মা'আরিফুল হাদীস

কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়

হাদীস নং: ৭৪
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
কিয়ামতের আলামতসমূহ

যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের মধ্যে বিস্তার লাভকারী ফিতনাসমূহের সংবাদ দিয়েছেন, অনুরূপভাবে কতক বিষয় সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, কিয়ামতের পূর্বে এগুলো প্রকাশ পাবে। সেগুলোর মধ্যে কতক অসাধারণ জাতীয় যা স্পষ্টত সেই সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের পরিপন্থী, যে সব নিয়মের ওপর এ জগতের শৃঙ্খলা নির্ভরশীল। যেমন, পূর্ব দিকের পরিবর্তে পশ্চিম দিক হতে সূর্য উদিত হওয়া, দাবাতুল আরদ নির্গত হওয়া, দাজ্জালের প্রকাশ ও হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ ইত্যাদি, এই সব অসাধারণ আলামত তখন প্রকাশ পাবে। এসব ঘটনা যেন কিয়ামতের অগ্রবর্তী ঘোষক ও ভূমিকাস্বরূপ। এগুলোকে কিয়ামতের 'আলামাতে খাস্‌সা' ও 'আলামাতে কুবরা'ও বলা হয়। এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামতের পূর্বে কতক এরূপ বিষয়, ঘটনাবলি ও পরিবর্তন প্রকাশের সংবাদ দিয়েছেন যেগুলো অসাধারণ নয় বটে, তবে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র ও উত্তম যুগে কল্পনাতীত ও অস্বাভাবিক ছিল। উম্মতের মধ্যে যে সবের প্রকাশ মন্দ ও ফাসাদের লক্ষণ হবে, সে সবকে কিয়ামতের সাধারণ আলামত বলা হয়। নিম্নে প্রথমে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সেই বাণীসমূহ উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেগুলোতে তিনি কিয়ামতের সাধারণ লক্ষণ উল্লেখ করেছেন। প্রথম প্রকার অর্থাৎ আলামাত কুবরা (বড় আলামতসমূহ) সম্বন্ধে হাদীস পরে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

কিয়ামতের সাধারণ আলামতসমূহ
৭৪. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) বলেন, (একদিন) নবী করীম (সা) বর্ণনা করছিলেন, ইতোমধ্যে এক আরাবী (বেদুইন) এল। সে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, কিয়ামত কবে হবে? তিনি বললেন, যখন (সে সময় এসে যাবে যে,) আমানত ধ্বংস করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর। আরাবী পুনরায় নিবেদন করল, আমানত কিভাবে ধ্বংস করা হবে? তিনি বললেন, যখন বিষয়াবলি অযোগ্যদের প্রতি অর্পিত করা হবে তখন কিয়ামতের অপেক্ষা কর। (সহীহ বুখারী)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: بَيْنَمَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُحَدِّثُ، إِذْ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ: مَتَى السَّاعَةُ؟ قَالَ: «إِذَا ضُيِّعَتِ الأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ»، قَالَ: كَيْفَ إِضَاعَتُهَا؟ قَالَ: «إِذَا وُسِّدَ الأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ» (رواه البخارى)

হাদীসের ব্যাখ্যা:

আমাদের উর্দু ভাষায় 'আমানত'-এর অর্থ খুবই সীমিত। কিন্তু কুরআন ও হাদীসের ভাষায় এর অর্থ ব্যাপক। শব্দটি নিজের মধ্যে মর্যাদা ও গুরুত্ব বহন করে। প্রত্যেক মহান ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বকে 'আমানত' দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়। আমানতের অর্থের প্রশস্ততা ও মর্যাদা বুঝার জন্যে সূরাঃ আল আহ্‌যাব - আয়াত নংঃ 72- اِنَّا عَرَضۡنَا الۡاَمَانَۃَ عَلَی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَالۡجِبَالِ .. الآية এর প্রতি দৃষ্টিদান করা যেতে পারে।

হযরত আবূ হুরাইরা (রা)-এর আলোচ্য হাদীসে আমানত ধ্বংস করার ব্যাখ্যা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিয়েছেন যে, দায়িত্বসমূহ এমন লোকদের প্রতি অর্পিত করা হবে যারা এর অযোগ্য। স্তর অনুযায়ী সর্ব প্রকার দায়িত্ব এর অন্তর্ভুক্ত।

রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয়পদ ও চাকুরী, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, এভাবে দীনী নেতৃত্ব ও ইমামত, ফাতওয়া, ফায়সালা, ওয়াক্‌ফের তত্ত্বাবধান ও এর ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি দায়িত্ব সমূহ। এরূপ যে কোন ছোট বড় দায়িত্ব যখন অযোগ্যদের প্রতি অর্পণ করা হয় তখন তা আমানতের ধ্বংস ও সামষ্টিক জীবনের জন্য ভীষণ অপরাধ। এটাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামত নিকটবর্তীতার লক্ষণ বলেছেন। আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী যদিও এক বেদুইনের জিজ্ঞাসার উত্তর ছিল, কিন্তু সর্বস্তরের উম্মতের জন্য এর বার্তা ও সবক হচ্ছে আমানত সংরক্ষণের গুরুত্ব অনুভব কর। এর দাবি পূর্ণ কর, সর্বপ্রকার দায়িত্বসমূহ যোগ্য ব্যক্তির প্রতি সমর্পণ কর। এর বিপরীত করলে আমানত ধ্বংসের অপরাধী হবে। আল্লাহর সামনে এজন্য জবাবদিহিতা করতে হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান