আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ

৪৪. কুরআনে কারীমের ফযীলত ও আদব

হাদীস নং: ২৯০৬
আন্তর্জাতিক নং: ২৯০৬
কুরআনে কারীমের ফযীলত ও আদব
কুরআনের ফযীলত।
২৯০৬. আব্দ ইবনে হুমায়দ (রাহঃ) ..... হারিছ আওয়ার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি একদিন মসজিদে গিয়ে দেখি লোকেরা আলাপ আলোচনায় রত। পরে আলী (রাযিঃ)-এর নিকট গেলাম। বললামঃ হে আমীরুল মু’মিনীন, দেখছেন না লোকেরা নানা কর্থাবার্তায় মত্ত? তিনি বললেনঃ এরা কি তাই করছে? আমি বললামঃ হ্যাঁ।

তিনি বলেনঃ শোন, আমি তো রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, সাবধান, অচিরেই ফিতনা ফাসাদ দেখা দিবে। আমি বললামঃ তা থেকে বাঁচার উপায় কি, ইয়া রাসূলাল্লাহ্?

তিনি বললেনঃ আল্লাহর কিতাব। তাতে আছে তোমাদের পূর্ববর্তীদেরও সংবাদ এবং পরবর্তীদের খবর। আর তোমাদের জন্য ফয়সালা-বিধান। এ হল (সত্য ও মিথ্যার) পার্থক্যকারী। এ নিরর্থক নয়। যে ব্যক্তি অহংকার বশে তা পরিত্যাগ করবে আল্লাহ্ তাআলা তার গর্দান ভেঙ্গে দিবেন। একে বাদ দিয়ে যে ব্যক্তি হিদায়াত তালাশ করবে তাকে আল্লাহ্ তাআলা গুমরাহ করে দিবেন।

এ হল আল্লাহ্ তাআলার সুদৃঢ় রশি। এ হল হিকমত ও পূর্ণ নসীহত। এই হল সরল সঠিক পথ। এর অনুসরণে মানুষের চিন্তাধারা বক্র হয় না। এতে যবান জড়তার শিকার হয় না। আলিমগণ এর থেকে কখনো পরিতৃপ্ত হয় না। বার বার পাঠেও তা কখনো পুরনো হয় না। এর বিস্বয়ের অন্ত নেই। এটি ঐ গ্রন্থ যা শোনার পর জিনরা এই কথা না বলে থাকতে পারে নি যে, ’আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি যা সঠিক পথ-নির্দেশ করে। সুতরাং আমরা তাতে ঈমান এনেছি।’’ (জিন ৭২ঃ ১-২)

যে ব্যক্তি এর অনুসরণে কথা বলে সে সত্য বলে, যে এতদানুযায়ী আমল করে সে প্রতিদান প্রাপ্ত হয়, যে ব্যক্তি এতদানুসারে ফায়সালা দেয় সে ইনসাফ-এর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে আর যে ব্যক্তি এর দিকে আহবান জানায় সে সিরাতে মুস্তাকীমের হেদায়ত পায়। হে আ’ওয়ার, তোমার প্রতি এই কথাগুলোকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর।

হাদীসটি গারীব। হামযা আয-যাইয়াত-এর রিওয়ায়াত ছাড়া এটি সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা নেই। এর সনদ মাজহূল বা অজ্ঞাত। হারিছের রিওয়ায়াত সম্পর্কে সামালোচনা রয়েছে।
أبواب فضائل القرآن عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
بَابُ مَا جَاءَ فِي فَضْلِ القُرْآنِ
حَدَّثَنَا عَبْدُ بْنُ حُمَيْدٍ، حَدَّثَنَا حُسَيْنُ بْنُ عَلِيٍّ الْجُعْفِيُّ، قَالَ سَمِعْتُ حَمْزَةَ الزَّيَّاتَ، عَنْ أَبِي الْمُخْتَارِ الطَّائِيِّ، عَنِ ابْنِ أَخِي الْحَارِثِ الأَعْوَرِ، عَنِ الْحَارِثِ، قَالَ مَرَرْتُ فِي الْمَسْجِدِ فَإِذَا النَّاسُ يَخُوضُونَ فِي الأَحَادِيثِ فَدَخَلْتُ عَلَى عَلِيٍّ فَقُلْتُ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ أَلاَ تَرَى أَنَّ النَّاسَ قَدْ خَاضُوا فِي الأَحَادِيثِ . قَالَ وَقَدْ فَعَلُوهَا قُلْتُ نَعَمْ . قَالَ أَمَا إِنِّي قَدْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " أَلاَ إِنَّهَا سَتَكُونُ فِتْنَةٌ " . فَقُلْتُ مَا الْمَخْرَجُ مِنْهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ " كِتَابُ اللَّهِ فِيهِ نَبَأُ مَا كَانَ قَبْلَكُمْ وَخَبَرُ مَا بَعْدَكُمْ وَحُكْمُ مَا بَيْنَكُمْ هُوَ الْفَصْلُ لَيْسَ بِالْهَزْلِ مَنْ تَرَكَهُ مِنْ جَبَّارٍ قَصَمَهُ اللَّهُ وَمَنِ ابْتَغَى الْهُدَى فِي غَيْرِهِ أَضَلَّهُ اللَّهُ وَهُوَ حَبْلُ اللَّهِ الْمَتِينُ وَهُوَ الذِّكْرُ الْحَكِيمُ وَهُوَ الصِّرَاطُ الْمُسْتَقِيمُ هُوَ الَّذِي لاَ تَزِيغُ بِهِ الأَهْوَاءُ وَلاَ تَلْتَبِسُ بِهِ الأَلْسِنَةُ وَلاَ يَشْبَعُ مِنْهُ الْعُلَمَاءُ وَلاَ يَخْلَقُ عَلَى كَثْرَةِ الرَّدِّ وَلاَ تَنْقَضِي عَجَائِبُهُ هُوَ الَّذِي لَمْ تَنْتَهِ الْجِنُّ إِذْ سَمِعَتْهُ حَتَّى قَالُوا (إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا * يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ ) مَنْ قَالَ بِهِ صَدَقَ وَمَنْ عَمِلَ بِهِ أُجِرَ وَمَنْ حَكَمَ بِهِ عَدَلَ وَمَنْ دَعَا إِلَيْهِ هُدِيَ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ " . خُذْهَا إِلَيْكَ يَا أَعْوَرُ . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ لاَ نَعْرِفُهُ إِلاَّ مِنْ هَذَا الْوَجْهِ وَإِسْنَادُهُ مَجْهُولٌ . وَفِي الْحَارِثِ مَقَالٌ .

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ হাদীসখানা কুরআনুল করীমের মাহাত্ম্য ও ফযীলত বর্ণনায় নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ব্যাপক হাদীস। এতে ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বাক্যগুলোর ব্যাখ্যা অনুবাদের সাথে করে দেয়া হয়েছে।

অনুবাদ: হযরত আলী মুরতাযা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছিঃ সাবধান, একটি মহা বিপর্যয় আসন্ন। আমি জিজ্ঞেস করলাম: তা থেকে বাঁচবার কী ব্যবস্থা রয়েছে ইয়া রাসূলাল্লাহ?
জবাবে তিনি বললেন; কিতাবুল্লাহ্, তাতে রয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের (শিক্ষাপ্রদ ঘটনাবলীর) সংবাদ এবং তোমাদের পরবর্তীদের হাল-হাকীকত, (অর্থাৎ আমল ও আখলাকের যে সব পার্থিব এবং পারলৌকিক পরিণতি দেখা দিবে, কুরআন মজীদে সে সব সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে) তোমাদের মধ্যকার সমস্য সমূহ সম্পর্কে কুরআন মজীদে সিদ্ধান্ত ও বিধান রয়েছে, (হক-বাতিল ও ভুল-শুদ্ধ সম্পর্কে) তা হচ্ছে চূড়ান্ত ফয়সালা স্বরূপ, বেহুদা বাক্যলাপ নয়। যে কেউ গোঁয়ার্তুমী করে তা থেকে ঘাড় ফিরিয়ে নেবে আল্লাহ তার ঘাড় মটকাবেন। আর যে ব্যক্তি এর বাইরে হিদায়াত অন্বেষণ করবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্যে আসবে কেবল গুমরাহী। (অর্থাৎ সে হকের হিদায়াত থেকে অবশ্যই বঞ্চিত থাকবে)। কুরআনই হচ্ছে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ রক্ষার মযবুত বন্ধন বা মাধ্যম আর তা হচ্ছে সুদৃঢ় হিদায়াত এবং এটাই সিরাতুল মুস্তাকীম বা সহজ-সরল পথ। এটাই হচ্ছে সেই স্পষ্ট সত্য, যার অনুসরণে প্রবৃত্তিসমূহ বক্র পথ অবলম্বন করতে পারে না এবং রসনা সমূহ তাকে বিকৃত করতে পারে না। (অর্থাৎ যেভাবে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহে রসনার পথে গুমরাহীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং বিকৃতিকারীরা নিজেদের ইচ্ছা মত একটির স্থলে অন্যটি পড়ে পড়ে সে সব কিতাবে বিকৃতি সাধন করেছে, এই কুরআনে তারা সেভাবে তা করে বিকৃতি সাধন করতে পারবে না। আল্লাহ্ তা'আলা কিয়ামত পর্যন্ত তার সুসংরক্ষণের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।) জ্ঞানীরা কখনো তার দ্বারা পূর্ণ পরিতৃপ্ত হবেন না। (মানে যতই তারা এ নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করবেন ততই জ্ঞানের নিকট নতুন নতুন রহস্য উম্মোচিত হতে থাকবে এবং কখনো কুরআন চর্চাকারী এটা মনে করবেন না যে, এর জ্ঞান-বিজ্ঞানের সবটুকুই তাঁর আয়ত্তে এসে গেছে আর কিছু জানবার বা বুঝবার মত বাকী নেই; বরং যতই তাঁরা এ নিয়ে গবেষণা করবেন ততই তাঁরা অনুভব করবেন যে, এ পর্যন্ত কুরআনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের যতটুকু আমরা হাসিল করেছি তার চাইতে অনেকগুণ বেশি আমাদের অজ্ঞাত রয়ে গেছে) বার বার পূনরাবৃত্তির দরুন তা কখনো পুরনো হয়ে যাবে না (অর্থাৎ যে ভাবে পৃথিবীর অন্য দশটি বই একবার পড়ে নিলেই বার বার পড়তে আর মন চায় না, বিরক্তিকর ঠেকে; কুরআন শরীফের ব্যাপারে তা ঘটবে না তা যতবেশি তিলাওয়াত করা হবে আর যত বেশি তাতে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করা হবে, ততই উপভোগ্য ও আনন্দদায়ক মনে হবে।) আর এর চমৎকারিত্ব ও বিস্ময় কখনো শেষ হবার নয়। কুরআন শরীফের শান হচ্ছে এই যে, যখন জিনেরা তা শুনলো তখন তারা বলে উঠলোঃ

إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ

আমরা কুরআন শ্রবণ করেছি যা বিস্ময়কর, পথ প্রদর্শন করে কল্যাণের দিকে। তাই আমরা এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছি।

যে ব্যক্তি কুরআন অনুযায়ী কথা বলবে, সে যথার্থ ও হক কথা বলবে আর যে ব্যক্তি সে অনুসারে আমল করবে, সে তার বিনিময় বা পুরস্কার লাভ করবে। যে ব্যক্তি কুরআন অনুসারে ফয়সালা করবে সে ইনসাফ করবে এবং যে ব্যক্তি কুরআনের দিকে আহবান জানাবে, সে সিরাতুল মুস্তাকীম বা সহজ-সরল পথে পরিচালিত হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান