কিতাবুস সুনান- ইমাম ইবনে মাজা রহঃ

৩৪. ফিতনাসমূহ ও কিয়ামতপূর্ব আলামতের বর্ণনা

হাদীস নং: ৩৯৭৩
আন্তর্জাতিক নং: ৩৯৭৩
ফিতনাসমূহ ও কিয়ামতপূর্ব আলামতের বর্ণনা
ফিতনার দিনে রসনা সংযত রাখা
৩৯৭৩। মুহাম্মাদ ইবন আবু উমার আদানী (রাহঃ) …….. মু'আয ইবন জাবাল (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা কোন এক সফরে আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) -এর সঙ্গে ছিলাম। একদিন আমি অতি ভোরে তাঁর নিকটে লোম এবং এ সময় আমরা পথ চলছিলাম। তখন আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন, যা আমাকে জান্নাতে দাখিল করবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে। তিনি বললেনঃ তুমি বড় কঠিন প্রশ্ন করলে। এই বিষয়টি তার জন্যই সহজ, যাকে আল্লাহ সহজ লভ্য করে দেন। তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে অন্য কিছুর শরীক করবে না, সালাত আদায় করবে, যাকাত দিবে, রামাযান মাসের সিয়াম পালন করবে এবং বায়তুল্লাহর হাজ্জ করবে। অতঃপর তিনি বললেনঃ আমি তোমাকে কল্যাণের পথসমূহ বলে দিব কি? (তাহলোঃ ) সিয়াম ঢাল স্বরূপ, সাদাকাহ (দান খয়রাত) পাপরাশি মোচন করে দেয়, যেমন পানি আগুন নিভিয়ে ফেলে এবং রাতের মধ্যবর্তী সময়ে মানুষের সালাত অর্থাৎ তাহাজ্জুদ। অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ

تتجافى جنوبهم عن المضاجع يدعون ربهم خوفا وطمعا وممارزقنهم ينفقون. فلا تعلم نفس ما أخفى لهم من قرة أعين جزاء بما كانوا يعملون.

“তারা শয্যাত্যাগ করে তাদের রবকে ডাকে আশাও আকাঙ্ক্ষায় এবং আমি তাদেরকে যে জীবনোপকরণ দান করেছি, তা থেকে তারা খরচ করে। কেউই জানে না তাদের জন্য নয়ন প্রীতিকরকী লুক্কায়িত রাখা হয়েছে, তাদের কতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ।" (৩২ঃ ১৬-১৭)

অতঃপর তিনি বললেনঃ আমি কি তোমাকে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সার সংক্ষেপ ও শীর্ষস্থানীয় কাজটি বলে দিব? (তা হচ্ছে)ঃ জিহাদ। তারপর তিনি বললেনঃ এই সব কাজের ভিত্তি যার উপর রচিত, সেটা কি আমি তোমাকে বলে দিব না? আমি বললাম, জ্বি হ্যাঁ, (হে আল্লার নবী! আমাদের মুখের কথাবার্তা সম্পর্কে কি আমাদের পাকড়াও করা হবে? তিনি বললেনঃ হে মু'আয! তোমার মা তোমার জন্য কাঁদুক! (এটা একটা প্রবাদ যা মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বলা হয়) মানুষ তো তার অসংযত কথাবার্তার কারণে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
كتاب الفتن
بَاب كَفِّ اللِّسَانِ فِي الْفِتْنَةِ
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ أَبِي عُمَرَ الْعَدَنِيُّ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُعَاذٍ، عَنْ مَعْمَرٍ، عَنْ عَاصِمِ بْنِ أَبِي النَّجُودِ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، قَالَ كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فِي سَفَرٍ فَأَصْبَحْتُ يَوْمًا قَرِيبًا مِنْهُ وَنَحْنُ نَسِيرُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَخْبِرْنِي بِعَمَلٍ يُدْخِلُنِي الْجَنَّةَ وَيُبَاعِدُنِي مِنَ النَّارِ ‏.‏ قَالَ ‏"‏ لَقَدْ سَأَلْتَ عَظِيمًا وَإِنَّهُ لَيَسِيرٌ عَلَى مَنْ يَسَّرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ تَعْبُدُ اللَّهَ لاَ تُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا وَتُقِيمُ الصَّلاَةَ وَتُؤْتِي الزَّكَاةَ وَتَصُومُ رَمَضَانَ وَتَحُجُّ الْبَيْتَ ‏"‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ أَلاَ أُدُلُّكَ عَلَى أَبْوَابِ الْجَنَّةِ الصَّوْمُ جُنَّةٌ وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِئُ النَّارَ الْمَاءُ وَصَلاَةُ الرَّجُلِ فِي جَوْفِ اللَّيْلِ ‏"‏ ‏.‏ ثُمَّ قَرَأَ ‏(تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ‏)‏ حَتَّى بَلَغَ ‏(جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ)‏ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ أَلاَ أُخْبِرُكَ بِرَأْسِ الأَمْرِ وَعَمُودِهِ وَذُرْوَةِ سَنَامِهِ الْجِهَادُ ‏"‏ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ أَلاَ أُخْبِرُكَ بِمِلاَكِ ذَلِكَ كُلِّهِ ‏"‏ ‏.‏ قُلْتُ بَلَى ‏.‏ فَأَخَذَ بِلِسَانِهِ فَقَالَ ‏"‏ تَكُفُّ عَلَيْكَ هَذَا ‏"‏ ‏.‏ قُلْتُ يَا نَبِيَّ اللَّهِ وَإِنَّا لَمُؤَاخَذُونَ بِمَا نَتَكَلَّمُ بِهِ قَالَ ‏"‏ ثَكِلَتْكَ أُمُّكَ يَا مُعَاذُ وَهَلْ يَكُبُّ النَّاسَ عَلَى وُجُوهِهِمْ فِي النَّارِ إِلاَّ حَصَائِدُ أَلْسِنَتِهِمْ ‏"‏ ‏.‏

হাদীসের ব্যাখ্যা:

জান্নাতে যাওয়ার জন্য যেসব অবশ্য পালনীয় আমলের উল্লেখ নবী করীম ﷺ করেছেন, তার মধ্যে নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের সাথে আল্লাহর ইবাদত করা এবং শিরক থেকে দূরে থাকার কথা রয়েছে। নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতের উল্লেখ করার পূর্বে পৃথকভাবে আল্লাহর ইবাদত করা এবং শিরক থেকে দূরে থাকার বর্ণনা করা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তাতে বুঝা যাচ্ছে, বর্ণিত চারটি ইবাদত ছাড়াও আরো ইবাদত রয়েছে, যা জান্নাতের জন্য সম্পাদন করা অপরিহার্য। আল্লাহর ইবাদত করা ও তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা খুবই ব্যাপক বিষয়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এবং জীবনের সকল পর্যায়ে, মসজিদ থেকে রণাঙ্গন পর্যন্ত যার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন, অফিস-আদালত, পার্লামেন্ট শামিল রয়েছে। আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সাথে বা তাঁর গুণ ও এখতিয়ারের সাথে কাউকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরীক না করা। কোন ব্যক্তি নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাত সম্পাদন করা সত্ত্বেও জীবনের বৃহত্তম এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আল্লাহর গুণ ও এখতিয়ারের সাথে যদি কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আদর্শকে শরীক করে, তাহলে সে শিরকের দোষে দোষী সাব্যস্ত হবে। তাকে আখিরাতের আদালতে অপমানের বোঝা বহন করতে হবে। অনেক নামধারী মুসলমান আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করাকে অপসন্দ করলেও আল্লাহ জাল্লা-জালালুহুর সিফাত ও এখতিয়ারের সাথে শিরক করার অর্থ মোটেই বুঝে না বা বুঝবার চেষ্টা করে না। আলেম সমাজের উচিত, এ ধরনের লোকের অজ্ঞতা দূর করা। অন্যথায় এসব লোকের অজ্ঞতার অপরাধের জন্য আখিরাতের আদালতে তাদের সাথে আলেমদেরকেও আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

