আল জামিউল কাবীর- ইমাম তিরমিযী রহঃ

৪৮. নবীজী সাঃ ও সাহাবা রাঃ ; মর্যাদা ও বিবিধ ফাযায়েল

হাদীস নং: ৩৬১৬
আন্তর্জাতিক নং: ৩৬১৬
নবীজী সাঃ ও সাহাবা রাঃ ; মর্যাদা ও বিবিধ ফাযায়েল
নবী (ﷺ) এর মর্যাদা
৩৬১৬। আলী ইব্‌ন নসর ইবন আলী জাহযামী (রাহঃ)... ইবন আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ একবার রাসূলুল্লাহ্ -এর কয়েকজন সাহাবী বসে তাঁর অপেক্ষা করছিলেন। তিনি (ঘর থেকে) বের হয়ে তাদের কাছাকাছি যখন হলেন, শুনলেন তারা পরস্পর আলোচনা করছে। তিনি তাদের কথাবার্তাও শুনতে পেলেন। তাদের কেউ কেউ বলছিল : কি আশ্চর্য! আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি থেকে একজনকে অন্তরং্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন! ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে তিনি তার খালীল (অন্তরং্গ বন্ধুরূপে) গ্রহণ করেছেন।
অপর একজন বলল ঃ মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর সঙ্গে কালাম করা অপেক্ষা এটা আশ্চর্যের নয়। আল্লাহ্ তো মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর সঙ্গে বিশেষ কালাম করেছেন। অন্য একজন বললঃ ঈসা (আলাইহিস সালাম) তো আল্লাহর কালিমা ও তাঁর (প্রদত্ত) রূহ।
আরেকজন বললঃ আদম (আলাইহিস সালাম)-কে তো আল্লাহ্ তা'আলা বিশেষভাবে মনোনীত করেছেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ তাদের সমক্ষে বের হয়ে এলেন এবং তাদেরকে সালাম করলেন। পরে বললেনঃ আমি তোমাদের কথাবার্তা এবং বিস্ময়ের কথা শুনেছি। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর খালীল অবশ্যই তিনি এই মুসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর সঙ্গে আলাপ করেছেন কথা ঠিক, ঈসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ্র রূহ ও তার কালিমা, তিনি তাই, আদম (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর মনোনীত, তিনি ঠিক তা-ই। তবে তোমরা শুনে রাখ, আমি হলাম হাবীবুল্লাহ্ আল্লাহর হাবীব, এ কোন অহংকার নয়। কিয়ামতের দিন আমিই হব প্রশংসার পতাকা বহনকারী এ কোন অহংকার নয়। কিয়ামতের দিন আমিই হব প্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই সর্বপ্রথম গ্রহণ করা হবে, এ কোন অহংকার নয়। জান্নাতের আংটাসমূহ আমিই প্রথম পরাব। আল্লাহ্ তা'আলা তা আমার জন্য খুলে দিবেন এবং আমাকে সেখানে প্রবেশ করাবেন। দরিদ্র মু'মিনরা আমার সঙ্গে থাকবে তখন, এ কোন অহংকার নয়। পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সবার তুলনায় আমি সবচেয়ে সম্মানের অধিকারী, এ কোন অহংকার নয়।
أبواب المناقب عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ نَصْرِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ: حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ المَجِيدِ قَالَ: حَدَّثَنَا زَمْعَةُ بْنُ صَالِحٍ، عَنْ سَلَمَةَ بْنِ وَهْرَامَ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: جَلَسَ نَاسٌ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْتَظِرُونَهُ قَالَ: فَخَرَجَ حَتَّى إِذَا دَنَا مِنْهُمْ سَمِعَهُمْ يَتَذَاكَرُونَ فَسَمِعَ حَدِيثَهُمْ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ: عَجَبًا إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ اتَّخَذَ مِنْ خَلْقِهِ خَلِيلًا، اتَّخَذَ مِنْ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا، وَقَالَ آخَرُ: مَاذَا بِأَعْجَبَ مِنْ كَلَامِ مُوسَى كَلَّمَهُ تَكْلِيمًا، وَقَالَ [ص:588] آخَرُ: فَعِيسَى كَلِمَةُ اللَّهِ وَرُوحُهُ، وَقَالَ آخَرُ: آدَمُ اصْطَفَاهُ اللَّهُ. فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ فَسَلَّمَ وَقَالَ: «قَدْ سَمِعْتُ كَلَامَكُمْ وَعَجَبَكُمْ إِنَّ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلُ اللَّهِ وَهُوَ كَذَلِكَ وَمُوسَى نَجِيُّ اللَّهِ وَهُوَ كَذَلِكَ، وَعِيسَى رُوحُهُ وَكَلِمَتُهُ وَهُوَ كَذَلِكَ وَآدَمُ اصْطَفَاهُ اللَّهُ وَهُوَ كَذَلِكَ، أَلَا وَأَنَا حَبِيبُ اللَّهِ وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا حَامِلُ لِوَاءِ الحَمْدِ يَوْمَ القِيَامَةِ وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا أَوَّلُ شَافِعٍ وَأَوَّلُ مُشَفَّعٍ يَوْمَ القِيَامَةِ وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا أَوَّلُ مَنْ يُحَرِّكُ حِلَقَ الجَنَّةِ فَيَفْتَحُ اللَّهُ لِي فَيُدْخِلُنِيهَا وَمَعِي فُقَرَاءُ المُؤْمِنِينَ وَلَا فَخْرَ، وَأَنَا أَكْرَمُ الأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ وَلَا فَخْرَ» : «هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ»

হাদীসের তাখরীজ (সূত্র):

হাদীসটি গারীব।

হাদীসের ব্যাখ্যা:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্বভাব মুবারক ও সাধারণ রীতি ছিল বিনয়-নম্রতা প্রকাশের। তবে প্রয়োজন দেখা দিলে আল্লাহ্ তা'আলার বাণী- وَاَمَّا بِنِعۡمَۃِ رَبِّکَ فَحَدِّثۡ পালনার্থে আল্লাহর সেই বিশেষ নি'আমতরাজি, সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা এবং স্তরেরও উল্লেখ করতেন, যে গুলোর ব্যাপারে তিনি বৈশিষ্ট্যিমণ্ডিত ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা)-এর আলোচ্য হাদীস তাঁর সেই বর্ণনার ধারাবাহিকতা।

আলোচ্য হাদীসে যে সব সাহাবীর আলোচনা উল্লিখিত হয়েছে তাঁরা হযরত ইব্রাহীম (আ), হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ), হযরত আদম (আ) প্রমুখের প্রতি আল্লাহ তা'আলার দানকৃত বিশেষ নি'আমতরাজি সম্বন্ধে অবগত ছিলেন, তাই তাঁরা আলোচনা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শিক্ষা ও কুরআন মজীদ থেকে এ সব তাঁদের জানা ছিল। তবে সম্ভবত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদার স্তর সম্বন্ধে তাঁদের জানা অপ্রতুল ছিল। এজন্য এটা তাঁদের প্রয়োজন ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এ ব্যাপারে তাঁদেরকে বলবেন। সুতরাং তিনি তাঁদেরকে বললেন এবং এভাবে বললেন যে, হযরত ইব্রাহীম (আ), হযরত মূসা (আ), হযরত ঈসা (আ) ও হযরত আদম (আ)-এর প্রতি আল্লাহ্ যে সব নি'আমতরাজি এবং তাঁদের যে ফযীলত ও প্রশংসা তাঁরা করছিলেন, প্রথমে তিনি সে সবের সত্যায়ন করেন। এর পর নিজের সম্বন্ধে বলেন, আমার প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার এ বিশেষ বৈশিষ্টমণ্ডিত নি'আমতরাজি রয়েছে যে, আমাকে মাহবুবের স্থান দেওয়া হয়েছে। আর আমি আল্লাহর হাবীব। (উল্লেখ্য, সাহাবা কিরামকে তিনি একথা বলেছিলেন, তাঁরা জানতেন যে, মাহবুবের স্থান সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবার উর্ধ্বে। এ জন্য তিনি এ বিষয় অধিক সুস্পষ্ট করার প্রয়োজন মনে করেন নি)।

এরপর তিনি আল্লাহ্ তা'আলার কতক সেই নি'আমতের উল্লেখ করেন, যেগুলোর প্রকাশ এ জগত সমাপ্তির পর কিয়ামতে হবে। সে গুলোর মধ্যে لِوَاءُ الْحَمْدِ (প্রশংসার পতাকা) হাতে আসা। সর্ব প্রথম সুপারিশকারী ও সর্ব প্রথম সুপারিশ গৃহীত হওয়ার বিষয় উল্লিখিত হাদীসসমূহেও এসেছে। এরপর তিনি আল্লাহ্ তা'আলার দু'টি বিশেষ নি'আমতের উল্লেখ করেন। ১. জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করাবার জন্যে সর্ব প্রথম আমিই এর হুড়কাগুলো নাড়া দেব। (যে ভাবে কোন ঘরের দরজা খুলবার জন্যে করাঘাত করা হয়) আল্লাহ্ তা'আলা তৎক্ষণাত দরজা খুলিয়ে দেবেন ও আমাকে জান্নাতে দাখিল করবেন। আর আমার সাথে মু'মিনদের ফকিরগণ হবে। তাদেরকেও আমার সাথে জান্নাতে দাখিল করা হবে। (এসব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাহবুবের দরজায় আসীন হওয়ার বাহ্যিক বিষয় হবে।)

এ ধারাবাহিকতায় তিনি শেষ কথা এই বলেন যে, وَأَنَا أَكْرَمُ الْأَوَّلِينَ وَالآخِرِينَ عَلَى اللَّهِ অর্থাৎ এটাও আমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ নি'আমত যে, তাঁর পূর্বাপর সবার থেকে অধিক সম্মান ও মর্যাদা আমারই। আর মর্যাদার যে স্তর আমাকে দেওয়া হয়েছে তা পূর্বাপর কাউকেই দেওয়া হয়নি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর এই বাণীসমূহে আল্লাহ্ তা'আলার যে সব নি'আমতরাজির উল্লেখ করেছেন সেগুলোর প্রতিটির সাথে এটাও বলেছেন وَلَا فَخْرَ যে ভাবে বলা হয়েছে এর অর্থ এটাই যে, আল্লাহ্ তা'আলার এসব বিশেষ নি'আমতের উল্লেখ আমি গর্ব ও নিজের বড়ত্ব প্রকাশের জন্য করছি না, বরং কেবল আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে নি'আমতের আলোচনা ও শোকর আদায়ের জন্যে এবং তোমাদেরকে জ্ঞাত করার জন্য করছি। যেন তোমরাও সেই মহান আল্লাহর শোকর আদায় কর। কেননা, এসব নি'আমত তোমাদের জন্য সৌভাগ্য ও কল্যাণের ওসীলা হবে।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)