কিতাবুস সুনান (আলমুজতাবা) - ইমাম নাসায়ী রহঃ
৫০. আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রসমূহ
হাদীস নং: ৫৪৯৪
আন্তর্জাতিক নং: ৫৪৯৪
আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রসমূহ
জ্বীনদের কুদৃষ্টি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করা
৫৪৯৩. হিলাল ইবনে আলা (রাহঃ) ......... আবু সাঈদ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিনের কুদৃষ্টি এবং মানুষের কুদৃষ্টি হতে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। পরে যখন সূরা ফালাক এবং সূরা নাস নাযিল হলো, তখন তিনি ঐ সূরাদ্বয় পড়া আরম্ভ করলেন এবং অন্যগুলো পরিত্যাগ করলেন।
كتاب الاستعاذة
الِاسْتِعَاذَةُ مِنْ عَيْنِ الْجَانِّ
أَخْبَرَنَا هِلَالُ بْنُ الْعَلَاءِ قَالَ حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ سُلَيْمَانَ قَالَ حَدَّثَنَا عَبَّادٌ عَنْ الْجُرَيْرِيِّ عَنْ أَبِي نَضْرَةَ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَعَوَّذُ مِنْ عَيْنِ الْجَانِّ وَعَيْنِ الْإِنْسِ فَلَمَّا نَزَلَتْ الْمُعَوِّذَتَانِ أَخَذَ بِهِمَا وَتَرَكَ مَا سِوَى ذَلِكَ
হাদীসের ব্যাখ্যা:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَعَوَّذُ مِنَ الْجَانِّ وَعَيْنِ الْإِنْسَانِ (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিন থেকে এবং মানুষের বদনজর থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করতেন)। اَلْجَانُّ এর অর্থ জিন। কেউ বলেন দুষ্ট জিন, যারা মানুষের ক্ষতি করে। ইমাম রাযি রহ. প্রমুখ মুফাসসিরগণ বলেন, اَلْجَانُّ হলো জিনদের আদি পিতা। তাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃপর তার থেকে তার বংশবিস্তার ঘটেছে।
وَخَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ
‘আর জিনদেরকে সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা দ্বারা।’ (সূরা আর রাহমান, আয়াত ১৫)
কারও কারও মতে একপ্রকার সাদা রঙের সাপকে اَلْجَانُّ বলা হয়।
عَيْنِ الْإِنْسَانِ এর অর্থ মানুষের চোখ। এর দ্বারা বদনজরের বোঝানো উদ্দেশ্য। অর্থাৎ বদনজর থেকে হেফাজত এবং কারও ওপর মানুষের বদনজর লাগলে তার ক্ষতি থেকে মুক্তির জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করতেন। যেমন বলতেন, হে আল্লাহ! আমি জিনের ক্ষতি এবং মানুষের বদনজর থেকে আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি। সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাযিল না হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করতেন।
নজর লাগার বাস্তবতা
বদনজর লাগার বিষয়টি সত্য। হিংসুটে ব্যক্তি তার হিংসার চোখ দিয়ে যখন কোনো কিছু দেখে, তখন তার কুদৃষ্টির প্রভাব সেই বস্তুর ওপর পড়ে। তাতে সেই বস্তুর অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। সে ক্ষতি মানুষের বেলায়ও ঘটে। কুরআন ও হাদীছ দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ
‘যারা কুফর অবলম্বন করেছে তারা যখন উপদেশবাণী শোনে, তখন মনে হয় তারা যেন তাদের (তীব্র) দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছাড়িয়ে দেবে’। (সূরা কলম, আয়াত ৫১)
হযরত ইবন আব্বাস রাযি. বলেন, এর অর্থ তারা তাদের দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে বিদ্ধ করতে চায়। মুজাহিদ রহ. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। মুফাসসিরদের অনেকেই এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন। এর দ্বারা বদনজরের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এ আয়াতের আরও বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে।
পুত্রদের ওপর নজর লাগার ভয়ে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের উপদেশ
কুরআন মাজীদে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের যে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণিত রয়েছে, তার এক জায়গায় আছে, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্রদেরকে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও তাঁর ভাই বিনয়ামীনকে অনুসরণ করার জন্য মিশরে যাওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন-
لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ ۖ وَمَا أُغْنِي عَنْكُم مِّنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ ۖ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ
‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা (নগরে) সকলে এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না; বরং ভিন্ন-ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আমি তোমাদের আল্লাহর ইচ্ছা হতে রক্ষা করতে পারব না। আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম কার্যকর হয় না, আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করেছি। আর যারা নির্ভর করতে চায় তাদের উচিত তাঁরই ওপর নির্ভর করা’। (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৬৭)
কেন তিনি তাদেরকে এক দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বলেছিলেন? মুফাসসিরগণ বলেন, তা বলেছিলেন এ কারণে যে, তিনি তাদের প্রতি নজর লাগার আশঙ্কা করেছিলেন। কেননা তারা সকলেই ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর এবং সুপুরুষ। ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। একই পিতার এতগুলো রূপবান পুত্র একসঙ্গে প্রবেশ করলে তাদের প্রতি কারো হিংসাদৃষ্টি লেগে যেতে পারে। তা থেকে হেফাজতের ব্যবস্থা হিসেবেই তিনি তাদেরকে আলাদা আলাদা দরজা দিয়ে প্রবেশ করার হুকুম দিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে এটাও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, এটা একটা ব্যবস্থা মাত্র। কিন্তু হবে তাই যা আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করেন। তাই ভরসা রাখতে হবে কেবল আল্লাহ তা‘আলার উপরই। সুতরাং এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় যে, নজর লাগার বিষয়টি সত্য এবং তা থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করাও শরীয়তসম্মত।
হযরত ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
اَلْعَيْنُ حَقٌّ، وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابِقَ الْقَدَرِ سَبَقَتْهُ الْعَيْنُ.
‘নজর লাগার বিষয়টি সত্য। কোনো জিনিস যদি তাকদীরকে ছাড়িয়ে যেতে পারত, তবে বদনজর অবশ্যই তা ছাড়িয়ে যেত’।(সহীহ মুসলিম : ২১৮৮; সুনান আবূ দাউদ : ৩৮৭৯; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৭৫৭৩; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার : ২৮৯২; সহীহ ইবন হিব্বান : ৬১০৭; তাবারানী, আল মু‘জামুল কাবীর : ১০৯০৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা : ১৯৬১৪; জামে‘ মা‘মার ইবন রাশিদ : ১৯৭৭০)
হযরত সাহল ইবন হুনায়ফ রাযি.-এর ওপর নজর লাগার ঘটনা
নজর লাগা সম্পর্কে একটি বিস্ময়কর ঘটনা হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে। হযরত সাহল ইবন হুনায়ফ রাযি. বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলতে থাকলেন। তাঁর সঙ্গে কতিপয় সাহাবীও ছিলেন। তারা মক্কার দিকে চলতে থাকলেন। তারা যখন জুহফা নামক উপত্যকায় পৌঁছালেন, তখন সাহল ইবন হুনায়ফ রাযি. গোসল করছিলেন। তিনি ছিলেন একজন খুব সুদর্শন ব্যক্তি। তিনি যখন গোসল করছিলেন, তখন আমীর ইবন রাবী‘আ তাঁকে দেখে ফেলেন। অমনি বলে ওঠেন, এমন সুন্দর আর কখনো দেখিনি। সঙ্গে সঙ্গে সাহল রাযি. মাটিতে পড়ে যান। একজন এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানাল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি সাহলের কাছে আসবেন কি? সে তো মাথা তুলছে না! অচেতন হয়ে পড়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার ব্যাপারে তোমরা কাউকে সন্দেহ কর কি? তারা বলল, আমীর ইবন রাবী‘আ তার দিকে তাকিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমীরকে ডাকলেন এবং তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন-
عَلاَمَ يَقْتُلُ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَة
(তোমাদের একেকজন তার ভাইকে কেন খুন করে? তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের এমন কিছু দেখে, যা তাকে মুগ্ধ করে, তখন সে যেন তার জন্য বরকতের দুআ করে)।
তারপর তাকে বললেন, গোসল করো। সে গোসল করল। তারপর তার গোসলের পানি হযরত সাহল রাযি.-এর ওপর ঢেলে দেওয়া হলো। পানি ঢালা মাত্র সাহল রাযি. এমন সুস্থ হয়ে উঠলেন, যেন তাঁর কিছু হয়নি। (মুসনাদে আহমাদ : ১৫৫৫০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ২৩৫৯৫; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৭৫৭১; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫০৯; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার : ২৮৯৪; খারাইতী, মাকারিমুল আখলাক : ১০৭২; তাবারানী, আল মু‘জামুল কাবীর:৫৫৭৩; হাকিম, আল মুসতাদরাক : ৫৭৪১)
হযরত উম্মু সালামা রাযি. থেকে বর্ণিত-
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ رَأَى فِي بَيْتِهَا جَارِيَةً فِي وَجْهِهَا سَفْعَةٌ، فَقَالَ: اسْتَرْقُوا لَهَا، فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ.
(নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরে একটি বালিকার চেহারায় লালচে দাগ দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, একে রুকয়া করো। কেননা তার নজর লেগেছে)। (সহীহ বুখারী : ৫৭৩৯; সহীহ মুসলিম : ২১৯৭; তাবারানী, আল মু‘জামুল কাবীর : ৮০১; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা : ১৯৫৮৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক : ৭৪৮৬; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ : ৩২৪৫)
বিখ্যাত সাহাবিয়া হযরত আসমা বিনতে উনায়স রাযি, ছিলেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই হযরত জা'ফর তায়্যার রাযি.-এর স্ত্রী। মুতার যুদ্ধে হযরত জা'ফর রাযি, শহীদ হয়ে যান। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় তাঁর ইয়াতীম সন্তানদের খোঁজখবর নিতেন। একবার তিনি দেখতে পান তাঁর বাচ্চারা খুবই দুর্বল, জীর্ণশীর্ণ। তিনি হযরত আসমা রাযি.-কে বললেন, কী ব্যাপার, আমার ভাতিজাদের শরীর এমন জীর্ণশীর্ণ দেখছি কেন? তারা কী অনাহারে থাকে? হযরত আসমা রাযি. বললেন, না। আসলে ওদের খুব দ্রুত নজর লেগে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের রুকয়া করেন। (সহীহ মুসলিম: ২১৯৮; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৫৯৩)
এসব হাদীছ দ্বারা প্রমাণ হয় নজর লাগার বিষয়টা সত্যিই আছে। কারও উপর কারও নজর লাগলে তার আছর চেহারায় বা শরীরে প্রকাশ পায়। নজর লাগা ব্যক্তি শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর দ্বারা আরও প্রমাণ হয় রুকয়া করার মাধ্যমে নজরের ক্ষতি থেকে নিরাময় লাভ হয়। তাই বদনজরের ক্ষতি থেকে হেফাজতের জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি নিজে নিজেরও রুকয়া করতেন এবং করতেন অন্যদেরও।
নজরের কুপ্রভাব ও তা থেকে হেফাজতের উপায়
নজরের কুপ্রভাব হাসাদ থেকে জন্ম নেয়। হাসাদের দৃষ্টিতে কোনওকিছুর দিকে তাকালে তাতে বদনজর লেগে যায়। যার অন্তরে হাসাদ খুব বেশি, সাধারণত তার দ্বারাই বদনজর বেশি লাগে। বদনজর দ্বারা জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়, গাছের ফল ঝরে যায়, গবাদি পশুর দুধ কমে যায়, সুন্দর চেহারা নষ্ট হয়ে যায়, স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির স্বাস্থ্যহানি ঘটে ইত্যাদি। কার অন্তরে হাসাদ আছে কার নেই, তা বোঝা মুশকিল। নিজের সম্পর্কেও নিজের সঠিক ধারণা বেশির ভাগই থাকে না। কাজেই এমনও হতে পারে যে, আমার নিজের দৃষ্টিও অন্যের জন্য নিরাপদ নয়। তাই কোনওকিছু দেখে ভালো লাগলে খুব সতর্ক হওয়া উচিত যাতে আমার সে ভালো লাগাটা তার জন্য ক্ষতিকর না হয়ে যায়। ক্ষতি যাতে না হয়, সেজন্য বরকতের দুআ করা উচিত। মাশাআল্লাহ বলা উচিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ، فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَةِ.
‘তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের এমন কিছু দেখে, যা তাকে মুগ্ধ করে, তখন সে যেন তার জন্য বরকতের দুআ করে’। (সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫০৮; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার : ২৯০১) যেমন বলবে- بَارَكَ اللَّهُ فِيكَ (আল্লাহ তোমাতে বরকত দিন)।
সূরা ফালাক ও সূরা নাস উত্তম রুকয়া
(فَلَمَّا نَزَلَتَا، أَخَذَ بِهِمَا وَتَرَكَ مَا سِوَاهُمَا) (এ সূরাদু’টি নাযিল হওয়ার পর তিনি এ দু’টিই অবলম্বন করলেন এবং এছাড়া অন্য সবকিছু ছেড়ে দিলেন)। এর দ্বারা বাহ্যত মনে হয় সূরা ফালাক ও সূরা নাস ছাড়া অন্যকিছু দ্বারা রুকয়া করা জায়েয নয়। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা তা নয়। ইমাম ইবন হাজার রহ. আলোচ্য হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, এ হাদীছটি দ্বারা সূরা ফালাক ও সূরা নাস ছাড়া অন্যকিছুর মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ হয় না। বরং এতটুকুই প্রমাণ করে যে, এ সূরাদু’টি দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ উত্তম। কেননা সূরা ফাতিহা দ্বারা রুকয়া করানোর প্রমাণ রয়েছে। সূরা ফাতিহায় আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য গ্রহণের কথা আছে। কাজেই যা-কিছুতেই আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনার বিষয়টা আছে কিংবা যা দ্বারা এরূপ ভাব প্রকাশ পায়, তার মাধ্যমেই রুকয়া করা বৈধ।
শাওকানী রহ. বলেন, এ হাদীছ দ্বারা প্রমাণ হয় অন্যকিছুর তুলনায় এ সূরাদু’টি দ্বারা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ উত্তম। তাও সব ক্ষেত্রে নয়; বরং কেবল জিন ও মানুষের নজর থেকে হেফাজতের ক্ষেত্রে।
কেমন লোক ও কোন কোন বস্তুর নজর লাগে
প্রকাশ থাকে যে, বদনজর লাগার বিষয়টা যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা বোঝা যায় না। তা নাই-বা বোঝা গেল; হাদীছে যে একে সত্য বলা হয়েছে, একজন মুমিনের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। হাদীছে যাদের বিশ্বাস নেই, যুক্তি-বুদ্ধিকেই জ্ঞানের চূড়ান্ত মনে করে, তারা নজর লাগার বিষয়টা মানতে চায় না। এটা তাদের অন্ধত্ব। হাদীছ যাকে সত্য বলেছে, একজন মুমিন গভীর বিশ্বাসের সঙ্গেই তা গ্রহণ করবে। তাছাড়া বাস্তবে এর সত্যতা প্রমাণিতও বটে। এর সপক্ষে বিভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে। হিংসুটে ব্যক্তির নজর বিষাক্ত। তিরের মতো তা বিদ্ধ করে। নজর তো বিষাক্ত সাপেরও লেগে যায়। কোনো কোনো সাপ এমনও আছে, যা দূর থেকে মানুষ বা অন্য কোনোও প্রাণীর উপর কোনো কোনো সাপ এমনও আছে, যা দূর থেকে মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর উপর দৃষ্টি ফেলে। সে দৃষ্টি যার উপর পড়ে, তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
অনেক সময় নজর লাগে কুকুরেরও। কুখ্যাত কুকুরের সামনে যদি কেউ খাবার খায় আর কুকুর সেদিকে তাকিয়ে থাকে, তখন ওই ব্যক্তির উপর কুকুরের নজর লেগে যায়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. বলেন, কুকুর (বিশেষত কালো কুকুর) জিনদের অন্তর্ভুক্ত। এরা দুর্বল জিন। তোমাদের খাবারের কাছে যদি তারা হাজির হয়, তবে তাদের দিকে কিছু খাবার ছুঁড়ে দিও। কেননা তাদের নজর আছে। সে নজর দিয়ে তারা ক্ষতি করে। (ইবন কুতায়বা, তাবীলু মুখতালিফিন হাদীছ, ১ খণ্ড, ২০৮ পৃষ্ঠা; বদরূদ্দীন আইনী, উমদাতুল কারী, ১২ খণ্ড, ৮৫ পৃষ্ঠা; মা‘জমা‘উ বিহারিল আনওয়ার, ১ খণ্ড, ৫৯৪ পৃষ্ঠা)
আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ এক অদৃশ্য বর্ম
নজর যে সবসময় সবাইকে আকঁড়ে ধরবে, এটা অবধারিত নয়। তির যেমন অনেক সময় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, বদনজরও তেমনি। কাউকে তা আকঁড়ে ধরে, কাউকে করে না। আবার সে ব্যক্তি বর্ম পরিহিত থাকে, তির যেমন তাকে ঘায়েল করতে পারে না, তেমনি যে ব্যক্তি রুকয়া-তাবিয দ্বারা আল্লাহর আশ্রয়ে প্রবেশ করে, সেও যেন এক অদৃশ্য বর্মে সজ্জিত থাকে। ফলে বদনজর তার কোনোও ক্ষতি করতে পারে না। কাজেই প্রত্যেক মুমিনের উচিত দুষ্ট জিন ও দুষ্ট মানুষের ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য এ অদৃশ্য বর্ম অবলম্বন করা।
মানুষ যে জাদুকরের জাদু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হিংসুকের বদনজর দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং দৃশ্য-অদৃশ্য নানা অনিষ্টের শিকার হয়, এর একটি বড় কারণ শরীয়তপ্রদত্ত আত্মরক্ষার এ ব্যবস্থা অবলম্বনে গাফিলতি করা। এসব অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য শরীয়ত আমাদেরকে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ার ব্যবস্থা দিয়েছেন। এছাড়া নানা দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। কেউ যদি আল্লাহ তা‘আলার প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান, তাঁর প্রতি গভীর আস্থা ও তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মনিবেদিত হয়ে এর উপর আমল করে, তবে নিঃসন্দেহে হাজারও অনিষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকবে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. নজর লাগার বিষয়টি সত্য।
খ. দুষ্ট জিনের দ্বারা মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতির শিকার হতে পারে।
গ. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ার দ্বারা বদনজর, সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদি বিষাক্ত প্রাণী ও জিনের ক্ষতি থেকে নিরাপত্তা থাকা যায়।
وَخَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَّارِجٍ مِّنْ نَّارٍ
‘আর জিনদেরকে সৃষ্টি করেছেন আগুনের শিখা দ্বারা।’ (সূরা আর রাহমান, আয়াত ১৫)
কারও কারও মতে একপ্রকার সাদা রঙের সাপকে اَلْجَانُّ বলা হয়।
عَيْنِ الْإِنْسَانِ এর অর্থ মানুষের চোখ। এর দ্বারা বদনজরের বোঝানো উদ্দেশ্য। অর্থাৎ বদনজর থেকে হেফাজত এবং কারও ওপর মানুষের বদনজর লাগলে তার ক্ষতি থেকে মুক্তির জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ করতেন। যেমন বলতেন, হে আল্লাহ! আমি জিনের ক্ষতি এবং মানুষের বদনজর থেকে আপনার আশ্রয় গ্রহণ করছি। সূরা ফালাক ও সূরা নাস নাযিল না হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করতেন।
নজর লাগার বাস্তবতা
বদনজর লাগার বিষয়টি সত্য। হিংসুটে ব্যক্তি তার হিংসার চোখ দিয়ে যখন কোনো কিছু দেখে, তখন তার কুদৃষ্টির প্রভাব সেই বস্তুর ওপর পড়ে। তাতে সেই বস্তুর অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। সে ক্ষতি মানুষের বেলায়ও ঘটে। কুরআন ও হাদীছ দ্বারা এর প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ
‘যারা কুফর অবলম্বন করেছে তারা যখন উপদেশবাণী শোনে, তখন মনে হয় তারা যেন তাদের (তীব্র) দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে আছাড়িয়ে দেবে’। (সূরা কলম, আয়াত ৫১)
হযরত ইবন আব্বাস রাযি. বলেন, এর অর্থ তারা তাদের দৃষ্টি দ্বারা তোমাকে বিদ্ধ করতে চায়। মুজাহিদ রহ. থেকেও অনুরূপ বর্ণিত আছে। মুফাসসিরদের অনেকেই এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন। এর দ্বারা বদনজরের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এ আয়াতের আরও বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে।
পুত্রদের ওপর নজর লাগার ভয়ে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের উপদেশ
কুরআন মাজীদে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের যে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণিত রয়েছে, তার এক জায়গায় আছে, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাঁর পুত্রদেরকে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও তাঁর ভাই বিনয়ামীনকে অনুসরণ করার জন্য মিশরে যাওয়ার হুকুম দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি তাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলেন-
لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُتَفَرِّقَةٍ ۖ وَمَا أُغْنِي عَنْكُم مِّنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ ۖ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ
‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা (নগরে) সকলে এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না; বরং ভিন্ন-ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আমি তোমাদের আল্লাহর ইচ্ছা হতে রক্ষা করতে পারব না। আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম কার্যকর হয় না, আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করেছি। আর যারা নির্ভর করতে চায় তাদের উচিত তাঁরই ওপর নির্ভর করা’। (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৬৭)
কেন তিনি তাদেরকে এক দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে বলেছিলেন? মুফাসসিরগণ বলেন, তা বলেছিলেন এ কারণে যে, তিনি তাদের প্রতি নজর লাগার আশঙ্কা করেছিলেন। কেননা তারা সকলেই ছিলেন অত্যন্ত সুন্দর এবং সুপুরুষ। ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী। একই পিতার এতগুলো রূপবান পুত্র একসঙ্গে প্রবেশ করলে তাদের প্রতি কারো হিংসাদৃষ্টি লেগে যেতে পারে। তা থেকে হেফাজতের ব্যবস্থা হিসেবেই তিনি তাদেরকে আলাদা আলাদা দরজা দিয়ে প্রবেশ করার হুকুম দিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে এটাও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, এটা একটা ব্যবস্থা মাত্র। কিন্তু হবে তাই যা আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করেন। তাই ভরসা রাখতে হবে কেবল আল্লাহ তা‘আলার উপরই। সুতরাং এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় যে, নজর লাগার বিষয়টি সত্য এবং তা থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করাও শরীয়তসম্মত।
হযরত ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
اَلْعَيْنُ حَقٌّ، وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابِقَ الْقَدَرِ سَبَقَتْهُ الْعَيْنُ.
‘নজর লাগার বিষয়টি সত্য। কোনো জিনিস যদি তাকদীরকে ছাড়িয়ে যেতে পারত, তবে বদনজর অবশ্যই তা ছাড়িয়ে যেত’।(সহীহ মুসলিম : ২১৮৮; সুনান আবূ দাউদ : ৩৮৭৯; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৭৫৭৩; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার : ২৮৯২; সহীহ ইবন হিব্বান : ৬১০৭; তাবারানী, আল মু‘জামুল কাবীর : ১০৯০৫; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা : ১৯৬১৪; জামে‘ মা‘মার ইবন রাশিদ : ১৯৭৭০)
হযরত সাহল ইবন হুনায়ফ রাযি.-এর ওপর নজর লাগার ঘটনা
নজর লাগা সম্পর্কে একটি বিস্ময়কর ঘটনা হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে। হযরত সাহল ইবন হুনায়ফ রাযি. বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলতে থাকলেন। তাঁর সঙ্গে কতিপয় সাহাবীও ছিলেন। তারা মক্কার দিকে চলতে থাকলেন। তারা যখন জুহফা নামক উপত্যকায় পৌঁছালেন, তখন সাহল ইবন হুনায়ফ রাযি. গোসল করছিলেন। তিনি ছিলেন একজন খুব সুদর্শন ব্যক্তি। তিনি যখন গোসল করছিলেন, তখন আমীর ইবন রাবী‘আ তাঁকে দেখে ফেলেন। অমনি বলে ওঠেন, এমন সুন্দর আর কখনো দেখিনি। সঙ্গে সঙ্গে সাহল রাযি. মাটিতে পড়ে যান। একজন এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানাল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি সাহলের কাছে আসবেন কি? সে তো মাথা তুলছে না! অচেতন হয়ে পড়ে আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার ব্যাপারে তোমরা কাউকে সন্দেহ কর কি? তারা বলল, আমীর ইবন রাবী‘আ তার দিকে তাকিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমীরকে ডাকলেন এবং তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন-
عَلاَمَ يَقْتُلُ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَة
(তোমাদের একেকজন তার ভাইকে কেন খুন করে? তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের এমন কিছু দেখে, যা তাকে মুগ্ধ করে, তখন সে যেন তার জন্য বরকতের দুআ করে)।
তারপর তাকে বললেন, গোসল করো। সে গোসল করল। তারপর তার গোসলের পানি হযরত সাহল রাযি.-এর ওপর ঢেলে দেওয়া হলো। পানি ঢালা মাত্র সাহল রাযি. এমন সুস্থ হয়ে উঠলেন, যেন তাঁর কিছু হয়নি। (মুসনাদে আহমাদ : ১৫৫৫০; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ২৩৫৯৫; নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ৭৫৭১; সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫০৯; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার : ২৮৯৪; খারাইতী, মাকারিমুল আখলাক : ১০৭২; তাবারানী, আল মু‘জামুল কাবীর:৫৫৭৩; হাকিম, আল মুসতাদরাক : ৫৭৪১)
হযরত উম্মু সালামা রাযি. থেকে বর্ণিত-
أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ رَأَى فِي بَيْتِهَا جَارِيَةً فِي وَجْهِهَا سَفْعَةٌ، فَقَالَ: اسْتَرْقُوا لَهَا، فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ.
(নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরে একটি বালিকার চেহারায় লালচে দাগ দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, একে রুকয়া করো। কেননা তার নজর লেগেছে)। (সহীহ বুখারী : ৫৭৩৯; সহীহ মুসলিম : ২১৯৭; তাবারানী, আল মু‘জামুল কাবীর : ৮০১; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা : ১৯৫৮৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক : ৭৪৮৬; বাগাবী, শারহুস সুন্নাহ : ৩২৪৫)
বিখ্যাত সাহাবিয়া হযরত আসমা বিনতে উনায়স রাযি, ছিলেন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই হযরত জা'ফর তায়্যার রাযি.-এর স্ত্রী। মুতার যুদ্ধে হযরত জা'ফর রাযি, শহীদ হয়ে যান। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় তাঁর ইয়াতীম সন্তানদের খোঁজখবর নিতেন। একবার তিনি দেখতে পান তাঁর বাচ্চারা খুবই দুর্বল, জীর্ণশীর্ণ। তিনি হযরত আসমা রাযি.-কে বললেন, কী ব্যাপার, আমার ভাতিজাদের শরীর এমন জীর্ণশীর্ণ দেখছি কেন? তারা কী অনাহারে থাকে? হযরত আসমা রাযি. বললেন, না। আসলে ওদের খুব দ্রুত নজর লেগে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের রুকয়া করেন। (সহীহ মুসলিম: ২১৯৮; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ১৯৫৯৩)
এসব হাদীছ দ্বারা প্রমাণ হয় নজর লাগার বিষয়টা সত্যিই আছে। কারও উপর কারও নজর লাগলে তার আছর চেহারায় বা শরীরে প্রকাশ পায়। নজর লাগা ব্যক্তি শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর দ্বারা আরও প্রমাণ হয় রুকয়া করার মাধ্যমে নজরের ক্ষতি থেকে নিরাময় লাভ হয়। তাই বদনজরের ক্ষতি থেকে হেফাজতের জন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি নিজে নিজেরও রুকয়া করতেন এবং করতেন অন্যদেরও।
নজরের কুপ্রভাব ও তা থেকে হেফাজতের উপায়
নজরের কুপ্রভাব হাসাদ থেকে জন্ম নেয়। হাসাদের দৃষ্টিতে কোনওকিছুর দিকে তাকালে তাতে বদনজর লেগে যায়। যার অন্তরে হাসাদ খুব বেশি, সাধারণত তার দ্বারাই বদনজর বেশি লাগে। বদনজর দ্বারা জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়, গাছের ফল ঝরে যায়, গবাদি পশুর দুধ কমে যায়, সুন্দর চেহারা নষ্ট হয়ে যায়, স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির স্বাস্থ্যহানি ঘটে ইত্যাদি। কার অন্তরে হাসাদ আছে কার নেই, তা বোঝা মুশকিল। নিজের সম্পর্কেও নিজের সঠিক ধারণা বেশির ভাগই থাকে না। কাজেই এমনও হতে পারে যে, আমার নিজের দৃষ্টিও অন্যের জন্য নিরাপদ নয়। তাই কোনওকিছু দেখে ভালো লাগলে খুব সতর্ক হওয়া উচিত যাতে আমার সে ভালো লাগাটা তার জন্য ক্ষতিকর না হয়ে যায়। ক্ষতি যাতে না হয়, সেজন্য বরকতের দুআ করা উচিত। মাশাআল্লাহ বলা উচিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ مِنْ أَخِيهِ مَا يُعْجِبُهُ، فَلْيَدْعُ لَهُ بِالْبَرَكَةِ.
‘তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের এমন কিছু দেখে, যা তাকে মুগ্ধ করে, তখন সে যেন তার জন্য বরকতের দুআ করে’। (সুনানে ইবন মাজাহ : ৩৫০৮; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার : ২৯০১) যেমন বলবে- بَارَكَ اللَّهُ فِيكَ (আল্লাহ তোমাতে বরকত দিন)।
সূরা ফালাক ও সূরা নাস উত্তম রুকয়া
(فَلَمَّا نَزَلَتَا، أَخَذَ بِهِمَا وَتَرَكَ مَا سِوَاهُمَا) (এ সূরাদু’টি নাযিল হওয়ার পর তিনি এ দু’টিই অবলম্বন করলেন এবং এছাড়া অন্য সবকিছু ছেড়ে দিলেন)। এর দ্বারা বাহ্যত মনে হয় সূরা ফালাক ও সূরা নাস ছাড়া অন্যকিছু দ্বারা রুকয়া করা জায়েয নয়। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টা তা নয়। ইমাম ইবন হাজার রহ. আলোচ্য হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, এ হাদীছটি দ্বারা সূরা ফালাক ও সূরা নাস ছাড়া অন্যকিছুর মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ হয় না। বরং এতটুকুই প্রমাণ করে যে, এ সূরাদু’টি দ্বারা আশ্রয় গ্রহণ উত্তম। কেননা সূরা ফাতিহা দ্বারা রুকয়া করানোর প্রমাণ রয়েছে। সূরা ফাতিহায় আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য গ্রহণের কথা আছে। কাজেই যা-কিছুতেই আল্লাহ তা‘আলার আশ্রয় গ্রহণ, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনার বিষয়টা আছে কিংবা যা দ্বারা এরূপ ভাব প্রকাশ পায়, তার মাধ্যমেই রুকয়া করা বৈধ।
শাওকানী রহ. বলেন, এ হাদীছ দ্বারা প্রমাণ হয় অন্যকিছুর তুলনায় এ সূরাদু’টি দ্বারা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ উত্তম। তাও সব ক্ষেত্রে নয়; বরং কেবল জিন ও মানুষের নজর থেকে হেফাজতের ক্ষেত্রে।
কেমন লোক ও কোন কোন বস্তুর নজর লাগে
প্রকাশ থাকে যে, বদনজর লাগার বিষয়টা যুক্তি-বুদ্ধি দ্বারা বোঝা যায় না। তা নাই-বা বোঝা গেল; হাদীছে যে একে সত্য বলা হয়েছে, একজন মুমিনের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। হাদীছে যাদের বিশ্বাস নেই, যুক্তি-বুদ্ধিকেই জ্ঞানের চূড়ান্ত মনে করে, তারা নজর লাগার বিষয়টা মানতে চায় না। এটা তাদের অন্ধত্ব। হাদীছ যাকে সত্য বলেছে, একজন মুমিন গভীর বিশ্বাসের সঙ্গেই তা গ্রহণ করবে। তাছাড়া বাস্তবে এর সত্যতা প্রমাণিতও বটে। এর সপক্ষে বিভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে। হিংসুটে ব্যক্তির নজর বিষাক্ত। তিরের মতো তা বিদ্ধ করে। নজর তো বিষাক্ত সাপেরও লেগে যায়। কোনো কোনো সাপ এমনও আছে, যা দূর থেকে মানুষ বা অন্য কোনোও প্রাণীর উপর কোনো কোনো সাপ এমনও আছে, যা দূর থেকে মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর উপর দৃষ্টি ফেলে। সে দৃষ্টি যার উপর পড়ে, তার মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
অনেক সময় নজর লাগে কুকুরেরও। কুখ্যাত কুকুরের সামনে যদি কেউ খাবার খায় আর কুকুর সেদিকে তাকিয়ে থাকে, তখন ওই ব্যক্তির উপর কুকুরের নজর লেগে যায়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. বলেন, কুকুর (বিশেষত কালো কুকুর) জিনদের অন্তর্ভুক্ত। এরা দুর্বল জিন। তোমাদের খাবারের কাছে যদি তারা হাজির হয়, তবে তাদের দিকে কিছু খাবার ছুঁড়ে দিও। কেননা তাদের নজর আছে। সে নজর দিয়ে তারা ক্ষতি করে। (ইবন কুতায়বা, তাবীলু মুখতালিফিন হাদীছ, ১ খণ্ড, ২০৮ পৃষ্ঠা; বদরূদ্দীন আইনী, উমদাতুল কারী, ১২ খণ্ড, ৮৫ পৃষ্ঠা; মা‘জমা‘উ বিহারিল আনওয়ার, ১ খণ্ড, ৫৯৪ পৃষ্ঠা)
আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ এক অদৃশ্য বর্ম
নজর যে সবসময় সবাইকে আকঁড়ে ধরবে, এটা অবধারিত নয়। তির যেমন অনেক সময় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, বদনজরও তেমনি। কাউকে তা আকঁড়ে ধরে, কাউকে করে না। আবার সে ব্যক্তি বর্ম পরিহিত থাকে, তির যেমন তাকে ঘায়েল করতে পারে না, তেমনি যে ব্যক্তি রুকয়া-তাবিয দ্বারা আল্লাহর আশ্রয়ে প্রবেশ করে, সেও যেন এক অদৃশ্য বর্মে সজ্জিত থাকে। ফলে বদনজর তার কোনোও ক্ষতি করতে পারে না। কাজেই প্রত্যেক মুমিনের উচিত দুষ্ট জিন ও দুষ্ট মানুষের ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য এ অদৃশ্য বর্ম অবলম্বন করা।
মানুষ যে জাদুকরের জাদু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হিংসুকের বদনজর দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং দৃশ্য-অদৃশ্য নানা অনিষ্টের শিকার হয়, এর একটি বড় কারণ শরীয়তপ্রদত্ত আত্মরক্ষার এ ব্যবস্থা অবলম্বনে গাফিলতি করা। এসব অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য শরীয়ত আমাদেরকে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ার ব্যবস্থা দিয়েছেন। এছাড়া নানা দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। কেউ যদি আল্লাহ তা‘আলার প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান, তাঁর প্রতি গভীর আস্থা ও তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মনিবেদিত হয়ে এর উপর আমল করে, তবে নিঃসন্দেহে হাজারও অনিষ্ট ও বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকবে।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. নজর লাগার বিষয়টি সত্য।
খ. দুষ্ট জিনের দ্বারা মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতির শিকার হতে পারে।
গ. সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ার দ্বারা বদনজর, সাপ-বিচ্ছু ইত্যাদি বিষাক্ত প্রাণী ও জিনের ক্ষতি থেকে নিরাপত্তা থাকা যায়।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
বর্ণনাকারী: