মা'আরিফুল হাদীস
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
হাদীস নং: ৯২
কিয়ামতের আলামতসমূহ অধ্যায়
হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ
৯২. হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (হযরত ঈসা ইনবে মারয়াম (আ)-এর উল্লেখ করে এবং তাঁর সাথে নিজের বিশেষ সম্পর্কের কথা প্রসঙ্গে) বলেন, আমার ও তাঁর মধ্যখানে কোন নবী নেই। (তাঁর পর আল্লাহ্ তা'আলা আমাকেই নবী ও রাসূল করে পাঠিয়েছেন)। আর নিঃসন্দেহে তিনি (আমার নবুওতী যুগে কিয়ামতের পূর্বে) অবতরণকারী। তোমরা যখন তাঁকে দেখবে তাঁকে চিনতে পারবে, তিনি মাঝারী আকৃতির হবেন। তাঁর রং হবে লাল সাদা। তিনি হলুদ রংগের দু'কাপড়ের মধ্যে হবেন। মনে হবে, তাঁর মাথার চুল থেকে পানির ফোঁটা ঝরছে। যদিও মাথা ভেজা হবে না। তিনি অবতরণের পর ইসলামের শত্রুদের সাথে জিহাদ করবেন। তিনি ক্রুশ টুকরা টুকরা করবেন। শুকর ধ্বংস করবেন এবং জিয্য়া রহিত করবেন। তাঁর সময় আল্লাহ্ তা'আলা ইসলাম ছাড়া সব মিল্লাত ও মাযহাবকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। হযরত মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন, তাকে নিশ্চিহ্ন করবেন। তিনি এ যমিন ও জগতে চল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। এরপর এখানে ইন্তিকাল করবেন এবং মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামায আদায় করবেন। (সুনানে আবু দাউদ)
کتاب علاماتِ قیامت
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَيْسَ بَيْنِي وَبَيْنَهُ نَبِيٌّ- يَعْنِي عِيسَى عليه السلام - وَإِنَّهُ نَازِلٌ فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَاعْرِفُوهُ رَجُلٌ مَرْبُوعٌ إِلَى الْحُمْرَةِ وَالْبَيَاضِ بَيْنَ مُمَصَّرَتَيْنِ كَأَنَّ رَأْسَهُ يَقْطُرُ وَإِنْ لَمْ يُصِبْهُ بَلَلٌ فَيُقَاتِلُ النَّاسَ عَلَى الإِسْلاَمِ فَيَدُقُّ الصَّلِيبَ وَيَقْتُلُ الْخِنْزِيرَ وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ وَيُهْلِكُ اللَّهُ فِي زَمَانِهِ الْمِلَلَ كُلَّهَا إِلاَّ الإِسْلاَمَ وَيُهْلِكُ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ فَيَمْكُثُ فِي الأَرْضِ أَرْبَعِينَ سَنَةً ثُمَّ يُتَوَفَّى فَيُصَلِّي عَلَيْهِ الْمُسْلِمُونَ. (رواه ابوداؤد)
হাদীসের ব্যাখ্যা:
আলোচ্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণের সংবাদের সাথে তার কতক প্রকাশ্য চিহ্নও বর্ণনা করেছেন। প্রথমত তিনি নাতিদীর্ঘ অর্থাৎ মধ্যম আকৃতির হবেন। দ্বিতীয়ত তাঁর রং লাল-সাদা হবে। তৃতীয়ত তাঁর পোশাক হালকা হলুদ রংগের দু'টি কাপড় হবে। চতুর্থত দর্শকের মনে হবে, তাঁর মাথার চুলগুলো থেকে পানির ফোঁটা ঝরছে অথচ তাঁর মাথায় পানি থাকবে না। তখনই তিনি আসমান থেকে অবতরণ করে থাকবেন। অর্থাৎ তিনি এরূপ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হবেন এবং তাঁর মাথার চুল গুলোর অবস্থা এরূপ হবে যেমন এখনই গোসল সেরে এসেছেন।
এই কতক প্রকাশ্য চিহ্ন বর্ণনার পর তিনি তাঁর বিশেষ পদক্ষেপ ও কার্যাবলির উল্লেখ করেন। এ ধারাবাহিকতার প্রথম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে-তিনি লোকজনকে আল্লাহর সত্য দীন ইসলামের দাওআত দেবেন। (যার দাওআত স্ব স্ব যুগে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে আগমনকারী সব নবী দিয়েছেন)। আসমান থেকে অবতরণ করে তাঁর ইসলামের দাও'আত প্রদান ইসলাম সত্য দীন হওয়ার এরূপ উজ্জ্বল দলীল হবে যার পর তা কবুল করা থেকে কেবল সেই হতভাগা ও অন্ধ হৃদয়ের লোকই অস্বীকার করবে, যাদের অন্তর সত্যদ্রোহী হবে এবং তা কবুল করার যোগ্য থাকবে না। তখন হযরত ঈসা (আ) তাদেরকেও সত্য ইসলামের নিয়ামতরাজি সম্বন্ধে অবগত করার জন্য অবশেষে শক্তি প্রয়োগ করবেন। সশস্ত্র জিহাদ করবেন। এছাড়া বিশেষভাবে তাঁর দু'টি পদক্ষেপ তাঁর নামধারী খ্রিস্টানদের সম্পর্কিত হবে। ১. তিনি ক্রুশ টুকরা টুকরা করবেন, যে ক্রুশ খ্রিস্টানরা নিজেদের চিহ্ন এবং যেন মাবুদ বানিয়েছে নিয়েছে। এরই ওপর তাদের চূড়ান্ত গোমরাহী আকীদা-কুফরীর ভিত্তি। এর মাধ্যমে এ সত্যও প্রকাশিত হবে যে, তাঁকে ফাঁসীতে চড়ানো হয়নি, এ বিষয়ে ইয়াহুদী ও নাসরা উভয় দলের আকীদা ভুল ও ভ্রান্ত। কুরআন মজীদে যা বলা হয়েছে এবং মুসলিম জাতির যা বিশ্বাস- তাই সত্য। ২. তাঁর নামধারী খ্রিস্টানদের সম্বন্ধে তাঁর অন্য পদক্ষেপ এই হবে, তিনি শুকর ধ্বংস করবেন। যেগুলো খ্রিস্টানরা নিজেদের জন্য হালাল নির্ধারণ করেছিল। অথচ সব আসমানী শরী'আতে এটা হারাম হিসাবে চলে আসছে। এরপর হাদীস শরীফে হযরত ঈসা (আ)-এর এই পদক্ষেপের উল্লেখ করা হয়েছে যে, জিযয়া গ্রহণ তিনি রহিত করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন, আমাদের শরী'আতে জিযয়ার কানুন ঈসা (আ)-এর অবতরণ পর্যন্ত সময়ের জন্য। যখন তিনি অবতরণ করবেন এবং আমার খলীফা হিসেবে মুসলিম জাতির নেতা ও শাসক হবেন, তখন জিযয়ার আইন রহিত হয়ে যাবে। (এর এক প্রকাশ্য কারণ এটাও হতে পারে যে, তাঁর অবতরণের পর আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে যে অস্বাভাবিক বরকত হবে তখন রাষ্ট্রের জিযয়া আদায়ের প্রয়োজনই থাকবে না, যা এক প্রকার ট্যাক্স) এরপর হাদীস শরীফে তাঁর আরো দু'টি গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলির উল্লেখ করা হয়েছে। ১. আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মাধ্যমে সত্য দীন ইসলাম ছাড়া অন্যান্য বাতিল মাযহাব ও মিল্লাত বিলীন করবেন। সবাই ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করবে। ২. আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর হাতে দাজ্জালকে নিহত করিয়ে তাকে জাহান্নামে পাঠাবেন। দুনিয়া দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তি পাবে, যা ছিল এ দুনিয়ার সর্বাধিক বড় ফিতনা ।
শেষে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মাসীহ্ নাযিল হওয়ার পর এ জগতে চল্লিশ বছর থাকবেন। এরপর এখানেই ইন্তিকাল করবেন। মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামায পড়বেন। হযরত আবু হুরাইরা (রা)-এর এ হাদীস যা সুনানে আবূ দাউদ-এর বরাতে এখানে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
হাদীসে আরো আছে, ঈসা (আ)-এর অবতরণের পর তাঁর রাষ্ট্রীয় ও খিলাফতের যুগে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে যে অস্বাভাবিক বরকতসমূহ হবে সেগুলোর মধ্যে একটি এটাও হবে যে, বাঘ, নেকড়ে ইত্যাদি হিংস্র জন্তুর স্বভাব পরিবর্তন হয়ে যাবে। হিংস্রতার পরিবর্তে সেগুলোর মধ্যে শান্ত স্বভাব এসে যাবে। উট, গাভী ও ষাঁড়গুলোর সাথে বাঘ এবং বকরীগুলোর সাথে নেকড়ে এ ভাবে ফিরবে যে, কেউ কারো ওপর হামলা করবে না। এ ভাবে ছোট শিশু সাপের সাথে খেলা করবে। আর সাপ তাকে দংশন করবে না। কারো দ্বারা কারো কষ্ট হবে না। এই অপ্রাকৃতিক নিয়মাবলি এবং হিংস্র জন্তুদের স্বভাবের পরিবর্তন ও বিপ্লব এ কথার চিহ্ন হবে যে, এ জগত এখন পর্যন্ত যে পদ্ধতিতে চলছিল, তা এখন সমাপ্তির পথে এবং কিয়ামত নিকটবর্তী। এরপর আখিরাতের পদ্ধতি চালু হবে। সে সময়কে কিয়ামতের সুবহে সাদিক মনে করা চাই। আল্লাহ্ তা'আলার কুদরতের প্রশস্ততার ওপর যার ঈমান রয়েছে তার জন্য এগুলোর মধ্যে কোন বিষয়ই অবোধগম্য ও বিশ্বাসের অযোগ্য নয়।
এই কতক প্রকাশ্য চিহ্ন বর্ণনার পর তিনি তাঁর বিশেষ পদক্ষেপ ও কার্যাবলির উল্লেখ করেন। এ ধারাবাহিকতার প্রথম এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে-তিনি লোকজনকে আল্লাহর সত্য দীন ইসলামের দাওআত দেবেন। (যার দাওআত স্ব স্ব যুগে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে আগমনকারী সব নবী দিয়েছেন)। আসমান থেকে অবতরণ করে তাঁর ইসলামের দাও'আত প্রদান ইসলাম সত্য দীন হওয়ার এরূপ উজ্জ্বল দলীল হবে যার পর তা কবুল করা থেকে কেবল সেই হতভাগা ও অন্ধ হৃদয়ের লোকই অস্বীকার করবে, যাদের অন্তর সত্যদ্রোহী হবে এবং তা কবুল করার যোগ্য থাকবে না। তখন হযরত ঈসা (আ) তাদেরকেও সত্য ইসলামের নিয়ামতরাজি সম্বন্ধে অবগত করার জন্য অবশেষে শক্তি প্রয়োগ করবেন। সশস্ত্র জিহাদ করবেন। এছাড়া বিশেষভাবে তাঁর দু'টি পদক্ষেপ তাঁর নামধারী খ্রিস্টানদের সম্পর্কিত হবে। ১. তিনি ক্রুশ টুকরা টুকরা করবেন, যে ক্রুশ খ্রিস্টানরা নিজেদের চিহ্ন এবং যেন মাবুদ বানিয়েছে নিয়েছে। এরই ওপর তাদের চূড়ান্ত গোমরাহী আকীদা-কুফরীর ভিত্তি। এর মাধ্যমে এ সত্যও প্রকাশিত হবে যে, তাঁকে ফাঁসীতে চড়ানো হয়নি, এ বিষয়ে ইয়াহুদী ও নাসরা উভয় দলের আকীদা ভুল ও ভ্রান্ত। কুরআন মজীদে যা বলা হয়েছে এবং মুসলিম জাতির যা বিশ্বাস- তাই সত্য। ২. তাঁর নামধারী খ্রিস্টানদের সম্বন্ধে তাঁর অন্য পদক্ষেপ এই হবে, তিনি শুকর ধ্বংস করবেন। যেগুলো খ্রিস্টানরা নিজেদের জন্য হালাল নির্ধারণ করেছিল। অথচ সব আসমানী শরী'আতে এটা হারাম হিসাবে চলে আসছে। এরপর হাদীস শরীফে হযরত ঈসা (আ)-এর এই পদক্ষেপের উল্লেখ করা হয়েছে যে, জিযয়া গ্রহণ তিনি রহিত করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন, আমাদের শরী'আতে জিযয়ার কানুন ঈসা (আ)-এর অবতরণ পর্যন্ত সময়ের জন্য। যখন তিনি অবতরণ করবেন এবং আমার খলীফা হিসেবে মুসলিম জাতির নেতা ও শাসক হবেন, তখন জিযয়ার আইন রহিত হয়ে যাবে। (এর এক প্রকাশ্য কারণ এটাও হতে পারে যে, তাঁর অবতরণের পর আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে যে অস্বাভাবিক বরকত হবে তখন রাষ্ট্রের জিযয়া আদায়ের প্রয়োজনই থাকবে না, যা এক প্রকার ট্যাক্স) এরপর হাদীস শরীফে তাঁর আরো দু'টি গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলির উল্লেখ করা হয়েছে। ১. আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর মাধ্যমে সত্য দীন ইসলাম ছাড়া অন্যান্য বাতিল মাযহাব ও মিল্লাত বিলীন করবেন। সবাই ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করবে। ২. আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর হাতে দাজ্জালকে নিহত করিয়ে তাকে জাহান্নামে পাঠাবেন। দুনিয়া দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তি পাবে, যা ছিল এ দুনিয়ার সর্বাধিক বড় ফিতনা ।
শেষে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মাসীহ্ নাযিল হওয়ার পর এ জগতে চল্লিশ বছর থাকবেন। এরপর এখানেই ইন্তিকাল করবেন। মুসলমানগণ তাঁর জানাযার নামায পড়বেন। হযরত আবু হুরাইরা (রা)-এর এ হাদীস যা সুনানে আবূ দাউদ-এর বরাতে এখানে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
হাদীসে আরো আছে, ঈসা (আ)-এর অবতরণের পর তাঁর রাষ্ট্রীয় ও খিলাফতের যুগে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট হতে যে অস্বাভাবিক বরকতসমূহ হবে সেগুলোর মধ্যে একটি এটাও হবে যে, বাঘ, নেকড়ে ইত্যাদি হিংস্র জন্তুর স্বভাব পরিবর্তন হয়ে যাবে। হিংস্রতার পরিবর্তে সেগুলোর মধ্যে শান্ত স্বভাব এসে যাবে। উট, গাভী ও ষাঁড়গুলোর সাথে বাঘ এবং বকরীগুলোর সাথে নেকড়ে এ ভাবে ফিরবে যে, কেউ কারো ওপর হামলা করবে না। এ ভাবে ছোট শিশু সাপের সাথে খেলা করবে। আর সাপ তাকে দংশন করবে না। কারো দ্বারা কারো কষ্ট হবে না। এই অপ্রাকৃতিক নিয়মাবলি এবং হিংস্র জন্তুদের স্বভাবের পরিবর্তন ও বিপ্লব এ কথার চিহ্ন হবে যে, এ জগত এখন পর্যন্ত যে পদ্ধতিতে চলছিল, তা এখন সমাপ্তির পথে এবং কিয়ামত নিকটবর্তী। এরপর আখিরাতের পদ্ধতি চালু হবে। সে সময়কে কিয়ামতের সুবহে সাদিক মনে করা চাই। আল্লাহ্ তা'আলার কুদরতের প্রশস্ততার ওপর যার ঈমান রয়েছে তার জন্য এগুলোর মধ্যে কোন বিষয়ই অবোধগম্য ও বিশ্বাসের অযোগ্য নয়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)