আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ

৪৪. কুরআনে কারীমের ফযীলত ও আদব

হাদীস নং: ২৮৯১
আন্তর্জাতিক নং: ২৮৯১
কুরআনে কারীমের ফযীলত ও আদব
সূরা আল-মুলক এর ফযীলত
২৮৯১. মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার (রাহঃ) ..... আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেনঃ ত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট কুরআনের একটি সূরা (পাঠ করে) কোন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করলে তাকে মাফ করে দেওয়া হয়। সেই সূরাটি হল তাবারাকল্লাযী বিইয়াদিহিল মুলক।

(আবু ঈসা বলেন)হাদীসটি হাসান।
أبواب فضائل القرآن عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
بَابُ مَا جَاءَ فِي فَضْلِ سُورَةِ الْمُلْكِ
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ عَبَّاسٍ الْجُشَمِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " إِنَّ سُورَةً مِنَ الْقُرْآنِ ثَلاَثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَهُ وَهِيَ سُورَةُ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ " . هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

সূরা মুলক অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ একটি সূরা। এ সূরায় আল্লাহ তা'আলার তাওহীদ ও আখিরাত সম্পর্কিত বিশ্বাস বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে আছে মানুষের পার্থিব জীবনযাপনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা। ইহজগতে মানুষের অস্তিত্ব কী উদ্দেশ্যে রয়েছে তার বলিষ্ঠ বয়ান। সে উদ্দেশ্য পূরণে যাতে মানুষ কর্মব্যস্ত থাকে, যাতে সে তার প্রতিটি কাজ সুন্দর ও সুচারুরূপে আঞ্জাম দেয়, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এক কথায় পরকালীন ও ইহকালীন জীবন সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য মানুষের যা করণীয়, তার হিদায়াত এ সূরায় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজেই সূরাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

জীবন গঠনমূলক এ সূরাটি বার বার পড়া দরকার। নিয়মিত পড়া দরকার। সেইসঙ্গে তরজমা ও তাফসীর গ্রন্থ থেকে সূরাটির অর্থ ও ব্যাখ্যাও জেনে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। মানুষ যাতে এ সূরাটি নিয়মিত পড়ে, সেজন্য নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরাটিকে মুসলিম ব্যক্তির দৈনন্দিন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছেন। এর প্রতি অনুপ্রাণিত করার জন্য তুলে ধরেছেন সূরাটির বিশেষ ফযীলত। এর ফযীলত সম্পর্কে আছে একাধিক হাদীছ।

সূরা মুলকের শাফা'আত কবুল হওয়া
হযরত আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

مِنَ الْقُرْآنِ سُوْرَةٌ ثَلاَثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَه

(কুরআনের ত্রিশ আয়াতবিশিষ্ট একটি সূরা আছে। সূরাটি এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করল। ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো)। পুরো কুরআন মাজীদ যে মুমিন ব্যক্তির জন্য এক সুপারিশকারী বিভিন্ন হাদীছে তা বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীছ দ্বারা জানা গেল, কুরআন মাজীদের বিশেষ বিশেষ সূরাও সুপারিশ করবে। এতে জানানো হয়েছে, সূরা মুলক এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেছে, ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। এ কথাটি বলা হয়েছে অতীতবাচক ক্রিয়াপদ দ্বারা। অর্থাৎ এক ব্যক্তির জন্য এটি ঘটেছে।

সম্ভবত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় এমন এক সাহাবীর ইন্তিকাল হয়েছিল, যিনি সূরা মুলক নিয়মিত পড়তেন এবং এর উপর আমল করতেন, ফলে সূরাটি তার জন্য সুপারিশ করেছে। হাদীছটি জানাচ্ছে, সূরাটির সুপারিশের বদৌলতে সে ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমার চূড়ান্ত রূপ তো হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভ করা। তা কিয়ামতে মহা বিচারদিবসের পর সম্পন্ন হবে। তবে ক্ষমাপ্রাপ্তির সুফল কেবল সেই দিনের জন্যই নির্ধারিত নয়; তার আগেও মুমিন ব্যক্তি সে সুফল লাভ করে থাকে, যেমন কবরের আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া। এ সাহাবীর বেলায় হয়তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ওহী মারফত জানানো হয়েছিল যে, সূরাটির সুপারিশের বদৌলতে আল্লাহ তা'আলা তার কবরের আযাব মাফ করে দিয়েছেন, তাকে কবরে শান্তি দান করেছেন।

এমনও হতে পারে যে, কথাটিকে অতীতবাচক ক্রিয়ায় ব্যক্ত করা হয়েছে বিষয়বস্তুটি জোরদার করার জন্য। কুরআন মাজীদ ও হাদীছে ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য বিষয়ের জন্য অতীতবাচক ক্রিয়ার বহুল ব্যবহার রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তা-ই হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য সূরা মুলক তার পাঠক ও অনুসারীর জন্য অবশ্যই সুপারিশ করবে। তার সুপারিশ করার বিষয়টা এমনই নিশ্চিত, যেন তা ঘটেই গেছে। কাজেই ক্রিয়াপদটি অতীতবাচক হলেও বোঝানো উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ কাল।

সুনানে আবূ দাউদের এক বর্ণনা দ্বারা এ ব্যাখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়। তাতে আছে- تَشْفَعُ لِصَاحِبهَا (সূরাটি সুপারিশ করবে তার সঙ্গীর জন্য)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি সূরাটি নিয়মিত পাঠ করে এবং এর অনুসরণও করে, তার মৃত্যুর পর সূরাটি তার জন্য সুপারিশ করবে। ফলে কবরে সে আযাব থেকে রক্ষা পাবে এবং কিয়ামতের দিন সে জাহান্নাম থেকে নাজাত পাবে।

লক্ষণীয়, সুপারিশ কার জন্য করবে তা বোঝানোর জন্য لِصَاحِبها শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দটির উৎপত্তি صُحْبَةٌ (সুহবাত) থেকে। এর অর্থ সঙ্গ ও সাহচর্য। অর্থাৎ সুপারিশ করবে এমন ব্যক্তির জন্য, যে সূরাটির সঙ্গী ও সহচর হয়ে গেছে। তার মানে সূরাটি সে নিয়মিত পড়ে। সে সূরাটির নির্দেশনা অনুসরণ করে চলে। কাজেই সূরাটির সুপারিশ লাভ করতে হলে অবশ্যই নিয়মিত তিলাওয়াত করতে হবে এবং এর হিদায়াত অনুযায়ী চলতে হবে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আচমকা বলে দেননি যে, সূরা মুলক সুপারিশ করবে। বরং এর প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য খানিকটা সময় নিয়েছেন। শ্রোতার অন্তরে কৌতূহল সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, সেটি কুরআনের এমন এক সূরা, যাতে ৩০টি আয়াত আছে। স্বাভাবিকভাবেই এ কথা শুনলে শ্রোতার অন্তরে কৌতূহল জাগবে। সে মনে মনে খুঁজবে সেটি কোন সূরা। তারা জানার প্রতীক্ষায় থাকবে। প্রতীক্ষার পর যখন কোনও কথা বলা হয়, তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয় এবং তার মর্মবাণী অন্তরে বসে যায়। হাদীছটি অন্তরে বসিয়ে দেওয়ার দরকারও ছিল, যাতে শ্রোতা কখনও না ভোলে এবং সে নিয়মিত এটি পাঠ করতে থাকে। কাজেই কৌতূহল সৃষ্টির পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দেন, সেটি হলো সূরা- تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ (মহিমাময় সেই সত্তা, যাঁর হাতে রাজত্ব)। এটি সূরার প্রথম আয়াতের শুরুর অংশ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াতের এ অংশ দ্বারা সূরাটির নামকরণ করেছেন। তিনি আরও অনেক সূরার ক্ষেত্রেই এমন করেছেন। এক শব্দের নাম না বলে আয়াত বা আয়াতের অংশবিশেষকে নাম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে সেসব সূরার সংক্ষিপ্ত নামও আছে। আলোচ্য সূরাটিকে সংক্ষেপে সূরা মুলক বলা হয়। এ নামটি নেওয়া হয়েছে আয়াতের এ অংশেরই الْمُلْكُ। (মুলক = রাজত্ব) শব্দটি থেকে।