সদকা, রোযা এবং মধ্যরাতের নামায অর্থাৎ তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য নফল ইবাদতকে কল্যাণের দরজা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সদকা পাপকে নির্বাপিত করে। সদকার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষের পাপ দূর করে দেন এবং সদকাকারীকে পাক-সাফ থাকার তওফিক দান করেন। রোযা বান্দাকে পাপ থেকে রক্ষা করে। মধ্যরাতের নামাযের খুব ফযীলত রয়েছে। তাহাজ্জুদ গুযার এবং দাতা ব্যক্তির জন্য জান্নাতের মধ্যে এমন সব নিয়ামত রাখা হয়েছে যা দুনিয়ার কোন প্রাণী কখনো দেখেনি।

অতঃপর নবী করীম ﷺ দীনের একটা নক্সা পেশ করেছেন। তাতে ইসলামকে راس الامر বা দীনের প্রধান অংশ বা দীনের মাথা বলা হয়েছে। শরীরের সাথে মাথার যে সম্পর্ক, দীনের সাথে ইসলামেরও সে সম্পর্ক। এখানে ইসলাম বলতে শুধু কালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু পড়ে ইসলাম কবুল করা নয়, বরং ইসলামকে দীন হিসেবে অর্থাৎ জীবনের যাবতীয় দিক ও বিভাগের এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত গোটা জীবনের জন্য একক এবং একমাত্র ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা বুঝানো হয়েছে। নামাযকে দীনের স্তম্ভ বলা হয়েছে। অপর একটি মশহুর হাদীসে নামাযসহ পাঁচটি জিনিস, যথা: কালেমা শাহাদাত, নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতকে দীনের স্তম্ভ বলা হয়েছে। যেরূপ স্তম্ভ ছাড়া ইমারত দাঁড়াতে পারে না, সেরূপ বর্ণিত বিষয়সমূহ ছাড়া দীনের কল্পনা করা যায় না। যেরূপ স্তম্ভের নাম ইমারত নয়, সেরূপ নামাযসহ পাঁচটি জিনিসের সমষ্টিও পরিপূর্ণ দীন নয়। যেরূপ ইমারতকে বসবাস উপযোগী করার জন্য দরজা-জানালা, ছাদ, প্রাচীর প্রভৃতির প্রয়োজন হয়, সেরূপ দীনকে পরিপূর্ণ রূপ দান করার জন্য আরো বহু জিনিসের প্রয়োজন হয়। জিহাদকে দীনের বুলন্দ শীর্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করে নবী করীম ﷺ দীনের পরিপূর্ণ রূপের উপর আলোকসম্পাত করেছেন। অর্থাৎ দীনকে পরিপূর্ণ রূপ দান করতে হলে, দীনকে অন্য দীনের উপর বিজয়ী করতে হলে জিহাদ অপরিহার্য। দীন ইসলামকে অপর দীনের উপর বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে জিহাদ পরিচালনা করা বা জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়ত বা নবুওয়তের পদ্ধতিতে রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করা অপরিহার্য। এ জন্য যে সংগ্রাম ও সাধনা করা হয়, তা জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।

কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের ফল থেকে বান্দা যাতে বঞ্চিত না হয় তার জন্য নবী করীম ﷺ জিহ্বার হিফাযতের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। জিহ্বাকে সংযত না রাখলে বান্দা জীবনব্যাপী বহু সংখ্যক ইবাদত করা সত্ত্বেও কিয়ামতের দিন বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। জিহ্বার অপপ্রয়োগ বা অন্যায় প্রয়োগের কারণে মানুষ দোষখে নিক্ষিপ্ত হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান