আল জামিউস সহীহ- ইমাম বুখারী রহঃ

৪১- হিবা তথা উপহার প্রদান, এর ফযীলত ও এতে উৎসাহ প্রদান

হাদীস নং: ২৪১৭
আন্তর্জাতিক নং: ২৫৮৮
- হিবা তথা উপহার প্রদান, এর ফযীলত ও এতে উৎসাহ প্রদান
১৬১৮. স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে এবং স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে দান করা। ইবরাহীম (রাহঃ) বলেছেন, এরূপ দান বৈধ। আর উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রাহঃ) বলেছেন, (এ ধরনের দান পরে) তারা প্রত্যাহার করতে পারবে না। নবী (ﷺ) তার স্ত্রীগণের কাছে আয়িশা (রাযিঃ) এর ঘরে সেবা শুশ্রূষা গ্রহণের অনুমতি চেয়েছিলেন। নবী (ﷺ) বলেছেন, যে আপন দান ফেরত নেয় সে ঐ কুকুরের ন্যায়, যে বমি করে পুনরায় খায়। ইমাম যুহরী (রাহঃ) বলেন,কোন ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে বলে, আমাকে তোমার মাহরের কিছু অংশ বা সবটুকু দান করে দাও। অথচ সে দান করার কিছু (দিন বা সময়) পরেই তাকে তালাক দিয়ে বসে, আর স্ত্রীও তার দান ফেরত দাবি করে তাহলে তাকে তা ফেরত দিতে হবে; যদি প্রতারণার উদ্দেশ্যে এরূপ করে থাকে। আর যদি সে খুশি মনে দান করে থাকে, আর স্বামীর আচরণেও প্রতারনা না থাকে তাহলে বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ পরে যদি তারা তার কিছু অংশ দান করে দেয় তবে স্বাচ্ছন্দে ও তৃপ্তিভরে তা আহার কর। (৪ঃ ৪)
২৪১৭। ইবরাহীম ইবনে মুসা (রাহঃ) .... আয়িশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর কষ্ট বেড়ে গেল! তখন তিনি তাঁর স্ত্রীগণের কাছে আমার ঘরে সেবা-শুশ্রূষা লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তারা তাকে সম্মতি দিলেন। তারপর একদিন দু’ ব্যক্তির উপর ভর করে বের হলেন, তখন তার উভয় কদম মুবারক মাটি স্পর্শ করছিল। তিনি আব্বাস (রাযিঃ) ও আরেক ব্যক্তির মাঝে ভর দিয়ে চলছিলেন। উবাইদুল্লাহ্ (রাহঃ) বলেন, আয়িশা (রাযিঃ) যা বললেন, তা আমি ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) এর কাছে আরয করলাম, তিনি তখন আমাকে বললেন, জানো, আয়িশা (রাযিঃ) যার নাম উল্লেখ করলেন না, তিনি কে? আমি বললাম, না; (জানি না)। তিনি বললেন, তিনি হলেন আলী ইবনে আবু তালিব (রাযিঃ)।
كتاب الهبة وفضلها والتحريض عليها
بَابُ هِبَةِ الرَّجُلِ لِامْرَأَتِهِ وَالمَرْأَةِ لِزَوْجِهَا قَالَ إِبْرَاهِيمُ: «جَائِزَةٌ» وَقَالَ عُمَرُ بْنُ عَبْدِ العَزِيزِ: «لاَ يَرْجِعَانِ» وَاسْتَأْذَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نِسَاءَهُ فِي أَنْ يُمَرَّضَ فِي بَيْتِ عَائِشَةَ وَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «العَائِدُ فِي هِبَتِهِ كَالكَلْبِ يَعُودُ فِي قَيْئِهِ» وَقَالَ الزُّهْرِيُّ: فِيمَنْ قَالَ لِامْرَأَتِهِ: هَبِي لِي بَعْضَ صَدَاقِكِ أَوْ كُلَّهُ، ثُمَّ لَمْ يَمْكُثْ إِلَّا يَسِيرًا حَتَّى طَلَّقَهَا فَرَجَعَتْ فِيهِ، قَالَ: «يَرُدُّ إِلَيْهَا إِنْ كَانَ خَلَبَهَا، وَإِنْ كَانَتْ أَعْطَتْهُ عَنْ طِيبِ نَفْسٍ لَيْسَ فِي شَيْءٍ مِنْ أَمْرِهِ خَدِيعَةٌ، جَازَ» قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: {فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هنيئا مريئا} [النساء: 4]
2588 - حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُوسَى، أَخْبَرَنَا هِشَامٌ، عَنْ مَعْمَرٍ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ: أَخْبَرَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَتْ عَائِشَةُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا: «لَمَّا ثَقُلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاشْتَدَّ وَجَعُهُ اسْتَأْذَنَ أَزْوَاجَهُ أَنْ يُمَرَّضَ فِي بَيْتِي، فَأَذِنَّ لَهُ، فَخَرَجَ بَيْنَ رَجُلَيْنِ تَخُطُّ رِجْلاَهُ الأَرْضَ، وَكَانَ بَيْنَ العَبَّاسِ وَبَيْنَ رَجُلٍ آخَرَ» ، فَقَالَ عُبَيْدُ اللَّهِ: فَذَكَرْتُ لِابْنِ عَبَّاسٍ مَا قَالَتْ عَائِشَةُ، فَقَالَ لِي: وَهَلْ تَدْرِي مَنِ الرَّجُلُ الَّذِي لَمْ تُسَمِّ عَائِشَةُ؟ قُلْتُ: لاَ، قَالَ: هُوَ عَلِيُّ بْنُ أَبِي طَالِبٍ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসের বিষয়বস্তুটি সঠিকভাবে বুঝার জন্য এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, হুযুর (ﷺ)-এর নয়জন স্ত্রী ছিলেন, যাঁদের হুজরাসমূহ পৃথক পৃথক ছিল। হুযুর (ﷺ)-এর অভ্যাস ও রীতি এই ছিল যে, ইনসাফের স্বার্থে তিনি পালাক্রমে সবার ঘরে এক এক রাত অবস্থান করতেন। তিনি এ নীতির এভাবে অনুসরণ করতেন যে, কোন কোন আলেম এ থেকে এই বুঝেছেন যে, এমনটি করা তাঁর বেলায় ফরয ও ওয়াজিব ছিল। যাহোক, সফর মাসের কোন এক তারিখে (যার ব্যাপারে রিওয়ায়াত বিভিন্ন ধরনের রয়েছে।) তাঁর এ অসুস্থতার সূচনা হল, যার সমাপ্তি ওফাতের উপরই হয়। বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, এ দিন হুযুর (ﷺ)-এর অবস্থান ছিল হযরত মায়মূনা রাযি.-এর ঘরে। পরের দিন যে স্ত্রীর ঘরে তাঁর অবস্থান নির্ধারিত ছিল, তিনি তাঁর ঘরে স্থানান্তরিত হয়ে গেলেন এবং এ অসুস্থতার অবস্থায়ই কয়েক দিন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকল যে, যে দিন যে স্ত্রীর ঘরে অবস্থান নির্ধারিত থাকত, সেদিন তিনি সেখানে স্থানান্তরিত হয়ে যেতেন। অসুস্থ অবস্থায় প্রতিদিন এক ঘর থেকে অন্য ঘরে স্থানান্তরিত হওয়া তাঁর জন্য খুবই কষ্টের কারণ হয়ে গিয়েছিল। তাই তাঁর বাসনা ছিল যে, তিনি একই ঘরে অবস্থান করবেন এবং বিভিন্ন কারণে তাঁর অন্তরে হযরত আয়েশার ঘরের প্রাধান্য ছিল। হাদীসের শব্দমালার বাহ্যিক অর্থ এটাই যে, হুযুর (ﷺ) স্বয়ং স্ত্রীদের কাছে এ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং তাঁদের নিকট এর অনুমতি চাইলেন, কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে এ হাদীসেরই ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, ইবনে সাদ বিশুদ্ধ সনদে ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উম্মাহাতুল মু'মিনীন থেকে এ অনুমতি হুযুর (ﷺ)-এর পক্ষ থেকে তাঁর প্রিয়তমা কন্যা হযরত ফাতেমা রাযি. নিয়েছিলেন। যাহোক, সমস্ত আযওয়াজে মুতাহহারাত এতে সম্মত হয়ে গেলেন এবং হুযুর (ﷺ)-কে হযরত আয়েশার হুজরায় পৌঁছে দেওয়া হল। স্বয়ং হযরত আয়েশার বর্ণনা যে, এ দিনটা ছিল সোমবার অর্থাৎ, ওফাতের ঠিক এক সপ্তাহ পূর্বে। হুযুর (ﷺ) অসুস্থতার কারণে যখন এমন দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন যে, তিনি নিজে চলাফেরা করতে পারতেন না; বরং দু'ব্যক্তি এভাবে তাঁকে আনছিল যে, তাঁর পা মুবারক মাটিতে হেঁচড়ে চলছিল। হযরত আয়েশা রাযি.-এর এ দু'ব্যক্তির মধ্যে হুযুর (ﷺ)-এর চাচা হযরত আব্বাস রাযি.-এর নাম তো উল্লেখ করেছেন, কিন্তু অপরজনের নাম বলেননি। যাহোক, এভাবে হুযুর (ﷺ)-কে হযরত আয়েশার হুজরায় পৌঁছিয়ে দেওয়া হল, যে স্থানটি সর্বদার জন্য তাঁর শয়ন ও বিশ্রামস্থল হিসাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বেই নির্ধারিত ছিল। আর আগেই যেমন বলা হয়েছে যে, এ দিনটি ছিল সোমবার।

অন্য বর্ণনায় আছে হযরত আয়েশা রাযি. যে বলেছেন, আমার ঘরে আসার পর হুযুর (ﷺ)-এর অসুখ বেড়ে গেল এবং তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে গোসল করানো হল এবং সাত মশক পানি ঢালা হল- যার ফলে তাঁর অবস্থা ভাল ও হালকা হয়ে গেল। তারপর তিনি মসজিদে গেলেন, নামায পড়ালেন এবং নামাযের পর ভাষণ দিলেন, এ ঘটনাটি ঐ দিনকার নয়, যেদিন তিনি হযরত আয়েশার ঘরে এসেছিলেন; বরং এটা তিন দিন পরের বৃহস্পতিবারের ঘটনা, যেমন অন্যান্য বর্ণনায় এটা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আর এটা ছিল যোহরের নামায এবং এটা হুযুর (ﷺ)-এর জীবনের শেষ নামায ছিল, যা তিনি মসজিদে পড়িয়েছিলেন এবং এটাই তাঁর জীবনের শেষ ভাষণ ছিল।

এটা যোহরের ওয়াক্ত ছিল এবং হুযুর (ﷺ)-এর নির্দেশ অনুযায়ী হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর পেছনে নামায শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় হুযুর (ﷺ) একটু স্বস্তি ও আরামবোধ করলেন এবং দু'ব্যক্তির সাহায্যে মসজিদে তাশরীফ নিয়ে গেলেন। হযরত আবু বকরের দৃষ্টি হুযুর (ﷺ)-এর প্রতি পড়লে তিনি নিজ স্থান থেকে পেছনে সরে আসতে লাগলেন। হুযুর (ﷺ) তখন ইশারা করলেন যে, পেছনে সরে আসবে না, নিজের স্থানে থাক। আর যে দু' ব্যক্তি হুযুর (ﷺ)-কে মসজিদে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদেরকে বললেন যে, আমাকে আবু বকরের বরাবরই বসিয়ে দাও। তারা তাই করল এবং এখন আসল ইমাম তিনিই হয়ে গেলেন এবং আবু বকর হয়ে গেলেন মুক্তাদী।

এ জাতীয় বিভিন্ন রিওয়ায়াত সামনে রাখার পর ঘটনাসমূহের ক্রমপর্যায় এই জানা যায় যে, ওফাতের পাঁচ দিন পূর্বে বৃহস্পতিবার যোহরের আগে এক সময় হুযুর (ﷺ)-এর রোগ ও কষ্ট বেড়ে গেল। এ সময় তিনি ওসিয়্যত হিসাবে কিছু লিখানোর ইচ্ছা করেন, লিখন সামগ্রী আনতে বললেন। এরপর তাঁর মত পরিবর্তন হয়ে গেল। কিন্তু তাঁর অন্তরে এ আকাঙ্খা রইল যে, ওসিয়্যত হিসাবে কিছু জরুরী কথা সাহাবায়ে কেরামকে বলে দেওয়া হোক। তাই যখন যোহরের নামাযের ওয়াক্ত আসল, তখন তিনি স্ত্রীদেরকে বললেন যে, আমাকে গোসল করাও এবং এমন সাত মশক পানি ঢেলে দাও, যেগুলোর মুখ খোলা হয়নি। নির্দেশ অনুযায়ী আযওয়াজে মুতাহহারাত তাঁকে একটি পানির টবে বসিয়ে গোসল করালেন।

এর ফলে তিনি কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন এবং দু'জন মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে গেলেন এবং আগেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে- নামাযও পড়ালেন। তারপর মিম্বরে উঠে ভাষণও দিলেন। ঐ বক্তব্যে তিনি সবচেয়ে গুরুত্ব সহকারে উম্মতের মধ্যে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং এ কথাও উচ্চারণ করেছেন যে, উম্মতের মাঝে যে মর্যাদা আবু বকরের রয়েছে তা অন্য কারো নেই। আর নিজের জায়গায় নামাযের ইমাম তো তাকে আগেই বানিয়ে নিয়েছিলেন। এসব বিষয় সামনে রেখে চিন্তা করলে এক পর্যায়ের ইয়াকীন ও বিশ্বাস হয়ে যায় যে, তিনি ঐ দিনই যোহরের পূর্বে রোগের প্রচন্ড কষ্টের সময় ওসিয়্যত হিসাবে কিছু লিখবার যে ইচ্ছা করেছিলেন, সেটা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি.-এর খেলাফত ও ইমামতের ব্যাপারেই ছিল- যদিও পরে স্বয়ং তাঁর মত লিখার পক্ষে থাকেনি। কিন্তু হুযুর (ﷺ) তাঁকে নামাযের ইমাম বানিয়ে মসজিদে নববীর এ শেষ ভাষণে উম্মতের মাঝে তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থান বর্ণনা করে তাঁর খেলাফতের ব্যাপারটির দিকে পূর্ণ দিক নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরামের জন্য এ পথনির্দেশ যথেষ্ট হয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)