আল্লাহর পরিচয় তাঁর কয়েকটি গুণের দ্বারা
আয়াতটির প্রথম অংশে আল্লাহ তা'আলার একটি বিশেষ গুণ তুলে ধরা হয়েছে। তা হলো- তিনি রাজত্ব ও সার্বভৌমত্বের মালিক। তাঁর একটি গুণবাচক নাম اَلْمَلِكُ (মহাবিশ্বের অধিকর্তা ও সার্বভৌম মালিক)। নামটির উৎপত্তি এই 'মুলক' শব্দ থেকেই। 'তাঁর হাতে রাজত্ব' এর অর্থ রাজত্ব ও আধিপত্য তাঁর ক্ষমতায়। হাত দ্বারা রূপকার্থে ক্ষমতা বোঝানো হয়। এটা সব ভাষায়ই আছে।

আয়াতটির শেষাংশে তাঁর আরেকটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে যে- وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِير (তিনি সবকিছুর উপর পরিপূর্ণ শক্তিমান)। তিনি দুনিয়ার রাজা-বাদশাহের মতো নন, যাদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ নয়। তাদের ক্ষমতা নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে, নির্দিষ্ট পরিমাণে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এমনই জগৎপতি, যাঁর ক্ষমতা মহাবিশ্বের সর্বত্র, সবকিছুতে পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান। তাঁর সে ক্ষমতার এক প্রকাশ হলো জীবন ও মৃত্যুর সৃষ্টি, মহাবিশ্বের সৃষ্টি এবং মানুষের সৃষ্টি। তিনি বলেন-

الَّذِیۡ خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَالۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا وَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفُوۡرُ ۙ

'যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে, কর্মে তোমাদের মধ্যে কে উত্তম। তিনিই পরিপূর্ণ ক্ষমতার মালিক, অতি ক্ষমাশীল।'

অর্থাৎ তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। তিনি নাস্তি থেকে তোমাদের অস্তিত্ব দান করেছেন। তারপর আবার তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। দুনিয়ায় তোমাদেরকে একটা সীমিত আয়ু দান করেছেন। এ সীমিত আয়ু দানের উদ্দেশ্য তোমাদেরকে পরীক্ষা করা। তিনি দেখতে চান তোমাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম। তা দেখতে চাওয়ার অধিকার তো তাঁর আছেই। তিনি তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করতেই পারেন। পরীক্ষা করার উদ্দেশ্য ভালো-মন্দ কাজের জন্য পুরস্কার ও শাস্তি দেওয়া। তিনি অসীম ও অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী। বান্দাকে যা ইচ্ছা আদেশ করার এখতিয়ার তিনি রাখেন। তাঁর সে ইচ্ছা ও আদেশ প্রতিহত করার ক্ষমতা কারও নেই। আদেশ পালন করলে পুরস্কার দেওয়া এবং অমান্য করলে শাস্তি দেওয়ারও পরিপূর্ণ ক্ষমতা তাঁর আছে। তাতেও কেউ বাধা দেওয়ার শক্তি রাখে না।

যা হোক, ইহজীবনে মানুষ পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ পরীক্ষা করছেন কে কাজেকর্মে উত্তম। কর্ম উত্তম হয় সঠিক পন্থায় সঠিক উদ্দেশ্যে সুচারুরূপে করার দ্বারা। আল্লাহ তা'আলা শরীয়ত দিয়েছেন। মানুষ ইহজীবনে কী কী কাজ করবে, কোন কাজ কীভাবে করবে, তার রূপরেখার নাম শরীয়ত। যে কাজ শরীয়ত অনুযায়ী করা হবে, করা হবে পূর্ণ মনোযোগ সহকারে সুন্দর ও নিখুঁতভাবে এবং তা করা হবে আল্লাহ তা'আলাকে রাজি-খুশি করার জন্য, তাই উত্তম কাজ। তবে মানুষের ক্ষমতা সীমিত। নানা প্রতিবন্ধকতা সামনে আছে। তাই ভুলত্রুটি হয়ে যেতে পারে। সে ভুলত্রুটির অনুভূতি থাকলে এবং সেজন্য অনুশোচনা প্রকাশ করলে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমা করে দেন। কেননা তিনি মহা ক্ষমাশীল।

মানুষ যাতে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনে যত্নবান থাকে, সেজন্য সূরাটির শুরুর দিকে আল্লাহ তা'আলার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। আল্লাহকে চেনা যায় তাঁর গুণাবলি দ্বারা। তাই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃজন এবং এর মধ্যে বিরাজমান আল্লাহর শক্তি-ক্ষমতার বহু বিচিত্র নিদর্শনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। সেসবের প্রতি গভীরভাবে লক্ষ করতে বলা হয়েছে। যাতে সে বুঝতে পারে আল্লাহর সৃষ্টি কত নিখুঁত এবং তিনি কী পরিপূর্ণ হিকমত ও ক্ষমতার মালিক। এর দ্বারা এ শিক্ষাও লাভ হয় যে, মানুষ যেন আপন সাধ্য অনুযায়ী সকল কাজ নিখুঁতভাবে করতে সচেষ্ট থাকে।

এ পৃথিবীতে তার ভোগ-উপভোগের বস্তুরাজি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেসব আহরণ করার জন্য জলে-স্থলে চলাচল করার জন্য রাস্তাঘাটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি মানুষের কর্তব্য অলস বসে না থেকে প্রয়োজনীয় বস্তুসামগ্রী সংগ্রহের চেষ্টা করা। আল্লাহর দেওয়া পথে সে বিচরণ করবে আর আল্লাহর দেওয়া রিযিক আহরণ করবে। কারও উপর নির্ভরশীল হবে না। তবে সর্বাবস্থায় তাকে মনে রাখতে হবে, ইহজগৎ অনন্তকালের নয়। একদিন সকলকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তিনি সকলকে তাদের কাজের পরিপূর্ণ প্রতিদান দেবেন। ফলে ভাগ্যবানেরা জান্নাতে যাবে আর হতভাগাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম।

মুমিন ব্যক্তি যদি সূরাটি মন দিয়ে পড়ে আর এসব বিষয়ে চিন্তা করে, তবে আল্লাহর প্রতি তার আকীদা-বিশ্বাস দৃঢ় হবে, তাঁর প্রতি তাওয়াক্কুল ও নির্ভরতায় গভীরতা আসবে, অন্তরে সন্তুষ্টি ও প্রশান্তি ছেয়ে যাবে আর এভাবে সে তাঁর আদেশ-নিষেধ পালনে অনুপ্রাণিত হবে। তারপরও যদি কোনও ভুলত্রুটি হয়ে যায় এবং নফস ও শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ত্রুটিবিচ্যুতি করে ফেলে, তবে তাওবার দুয়ার খোলা রয়েছে। তাওবা করলে তিনি ক্ষমা করে দেবেন। মৃত্যুর পর সে সূরাটির সুপারিশ ও আল্লাহ তা'আলার কাছে মাগফিরাত পেয়ে যাবে, যেহেতু তিনি অতি ক্ষমাশীল।

রাতে ঘুমানোর আগে সূরা মুলক পড়া
এতটা বরকত ও কল্যাণ এবং এত গভীর শিক্ষা ও হিদায়াত যে সূরার মধ্যে নিহিত রয়েছে, সে সূরাটি তো বারবারই পড়া উচিত। এটিকে দৈনন্দিন আমলের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া উচিত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তাই করতেন। হযরত জাবির রাযি. থেকে বর্ণিত-

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ لَا يَنَامُ حَتَّى يَقْرَأَ الم تَنْزِيل، وَتَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ.

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা আলিফ-লাম-মীম সাজদা ও সূরা তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না। (জামে' তিরমিযী: ৩৪০৪; মুসনাদে আহমাদ: ১৪৬৫৯; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা : ২৯৮১৬; সুনানে দারিমী: ৩৪৫৪; খারাইতী, মাকারিমুল আখলাক ৯৫১: নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা : ১০৪৭৭; হাকিম, আল মুসতাদরাক ৩৫৪৫; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ১৪৮৩)

এ হাদীছ দ্বারা বোঝা যায়, ঘুমের আগে যেসব আমল মাসনূন, সূরা মুলক পড়াও তার একটি। কোনও কোনও হাদীছে এটিকে সাধারণভাবে রাতের আমলসমূহের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাযি. থেকে বর্ণিত-

مَنْ قَرَأَ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ كُلَّ لَيْلَةٍ، مَنَعَهُ اللَّهُ بِهَا مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ۔

যে ব্যক্তি প্রতিরাতে সূরা মুলক পড়বে, আল্লাহ তা'আলা এর প্রতিদানে তাকে কবরের আযাব থেকে মুক্ত রাখবেন। (নাসাঈ, আস সুনানুল কুবরা ১০৪৭৯; তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ১০২৫৪; আল মু'জামুল আওসাত: ৬২১৬)

হযরত ইবন মাস'উদ রাযি. বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এ সূরাটিকে 'আল-মানিআ' নামে অভিহিত করতাম। আল-মানিআ অর্থ রক্ষাকারী অর্থাৎ এটি কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবে অথবা এটি গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে, যা কিনা কবর আযাবের কারণ।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ রাযি.-এর হাদীছে ঘুমের আগে পড়ার কথা নেই। হযরত জাবির রাযি. বর্ণিত হাদীছের সঙ্গে এ হাদীছটিকে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় এ সূরাটি ইশার নামাযের পরে ঘুমের আগপর্যন্ত যে-কোনও সময়ই পড়া যেতে পারে।

পরিবারের প্রত্যেককে সূরা মুলক শেখানো
মোটকথা সূরা মুলক অত্যন্ত মুবারক ও কল্যাণময় একটি সূরা। মানুষের জীবনগঠনে এর বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আখিরাতের জীবনেও সূরাটি তার পাঠকের পক্ষে অতীব উপকারী সাব্যস্ত হবে। সুতরাং মানুষের জন্য আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে সূরাটি এক মহামূল্যবান উপহার।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. একদিন তাঁর এক শিষ্যকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আমি কি তোমাকে একটি উপহার দেব, যা পেয়ে তুমি খুব খুশি হবে? শিষ্য বলল, অবশ্যই হে আবূল আব্বাস। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। তিনি বললেন, তুমি সূরা তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক পড়বে। এটি মুখস্থ করবে। এটি তোমার স্ত্রীকে শেখাবে। তোমার ছেলেমেয়ে ও ঘরের শিশুদেরকে শেখাবে, শেখাবে প্রতিবেশীদেরকেও। কেননা এটি নাজাতদাতা। কিয়ামতের দিন এটি তার পাঠকের পক্ষে তার প্রতিপালকের কাছে ফরিয়াদ করবে, যেন তিনি তাকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দেন। যে ব্যক্তি এ সূরাটি নিয়মিত পড়বে, আল্লাহ তা'আলা তাকে এর অসিলায় কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবেন।

হযরত ইবন মাস'উদ রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

لَوَدِدْتُ أَنَّهَا فِيْ قَلْبِ كُلِّ إِنْسَانٍ مِنْ أُمَّتِيْ.

আমার কামনা, এ সূরাটি আমার উম্মতের প্রতিটি লোকের অন্তরে থাকুক। তাবারানী, আল মু'জামুল কাবীর ১১৬১৬; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ২২৭৭

হযরত ইবন মাস'উদ রাযি. বলেন, মৃতব্যক্তির কবরে (শাস্তিদাতা ফিরিশতাদের) উপস্থিতি ঘটবে। প্রথমে তারা আসবে তার দু'পায়ের দিক থেকে। তখন তার পা'দুটি বলবে, আমার দিক থেকে তোমাদের জন্য কোনও পথ নেই। কারণ সে আমার উপর ভর করে সূরা মুলক পড়ত। তারপর আসবে তার বুকের দিক থেকে। বুক বলবে, আমার দিক থেকে তোমাদের জন্য কোনও পথ নেই। কারণ সে আমার ভেতর সূরা মুলক সংরক্ষণ করত। তারপর আসবে তার মাথার দিক থেকে। মাথা বলবে, আমার দিক থেকে তোমাদের জন্য কোনও পথ নেই। কারণ সে আমার দ্বারা সূরা মূলক পড়ত। এভাবে এ সূরা তাকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবে। মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক: ৬০২৫; হাকিম, আল মুসতাদরাক দরাক: ৩৮৩৯; বায়হাকী, শু'আবূল ঈমান: ২২৭৯

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, জনৈক সাহাবী একটি কবরের উপর ঘর তৈরি করেছিলেন। তার জানা ছিল না সেটি কবর। হঠাৎ তিনি শুনতে পান এক ব্যক্তি সূরা তাবারাকা (সূরা মুলক) পাঠ করছে। সে পূর্ণ সূরাটি পাঠ করে ফেলে।

সেই সাহাবী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! আমি একটি কবরের উপর ঘর তৈরি করেছি। আমার জানা ছিল না সেটি কবর। হঠাৎ শুনতে পাই তাতে এক ব্যক্তি সূরা তাবারাকা পাঠ করছে। সে শেষ পর্যন্ত সূরাটি পাঠ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ সূরাটি রক্ষাকারী- কবরের আযাব থেকে রক্ষা করে। জামে তিরমিযী: ২৮৯০; বায়হাকী, শু'আবুল ঈমান: ২২৮০

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. রাতের বেলা, বিশেষত ঘুমের আগে সূরা মুলক তিলাওয়াত করার দ্বারা কবরের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কাজেই আমরা রাতের বেলা এ সূরাটি নিয়মিত পড়ব।

খ. সূরাটির সুপারিশ পাওয়ার জন্য এর শিক্ষা ও হিদায়াত অনুসারে আমল করাও জরুরি।

গ. বান্দার পক্ষে যারা সুপারিশ করবে, সূরা মুলক তার অন্যতম।

ঘ. আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে মুমিন ব্যক্তির জন্য সুপারিশের অনুমতি থাকার বিষয়টা সত্য। এটা ইসলামের একটি আকীদা। এর উপর বিশ্বাস রাখা চাই।

ঙ. সবকিছুর নিরঙ্কুশ মালিকানা কেবল আল্লাহ তা'আলারই আছে। নিরঙ্কুশ আধিপত্য কেবল তাঁরই, অন্য কারও নেই। যার যা মালিকানা বা আধিপত্য, তা অতি সীমিত পরিসরে ও সীমিত পরিমাণে এবং সীমিত সময়ের জন্য।

চ. পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে সূরা মুলক শেখানো উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান
জামে' তিরমিযী - হাদীস নং ২৮৯১ | মুসলিম বাংলা