মা'আরিফুল হাদীস
কল্যাণের দিকে আহ্বান: সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ অধ্যায়
হাদীস নং: ৫০
কল্যাণের দিকে আহ্বান: সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ অধ্যায়
আল্লাহর পথে জিহাদ, হত্যা ও শাহাদত
৫০. হযরত আবূ আবস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এটা হতে পারে না যে, কোন বান্দার পা আল্লাহর পথে চলতে গিয়ে ধুলায় ধূসরিত হল, আর জাহান্নামের আগুন তা স্পর্শ করতে সক্ষম হবে। (সহীহ বুখারী)
دعوت الی الخیر امربالمعروف نہی عن المنکر
عَنْ أَبِي عَبْسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَا اغْبَرَّتْ قَدَمَا عَبْدٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَتَمَسَّهُ النَّارُ. (رواه البخارى)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
আলোচ্য হাদীসের বিষয়বস্তু কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মুখাপেক্ষী নয়। তবে এ কথা উল্লেখযোগ্য যে, হযরত আবূ আবস-এর আলোচ্য হাদীস ইমাম তিরমিযীও বর্ণনা করেছেন। তাতে এই সংযোজন রয়েছে যে, এ হাদীসের বর্ণনাকারী ইয়াযিদ ইবনে আবি মারয়াম বর্ণনা করেন যে, আমি জুমু'আর নামায পড়ার জন্য জামি' মসজিদের দিকে যাচ্ছিলাম। পথে আমি আবায়া ইবনে রিফা'আ তাবিঈর সাক্ষাত পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, أَبْشَرْ فَإِنْ خَطَاكَ هذه في سبيل الله سَمِعْتَ أَبَا عَبْسٍ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنِ اعْبَرْتَ قَدَمَاهُ فِي - سبيل الله فَهُمَا حَرَامِ عَلَى النَّارِ তোমাকে সুসংবাদ। তোমার এই পা (যা দিয়ে চলে তুমি জামি' মসজিদের দিকে যাচ্ছ) আল্লাহর পথে রয়েছে। আমি আবূ আবস (রা) কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে বান্দার পা আল্লাহর পথে ধূলায় ধূসরিত হয়েছে সেই পাদ্বয় জাহান্নামে হারাম (অর্থাৎ জাহান্নামের আগুন তা স্পর্শ করতে পারবে না)। আবায়া ইবনে রিফা'আ তাবিঈর এই বর্ণনা থেকে জানা গেল যে, তাঁর নিকট 'আল্লাহর পথে' জিহাদ ও হত্যাই নির্দিষ্ট নয়। বরং তাতে প্রশস্ততা রয়েছে। নামায আদায় করার জন্য যাওয়া, অনুরূপভাবে দীনের খিদমত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করাও এর প্রশস্ত অর্থে অন্তর্ভুক্ত। এভএভাবে হযরত আনাস (রা) এর বর্ণিত পূর্ববর্তী হাদীস لَغَدْوةً فِي سَبِيل الله أوروحة ... الخ সম্পর্কও বুঝা চাই যে, আল্লাহর জন্য ও দীনের খিদমতের ধারাবাহিকতায় প্রতিটি আন্তরিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও পদক্ষেপ কারীদেরও এ সুসংবাদে অংশ রয়েছে।
জিহাদ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা
আমাদের উর্দু পরিভাষায় 'জিহাদ' সেই সশস্ত্র যুদ্ধকেই বলা হয় যা আল্লাহ্ ও রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী দীনের হিফাযত ও সাহায্যের জন্য সত্যের শত্রুদের সাথে করা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত আরবী পরিভাষা এবং কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় শত্রুর মুকাবালায় যে কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পূর্ণ চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং শক্তি ব্যয় করার নাম জিহাদ। স্থান কাল-পাত্র ভেদে যা যুদ্ধ ও হত্যার আকৃতিতেও হতে পারে। আর অন্যান্য পন্থায়ও হতে পারে। (কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এই ব্যাপক অর্থেই জিহাদ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে)। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওতের আসনে সমাসীন হওয়ার পর প্রায় ১৩ বছর মক্কা মু'আয্যমায় ছিলেন। এই গোটা সময়ে দীনের শত্রু, কাফির মুশরিকদের সাথে তলোওয়ারের যুদ্ধ ও হত্যার কেবল অনুমতি ছিল না বরং এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল। নির্দেশ ছিল । ... كفوا أيديكم (অর্থাৎ যুদ্ধ ও হত্যা থেকে তোমরা তোমাদের হাতকে সংবরণ কর)।
এই মক্কী জীবনেই সূরা আল ফুরকান নাযিল হয়েছিল। এতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে,
فَلَا تُطِعِ الۡکٰفِرِیۡنَ وَجَاہِدۡہُمۡ بِہٖ جِہَادًا کَبِیۡرًا
অর্থঃ সুতরাং (হে নবী!) তুমি কাফেরদের কথা শুনো না; বরং এ কুরআনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তিতে সংগ্রাম চালিয়ে যাও। (সূরাঃ আল ফুরকান - আয়াত নংঃ 52)
স্পষ্টত এ আয়াতে যে জিহাদের হুকুম দেওয়া হয়েছে তার অর্থ তলোয়ার ও হত্যার জিহাদ নয়। বরং কুরআনের সাহায্যে দাওআত ও তাবলীগের চেষ্টা-প্রচেষ্টাই উদ্দেশ্য। এবং এ আয়াতে একে কেবল জিহাদ নয় বরং 'হিজাদে কাবীর ও জিহাদে আযীম' বলা হয়েছে।
এভাবে সূরা আল আনকাবুতেও হিজরতের পূর্বে মক্কা মু'আয্যমায় অবস্থান কালেই নাযিল হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছে,
وَمَنۡ جَاہَدَ فَاِنَّمَا یُجَاہِدُ لِنَفۡسِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَغَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ
অর্থঃ আর আমার পথে যে ব্যক্তিই শ্রম-সাধনা করে, সে তো শ্রম-সাধনা করে নিজেরই কল্যাণার্থে। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্ব-জগতের সকল থেকে অনপেক্ষ। (সূরাঃ আল আনকাবুত - আয়াত নংঃ 6)
আর এ সূরা আনকাবুতেরই শেষ আয়াত
وَالَّذِیۡنَ جَاہَدُوۡا فِیۡنَا لَنَہۡدِیَنَّہُمۡ سُبُلَنَا ؕ وَاِنَّ اللّٰہَ لَمَعَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ
অর্থঃ যারা আমার উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালায়, আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে উপনীত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন। (সূরাঃ আল আনকাবুত - আয়াত নংঃ 69)
উল্লেখা, সূরা আনকাবুতের উভয় আয়াতেই 'জিহাদ' দ্বারা তলোয়ারের জিহাদ অর্থ গ্রহণ করা যায় না। বরং আল্লাহর পথে তাঁর 'নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং কষ্ট বহন করাই উদ্দেশ্য, যে প্রকারেই হোক। বস্তুত দীনের পথে আল্লাহর জন্য প্রতিটি আন্তরিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং জান মাল ও আরাম-আয়েশ-এর কুরবানি ও আল্লাহ্ তা'আলার দানকৃত যোগ্যতাসমূহ পরিপূর্ণ ব্যবহার, এসবই স্বস্থানে আল্লাহর পথে জিহাদের আকৃতি ধারণ করে আছে। আর এসবের পথ সর্বদা দুনিয়ার সব স্থানে আজও উন্মুক্ত আছে।
হ্যাঁ, তলোয়ারের জিহাদ এবং আল্লাহর পথে হত্যা কোন কোন দিক থেকে শ্রেষ্ঠ জিহাদ। আর এ পথে প্রাণ বিসর্জন ও শাহাদত মু'মিনের সর্বাধিক বড় সৌভাগ্য। এজন্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগ্রহ ও বাসনা প্রকাশ করে ছিলেন। যেমন আলোচিত হয়েছে। সামনে লিপিবদ্ধাধীন হযরত ফুযালা ইবনে উবাইদ -এর হাদীসও জিহাদের অর্থে এই প্রশস্ততার এক দৃষ্টান্ত।
জিহাদ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা
আমাদের উর্দু পরিভাষায় 'জিহাদ' সেই সশস্ত্র যুদ্ধকেই বলা হয় যা আল্লাহ্ ও রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী দীনের হিফাযত ও সাহায্যের জন্য সত্যের শত্রুদের সাথে করা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃত আরবী পরিভাষা এবং কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় শত্রুর মুকাবালায় যে কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পূর্ণ চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং শক্তি ব্যয় করার নাম জিহাদ। স্থান কাল-পাত্র ভেদে যা যুদ্ধ ও হত্যার আকৃতিতেও হতে পারে। আর অন্যান্য পন্থায়ও হতে পারে। (কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এই ব্যাপক অর্থেই জিহাদ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে)। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওতের আসনে সমাসীন হওয়ার পর প্রায় ১৩ বছর মক্কা মু'আয্যমায় ছিলেন। এই গোটা সময়ে দীনের শত্রু, কাফির মুশরিকদের সাথে তলোওয়ারের যুদ্ধ ও হত্যার কেবল অনুমতি ছিল না বরং এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল। নির্দেশ ছিল । ... كفوا أيديكم (অর্থাৎ যুদ্ধ ও হত্যা থেকে তোমরা তোমাদের হাতকে সংবরণ কর)।
এই মক্কী জীবনেই সূরা আল ফুরকান নাযিল হয়েছিল। এতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে,
فَلَا تُطِعِ الۡکٰفِرِیۡنَ وَجَاہِدۡہُمۡ بِہٖ جِہَادًا کَبِیۡرًا
অর্থঃ সুতরাং (হে নবী!) তুমি কাফেরদের কথা শুনো না; বরং এ কুরআনের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তিতে সংগ্রাম চালিয়ে যাও। (সূরাঃ আল ফুরকান - আয়াত নংঃ 52)
স্পষ্টত এ আয়াতে যে জিহাদের হুকুম দেওয়া হয়েছে তার অর্থ তলোয়ার ও হত্যার জিহাদ নয়। বরং কুরআনের সাহায্যে দাওআত ও তাবলীগের চেষ্টা-প্রচেষ্টাই উদ্দেশ্য। এবং এ আয়াতে একে কেবল জিহাদ নয় বরং 'হিজাদে কাবীর ও জিহাদে আযীম' বলা হয়েছে।
এভাবে সূরা আল আনকাবুতেও হিজরতের পূর্বে মক্কা মু'আয্যমায় অবস্থান কালেই নাযিল হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছে,
وَمَنۡ جَاہَدَ فَاِنَّمَا یُجَاہِدُ لِنَفۡسِہٖ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَغَنِیٌّ عَنِ الۡعٰلَمِیۡنَ
অর্থঃ আর আমার পথে যে ব্যক্তিই শ্রম-সাধনা করে, সে তো শ্রম-সাধনা করে নিজেরই কল্যাণার্থে। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্ব-জগতের সকল থেকে অনপেক্ষ। (সূরাঃ আল আনকাবুত - আয়াত নংঃ 6)
আর এ সূরা আনকাবুতেরই শেষ আয়াত
وَالَّذِیۡنَ جَاہَدُوۡا فِیۡنَا لَنَہۡدِیَنَّہُمۡ سُبُلَنَا ؕ وَاِنَّ اللّٰہَ لَمَعَ الۡمُحۡسِنِیۡنَ
অর্থঃ যারা আমার উদ্দেশ্যে প্রচেষ্টা চালায়, আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে উপনীত করব। নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন। (সূরাঃ আল আনকাবুত - আয়াত নংঃ 69)
উল্লেখা, সূরা আনকাবুতের উভয় আয়াতেই 'জিহাদ' দ্বারা তলোয়ারের জিহাদ অর্থ গ্রহণ করা যায় না। বরং আল্লাহর পথে তাঁর 'নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং কষ্ট বহন করাই উদ্দেশ্য, যে প্রকারেই হোক। বস্তুত দীনের পথে আল্লাহর জন্য প্রতিটি আন্তরিক চেষ্টা-প্রচেষ্টা এবং জান মাল ও আরাম-আয়েশ-এর কুরবানি ও আল্লাহ্ তা'আলার দানকৃত যোগ্যতাসমূহ পরিপূর্ণ ব্যবহার, এসবই স্বস্থানে আল্লাহর পথে জিহাদের আকৃতি ধারণ করে আছে। আর এসবের পথ সর্বদা দুনিয়ার সব স্থানে আজও উন্মুক্ত আছে।
হ্যাঁ, তলোয়ারের জিহাদ এবং আল্লাহর পথে হত্যা কোন কোন দিক থেকে শ্রেষ্ঠ জিহাদ। আর এ পথে প্রাণ বিসর্জন ও শাহাদত মু'মিনের সর্বাধিক বড় সৌভাগ্য। এজন্যে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগ্রহ ও বাসনা প্রকাশ করে ছিলেন। যেমন আলোচিত হয়েছে। সামনে লিপিবদ্ধাধীন হযরত ফুযালা ইবনে উবাইদ -এর হাদীসও জিহাদের অর্থে এই প্রশস্ততার এক দৃষ্টান্ত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)