কিতাবুস সুনান - ইমাম আবু দাউদ রহঃ
৯. জিহাদের বিধানাবলী
হাদীস নং: ২৫৯০
আন্তর্জাতিক নং: ২৫৯৮
জিহাদের বিধানাবলী
৩৪৮. সফরে বের হওয়ার সময় যে দুআ পাঠ করবে।
২৫৯০. মুসাদ্দাদ ..... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ্ (ﷺ) সফরে বের হওয়ার সময় বলতেনঃ
اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الأَهْلِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمُنْقَلَبِ وَسُوءِ الْمَنْظَرِ فِي الأَهْلِ وَالْمَالِ اللَّهُمَّ اطْوِ لَنَا الأَرْضَ وَهَوِّنْ عَلَيْنَا السَّفَرَ
(অর্থ) হে আল্লাহ্! তুমিই সফরে আমার সঙ্গী এবং আমার পরিবারের প্রতিনিধি। হে আল্লাহ্! আমি (তোমার নিকট) আশ্রয় প্রার্থনা করছি সফরের নানাবিধ কষ্ট হতে, চিন্তা ও মানসিক যাতনা হতে আর পারিববারিক ও আর্থিক অনটন জনিত কুদৃশ্য হতে। হে আল্লাহ! যমীনকে আমাদের জন্য প্রশস্ত করে দাও আর আমাদের সফর সহজ করে দাও।
اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الأَهْلِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمُنْقَلَبِ وَسُوءِ الْمَنْظَرِ فِي الأَهْلِ وَالْمَالِ اللَّهُمَّ اطْوِ لَنَا الأَرْضَ وَهَوِّنْ عَلَيْنَا السَّفَرَ
(অর্থ) হে আল্লাহ্! তুমিই সফরে আমার সঙ্গী এবং আমার পরিবারের প্রতিনিধি। হে আল্লাহ্! আমি (তোমার নিকট) আশ্রয় প্রার্থনা করছি সফরের নানাবিধ কষ্ট হতে, চিন্তা ও মানসিক যাতনা হতে আর পারিববারিক ও আর্থিক অনটন জনিত কুদৃশ্য হতে। হে আল্লাহ! যমীনকে আমাদের জন্য প্রশস্ত করে দাও আর আমাদের সফর সহজ করে দাও।
كتاب الجهاد
باب مَا يَقُولُ الرَّجُلُ إِذَا سَافَرَ
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا يَحْيَى، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَجْلاَنَ، حَدَّثَنِي سَعِيدٌ الْمَقْبُرِيُّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا سَافَرَ قَالَ " اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ وَالْخَلِيفَةُ فِي الأَهْلِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمُنْقَلَبِ وَسُوءِ الْمَنْظَرِ فِي الأَهْلِ وَالْمَالِ اللَّهُمَّ اطْوِ لَنَا الأَرْضَ وَهَوِّنْ عَلَيْنَا السَّفَرَ " .
হাদীসের ব্যাখ্যা:
وَعثاء এর অর্থ কষ্ট-ক্লেশ। সফর যত আরামের সাথেই হোক না কেন, তাতে কিছু না কিছু কষ্ট-ক্লেশ থাকেই। কারণ তাতে বাড়িতে থাকাকালীন সব নিয়ম-শৃঙ্খলা বদলে যায়। আর সফর করার আলাদা কষ্ট তো রয়েছেই। সে কারণেই আল্লাহ তা'আলার কাছে পানাহ চাওয়া হচ্ছে যাতে তিনি কষ্ট লাঘব করে আরামের ব্যবস্থা করে দেন এবং সফরের যাবতীয় বিষয় সহজ করে দেন।
وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ (কষ্টদায়ক দৃশ্য থেকে)। كآبة এর অর্থ শোক, দুঃখ। অর্থাৎ সফরকালে এমন কোনও দৃশ্য যেন আমার চোখে না পড়ে, যা মনের আনন্দ ও সুখ নষ্ট করে দেয় এবং তার পরিবর্তে শোক-দুঃখের জন্ম দেয়। সফর আনন্দময় হওয়া দরকার। অন্যথায় সফরের উদ্দেশ্যপূরণ ব্যাহত হয়। কেননা মন দুঃখ-ভারাক্রান্ত থাকলে সুষ্ঠু চিন্তা করা সম্ভব হয় না। কাজের হিম্মতও থাকে না। মনোবল হারিয়ে যাওয়ার দরুন শরীরেও আড়ষ্টভাব দেখা দেয়। অনেক সময় কঠিন মনোবেদনায় শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় যে উদ্দেশ্যে সফর করা হয়েছিল তা পূরণ করার জন্য যে মেহনত ও পরিশ্রম করা দরকার, তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেজন্যই দুআ করা হচ্ছে যাতে আল্লাহ তা'আলা দুঃখজনক কোনও দৃশ্য ও পরিস্থিতির সম্মুখীন না করেন।
الْحَوْرُ بَعْدَ الْكَوْنِ (অর্জনের পর বিসর্জন)। الْحَوْرُ এর অর্থ প্রত্যাবর্তন। যেমন কুরআন মাজীদে আছে-
اِنَّہٗ ظَنَّ اَنۡ لَّنۡ یَّحُوۡر
'সে মনে করেছিল, কখনোই (আল্লাহর কাছে) ফিরে যাবে না। (সূরা ইনশিকাক, আয়াত ১৪)
الْكَوْنُ অর্থ হওয়া, থাকা, ঘটা। বলা হয় حَارَ بَعْدَ مَا كَانَ (সে একটা সুন্দর অবস্থায় থাকার পর তা থেকে ফিরে গেছে)। অর্থাৎ তার সুন্দর অবস্থাটা লুপ্ত হয়ে গেছে। হাদীছে সুন্দর অবস্থার বিলুপ্তি থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করার কথা বোঝানো হয়েছে। যেমন ঈমান বিলুপ্ত হয়ে কুফর দেখা দেওয়া, ইবাদত-আনুগত্যের স্থানে অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়া, সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ চিন্তাভাবনার স্থানে ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস ও অশুদ্ধ চিন্তাভাবনা গ্রহণ করা। এমনিভাবে নিরাপত্তার পর নিরাপত্তাহীনতা, সচ্ছলতার পর অসচ্ছলতা, সুস্বাস্থ্যের পর অসুস্থতা, উদ্যম-উদ্দীপনার পর গাফলাত ও উদাসীনতার শিকার হওয়া ইত্যাদি বিষয়সমূহও এর অন্তর্ভুক্ত।
বোঝা গেল কোনও সুন্দর ও ভালো অবস্থা আল্লাহ তা'আলার নি'আমত। এ হিসেবে তা অর্জন করা এবং অর্জিত হয়ে যাওয়ার পর তা রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। ইচ্ছাকৃত তা নষ্ট করা বা নষ্ট হতে দেওয়া কিছুতেই উচিত নয়। সে নি'আমত যদি দীন ও ঈমান বিষয়ক হয়ে থাকে, তবে তা অর্জন করা যেমন ফরয, তেমনি তার হেফাজত করাও ফরয বটে। যে সমস্ত কারণে তা নষ্ট হতে পারে, তা এড়িয়ে চলা একান্ত কর্তব্য।
বর্তমানকালে ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস ও ভুল চিন্তাভাবনার ফিতনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কোনও কোনও সরলপ্রাণ মুসলিম খ্রিষ্টান মিশনারীদের অপপ্রচারের শিকার হয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করছে। কেউ বা কাদিয়ানী হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ নাস্তিকও হচ্ছে। আন্তঃধর্ম মতবাদেরও প্রচার-প্রচারণা রয়েছে। আছে তথাকথিত আহলে কুরআনের ফিতনা। এমনও দেখা গেছে যে, নামাযী-কালামী মুসলিম এমনকি কোনও সার্টিফিকেটধারী আলেম পর্যন্তও এসব ফিতনার শিকার হয়ে নিজের ঈমান-আমল বরবাদ করেছে। এ সবই الْحَوْرُ بَعْدَ الْكَوْنِ (অর্জনের পর বিসর্জন)-এর ভয়ানক দৃষ্টান্ত। সফরকালে নতুন অঞ্চল ও নতুন লোকের সঙ্গে মেলামেশার কারণে এ জাতীয় ফিতনার শিকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সফরের শুরুতে এ দুআ পড়া খুবই সংগত। বাড়িতে থাকা অবস্থায়ও এসব ফিতনার ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকা দরকার। হাদীছে দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে-
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ.
'হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তর আপনার দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। (জামে' তিরমিযী: ৩৫৮৭; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৭৬৯০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ৩৯১৯৭: মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ১৭১৩; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ২৩১৮; সহীহ ইবহে হিব্বান: ৯৪৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৭৫৯: বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ৭৪২)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এ দুআটি খুব বেশি বেশি পড়তেন।
কোনও কোনও বর্ণনায় الكونُ এর স্থলে الْكَوْرُ আছে। الْكَوْرُ এর অর্থ প্যাঁচানো। হাদীছে শব্দটি নেওয়া হয়েছে تَكْوِيرُ الْعِمَامَةِ অর্থাৎ পাগড়ি প্যাঁচানো থেকে। মাথায় পাগড়ি প্যাঁচানোর দ্বারা পাগড়ির কাপড় এক স্থানে জড়ো হয়। খুলে ফেললে তা ছড়িয়ে পড়ে। হাদীছটিতে الْحَوْرُ بَعْدَ الْكَوْرِ দ্বারা জামাতবদ্ধ থাকার পর তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, নিজের যাবতীয় অবস্থা সুসংহত থাকার পর তা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া, মনে প্রশান্তি লাভের পর অস্থিরতা দেখা দেওয়া ইত্যাদি সর্বপ্রকার অস্থিরতা ও অব্যবস্থাপনা থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করার কথা বোঝানো হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে দীনী ও দুনিয়াবী সর্বপ্রকার পেরেশানি ও অস্থিরতা এর অন্তর্ভুক্ত। সেদিক থেকে উভয় শব্দের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই। ব্যাখ্যাদাতাদের অনেকেই শব্দদু'টির একই মর্ম বর্ণনা করেছেন। কাজেই দুআটি যে শব্দেই পড়া হোক, উদ্দেশ্য আদায় হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
دَعْوَةُ الْمَظْلُوم (মজলুমের বদদুআ)। মজলুমের বদদুআ থেকে বাঁচা একান্ত জরুরি। কেননা মজলুম ব্যক্তি দুআ অবশ্যই কবুল হয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَين الله حجاب.
'আর মজলুমের দুআকে (অর্থাৎ বদদুআকে) ভয় করো, কেননা তার ও আল্লাহর মাঝখানে কোনও আড়াল থাকে না। (সহীহ বুখারী: ১৪৯৬; সহীহ মুসলিম: ১৯; জামে তিরমিযী: ২০১৪; সুনানে আবূ দাউদ: ১৫৮৪; সুনানে নাসাঈ: ২৫২২; সুনানে ইবন মাজাহ: ১৭৮৩; মুসনাদে আহমাদ: ২০৭১)
অর্থাৎ মজলুম ব্যক্তি যদি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানায় এবং জালিমের বিরুদ্ধে তাঁর কাছে দুআ করে, তবে তা অবশ্যই কবুল হয়। তার দুআ ও আল্লাহর মাঝখানে কোনও আড়াল না থাকা দ্বারা দুআ কবুলের অনিবার্যতা বোঝানো হয়েছে। মজলুম ব্যক্তি যেমনই হোক না কেন, তার বদদুআ কবুল হয়-ই। অপর এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ مُسْتَجَابَةٌ وَإِنْ كَانَ فَاجِرًا فَفُجُورُهُ عَلَى نَفْسِهِ.
'মজলুমের দুআ অবশ্যই কবুল হয়, যদিও সে পাপিষ্ঠ হয়। তার পাপাচারের দায় তার নিজের। (মুসনাদে আহমাদ: ৮৭৮০; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ২৪৫০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৯৩৭৪; খারাইতী, মাসাবিউল আখলাক: ৫৮৮)
মজলুমের দুআ থেকে বাঁচার কী উপায়? উপায় হলো কারও প্রতি জুলুম না করা। আর কখনও জুলুম করা হয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।
সফরকালে এ দুআ করার কারণ হলো সফরে অন্যের প্রতি জুলুমের আশঙ্কা থাকে। যেমন গাড়ির চালকের উপর, কুলির উপর, সহযাত্রীর উপর, সফরসঙ্গীর উপর ইত্যাদি। সফরের দলনেতা হলে সে ক্ষেত্রে নেতার পক্ষ হতে দলের লোকদের উপর অন্যায়-অবিচার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে। জুলুম করার অর্থ কাউকে তার প্রাপ্য অধিকার সঠিকভাবে বুঝিয়ে না দেওয়া বা কারও উপর তার দায়িত্বের বেশি কাজ চাপানো কিংবা শুধু শুধুই কাউকে কষ্ট দেওয়া, তা কটু কথার দ্বারা হোক, গালমন্দ করার দ্বারা হোক কিংবা শারীরিক আঘাত করার দ্বারা হোক। সর্বাবস্থায় মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি থাকার কারণে অনেক সময়ই ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। আর তখন ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অন্যের উপর জুলুম হয়ে যায়। তা যাতে না হয়, সে কারণেই সফরের শুরুতে আল্লাহ তা'আলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। মজলুমের বদদুআ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দ্বারা যেমন সে প্রার্থনা করা হয়, তেমনি নিজ অন্তরে অন্যের প্রতি জুলুম না করার চেতনাও জাগ্রত করা হয়। অন্তরে সে চেতনা জাগ্রত থাকলে জুলুম করা হতে আত্মরক্ষার চেষ্টা থাকবে। আর সে চেষ্টা থাকলে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সাহায্যও লাভ হবে। ফলে সম্পূর্ণ সফর এমনভাবে সম্পন্ন হবে যে, কারও প্রতি কোনওরকম জুলুম হবে না এবং মজলুমের বদদু'আর পাত্রও হতে হবে না।
سُوء الْمَنْظَرِ فِي الأَهْلِ وَالْمَال (এবং পরিবারবর্গ ও অর্থ-সম্পদে মন্দ দৃশ্য)। অর্থাৎ সফর থেকে ফিরে আসার পর যেন এসব ঠিকঠাকভাবে পাওয়া যায়। সফরে চলে যাওয়ার পর যেন অর্থসম্পদ কোনও বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে। পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততির কেউ যেন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত না হয়। এমন অনেক সময় হয়ে থাকে যে, মানুষ সফরে যায় আর ফিরে আসার পর জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পায়। হয় কোনও প্রিয়জন মারা গেছে বা কেউ কোনও কঠিন রোগের শিকার হয়ে পড়েছে কিংবা বড় ধরনের কোনও আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে। ফিরে আসার পর এরকম মন্দ কিছু যাতে দেখতে না হয়, এ প্রার্থনা ভেতর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে সে আকুতিই জানানো হয়েছে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সফরের শুরুতে এই দুআটি পড়ে নেওয়া উচিত-اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمُنْقَلَبِ وَمِنَ الْحَوْرِ بَعْدَ الْكَوْنِ وَمِنْ دَعْوَةِ الْمَظْلُومِ وَمِنْ سُوءِ الْمَنْظَرِ فِي الأَهْلِ وَالْمَالِ.
খ. সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সচ্ছলতা প্রভৃতি ভালো অবস্থা আল্লাহ তা'আলার নি'আমত। এর হেফাজত করা জরুরি।
গ. ঈমান, আমল, আকীদা-বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ চিন্তাচেতনা যাতে নষ্ট না হতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং এর জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআও করতে হবে।
ঘ. মজলুমের দুআ থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে হবে। আর সে লক্ষ্যে কারও প্রতি কোনও অবস্থায়ই যাতে জুলুম ও অন্যায়-অবিচার না হয়ে যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
ঙ. পরিবারবর্গ ও অর্থসম্পদের সুরক্ষায় সতর্ক থাকা যেমন জরুরি, তেমনি এর জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআ করাও কর্তব্য।
وَكَآبَةِ الْمَنْظَرِ (কষ্টদায়ক দৃশ্য থেকে)। كآبة এর অর্থ শোক, দুঃখ। অর্থাৎ সফরকালে এমন কোনও দৃশ্য যেন আমার চোখে না পড়ে, যা মনের আনন্দ ও সুখ নষ্ট করে দেয় এবং তার পরিবর্তে শোক-দুঃখের জন্ম দেয়। সফর আনন্দময় হওয়া দরকার। অন্যথায় সফরের উদ্দেশ্যপূরণ ব্যাহত হয়। কেননা মন দুঃখ-ভারাক্রান্ত থাকলে সুষ্ঠু চিন্তা করা সম্ভব হয় না। কাজের হিম্মতও থাকে না। মনোবল হারিয়ে যাওয়ার দরুন শরীরেও আড়ষ্টভাব দেখা দেয়। অনেক সময় কঠিন মনোবেদনায় শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় যে উদ্দেশ্যে সফর করা হয়েছিল তা পূরণ করার জন্য যে মেহনত ও পরিশ্রম করা দরকার, তা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সেজন্যই দুআ করা হচ্ছে যাতে আল্লাহ তা'আলা দুঃখজনক কোনও দৃশ্য ও পরিস্থিতির সম্মুখীন না করেন।
الْحَوْرُ بَعْدَ الْكَوْنِ (অর্জনের পর বিসর্জন)। الْحَوْرُ এর অর্থ প্রত্যাবর্তন। যেমন কুরআন মাজীদে আছে-
اِنَّہٗ ظَنَّ اَنۡ لَّنۡ یَّحُوۡر
'সে মনে করেছিল, কখনোই (আল্লাহর কাছে) ফিরে যাবে না। (সূরা ইনশিকাক, আয়াত ১৪)
الْكَوْنُ অর্থ হওয়া, থাকা, ঘটা। বলা হয় حَارَ بَعْدَ مَا كَانَ (সে একটা সুন্দর অবস্থায় থাকার পর তা থেকে ফিরে গেছে)। অর্থাৎ তার সুন্দর অবস্থাটা লুপ্ত হয়ে গেছে। হাদীছে সুন্দর অবস্থার বিলুপ্তি থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করার কথা বোঝানো হয়েছে। যেমন ঈমান বিলুপ্ত হয়ে কুফর দেখা দেওয়া, ইবাদত-আনুগত্যের স্থানে অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়া, সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ চিন্তাভাবনার স্থানে ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস ও অশুদ্ধ চিন্তাভাবনা গ্রহণ করা। এমনিভাবে নিরাপত্তার পর নিরাপত্তাহীনতা, সচ্ছলতার পর অসচ্ছলতা, সুস্বাস্থ্যের পর অসুস্থতা, উদ্যম-উদ্দীপনার পর গাফলাত ও উদাসীনতার শিকার হওয়া ইত্যাদি বিষয়সমূহও এর অন্তর্ভুক্ত।
বোঝা গেল কোনও সুন্দর ও ভালো অবস্থা আল্লাহ তা'আলার নি'আমত। এ হিসেবে তা অর্জন করা এবং অর্জিত হয়ে যাওয়ার পর তা রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। ইচ্ছাকৃত তা নষ্ট করা বা নষ্ট হতে দেওয়া কিছুতেই উচিত নয়। সে নি'আমত যদি দীন ও ঈমান বিষয়ক হয়ে থাকে, তবে তা অর্জন করা যেমন ফরয, তেমনি তার হেফাজত করাও ফরয বটে। যে সমস্ত কারণে তা নষ্ট হতে পারে, তা এড়িয়ে চলা একান্ত কর্তব্য।
বর্তমানকালে ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাস ও ভুল চিন্তাভাবনার ফিতনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কোনও কোনও সরলপ্রাণ মুসলিম খ্রিষ্টান মিশনারীদের অপপ্রচারের শিকার হয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করছে। কেউ বা কাদিয়ানী হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ নাস্তিকও হচ্ছে। আন্তঃধর্ম মতবাদেরও প্রচার-প্রচারণা রয়েছে। আছে তথাকথিত আহলে কুরআনের ফিতনা। এমনও দেখা গেছে যে, নামাযী-কালামী মুসলিম এমনকি কোনও সার্টিফিকেটধারী আলেম পর্যন্তও এসব ফিতনার শিকার হয়ে নিজের ঈমান-আমল বরবাদ করেছে। এ সবই الْحَوْرُ بَعْدَ الْكَوْنِ (অর্জনের পর বিসর্জন)-এর ভয়ানক দৃষ্টান্ত। সফরকালে নতুন অঞ্চল ও নতুন লোকের সঙ্গে মেলামেশার কারণে এ জাতীয় ফিতনার শিকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সফরের শুরুতে এ দুআ পড়া খুবই সংগত। বাড়িতে থাকা অবস্থায়ও এসব ফিতনার ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকা দরকার। হাদীছে দুআ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে-
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ.
'হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তর আপনার দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। (জামে' তিরমিযী: ৩৫৮৭; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা: ৭৬৯০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ৩৯১৯৭: মুসনাদে আবু দাউদ তয়ালিসী: ১৭১৩; মুসনাদে আবু ইয়া'লা: ২৩১৮; সহীহ ইবহে হিব্বান: ৯৪৩; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ৭৫৯: বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ৭৪২)
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও এ দুআটি খুব বেশি বেশি পড়তেন।
কোনও কোনও বর্ণনায় الكونُ এর স্থলে الْكَوْرُ আছে। الْكَوْرُ এর অর্থ প্যাঁচানো। হাদীছে শব্দটি নেওয়া হয়েছে تَكْوِيرُ الْعِمَامَةِ অর্থাৎ পাগড়ি প্যাঁচানো থেকে। মাথায় পাগড়ি প্যাঁচানোর দ্বারা পাগড়ির কাপড় এক স্থানে জড়ো হয়। খুলে ফেললে তা ছড়িয়ে পড়ে। হাদীছটিতে الْحَوْرُ بَعْدَ الْكَوْرِ দ্বারা জামাতবদ্ধ থাকার পর তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, নিজের যাবতীয় অবস্থা সুসংহত থাকার পর তা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া, মনে প্রশান্তি লাভের পর অস্থিরতা দেখা দেওয়া ইত্যাদি সর্বপ্রকার অস্থিরতা ও অব্যবস্থাপনা থেকে আল্লাহ তা'আলার আশ্রয় গ্রহণ করার কথা বোঝানো হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে দীনী ও দুনিয়াবী সর্বপ্রকার পেরেশানি ও অস্থিরতা এর অন্তর্ভুক্ত। সেদিক থেকে উভয় শব্দের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য নেই। ব্যাখ্যাদাতাদের অনেকেই শব্দদু'টির একই মর্ম বর্ণনা করেছেন। কাজেই দুআটি যে শব্দেই পড়া হোক, উদ্দেশ্য আদায় হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
دَعْوَةُ الْمَظْلُوم (মজলুমের বদদুআ)। মজলুমের বদদুআ থেকে বাঁচা একান্ত জরুরি। কেননা মজলুম ব্যক্তি দুআ অবশ্যই কবুল হয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَين الله حجاب.
'আর মজলুমের দুআকে (অর্থাৎ বদদুআকে) ভয় করো, কেননা তার ও আল্লাহর মাঝখানে কোনও আড়াল থাকে না। (সহীহ বুখারী: ১৪৯৬; সহীহ মুসলিম: ১৯; জামে তিরমিযী: ২০১৪; সুনানে আবূ দাউদ: ১৫৮৪; সুনানে নাসাঈ: ২৫২২; সুনানে ইবন মাজাহ: ১৭৮৩; মুসনাদে আহমাদ: ২০৭১)
অর্থাৎ মজলুম ব্যক্তি যদি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানায় এবং জালিমের বিরুদ্ধে তাঁর কাছে দুআ করে, তবে তা অবশ্যই কবুল হয়। তার দুআ ও আল্লাহর মাঝখানে কোনও আড়াল না থাকা দ্বারা দুআ কবুলের অনিবার্যতা বোঝানো হয়েছে। মজলুম ব্যক্তি যেমনই হোক না কেন, তার বদদুআ কবুল হয়-ই। অপর এক হাদীছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ مُسْتَجَابَةٌ وَإِنْ كَانَ فَاجِرًا فَفُجُورُهُ عَلَى نَفْسِهِ.
'মজলুমের দুআ অবশ্যই কবুল হয়, যদিও সে পাপিষ্ঠ হয়। তার পাপাচারের দায় তার নিজের। (মুসনাদে আহমাদ: ৮৭৮০; মুসনাদে আবূ দাউদ তয়ালিসী: ২৪৫০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ২৯৩৭৪; খারাইতী, মাসাবিউল আখলাক: ৫৮৮)
মজলুমের দুআ থেকে বাঁচার কী উপায়? উপায় হলো কারও প্রতি জুলুম না করা। আর কখনও জুলুম করা হয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।
সফরকালে এ দুআ করার কারণ হলো সফরে অন্যের প্রতি জুলুমের আশঙ্কা থাকে। যেমন গাড়ির চালকের উপর, কুলির উপর, সহযাত্রীর উপর, সফরসঙ্গীর উপর ইত্যাদি। সফরের দলনেতা হলে সে ক্ষেত্রে নেতার পক্ষ হতে দলের লোকদের উপর অন্যায়-অবিচার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে। জুলুম করার অর্থ কাউকে তার প্রাপ্য অধিকার সঠিকভাবে বুঝিয়ে না দেওয়া বা কারও উপর তার দায়িত্বের বেশি কাজ চাপানো কিংবা শুধু শুধুই কাউকে কষ্ট দেওয়া, তা কটু কথার দ্বারা হোক, গালমন্দ করার দ্বারা হোক কিংবা শারীরিক আঘাত করার দ্বারা হোক। সর্বাবস্থায় মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি থাকার কারণে অনেক সময়ই ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। আর তখন ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অন্যের উপর জুলুম হয়ে যায়। তা যাতে না হয়, সে কারণেই সফরের শুরুতে আল্লাহ তা'আলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। মজলুমের বদদুআ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দ্বারা যেমন সে প্রার্থনা করা হয়, তেমনি নিজ অন্তরে অন্যের প্রতি জুলুম না করার চেতনাও জাগ্রত করা হয়। অন্তরে সে চেতনা জাগ্রত থাকলে জুলুম করা হতে আত্মরক্ষার চেষ্টা থাকবে। আর সে চেষ্টা থাকলে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সাহায্যও লাভ হবে। ফলে সম্পূর্ণ সফর এমনভাবে সম্পন্ন হবে যে, কারও প্রতি কোনওরকম জুলুম হবে না এবং মজলুমের বদদু'আর পাত্রও হতে হবে না।
سُوء الْمَنْظَرِ فِي الأَهْلِ وَالْمَال (এবং পরিবারবর্গ ও অর্থ-সম্পদে মন্দ দৃশ্য)। অর্থাৎ সফর থেকে ফিরে আসার পর যেন এসব ঠিকঠাকভাবে পাওয়া যায়। সফরে চলে যাওয়ার পর যেন অর্থসম্পদ কোনও বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে। পরিবারবর্গ ও সন্তান-সন্ততির কেউ যেন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত না হয়। এমন অনেক সময় হয়ে থাকে যে, মানুষ সফরে যায় আর ফিরে আসার পর জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পায়। হয় কোনও প্রিয়জন মারা গেছে বা কেউ কোনও কঠিন রোগের শিকার হয়ে পড়েছে কিংবা বড় ধরনের কোনও আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে। ফিরে আসার পর এরকম মন্দ কিছু যাতে দেখতে না হয়, এ প্রার্থনা ভেতর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার কাছে সে আকুতিই জানানো হয়েছে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. সফরের শুরুতে এই দুআটি পড়ে নেওয়া উচিত-اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَآبَةِ الْمُنْقَلَبِ وَمِنَ الْحَوْرِ بَعْدَ الْكَوْنِ وَمِنْ دَعْوَةِ الْمَظْلُومِ وَمِنْ سُوءِ الْمَنْظَرِ فِي الأَهْلِ وَالْمَالِ.
খ. সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, সচ্ছলতা প্রভৃতি ভালো অবস্থা আল্লাহ তা'আলার নি'আমত। এর হেফাজত করা জরুরি।
গ. ঈমান, আমল, আকীদা-বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ চিন্তাচেতনা যাতে নষ্ট না হতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং এর জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআও করতে হবে।
ঘ. মজলুমের দুআ থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে হবে। আর সে লক্ষ্যে কারও প্রতি কোনও অবস্থায়ই যাতে জুলুম ও অন্যায়-অবিচার না হয়ে যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
ঙ. পরিবারবর্গ ও অর্থসম্পদের সুরক্ষায় সতর্ক থাকা যেমন জরুরি, তেমনি এর জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআ করাও কর্তব্য।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)