাতিমুন্নাবিয়্যিন সায়্যিদিনা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উত্তম আদর্শ। বস্তুত হাদীসের উদ্দেশ্য এই নয় যে, বেশি ইবাদত কোন ভুল বিষয়। বরং এর দাবি ও বার্তা হচ্ছে, এই তিন ব্যক্তি যে ভিত্তিতে নিজেদের ব্যাপারে ঐ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, তা চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির বিভ্রান্তি এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরীকার পরিপন্থী। সম্ভবত তাঁরা এটাও বুঝেননি যে, রাত সমূহে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরাম করা এবং সর্বদা রোযা না রাখা ও দাম্পত্য জীবন গ্রহণ করা, এভাবে অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হওয়া নিজের কর্ম পদ্ধতিতে উম্মতের জন্য শিক্ষা ছিল। আর এটা নবুওতী কর্মের অংশ ছিল এবং নিঃসন্দেহে তাঁর জন্য এটা নফল ইবাদত থেকে উত্তম ছিল। এতদসত্ত্বেও তিনি কখনো কখনো এত ইবাদত করতেন, পা মুবারক ফুলে যেত। আর যখন তাঁকে নিবেদন করা হত, এত ইবাদতের আপনার কি প্রয়োজন? তিনি বলতেন أَفَلَا يَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا؟ (আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?) এভাবে কখনো কখনো তিনি ধারাবাহিক কয়েক দিন ইফতার ও সাহরী ছাড়া রোযা রাখতেন। যাকে 'সাওমে বিসাল' বলা হয়। বস্তুত হযরত আনাস (রা)-এর হাদীস বা এ বিষয়ক অন্যান্য হাদীস থেকে এ ফলাফল বের করা সঠিক হবে না যে, ইবাদতের আধিক্য কোন অপসন্দনীয় বিষয়। হ্যাঁ, সন্যাসবাদ ও এ জাতীয় চিন্তাধারা নিঃসন্দেহে অপসন্দনীয় এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তরীকা ও শিক্ষার পরিপন্থী।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান