মা'আরিফুল হাদীস
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
হাদীস নং: ৮৮
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
হযরত মাহদীর আগমন, তাঁর মাধ্যমে অনুষ্ঠিতব্য বিপ্লব
৮৮. আবু ইস্হাক তাবিঈ (রহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আলী (রা) স্বীয় পুত্র হযরত হাসান (রা)-এর প্রতি তাকিয়ে বলেন, আমার এ পুত্র (সায়্যিদ) যে রূপে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ নাম (সায়্যিদ) দিয়েছেন। সে অবশ্যই এরূপ হবে যে, তার ঔরসে এক ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করবে, তার নাম তোমাদের নবীর নামে (অর্থাৎ মুহাম্মদ) হবে। চরিত্রে সে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সামঞ্জস্যশীল হবে। আর দৌহিক গঠনে সে তাঁর সাথে অধিক সামঞ্জস্যশীল হবে না। এরপর হযরত আলী (রা) এ ঘটনা উল্লেখ করেন যে, সে ন্যায় ও ইনসাফে ভূ-পৃষ্ঠ পূর্ণ করবে। (সুনানে আবূ দাউদ)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ قَالَ: قَالَ عَلِيٌّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَنَظَرَ إِلَى ابْنِهِ الْحَسَنِ ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ كَمَا سَمَّاهُ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَسَيَخْرُجُ مِنْ صُلْبِهِ رَجُلٌ يُسَمَّى بِاسْمِ نَبِيِّكُمْ يُشْبِهُهُ فِي الْخُلُقِ وَلاَ يُشْبِهُهُ فِي الْخَلْقِ ثُمَّ ذَكَرَ قِصَّةَ يَمْلأُ الأَرْضَ عَدْلاً. (رواه ابوداؤد)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এই বর্ণনায় হযরত আবূ ইসহাক তাবিঈ হযরত হাসান (রা)-এর বংশধর থেকে জন্মলাভকারী আল্লাহর যে বান্দা সম্বন্ধে হযরত আলী (রা)-এর বাণী উল্লেখ করেছেন, যেহেতু এটা অদৃশ্য বিষয়াবলির মধ্যে এবং শত শত হাজার বছর পর বাস্তবরূপলাভকারী সংবাদ, এজন্য বাহ্যত কথা এটাই যে, তিনি এ কথা ওহীধারী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেই বলেছিলেন। সাহাবা কিরামের এরূপ বর্ণনা মুহাদ্দিসীনের নিকট হাদীসে মারফু' (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহর বাণী) এরই নির্দেশ রাখে। তাঁদের ব্যাপারে এটাই মনে করা হয় যে, এ কথা তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকেই শুনেছেন।
এ বর্ণনায় হযরত আলী (রা) হযরত হাসান (রা) সম্বন্ধে এই বলেছেন যে, আমার এ ছেলে সায়্যিদ (সরদার) যেরূপ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ নাম (সায়্যিদ) দিয়েছিলেন, স্পষ্টত এ দ্বারা হযরত আলী (রা)-এর ইঙ্গিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীর প্রতি যা তিনি হযরত হাসান (রা)-এর ব্যাপারে বলেছিলেন : «إِنَّ ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ وَلَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ عَظِيمَتَيْنِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ» (আমার এই ছেলে সায়্যিদ (সরদার)। আশা করি তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের দু'টি বড় বিরোধী (যুদ্ধাবস্থা) গোষ্ঠীর মধ্যে সন্ধি করাবেন)। আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হাসান (রা)-এর জন্য সায়্যিদ শব্দ ব্যবহার করেছেন।
আলোচ্য হাদীস থেকে এটাও জানা গেল যে, হযরত মাহদী হযরত হাসান (রা) -এর বংশধরের মধ্যে হবেন। তবে অন্যান্য কতক বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি হযরত হুসাইনের বংশধর থেকে হবেন। কোন কোন ভাষ্যকার উভয়টির মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য বিধান করেছেন যে, পিতার দিকে তিনি হাসানী হবেন, আর মায়ের দিক থেকে হুসাইনী হবেন।
কোন কোন বর্ণনায় এটাও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চাচা হযরত আব্বাস (রা) কে সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন যে, মাহদী তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে হবে। তবে এ বর্ণনা খুবই দুর্বল স্তরের। (২) যা কোন ভাবেই নির্ভরযোগ্য নয়। এ থেকে এটাই জানা যায়, মাহ্দী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধর এবং হযরত সায়্যিদা ফাতিমা (রা)-এর সন্তানদের মধ্য থেকে হবেন। (আল্লাহই ভাল জানেন)
টিকা: ১. এ সব বর্ণনা কানযুল উম্মালের কিতাবুল কিয়ামাহ-এর কথা ও কার্যাবলি অংশে দেখা যেতে পারে। প্রথম সংস্করণ দায়িরাতুল মা'আরিফ উসমানিয়া হায়দরাবাদ, খণ্ড-৭ পৃঃ ১৮৮ ও ২৬০।
এ বিষয় সম্পর্কিত এক আবশ্যকীয় সতর্কতা
হযরত মাহদী সম্পর্কিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতায় এটাও আবশ্যক মনে করা হয়েছে যে, তাঁর সম্পর্কে আহলে সুন্নতের পথ ও চিন্তাধারা এবং শী'আ আকীদার পার্থক্য ও মতভেদ বর্ণনা করা হবে। কেননা, কোন কোন ব্যক্তি অজ্ঞদের সামনে এরূপ কথা বলে যে, মাহদীর আবির্ভাব বিষয়ে যেন উভয় দলের ঐকমত্য রয়েছে। অথচ এটা সম্পূর্ণ ধোঁকা ও প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।
টিকা: ২. مقدمة ابن خلدون مغربی فصل في اسر الفاطمي وما يذهب إليه الناس في شأنه وكشف الغطاء عن ذلك ص٢٤٦ تا (٢٦١)
আহলে সুন্নাতের হাদীসের কিতাবসমূহে হযরত মাহদী সম্বন্ধে যে বর্ণনাবলি রয়েছে (যেগুলোর মধ্যে কতক এই পৃষ্ঠাগুলোতেও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে) এসবের ভিত্তিতে তাঁর সম্বন্ধে আহলে সুন্নাতের চিন্তাধারা এই, কিয়ামতের সন্নিকটে এক সময় আসবে যখন দুনিয়াতে কুফর, শয়তানী, অত্যাচার ও বিদ্রোহীতা এরূপ প্রাধান্য পাবে যে, মু'মিনদের জন্য আল্লাহর প্রশস্ত যমিন সংকীর্ণ হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিম জাতির মধ্য থেকেই এক মুজাহিদ ব্যক্তিকে দাঁড় করাবেন। (তাঁর কতক আলামত, গুণাবলি এবং বৈশিষ্ট্যও হাদীসসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে) আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ সাহায্য তাঁর সাথে থাকবে। তাঁর চেষ্টা-প্রচেষ্টায় কুফর, শয়তানী এবং অত্যাচার ও বিদ্রোহীতার প্রাধান্য দুনিয়া থেকে শেষ হবে। গোটা জগতে ঈমান ও ইসলাম এবং ন্যায় ও ইনসাফের পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে অসাধারণ পন্থায় আসমান ও যমিনের বরকতসমূহ প্রকাশ পাবে।
হাদীসসমূহ থেকে এটাও জানা যায় যে, সে সময়ই দাজ্জাল প্রকাশ পাবে, যা হবে আমাদের এ জগতের সর্বাধিক বড় ও শেষ ফিতনা এবং মু'মিনগণের জন্য হবে কঠিনতম পরীক্ষা। তখন হক-বাতিল, এবং ভাল-মন্দ শক্তির মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ের টানাহেঁচড়া হবে। ভাল ও হিদায়াতের নেতা ও পতাকাবাহী হবেন হযরত মাহদী। আর মন্দ, কুফর ও বিদ্রোহীতার পতাকাবাহী হবে দাজ্জাল।
এরপর সে যুগেই হযরত ঈসা (আ)-এর আবির্ভাব হবে। আর তাঁর মাধ্যমেই আল্লাহ্ তা'আলা দাজ্জাল ও তার ফিতনাকে ধ্বংস করাবেন।
বস্তুত হযরত মাহদীর ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের পথ ও চিন্তাধারা তাই যা এই লাইনগুলোতে পেশ করা হয়েছে। তবে শী'আ আকীদা এ থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দুনিয়ার আশ্চর্য বিষয়াবলির মধ্যে সে মতবাদ একটি। আর এই এক আকীদাই তাদের নিকট ঈমানের অংগ যা জ্ঞানীদের জন্য ইসনা আশারিয়া ফিরকা সম্বন্ধে অভিমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য যথেষ্ট। এস্থলে কেবল আহলে সুন্নাতের অবগতির জন্য সংক্ষিপ্তরূপে তার উল্লেখ করা হচ্ছে। এর কতক বিস্তারিত বর্ণনা, শী'আ মাযহাবের কিতাবসমূহের বরাতে লিখিত এই অধমের কিতাব 'ইরানী ইনকিলাব, ইমাম খুমীনী ও শী'আ মতবাদ' দেখা যেতে পারে।
মাহ্দীর ব্যাপারে শী'আ আকীদা
শি'আদের আকীদা, যা তাদের নিকট ঈমানের অংগ তা হল, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য আল্লাহ্ তা'আলা বার ইমামের নাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাদের সবার স্তর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমান এবং অন্যান্য সব নবী ও রাসূল থেকে ঊর্ধ্বে। তারা সবাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ন্যায়ই। তাদের সবার আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য। তাদের সবার সেই সব গুণ ও পূর্ণতা অর্জিত, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ তা'আলা দান করেছিলেন। কেবল এতটুকু পার্থক্য যে, তাদেরকে নবী কিংবা রাসূল বলা যাবে না, বরং ইমাম বলা হবে। আর ইমামতের স্তর নবুওত ও রিসালত থেকে ঊর্ধ্বে। তাদের ইমামতের প্রতি ঈমান গ্রহণ অনুরূপ নাজাতের শর্ত যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের প্রতি ঈমান গ্রহণ নাজাতের শর্ত।
এই বার ইমামের মধ্যে সর্ব প্রথম ইমাম আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা)। তাঁর পর তাঁর বড় ছেলে হযরত হাসান (রা), তাঁরপর তাঁর ছোট ভাই হযরত হুসাইন (রা), তাঁরপর তাঁর ছেলে আলী ইবনুল হুসাইন (যাইনুল আবিদীন)। তাঁরপর এভাবে এক ইমামের এক ছেলে ইমাম হয়ে থাকবেন। এমনকি একাদশ ইমাম ছিলেন হাসান আসকারী। তাঁর ইন্তিকাল ২৬০ হিজরী সালে হয়েছিল।
শী'আ 'ইসনা' আশারিয়াদের আকীদা হচ্ছে, তাঁর ইন্তিকালের ৪-৫ বছর পূর্বে (বর্ণনার মতভেদে ২৫৫ হিজরী অথবা ২৫৬ হিজরীতে)। তাঁর এক ফেরেঙ্গী দাসী (নার্গিস)-এর গর্ভে এক ছেলে জন্ম গ্রহণ করেছিল। তাকে লোকদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখা হত। কেউ তাকে দেখতে পেত না। এজন্য লোকজনের (গোত্রীয় লোকদেরও) তার জন্ম ও তার অস্তিত্বের জ্ঞান ছিল না। এই ছেলে তার পিতা হাসান আসকারীর ইন্তিকালের কেবল দশ দিন পূর্বে (অর্থাৎ ৪-৫ বছর বয়সে) ইমামত সম্পর্কিত সেই সব বিষয় সাথে নিয়ে (যা আমিরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা) থেকে নিয়ে একাদশ ইমাম- তার পিতা হাসান আসকারী পর্যন্ত প্রত্যেক ইমামের নিকট রক্ষিত ছিল, মু'জিযা হিসাবে তিনি অদৃশ্য হয়ে স্বীয় শহর 'সুররা মান রাআ'-এর এক গর্তে তখন থেকে আত্মগোপন করে আছেন। আত্মগোপনের পর এখন সাড়ে এগার'শ বছরেরও অধিক যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে।
শী'আদের আকীদা ও ঈমান হচ্ছে, তিনি দ্বাদশতম ইমাম ও শেষ ইমাম মাহদী। তিনি কোন সময় গর্ত থেকে বের হয়ে আসবেন এবং অন্যান্য অসংখ্য মু'জিযাসুলভ এবং বুদ্ধি হতভম্বকারী কার্যাবলি ছাড়াও তিনি মৃতদেরকে জীবিত করবেন। আর (আল্লাহর পানাহ চাই) হযরত আবু বকর (রা), হযরত উমর (রা) এবং হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) কে যারা শী'আদের নিকট সারা দুনিয়ার কাফির, পাপী, ফির'আউন, নমরূদ, ইত্যাদি থেকেও নিকৃষ্ট স্তরের কাফির ও অপরাধী, তাঁদেরকে কবরগুলো হতে উঠিয়ে এবং জীবিত করে শাস্তি প্রদান করবেন, ফাঁসীতে চড়াবেন এবং হাজার বার জীবিত করে ফাঁসীতে চড়াবেন। আর এভাবে তাঁদের সহযোগিতাকারী সব সাহাবায়ে কিরাম (রা) এবং তাঁদের প্রতি বিশ্বাস ও আকীদা পোষণকারী সব সুন্নীকেও জীবিত করে শাস্তি প্রদান করা হবে। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা) এবং সব নিষ্পাপ ইমাম, বিশেষ করে শী'আ ভক্তগণও জীবিত হবে, আর (আল্লাহর পানাহ্) নিজেদের এই শত্রুদের শাস্তি ও আযাবের তামাশা দেখবেন। যেন শী'আদের এই জনাব ইমাম মাহ্দী কিয়ামতের পূর্বে এক কিয়ামত ঘটাবে। শী'আদের বিশেষ মাযহাবী পরিভাষায় এর নাম رجعت (প্রত্যাবর্তন) আর এর উপরও ঈমান গ্রহণ করা ফরয।
রাজ'আতের ধারাবাহিকতায় শী'আদের বর্ণনায় এটাও রয়েছে যে, যখন এই প্রত্যাবর্তন হবে তখন সেই জনাব মাহদীর হাতে সর্ব প্রথম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়'আত নেবেন। তাঁর পর দ্বিতীয় নাম্বারে আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা) বায়'আত নেবেন। এরপর স্তর অনুযায়ী অন্যান্য ব্যক্তিগণ বায়'আত নেবেন। এই হচ্ছে- শী'আ লোকদের ইমাম মাহদী। যাকে তারা আল কায়্যিম, আল হুজ্জাত, আল মুনতাযার নামে স্মরণ করে এবং গর্ত থেকে তার আগমনের অপেক্ষায় রয়েছে। আর যখন তার উল্লেখ করে তখন বলে এবং লিখে عَجلَ اللَّهُ فَرْجَهُ আল্লাহ্ তা'আলা তাকে তাড়াতাড়ি বাইরে নিয়ে আসুন।
আহলি সুন্নাতের নিকট শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটা কেবল অশ্লীল কাহিনী। যা এ কারণে রচনা করা হয়েছিল যে, শী'আদের একাদশ ইমাম হাসান আসকারী ২৬০ হিজরীতে সন্তানহীন ইন্তিকাল করেন। তার কোন ছেলে ছিল না। এজন্য ইসনা আশারিয়া পন্থীদের এ আকীদা বাতিল হতে বসেছিল যে, ইমামের ছেলেই ইমাম হয়, আর দ্বাদশ ইমাম শেষ ইমাম হবেন। তাঁর পর দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে। বস্তুত কেবল এই ভুল আকীদার বাধ্যবাধকতায় এই অসংগত উপাখ্যান রচনা করা হয়েছে। যা চিন্তা ভাবনার যোগ্যতা সম্পন্ন শী'আদের জন্য পরীক্ষার উপাদান হয়ে আছে।
আক্ষেপ! সংক্ষেপ করণের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মাহদী সম্বন্ধে শী'আ আকীদার বর্ণনা এতটা দীর্ঘায়িত হয়েছে। মাহ্দী সম্বন্ধে আহলে সুন্নতের পথ ও চিন্তাধারা এবং শী'আ আকীদার প্রভেদ ও মতভেদকে সুস্পষ্ট করার জন্যে এতসব লিখা আবশ্যক মনে করা হয়েছে।
হযরত মাহ্দী সম্বন্ধে হাদীসসমূহের ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতায় এটা উল্লেখ করাও সংগত যে, অষ্টম হিজরী শতাব্দীর তাত্ত্বিক ও সমালোচক, বিদ্বান ও লেখক ইবনে খালদুন মাগরিবী স্বীয় বিখ্যাত রচনা 'মুকাদ্দিমায়' মাহদী সংক্রান্ত প্রায় সেইসব বর্ণনার সনদসমূহের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যেগুলো আহলি সুন্নাতের হাদীসের কিতাবসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে। আর প্রায় সবগুলোকেই ক্ষত ও দুর্বল নির্ধারণ করেছেন। (১) যদিও পরবর্তী মুহাদ্দিসীন তাঁর ক্ষত নির্ধারণ ও সমালোচনার সাথে পূর্ণ ঐকমত্য হননি, তবে এটা সত্য যে, ইবনে খালদুনের এই ক্ষত নির্ধারণ ও সমালোচনায় বিষয়টিকে মুহাদ্দিসীনের আলোচনা ও যাচাইযোগ্য করেছে। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সঠিক ও সত্য হিদায়াত চাই।
এ বর্ণনায় হযরত আলী (রা) হযরত হাসান (রা) সম্বন্ধে এই বলেছেন যে, আমার এ ছেলে সায়্যিদ (সরদার) যেরূপ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ নাম (সায়্যিদ) দিয়েছিলেন, স্পষ্টত এ দ্বারা হযরত আলী (রা)-এর ইঙ্গিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীর প্রতি যা তিনি হযরত হাসান (রা)-এর ব্যাপারে বলেছিলেন : «إِنَّ ابْنِي هَذَا سَيِّدٌ وَلَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ عَظِيمَتَيْنِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ» (আমার এই ছেলে সায়্যিদ (সরদার)। আশা করি তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদের দু'টি বড় বিরোধী (যুদ্ধাবস্থা) গোষ্ঠীর মধ্যে সন্ধি করাবেন)। আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হাসান (রা)-এর জন্য সায়্যিদ শব্দ ব্যবহার করেছেন।
আলোচ্য হাদীস থেকে এটাও জানা গেল যে, হযরত মাহদী হযরত হাসান (রা) -এর বংশধরের মধ্যে হবেন। তবে অন্যান্য কতক বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি হযরত হুসাইনের বংশধর থেকে হবেন। কোন কোন ভাষ্যকার উভয়টির মধ্যে এভাবে সামঞ্জস্য বিধান করেছেন যে, পিতার দিকে তিনি হাসানী হবেন, আর মায়ের দিক থেকে হুসাইনী হবেন।
কোন কোন বর্ণনায় এটাও রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় চাচা হযরত আব্বাস (রা) কে সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন যে, মাহদী তাঁর সন্তানদের মধ্য থেকে হবে। তবে এ বর্ণনা খুবই দুর্বল স্তরের। (২) যা কোন ভাবেই নির্ভরযোগ্য নয়। এ থেকে এটাই জানা যায়, মাহ্দী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশধর এবং হযরত সায়্যিদা ফাতিমা (রা)-এর সন্তানদের মধ্য থেকে হবেন। (আল্লাহই ভাল জানেন)
টিকা: ১. এ সব বর্ণনা কানযুল উম্মালের কিতাবুল কিয়ামাহ-এর কথা ও কার্যাবলি অংশে দেখা যেতে পারে। প্রথম সংস্করণ দায়িরাতুল মা'আরিফ উসমানিয়া হায়দরাবাদ, খণ্ড-৭ পৃঃ ১৮৮ ও ২৬০।
এ বিষয় সম্পর্কিত এক আবশ্যকীয় সতর্কতা
হযরত মাহদী সম্পর্কিত হাদীসগুলোর ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতায় এটাও আবশ্যক মনে করা হয়েছে যে, তাঁর সম্পর্কে আহলে সুন্নতের পথ ও চিন্তাধারা এবং শী'আ আকীদার পার্থক্য ও মতভেদ বর্ণনা করা হবে। কেননা, কোন কোন ব্যক্তি অজ্ঞদের সামনে এরূপ কথা বলে যে, মাহদীর আবির্ভাব বিষয়ে যেন উভয় দলের ঐকমত্য রয়েছে। অথচ এটা সম্পূর্ণ ধোঁকা ও প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।
টিকা: ২. مقدمة ابن خلدون مغربی فصل في اسر الفاطمي وما يذهب إليه الناس في شأنه وكشف الغطاء عن ذلك ص٢٤٦ تا (٢٦١)
আহলে সুন্নাতের হাদীসের কিতাবসমূহে হযরত মাহদী সম্বন্ধে যে বর্ণনাবলি রয়েছে (যেগুলোর মধ্যে কতক এই পৃষ্ঠাগুলোতেও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে) এসবের ভিত্তিতে তাঁর সম্বন্ধে আহলে সুন্নাতের চিন্তাধারা এই, কিয়ামতের সন্নিকটে এক সময় আসবে যখন দুনিয়াতে কুফর, শয়তানী, অত্যাচার ও বিদ্রোহীতা এরূপ প্রাধান্য পাবে যে, মু'মিনদের জন্য আল্লাহর প্রশস্ত যমিন সংকীর্ণ হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিম জাতির মধ্য থেকেই এক মুজাহিদ ব্যক্তিকে দাঁড় করাবেন। (তাঁর কতক আলামত, গুণাবলি এবং বৈশিষ্ট্যও হাদীসসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে) আল্লাহ্ তা'আলার বিশেষ সাহায্য তাঁর সাথে থাকবে। তাঁর চেষ্টা-প্রচেষ্টায় কুফর, শয়তানী এবং অত্যাচার ও বিদ্রোহীতার প্রাধান্য দুনিয়া থেকে শেষ হবে। গোটা জগতে ঈমান ও ইসলাম এবং ন্যায় ও ইনসাফের পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে অসাধারণ পন্থায় আসমান ও যমিনের বরকতসমূহ প্রকাশ পাবে।
হাদীসসমূহ থেকে এটাও জানা যায় যে, সে সময়ই দাজ্জাল প্রকাশ পাবে, যা হবে আমাদের এ জগতের সর্বাধিক বড় ও শেষ ফিতনা এবং মু'মিনগণের জন্য হবে কঠিনতম পরীক্ষা। তখন হক-বাতিল, এবং ভাল-মন্দ শক্তির মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ের টানাহেঁচড়া হবে। ভাল ও হিদায়াতের নেতা ও পতাকাবাহী হবেন হযরত মাহদী। আর মন্দ, কুফর ও বিদ্রোহীতার পতাকাবাহী হবে দাজ্জাল।
এরপর সে যুগেই হযরত ঈসা (আ)-এর আবির্ভাব হবে। আর তাঁর মাধ্যমেই আল্লাহ্ তা'আলা দাজ্জাল ও তার ফিতনাকে ধ্বংস করাবেন।
বস্তুত হযরত মাহদীর ব্যাপারে আহলে সুন্নাতের পথ ও চিন্তাধারা তাই যা এই লাইনগুলোতে পেশ করা হয়েছে। তবে শী'আ আকীদা এ থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দুনিয়ার আশ্চর্য বিষয়াবলির মধ্যে সে মতবাদ একটি। আর এই এক আকীদাই তাদের নিকট ঈমানের অংগ যা জ্ঞানীদের জন্য ইসনা আশারিয়া ফিরকা সম্বন্ধে অভিমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য যথেষ্ট। এস্থলে কেবল আহলে সুন্নাতের অবগতির জন্য সংক্ষিপ্তরূপে তার উল্লেখ করা হচ্ছে। এর কতক বিস্তারিত বর্ণনা, শী'আ মাযহাবের কিতাবসমূহের বরাতে লিখিত এই অধমের কিতাব 'ইরানী ইনকিলাব, ইমাম খুমীনী ও শী'আ মতবাদ' দেখা যেতে পারে।
মাহ্দীর ব্যাপারে শী'আ আকীদা
শি'আদের আকীদা, যা তাদের নিকট ঈমানের অংগ তা হল, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের জন্য আল্লাহ্ তা'আলা বার ইমামের নাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাদের সবার স্তর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সমান এবং অন্যান্য সব নবী ও রাসূল থেকে ঊর্ধ্বে। তারা সবাই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ন্যায়ই। তাদের সবার আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য। তাদের সবার সেই সব গুণ ও পূর্ণতা অর্জিত, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ তা'আলা দান করেছিলেন। কেবল এতটুকু পার্থক্য যে, তাদেরকে নবী কিংবা রাসূল বলা যাবে না, বরং ইমাম বলা হবে। আর ইমামতের স্তর নবুওত ও রিসালত থেকে ঊর্ধ্বে। তাদের ইমামতের প্রতি ঈমান গ্রহণ অনুরূপ নাজাতের শর্ত যেরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের প্রতি ঈমান গ্রহণ নাজাতের শর্ত।
এই বার ইমামের মধ্যে সর্ব প্রথম ইমাম আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা)। তাঁর পর তাঁর বড় ছেলে হযরত হাসান (রা), তাঁরপর তাঁর ছোট ভাই হযরত হুসাইন (রা), তাঁরপর তাঁর ছেলে আলী ইবনুল হুসাইন (যাইনুল আবিদীন)। তাঁরপর এভাবে এক ইমামের এক ছেলে ইমাম হয়ে থাকবেন। এমনকি একাদশ ইমাম ছিলেন হাসান আসকারী। তাঁর ইন্তিকাল ২৬০ হিজরী সালে হয়েছিল।
শী'আ 'ইসনা' আশারিয়াদের আকীদা হচ্ছে, তাঁর ইন্তিকালের ৪-৫ বছর পূর্বে (বর্ণনার মতভেদে ২৫৫ হিজরী অথবা ২৫৬ হিজরীতে)। তাঁর এক ফেরেঙ্গী দাসী (নার্গিস)-এর গর্ভে এক ছেলে জন্ম গ্রহণ করেছিল। তাকে লোকদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখা হত। কেউ তাকে দেখতে পেত না। এজন্য লোকজনের (গোত্রীয় লোকদেরও) তার জন্ম ও তার অস্তিত্বের জ্ঞান ছিল না। এই ছেলে তার পিতা হাসান আসকারীর ইন্তিকালের কেবল দশ দিন পূর্বে (অর্থাৎ ৪-৫ বছর বয়সে) ইমামত সম্পর্কিত সেই সব বিষয় সাথে নিয়ে (যা আমিরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা) থেকে নিয়ে একাদশ ইমাম- তার পিতা হাসান আসকারী পর্যন্ত প্রত্যেক ইমামের নিকট রক্ষিত ছিল, মু'জিযা হিসাবে তিনি অদৃশ্য হয়ে স্বীয় শহর 'সুররা মান রাআ'-এর এক গর্তে তখন থেকে আত্মগোপন করে আছেন। আত্মগোপনের পর এখন সাড়ে এগার'শ বছরেরও অধিক যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে।
শী'আদের আকীদা ও ঈমান হচ্ছে, তিনি দ্বাদশতম ইমাম ও শেষ ইমাম মাহদী। তিনি কোন সময় গর্ত থেকে বের হয়ে আসবেন এবং অন্যান্য অসংখ্য মু'জিযাসুলভ এবং বুদ্ধি হতভম্বকারী কার্যাবলি ছাড়াও তিনি মৃতদেরকে জীবিত করবেন। আর (আল্লাহর পানাহ চাই) হযরত আবু বকর (রা), হযরত উমর (রা) এবং হযরত 'আইশা সিদ্দীকা (রা) কে যারা শী'আদের নিকট সারা দুনিয়ার কাফির, পাপী, ফির'আউন, নমরূদ, ইত্যাদি থেকেও নিকৃষ্ট স্তরের কাফির ও অপরাধী, তাঁদেরকে কবরগুলো হতে উঠিয়ে এবং জীবিত করে শাস্তি প্রদান করবেন, ফাঁসীতে চড়াবেন এবং হাজার বার জীবিত করে ফাঁসীতে চড়াবেন। আর এভাবে তাঁদের সহযোগিতাকারী সব সাহাবায়ে কিরাম (রা) এবং তাঁদের প্রতি বিশ্বাস ও আকীদা পোষণকারী সব সুন্নীকেও জীবিত করে শাস্তি প্রদান করা হবে। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা) এবং সব নিষ্পাপ ইমাম, বিশেষ করে শী'আ ভক্তগণও জীবিত হবে, আর (আল্লাহর পানাহ্) নিজেদের এই শত্রুদের শাস্তি ও আযাবের তামাশা দেখবেন। যেন শী'আদের এই জনাব ইমাম মাহ্দী কিয়ামতের পূর্বে এক কিয়ামত ঘটাবে। শী'আদের বিশেষ মাযহাবী পরিভাষায় এর নাম رجعت (প্রত্যাবর্তন) আর এর উপরও ঈমান গ্রহণ করা ফরয।
রাজ'আতের ধারাবাহিকতায় শী'আদের বর্ণনায় এটাও রয়েছে যে, যখন এই প্রত্যাবর্তন হবে তখন সেই জনাব মাহদীর হাতে সর্ব প্রথম রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বায়'আত নেবেন। তাঁর পর দ্বিতীয় নাম্বারে আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (রা) বায়'আত নেবেন। এরপর স্তর অনুযায়ী অন্যান্য ব্যক্তিগণ বায়'আত নেবেন। এই হচ্ছে- শী'আ লোকদের ইমাম মাহদী। যাকে তারা আল কায়্যিম, আল হুজ্জাত, আল মুনতাযার নামে স্মরণ করে এবং গর্ত থেকে তার আগমনের অপেক্ষায় রয়েছে। আর যখন তার উল্লেখ করে তখন বলে এবং লিখে عَجلَ اللَّهُ فَرْجَهُ আল্লাহ্ তা'আলা তাকে তাড়াতাড়ি বাইরে নিয়ে আসুন।
আহলি সুন্নাতের নিকট শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটা কেবল অশ্লীল কাহিনী। যা এ কারণে রচনা করা হয়েছিল যে, শী'আদের একাদশ ইমাম হাসান আসকারী ২৬০ হিজরীতে সন্তানহীন ইন্তিকাল করেন। তার কোন ছেলে ছিল না। এজন্য ইসনা আশারিয়া পন্থীদের এ আকীদা বাতিল হতে বসেছিল যে, ইমামের ছেলেই ইমাম হয়, আর দ্বাদশ ইমাম শেষ ইমাম হবেন। তাঁর পর দুনিয়া শেষ হয়ে যাবে। বস্তুত কেবল এই ভুল আকীদার বাধ্যবাধকতায় এই অসংগত উপাখ্যান রচনা করা হয়েছে। যা চিন্তা ভাবনার যোগ্যতা সম্পন্ন শী'আদের জন্য পরীক্ষার উপাদান হয়ে আছে।
আক্ষেপ! সংক্ষেপ করণের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মাহদী সম্বন্ধে শী'আ আকীদার বর্ণনা এতটা দীর্ঘায়িত হয়েছে। মাহ্দী সম্বন্ধে আহলে সুন্নতের পথ ও চিন্তাধারা এবং শী'আ আকীদার প্রভেদ ও মতভেদকে সুস্পষ্ট করার জন্যে এতসব লিখা আবশ্যক মনে করা হয়েছে।
হযরত মাহ্দী সম্বন্ধে হাদীসসমূহের ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতায় এটা উল্লেখ করাও সংগত যে, অষ্টম হিজরী শতাব্দীর তাত্ত্বিক ও সমালোচক, বিদ্বান ও লেখক ইবনে খালদুন মাগরিবী স্বীয় বিখ্যাত রচনা 'মুকাদ্দিমায়' মাহদী সংক্রান্ত প্রায় সেইসব বর্ণনার সনদসমূহের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যেগুলো আহলি সুন্নাতের হাদীসের কিতাবসমূহে বর্ণনা করা হয়েছে। আর প্রায় সবগুলোকেই ক্ষত ও দুর্বল নির্ধারণ করেছেন। (১) যদিও পরবর্তী মুহাদ্দিসীন তাঁর ক্ষত নির্ধারণ ও সমালোচনার সাথে পূর্ণ ঐকমত্য হননি, তবে এটা সত্য যে, ইবনে খালদুনের এই ক্ষত নির্ধারণ ও সমালোচনায় বিষয়টিকে মুহাদ্দিসীনের আলোচনা ও যাচাইযোগ্য করেছে। আল্লাহ্ তা'আলার নিকট সঠিক ও সত্য হিদায়াত চাই।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)