আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ
১৪. ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যাবসা-বাণিজ্যের অধ্যায়
হাদীস নং: ১২৪০
আন্তর্জাতিক নং: ১২৪০
ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যাবসা-বাণিজ্যের অধ্যায়
গমের বিনিময়ে গম ক্রয়ের ক্ষেত্রে সমপরিমাণ হতে হবে। এতে অতিরিক্ত প্রদান হারাম।
১২৪৩. সুওয়ায়দ ইবনে নসর (রাহঃ) ..... উবাদা ইবনুস সামিত (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী (ﷺ) বলেছেন, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ হলে সমপরিমাণ হতে হবে, রূপা হলে সমপরিমাণ হতে হবে, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর হলে সমপরিমাণ হতে হবে, গমের বিনিময়ে গম হলে সমপরিমাণ হতে হবে, নিমকের বিনিময়ে নিমক হলে সমপরিমাণ হতে হবে, যবের বিনিময়ে যব হলে সমপরিমাণ হতে হবে। এইসব ক্ষেত্রে কেউ অতিরিক্ত দিলে বা অতিরিক্ত চাইলে তা হবে সুদ। তোমার দস্ত বদস্ত (নগদ) হলে রূপার বিনিময়ে স্বর্ণ যেভাবে ইচ্ছা বিক্রয় করতে পারে; দস্ত বদস্ত হলে খেজুরের বিনিময়ে গম যদৃচ্ছা বিক্রি করতে পার; দস্ত বদস্ত হলে খেজুরের বিনিময়ে যব যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করতে পার। - ইবনে মাজাহ, মুসলিম
এই বিষয়ে আবু সাঈদ, আবু হুরায়রা, বিলাল ও আনাস (রাযিঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবু ঈসা (রাহঃ) বলেন উবাদা (রাযিঃ) বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ। কোন কোন রাবী এই হাদীসটিকে খালিদ (রাহঃ) থেকে উক্ত সনদে বর্ণনা করেছেন। এতে আছে, তোমরা দস্ত বদস্ত হলে যবের বিনিময়ে গম যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করতে পার। কেউ কেউ এই হাদীসটিকে খালিদ- আবু কিলারা- আবুল আশআছ- উবাদা (রাযিঃ) সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। এতে অতিরিক্ত আছে যে, খালিদ বলেন, আবু কিলাবা বলেছেন, যবের বিনিময়ে গম হলে যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করতে পার......।
এই হাদীস অনুসারে আলিমগণের আমল রয়েছে। তারা উভয় দিকে সমপরিমাণ না হওয়া ছাড়া গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব বিক্রি জায়েয বলে মনে করেন না। কিন্তু যদি জাত বিভিন্ন হয় তবে দস্ত বদস্ত হলে অতিরিক্ত প্রদান করায় কোন অসুবিধা আছে বলে মনে করেন না। এ হলো অধিকাংশ সাহাবী ও অপরাপর আলিমগণের অভিমত। সুফিয়ান ছাওরী, শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক (রাহঃ)-ও এইমত ব্যক্ত করেছেন। ইমাম শফিঈ (রাহঃ) বলেন, এই বিষয়ে দলীল হলো নবী (ﷺ) এর বাণী, দস্তবদস্ত হলে গমের বিনিময়ে যব যদৃচ্ছ বিক্রি করতে পার। কতক আলিম, যবের বিনিময়ে গমের ক্ষেত্রেও সমপরিমাণ না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি করা হারাম বলে মনে করেন। এ হলো ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রাহঃ) এর অভিমত। কিন্তু প্রথমোক্ত অভিমতটি অধিকতর সহীহ।
এই বিষয়ে আবু সাঈদ, আবু হুরায়রা, বিলাল ও আনাস (রাযিঃ) থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে। ইমাম আবু ঈসা (রাহঃ) বলেন উবাদা (রাযিঃ) বর্ণিত হাদীসটি হাসান-সহীহ। কোন কোন রাবী এই হাদীসটিকে খালিদ (রাহঃ) থেকে উক্ত সনদে বর্ণনা করেছেন। এতে আছে, তোমরা দস্ত বদস্ত হলে যবের বিনিময়ে গম যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করতে পার। কেউ কেউ এই হাদীসটিকে খালিদ- আবু কিলারা- আবুল আশআছ- উবাদা (রাযিঃ) সূত্রে নবী (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেছেন। এতে অতিরিক্ত আছে যে, খালিদ বলেন, আবু কিলাবা বলেছেন, যবের বিনিময়ে গম হলে যেভাবে ইচ্ছা বিক্রি করতে পার......।
এই হাদীস অনুসারে আলিমগণের আমল রয়েছে। তারা উভয় দিকে সমপরিমাণ না হওয়া ছাড়া গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব বিক্রি জায়েয বলে মনে করেন না। কিন্তু যদি জাত বিভিন্ন হয় তবে দস্ত বদস্ত হলে অতিরিক্ত প্রদান করায় কোন অসুবিধা আছে বলে মনে করেন না। এ হলো অধিকাংশ সাহাবী ও অপরাপর আলিমগণের অভিমত। সুফিয়ান ছাওরী, শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক (রাহঃ)-ও এইমত ব্যক্ত করেছেন। ইমাম শফিঈ (রাহঃ) বলেন, এই বিষয়ে দলীল হলো নবী (ﷺ) এর বাণী, দস্তবদস্ত হলে গমের বিনিময়ে যব যদৃচ্ছ বিক্রি করতে পার। কতক আলিম, যবের বিনিময়ে গমের ক্ষেত্রেও সমপরিমাণ না হওয়া পর্যন্ত বিক্রি করা হারাম বলে মনে করেন। এ হলো ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রাহঃ) এর অভিমত। কিন্তু প্রথমোক্ত অভিমতটি অধিকতর সহীহ।
أبواب البيوع عن رسول الله ﷺ
باب مَا جَاءَ أَنَّ الْحِنْطَةَ بِالْحِنْطَةِ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَكَرَاهِيَةِ التَّفَاضُلِ فِيهِ
حَدَّثَنَا سُوَيْدُ بْنُ نَصْرٍ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الْمُبَارَكِ، أَخْبَرَنَا سُفْيَانُ، عَنْ خَالِدٍ الْحَذَّاءِ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَبِي الأَشْعَثِ، عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ مِثْلاً بِمِثْلٍ فَمَنْ زَادَ أَوِ ازْدَادَ فَقَدْ أَرْبَى بِيعُوا الذَّهَبَ بِالْفِضَّةِ كَيْفَ شِئْتُمْ يَدًا بِيَدٍ وَبِيعُوا الْبُرَّ بِالتَّمْرِ كَيْفَ شِئْتُمْ يَدًا بِيَدٍ وَبِيعُوا الشَّعِيرَ بِالتَّمْرِ كَيْفَ شِئْتُمْ يَدًا بِيَدٍ " . قَالَ وَفِي الْبَابِ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ وَأَبِي هُرَيْرَةَ وَبِلاَلٍ وَأَنَسٍ . قَالَ أَبُو عِيسَى حَدِيثُ عُبَادَةَ حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ . وَقَدْ رَوَى بَعْضُهُمْ هَذَا الْحَدِيثَ عَنْ خَالِدٍ بِهَذَا الإِسْنَادِ وَقَالَ " بِيعُوا الْبُرَّ بِالشَّعِيرِ كَيْفَ شِئْتُمْ يَدًا بِيَدٍ " . وَرَوَى بَعْضُهُمْ هَذَا الْحَدِيثَ عَنْ خَالِدٍ عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ عَنْ أَبِي الأَشْعَثِ عَنْ عُبَادَةَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم الْحَدِيثَ وَزَادَ فِيهِ قَالَ خَالِدٌ قَالَ أَبُو قِلاَبَةَ " بِيعُوا الْبُرَّ بِالشَّعِيرِ كَيْفَ شِئْتُمْ " فَذَكَرَ الْحَدِيثَ . وَالْعَمَلُ عَلَى هَذَا عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ لاَ يَرَوْنَ أَنْ يُبَاعَ الْبُرُّ بِالْبُرِّ إِلاَّ مِثْلاً بِمِثْلٍ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ إِلاَّ مِثْلاً بِمِثْلٍ فَإِذَا اخْتَلَفَ الأَصْنَافُ فَلاَ بَأْسَ أَنْ يُبَاعَ مُتَفَاضِلاً إِذَا كَانَ يَدًا بِيَدٍ . وَهَذَا قَوْلُ أَكْثَرِ أَهْلِ الْعِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَغَيْرِهِمْ وَهُوَ قَوْلُ سُفْيَانَ الثَّوْرِيِّ وَالشَّافِعِيِّ وَأَحْمَدَ وَإِسْحَاقَ . قَالَ الشَّافِعِيُّ وَالْحُجَّةُ فِي ذَلِكَ قَوْلُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم " بِيعُوا الشَّعِيرَ بِالْبُرِّ كَيْفَ شِئْتُمْ يَدًا بِيَدٍ " . قَالَ أَبُو عِيسَى وَقَدْ كَرِهَ قَوْمٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ أَنْ تُبَاعَ الْحِنْطَةُ بِالشَّعِيرِ إِلاَّ مِثْلاً بِمِثْلٍ . وَهُوَ قَوْلُ مَالِكِ بْنِ أَنَسٍ وَالْقَوْلُ الأَوَّلُ أَصَحُّ .
হাদীসের ব্যাখ্যা:
এ-বিষয়ক হাদীসসমূহ হযরত আবূ সাঈদ খুদরী (রা) হযরত উমর (রা) হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রা) হযরত আবু বকর (রা) হযরত আবু হুরায়রা (রা) প্রমুখসহ আরো অনেক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদীসের দাবি ও উদ্দেশ্য এই যে, যে ছয় জিনিসের কথা এ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে (অর্থাৎ সোনা, রূপা, গম, যব (বার্লি), খেজুর, লবণ) যদি এ সবের কোন জাতের সাথে সে জাতীয় জিনিস দ্বারা বিনিময় করা হয় (যেমন গম দিয়ে এর বিনিময়ে গম নেয়া হয়) তবে এ বিষয় তখনই বৈধ হবে যখন উভয় দ্রব্য সমান ও নগদ আদান-প্রদান হবে। যদি কম বেশি হয় অথবা লেন-দেন নগদ (হাতে হাতে) না হয়, বরং ঋণ ও ধারের কথাবার্তা হয় তবে তা বৈধ হবে না বরং এটা এক প্রকার সুদের ব্যাপার হবে। এতে উভয় পক্ষ সুদের পাপে জড়িত হবে।
হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (র) 'হজ্জাতুল্লাহিল বালিগা' গ্রন্থে এ সব হাদীসের ব্যাখ্যায় যা বলেছেন তার মর্মকথা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে এবং তাঁর পূর্বে জাহিলী যুগে যে সুদের প্রচলন ছিল এবং যাকে 'রিবা' বলা হত তা যখন ঋণ ও ধার জাতীয় সুদ ছিল। যার নমুনা (যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে) এরূপ ছিল যে, যে সব পুঁজিপতি মহাজন সুদী ব্যবসা করত অভাবী লোকজন তাদের নিকট থেকে ঋণ করত এবং এ বিষয় নির্ধারিত হত যে, এতে অতিরিক্তসহ অমুক সময় পর্যন্ত পরিশোধ করবে। এরপর যদি নির্ধারিত সময়ে সে পরিশোধ করতে সক্ষম না হত তবে আরো সময় নিত আর এ সময়ের হিসাবের মধ্যে সুদের টাকায় আরো অতিরিক্ত নির্ধারিত হত। (শাহ্ সাহেব বলেন,) এ সুদী কারবারেরই প্রচলন ছিল। আর এটাকেই রিবা বলা হত। কুরআন মাজীদে সরাসরি ইহাকে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলারই নির্দেশে ক্রয়-বিক্রয়ের কোন কোন পন্থাও রিবার নির্দেশে অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দেন এবং এ থেকেও বাঁচার তাকিদ প্রদান করেন। এসব হাদীসে এ ঘোষণাই করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ও দাবি হচ্ছে হাদীসে বর্ণিত উপরোল্লিখিত ছয়টি দ্রব্যের মধ্যে কোন প্রকার যদি অনুরূপ জাতীয় দ্রব্যের সাথে বিনিময় করা হয় তবে শর্ত হচ্ছে কোন ভাগে কম-বেশি হবে না, বরং সমান সমান হবে এবং লেন-দেন নগদ হবে। যদি বিনিময়ের মধ্যে কম-বেশি হয় অথবা লেন-দেন নগদ না হয় তবে তা এক প্রকার সুদ হবে এবং উভয় পক্ষ গুনাহগার হবে
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র) স্বীয় রীতি অনুযায়ী এ নির্দেশের যে দর্শন বর্ণনা করেছেন, তার সারকথা হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বিলাসী ও অতি উঁচুস্তরের জাঁক-জমকের জীবন-যাপন পছন্দ করেন না। কেননা যে ব্যক্তি অতি উচুস্তরের বিলাসী জীবন-যাপন করবে সে অবশ্যম্ভাবীরূপে দুনিয়া অম্বেষণে বেশি জড়িত হবে। পক্ষান্তরে আখিরাতের জীবনকে সুন্দর করতে ও আত্মার পবিত্রতার চিন্তা থেকে অতটুকুই গাফিল হবে। এ ছাড়া অতিরিক্ত উঁচুনিচুর ফলে সমাজে যে বিভিন্ন প্রকার ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হয় তা সৃষ্টি হবে। বিলাসী ও উঁচু পর্যায়ের জীবনের দাবি হচ্ছে প্রতিটি জিনিস উৎকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টতর ও উন্নত মানের ব্যবহার করা হবে। গম উন্নত মানের খাওয়া হবে, খেজুর উন্নতমানের খাওয়া হবে, সোনা-রূপা উৎকৃষ্ট মানের ব্যবহার করা হবে। যার বাস্তব নমুনা প্রায়ই এরকম হয়ে থাকে যে, যদি নিজের নিকট উত্তম দ্রব্য না থাকে বরং নিম্নমানের থাকে তবে সে বেশি পরিমাণ দিয়ে তার পরিবর্তে উত্তম মানের অল্প পরিমাণ নিয়ে নেয়। বস্তুত কম-বেশি করে এক দ্রব্য অনুরূপ দ্রব্য দিয়ে বিনিময় করা সাধারণত বিলাসী ও উঁচু জীবন যাপনের দাবি থেকে হত। তাই এর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে এ পথে বাধা প্রদান করা হয়। এবং একটা সীমা পর্যন্ত তা বন্ধ করা হয়।
আল্লাহই এ নির্দেশের রহস্য ভাল জানেন। হাদীসে কেবল উল্লেখিত ছয়টি জিনিস সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে উম্মতের ফকীহ-মুজতাহিদগণ এ বিষয়ে প্রায় ঐক্যমত পোষণ করেন যে, এই ছয়টি জিনিস ছাড়াও যে সব জিনিস উক্ত প্রকারের সেগুলোরও হুকুম এটাই। যদিও বিস্তারিত বিবরণে ফকীহগণের অভিমতের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ও মতভেদ রয়েছে।
হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (র) 'হজ্জাতুল্লাহিল বালিগা' গ্রন্থে এ সব হাদীসের ব্যাখ্যায় যা বলেছেন তার মর্মকথা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে এবং তাঁর পূর্বে জাহিলী যুগে যে সুদের প্রচলন ছিল এবং যাকে 'রিবা' বলা হত তা যখন ঋণ ও ধার জাতীয় সুদ ছিল। যার নমুনা (যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে) এরূপ ছিল যে, যে সব পুঁজিপতি মহাজন সুদী ব্যবসা করত অভাবী লোকজন তাদের নিকট থেকে ঋণ করত এবং এ বিষয় নির্ধারিত হত যে, এতে অতিরিক্তসহ অমুক সময় পর্যন্ত পরিশোধ করবে। এরপর যদি নির্ধারিত সময়ে সে পরিশোধ করতে সক্ষম না হত তবে আরো সময় নিত আর এ সময়ের হিসাবের মধ্যে সুদের টাকায় আরো অতিরিক্ত নির্ধারিত হত। (শাহ্ সাহেব বলেন,) এ সুদী কারবারেরই প্রচলন ছিল। আর এটাকেই রিবা বলা হত। কুরআন মাজীদে সরাসরি ইহাকে হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। এরপর রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলারই নির্দেশে ক্রয়-বিক্রয়ের কোন কোন পন্থাও রিবার নির্দেশে অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দেন এবং এ থেকেও বাঁচার তাকিদ প্রদান করেন। এসব হাদীসে এ ঘোষণাই করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ও দাবি হচ্ছে হাদীসে বর্ণিত উপরোল্লিখিত ছয়টি দ্রব্যের মধ্যে কোন প্রকার যদি অনুরূপ জাতীয় দ্রব্যের সাথে বিনিময় করা হয় তবে শর্ত হচ্ছে কোন ভাগে কম-বেশি হবে না, বরং সমান সমান হবে এবং লেন-দেন নগদ হবে। যদি বিনিময়ের মধ্যে কম-বেশি হয় অথবা লেন-দেন নগদ না হয় তবে তা এক প্রকার সুদ হবে এবং উভয় পক্ষ গুনাহগার হবে
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ (র) স্বীয় রীতি অনুযায়ী এ নির্দেশের যে দর্শন বর্ণনা করেছেন, তার সারকথা হচ্ছে- আল্লাহ তা'আলা বিলাসী ও অতি উঁচুস্তরের জাঁক-জমকের জীবন-যাপন পছন্দ করেন না। কেননা যে ব্যক্তি অতি উচুস্তরের বিলাসী জীবন-যাপন করবে সে অবশ্যম্ভাবীরূপে দুনিয়া অম্বেষণে বেশি জড়িত হবে। পক্ষান্তরে আখিরাতের জীবনকে সুন্দর করতে ও আত্মার পবিত্রতার চিন্তা থেকে অতটুকুই গাফিল হবে। এ ছাড়া অতিরিক্ত উঁচুনিচুর ফলে সমাজে যে বিভিন্ন প্রকার ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হয় তা সৃষ্টি হবে। বিলাসী ও উঁচু পর্যায়ের জীবনের দাবি হচ্ছে প্রতিটি জিনিস উৎকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টতর ও উন্নত মানের ব্যবহার করা হবে। গম উন্নত মানের খাওয়া হবে, খেজুর উন্নতমানের খাওয়া হবে, সোনা-রূপা উৎকৃষ্ট মানের ব্যবহার করা হবে। যার বাস্তব নমুনা প্রায়ই এরকম হয়ে থাকে যে, যদি নিজের নিকট উত্তম দ্রব্য না থাকে বরং নিম্নমানের থাকে তবে সে বেশি পরিমাণ দিয়ে তার পরিবর্তে উত্তম মানের অল্প পরিমাণ নিয়ে নেয়। বস্তুত কম-বেশি করে এক দ্রব্য অনুরূপ দ্রব্য দিয়ে বিনিময় করা সাধারণত বিলাসী ও উঁচু জীবন যাপনের দাবি থেকে হত। তাই এর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে এ পথে বাধা প্রদান করা হয়। এবং একটা সীমা পর্যন্ত তা বন্ধ করা হয়।
আল্লাহই এ নির্দেশের রহস্য ভাল জানেন। হাদীসে কেবল উল্লেখিত ছয়টি জিনিস সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে উম্মতের ফকীহ-মুজতাহিদগণ এ বিষয়ে প্রায় ঐক্যমত পোষণ করেন যে, এই ছয়টি জিনিস ছাড়াও যে সব জিনিস উক্ত প্রকারের সেগুলোরও হুকুম এটাই। যদিও বিস্তারিত বিবরণে ফকীহগণের অভিমতের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ও মতভেদ রয়েছে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)