মা'আরিফুল হাদীস

কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সম্পর্কিত অধ্যায়

হাদীস নং: ২১
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সম্পর্কিত অধ্যায়
এ যুগে মুক্তির একমাত্র পথ রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য
২১. হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত, (একদিন) হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা) তাওরাতের এক কপি নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমীপে হাযির হলেন। তিনি নিবেদন করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এটা তাওরাতের এক কপি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চুপ রইলেন। (যবান মুবারক দ্বারা কিছু বললেন না) হযরত উমর (রা) তা পড়া (এবং হুযূরকে শুনানো) শুরু করলেন, আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র চেহেরা পরিবর্তীত হতে লাগলো। (হযরত উমর (রা) পড়তে থাকেন, হুযূরের চেহারা মুবারকের পরিবর্তন লক্ষ্য করেননি) হযরত আবূ বকর (রা) (যিনি মজলিসে উপস্থিত ছিলেন, হযরত উমর (রা) কে শাসালেন এবং বললেন ثكلتك الثواكِلُ (তোমার মরণ হোক) দেখছ না, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারা মুবারক! তখন হযরত উমর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারা মুবারকের প্রতি দৃষ্টিপাত করে তৎক্ষণাৎ বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ক্রোধ থেকে আল্লাহ্ নিকট আশ্রয় চাই।) আমি (মনে প্রাণে) সন্তুষ্ট আল্লাহকে নিজের রব মেনে, আর ইসলামকে নিজের দীন বানিয়ে এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী ও রাসূল মেনে। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সেই আল্লাহর শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! যদি (আল্লাহ্ নবী) মূসা (এ জগতে) তোমাদের সামনে আসেন আর তোমরা আমাকে ছেড়ে তাঁর অনুসরণ কর, তবে সত্য ও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গোমরাহ্ হয়ে যাবে। আর (শোন) যদি (আল্লাহ্ নবী) মূসা যিন্দা থাকতেন আর আমার নবুওতী যুগ পেতেন তবে তিনিও আমার অনুসরণ করতেন। (আর আমার আনীত শরী'আতের ওপর চলতেন।) (মুসনাদে দারিমী)
کتاب الاعتصام بالکتاب والسنۃ
عَنْ جَابِرٍ: أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ أَتَى رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِنُسْخَةٍ مِنَ التَّوْرَاةِ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذِهِ نُسْخَةٌ مِنَ التَّوْرَاةِ. فَسَكَتَ فَجَعَلَ يَقْرَأُ وَوَجْهُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَغَيَّرُ، فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: ثَكِلَتْكَ الثَّوَاكِلُ، أَمَا تَرَى مَا بِوَجْهِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟ فَنَظَرَ عُمَرُ إِلَى وَجْهِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ غَضَبِ اللَّهِ وَمِنْ غَضَبِ رَسُولِهِ، رَضِينَا بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِيناً وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ بَدَا لَكُمْ مُوسَى فَاتَّبَعْتُمُوهُ وَتَرَكْتُمُونِي لَضَلَلْتُمْ عَنْ سَوَاءِ السَّبِيلِ، وَلَوْ كَانَ حَيًّا وَأَدْرَكَ نُبُوَّتِي لاَتَّبَعَنِي. (رواه الدارمى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

نُسْخَةٌ مِّنَ التَّوْرَاةِ এর অর্থ তাওয়াতের আরবী তরজমার কোন অংশ ও কতক পৃষ্ঠা। হযরত আবু বকর (রা) হযরত উমর (রা) কে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসন্তুষ্টি ও চেহারা মুবারকের ওপর এর প্রভাবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে এই বাক্য বলেছেন تكلتك التواكل এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে 'ক্রন্দন কারীনীগণ তোমার প্রতি ক্রন্দন করুক'। যখন অসন্তুষ্টি প্রকাশের স্থলে এ বাক্য বলা হয় তখন এর অর্থ কেবলই অসন্তষ্টি প্রকাশ বুঝায়। শাব্দিক অর্থ উদ্দেশ্য হয় না। প্রত্যেক ভাষায়ই এরূপ পরিভাষা রয়েছে। আমাদের উর্দু ভাষায় মায়েরা তাদের সন্তানদেরকে শাসিয়ে مؤا বলেন, (যার শাব্দিক অর্থ মরে যাওয়া) উদ্দেশ্য কেবল অসন্তুষ্টি ও রাগ প্রকাশ করা।

হযরত উমর (রা)-এর এ কাজে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসন্তুষ্টি ও বিরক্তির বিশেষ কারণ এই ছিল যে, এতে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে, خاتم الكتب কুরআন মজীদ এবং خاتم الانبياء হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশাবলির পরও তাওরাত বা কোন প্রাচীন পুস্তিকা থেকে আলো ও পথ প্রদশর্ন অর্জনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অথচ কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর শিক্ষা আল্লাহর পরিচয় ও হিদায়াতের ব্যাপারে অন্য সব জিনিস থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছে। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ ও পূর্ববর্তী নবীগণের সহীফাসমূহে যে এরূপ বিষয়-বস্তু ও আহকাম ছিল যা মানুষের সর্বদা প্রয়োজন পড়বে, তা সব কুরআন মজীদে সংরক্ষিত করে দেওয়া হয়েছে, مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ - যা কুরআন মজীদের বৈশিষ্ট্য ও উদ্দেশ্য।
বস্তুত তাওরাত ও অন্যান্য পূর্ববর্তী সহীফাসমূহের যুগ শেষ হয়েছিল। কুরআন নাযিল ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণের পর নাজাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন তাঁরই আনুগত্যের ওপর সীমাবদ্ধ। এ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য তিনি শপথ করে বললেন, যদি ধরে নেওয়া হয়, তাওরাতের অধিকারী মূসা (আ) জীবিত হয়ে এ জগতে তোমাদের সামনে এসেছেন, আর আমাকে ও আমার আনীত হিদায়াত ও তালিম ছেড়ে তোমরা তাঁর অনুসরণ কর তবে তোমরা পথ প্রাপ্ত হবে না। বরং গোমরাহ্ ও সত্য পথ হতে দূর হয়ে যাবে। এ মূল তথ্যের ওপর আরো অধিক আলোকপাত করে তিনি বলেন, যদি আজ হযরত মুসা (আ) জীবিত থাকতেন, আর আমার নবুওত ও রিসালাতের এ যুগ পেতেন তবে স্বয়ং তিনিও এই এলাহী হিদায়াত এবং এই শরী'আতের আনুগত্য করতেন যা আমার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট থেকে এসেছে। এভাবে আমার অনুকরণ ও অনুসরণ করতেন। হযরত উমর (রা) যেহেতু তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সাহাবীগণের মধ্যে ছিলেন এজন্য তাঁর এই সামান্য স্খলনও হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম-এর জন্য অসন্তুষ্টির কারণ হয়েছিল।
جن کے رتبے میں سوا ان کو سوا مشکل ھے
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান