কিতাবুস সুনান (আলমুজতাবা) - ইমাম নাসায়ী রহঃ

৫০. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রসমূহ

হাদীস নং: ৫৪৬৬
আন্তর্জাতিক নং: ৫৪৬৬
আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রসমূহ
কবরের ফিতনা-অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা
৫৪৬৫. মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (রাহঃ) ......... আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) প্রায়ই এই দুআ পাঠ করতেনঃ হে আল্লাহ! আমি দোযখের ফিতনা, দোযখের আযাব, কবরের ফিতনা, কবরের আযাব, দাজ্জালের ফিতনা, অভাব-অনটন এবং ঐশ্বর্যের ফিতনা থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ্! আমার পাপসমূহকে বরফ ও শিলার পানি দ্বারা ধুয়ে দিন, আর আমার অন্তরকে পাপ-পঙ্কিলতা হতে এভাবে পরিষ্কার করে দিন, যেভাবে সাদা কাপড় ময়লা হতে পরিষ্কার করা হয়ে থাকে। আর আমাকে পাপ হতে এত দূরে রাখুন, যেমন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে দূরত্ব রেখেছেন। হে আল্লাহ্! আমি অলসতা, অতি বার্ধক্য, পাপ এবং ঋণগ্রস্ত হওয়া থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
كتاب الاستعاذة
الِاسْتِعَاذَةُ مِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْقَبْرِ
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ قَالَ حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ عَنْ أَبِيهِ عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَثِيرًا مَا يَدْعُو بِهَؤُلَاءِ الْكَلِمَاتِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ النَّارِ وَعَذَابِ النَّارِ وَفِتْنَةِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ وَشَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ وَشَرِّ فِتْنَةِ الْفَقْرِ وَشَرِّ فِتْنَةِ الْغِنَى اللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَايَ بِمَاءِ الثَّلْجِ وَالْبَرَدِ وَأَنْقِ قَلْبِي مِنْ الْخَطَايَا كَمَا أَنْقَيْتَ الثَّوْبَ الْأَبْيَضَ مِنْ الدَّنَسِ وَبَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْكَسَلِ وَالْهَرَمِ وَالْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ দু'আতে অন্যান্য ব্যাপারের সাথে সাথে هرم বা অতিবার্ধক্য থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। যে পর্যন্ত হুঁশ-বুদ্ধি ঠিক থাকে এবং পরকালের সম্বল সংগ্রহের কাজ অব্যাহত থাকে, সে পর্যন্ত আয়ু বৃদ্ধি আল্লাহ তা'আলার একটি বিরাট নিয়ামত। কিন্তু যে বার্ধক্যে মানুষ একান্তই অকেজো হয়ে পড়ে, যাকে কুরআন পাকে ارذل العمر বা অতি বার্ধক্য বলা হয়েছে এবং তা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। هرم বলে এ হাদীসে বয়সের এ পর্যায়কেই বুঝানো হয়েছে। এ দু'আতে দোযখের শাস্তির সাথে সাথে দোযখের ফিৎনা এবং কবরের আযাবের সাথে সাথে কবরের ফিৎনা থেকেও পানাহ চাওয়া হয়েছে। عَذَابُ النَّارِ বা দোযখের আযাব বলতে দোযখের ঐ শাস্তিকেই বুঝানো হয়েছে, যা দোযখে কাফির ও মুশরিকদের তাদের শিরক ও কুফর পর্যায়ের গুরুতর অপরাধের জন্য ভুগতে হবে। অনুরূপ কবরের আযাব বলতে ঐ শাস্তিকেই বুঝান হয়েছে, যা বড় বড় পাপী-তাপীকে কবরে দেওয়া হবে, কিন্তু তাদের চাইতে নিম্ন পর্যায়ের অপরাধীরা যদিও দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে না বা কবরেও তাদের প্রতি ঐ রূপ শাস্তি দেওয়া হবে না, যা সর্বোচ্চ পর্যায়ের অপরাধীদেরকে দেওয়া হবে, তবুও দোযখ ও কবরের কিছু না কিছু কষ্ট তাদেরকেও স্পর্শ করবে এবঙ তাই তাদের জন্যে যথেষ্ট শাস্তি হবে। এ নগণ্য লেখকের মতে, দোযখের ফিৎনা এবং কবরের ফিৎনা বলতে এ হাদীসে তা-ই বুঝানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ ﷺ দোযখের আযাব এবং কবরের আযাবের সাথে সাথে এই দোযখের ফিৎনা এবং কবরের ফিৎনা থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন এবং নিজ আমল-আচরণের দ্বারাও তার শিক্ষা দিয়েছেন।

দাজ্জালের ফিৎনাও সে সব মহা ফিৎনার একটি, যা থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লাম বহুলভাবে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন এবং ঈমানদারদেরকে তিনি এর শিক্ষা দিতেন। আল্লাহ্ তা'আলা বড় দাজ্জালদের সংবাদ হুযুর ﷺ-কে দিয়েছেন-তার ফিৎনা থেকে এবং সমস্ত দাজ্জালী ফিৎনা থেকে আমাদেরকে নিজ হিফাযত ও আশ্রয়ে রাখুন এবং আমৃত্যু ঈমান ও ইসলামের উপর অটল-অবিচল রাখুন।

এ দু'আতে প্রাচুর্যের ফিৎনার সাথে সাথে দারিদ্র্য ও পরমুখাপেক্ষিতার ফিৎনা থেকেও আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। ধন-দৌলত নিজে মন্দ কিছু নয়, বরং তা আল্লাহ তা'আলার একটি বড় নিয়ামত- যদি তার হক আদায় করার এবং এর সদ্ব্যবহারেরও তওফীক মিলে। হযরত উছমান (রা) তাঁর বিত্ত-বৈভব ও প্রাচুর্যের দ্বারাই সেই উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন যে, এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা করে দেন "আজ থেকে উছমান যাই করুন না কেন তাঁর প্রতি আল্লাহর কোন অসন্তুষ্টি বা ধরপাকড় হবে না।"

مَا عَلٰى عُثْمَانَ مَا عَمِلَ بَعَدَ هَذَا مَرَّتَيْنِ (رواه الترمذي)

অনুরূপ ভাবে দারিদ্র্যের সাথে যদি সবর বা ধৈর্য এবং কানাআত বা অল্পে তুষ্টির গুণ থাকে তা হলে তা-ও আল্লাহর একটি নিয়ামতই। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর নিজের জন্যে এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের জন্যে দরিদ্রসুলভ জীবনযাত্রাই পছন্দ করেছেন। তিনি দরিদ্র এবং দারিদ্র্য পীড়িত লোকদের অনেক মাহাত্ম্যের কথা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে প্রাচুর্য ও আর্থিক সচ্ছলতা যদি অহঙ্কারী করে তোলে অথবা বিত্ত-বৈভব যদি যথাস্থানে যথাযথ ব্যবহারের তওফীক না জুটে, তা হলে তা-ই হয়ে যায় কারূনের কাজ এবং তার পরিণাম হবে জাহান্নাম। অনুরূপ ভাবে দারিদ্র্য ও পরমুখাপেক্ষিতার সাথে যদি সবর ও কানাআত না থাকে আর এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নানা আকাম-কুকামে লিপ্ত হতে হয়, তা হলে তা হয়ে দাঁড়ায় আল্লাহর আযাব। এরই সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছে:

كَادَ الْفَقْرُ أَنْ يَكُونَ كُفْرًا

"দারিদ্র্য মানুষকে কুফর পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।"
এ দু'আতে প্রাচুর্য ও দারিদ্র্যের যে ফিৎনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে, তা হচ্ছে এটাই। আর এটা এমনি ব্যাপার, যা থেকে হাজার বার আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত।

এ দু'আর শেষাংশে গুনাহ সমূহের প্রভাব ধুয়ে মুছে ফেলা, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা এবং গুনাহরাশি থেকে অনেক অনেক দূরত্ব সৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা জানানো হয়েছে। বাহ্যত তা ইতিবাচক দু'আ হলেও গভীর ভাবে চিন্তা করলে তাও এক প্রকার নেতিবাচক দু'আ এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা মূলক দু'আই।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)