আল-আদাবুল মুফরাদ- ইমাম বুখারী রহঃ
আল-আদাবুল মুফরাদের পরিচ্ছেদসমূহ
হাদীস নং: ৩২
আল-আদাবুল মুফরাদের পরিচ্ছেদসমূহ
১৭- পিতামাতার দু'আ।
৩২। হযরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ﷺ) ফরমাইয়াছেন ঃ তিনটি দু'আ এমন-যাহা আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া সম্পর্কে কোন সন্দেহ নাই ঃ ১. মযলুম বা অত্যাচারিত ব্যক্তির দু'আ, ২. মুসাফিরের দু'আ, ৩. সন্তানের প্রতি পিতামাতার অভিশাপ। [অনুরূপভাবে সন্তানের পক্ষে পিতামাতার দু'আও সমধিক কার্যকরী হইয়া থাকে বলিয়া অন্য হাদীসে আছে।]
أبواب الأدب المفرد للبخاري
بَابُ دَعْوَةِ الْوَالِدَيْنِ
حَدَّثَنَا مُعَاذُ بْنُ فَضَالَةَ، قَالَ: حَدَّثَنَا هِشَامٌ، عَنْ يَحْيَى هُوَ ابْنُ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ أَبِي جَعْفَرٍ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ يَقُولُ: قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ مُسْتَجَابَاتٌ لَهُنَّ، لاَ شَكَّ فِيهِنَّ: دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ، وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ، وَدَعْوَةُ الْوَالِدِيْنِ عَلَى وَلَدِهِمَا.
হাদীসের ব্যাখ্যা:
হাদীছটিতে তিনটি দুআ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তা অবশ্যই কবুল হয় এবং কবুল হওয়ার মধ্যে কোনও সন্দেহ নেই। তার মধ্যে প্রথম হলো- دَعْوَةُ الْمَظْلُوْمِ (মজলুম ব্যক্তির দুআ)। অর্থাৎ কারও প্রতি যদি কেউ জুলুম করে আর সে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার কাছে জুলুমকারীর বিরুদ্ধে বিচার চায়, তবে আল্লাহ তা'আলা তা অবশ্যই শোনেন। তিনি নগদে হোক বা দেরিতে, তার জুলুমের বিচার অবশ্যই করেন। অপর এক হাদীছে ইরশাদ হয়েছে-
اتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ؛ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ.
'মজলুমের দুআকে (অর্থাৎ বদদুআকে) ভয় করো, কেননা তার ও আল্লাহর মাঝখানে কোনও আড়াল থাকে না। (সহীহ বুখারী: ১৪৯৬; সহীহ মুসলিম: ১৯; জামে তিরমিযী: ২০১৪; সুনানে আবু দাউদ: ১৫৮৪: সুনানে নাসাঈ: ২৫২২; সুনানে ইবন মাজাহ: ১৭৮৩; মুসনাদে আহমাদ: ২০৭১)
উল্লেখ্য, জালিমের বিরুদ্ধে বদদুআ করতে সতর্কতা জরুরি। জুলুম যে বিষয়ে হয় এবং যে পরিমাণে হয়, বদদুআ সেই অনুপাতেই হওয়া উচিত। কেউ যদি কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করে, তবে উত্তম তো হলো ক্ষমা করে দেওয়া। যদি প্রতিশোধ নিতে চায়, তবে সমপরিমাণ আঘাত দ্বারাই প্রতিশোধ নেওয়া যাবে, তার বেশি নয়। আর যদি বদদুআ করে, সে ক্ষেত্রেও ওই পরিমাণেই বদদুআ করা যাবে, যেমন হে আল্লাহ! সে আমাকে যে আঘাত করেছে, আপনি তাকে এর শাস্তি দিন। যদি বলে 'আপনি তাকে ধ্বংস করে দিন', তবে এটা জুলুমের তুলনায় বেশি হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে তার বদদু'আটাই জুলুম হয়ে যাবে। এজন্যই জালিমকে গালমন্দ করার ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কেননা অনেক সময় মজলুমের গালমন্দও জালিমের জুলুমের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে উল্টো মজলুমই জালিম সাব্যস্ত হবে।
একবার উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ.-এর সামনে এক ব্যক্তি হাজ্জাজ ইবন ইউসুফকে গালমন্দ করছিল। উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ. বললেন, থামো। কখনও এমন হয় যে, কারও প্রতি কোনওকিছু দ্বারা জুলুম করা হয়। পরে সে ব্যক্তি জালিমকে গালাগাল করতে থাকে। একপর্যায়ে গালাগাল করার দ্বারা তার হক উসুল হয়ে যায়। তারপর অতিরিক্ত যে গালাগাল করা হয়, তা দ্বারা সে নিজেই জালিম সাব্যস্ত হয়। ফলে তার কাছে প্রথম জুলুমকারী ব্যক্তির পাওনা সাব্যস্ত হয়ে যায়। (আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আয যুহদ ওয়ার রাকাইক: ৬৮১)
দ্বিতীয় হলো- وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ (মুসাফিরের দুআ)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোনও বৈধ উদ্দেশ্যে বা ফযীলতপূর্ণ কাজে সফর করে, সে আল্লাহ তা'আলার কাছে কোনও দুআ করলে তা অবশ্যই কবুল হয়। সে যতক্ষণ না বাড়িতে ফিরে আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার দুআ কবুলের এ সুযোগ থাকে। মুসাফির ব্যক্তির জন্য এ ফযীলত এ কারণে যে, সফর অবস্থায় তাকে অনেক কষ্ট-ক্লেশ সইতে হয়। নানা অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীনও তাকে হতে হয়। এমনিতেও পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজন ছেড়ে বাইরে চলে যাওয়ার কারণে তার মন ভাঙ্গা থাকে। কোনও কোনও বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, যারা ভগ্ন-হৃদয়ের লোক, আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে থাকেন। তাই তাদের দুআ বেশি কবুল হয়।
আর তৃতীয় হলো- وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ (এবং সন্তানের বিপক্ষে পিতার দুআ)। মায়ের বেলায়ও একই কথা। অর্থাৎ পিতা-মাতা যদি ছেলেমেয়ের উপর বদদুআ দেয়, তবে তা অবশ্যই কবুল হয়। তাই ছেলেমেয়ের উচিত সর্বদা পিতামাতাকে সন্তুষ্ট রাখা। কোনওক্রমেই যাতে তারা মনে কষ্ট না পান, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। কারণ একবার বদদুআ লেগে গেলে তা থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এটা পরীক্ষিত। পিতামাতার বদদু'আর কারণে জীবন বরবাদ হয়ে গেছে, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। বরবাদ কেবল দুনিয়ার জীবনই হয় না; আখিরাতের জীবনও ধ্বংস হয়ে যায়। তাই খুব সাবধান!
পিতামাতারও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া উচিত। ছেলেমেয়ে কষ্ট দিলেও যত বেশি সম্ভব ক্ষমা করে দেওয়াই আদর্শ পিতামাতার পরিচায়ক। একবার বদদুআ দেওয়ার দ্বারা সন্তানের এমন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, যার প্রতিকার শতবারের দুআ দ্বারাও সম্ভব না হতে পারে। পরে হয়তো বদদুআ দেওয়ার কারণে জীবনভর অনুশোচনা করতে হবে। তাই ছেলেমেয়ে যতই কষ্ট দিক না কেন, তাদের বদদুআ দিতে নেই। বরং ক্ষমা করা উচিত, ক্ষমা করাতেই কল্যাণ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّ مِنۡ اَزۡوَاجِکُمۡ وَاَوۡلَادِکُمۡ عَدُوًّا لَّکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُمۡ ۚ وَاِنۡ تَعۡفُوۡا وَتَصۡفَحُوۡا وَتَغۡفِرُوۡا فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
'হে মুমিনগণ! তোমাদের স্ত্রী ও তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাদের ব্যাপারে সাবধান থেকো। যদি তোমরা মার্জনা কর ও উপেক্ষা কর এবং ক্ষমা কর, তবে আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। '(সূরা তাগাবুন, আয়াত ১৪)
ছেলেমেয়ে যদি অবাধ্যতা করে, কষ্ট দেয়, আদেশ-উপদেশ না শোনে, তথাপি বদদুআ না করে সংশোধনের চেষ্টাই অব্যাহত রাখতে হবে। চেষ্টার পাশাপাশি দুআ করতে থাকলে আশা করা যায় একসময় তাদের মধ্যে পরিবর্তন আসবে।
কোনও কোনও লোক অতিরিক্ত অস্থির স্বভাবের। কথায় কথায় বদদুআ করা তাদের অভ্যাস। ছেলেমেয়েরাও বাদ যায় না। যে বদদু'আর পেছনে সংগত কোনও কারণ নেই, সেরকম বদদুআ কার্যকর হয় না। তাই এতে ভয়ের কিছু নেই। তথাপি সন্তান হিসেবে পিতামাতার বদদুআ থেকে যত বেশি বাঁচা যায় সে চেষ্টাই করা উচিত।
দুআ কবুলের শর্ত
প্রকাশ থাকে যে, দুআ কবুলের জন্য কিছু শর্ত আছে। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো উপার্জন হালাল হওয়া। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ اللهَ طَيِّبٌ لا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا، وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ ( يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ) المؤمنون: ٥١) وَقَالَ ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ) [البقرة: ١٧٢] ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
'হে লোকসকল! আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র ছাড়া অন্যকিছু কবুল করেন না। আল্লাহ মুমিনদের এমন বিষয়ের আদেশ করেছেন, যার আদেশ করেছেন তিনি তাঁর রাসূলদের। আল্লাহ বলেন- হে রাসূলগণ। তোমরা পবিত্র (হালাল) বস্তু খাও এবং সৎকর্ম করো। তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক জানেন। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, হে মুমিনগণ। আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তার মধ্যে যা পবিত্র তা থেকে খাও। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করে। তার মাথার চুল আলুথালু। শরীর ধুলোমলিন। সে আকাশের দিকে দুই হাত বিস্তার করে বলে, হে আমার রব্ব। হে আমার রব্ব। অথচ তার খাবার হারাম, যা পান করে তা হারাম, তার পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে। এ অবস্থায় কীভাবে তার দুআ কবুল হবে?' (সহীহ মুসলিম: ১০১৫; জামে তিরমিযী: ২৯৮৯; মুসনাদে আহমাদ: ৮৩৩০; মুসনাদে ইসহাক ইবন রাহুয়াহ। ১৯৯: সুনানে দারিমী ২৭৫৯। বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৬৩৯৪; শুআবুল ঈমান: ১১১৮)
বিখ্যাত বুযুর্গ ইয়াহইয়া ইবন মু'আয রাযী রহ. বলেন, ইবাদত-বন্দেগী হলো আল্লাহ তা'আলার খাজানা আর তার চাবি হলো দুআ। হালাল খাবার হলো সেই চাবির দাঁত। অর্থাৎ দাঁতবিহীন চাবি দ্বারা যেমন তালা খুলে না, তেমনি হালাল খাবার ছাড়াও দুআ কবুল হয় না।
দুআ কবুলের জন্য আরেক শর্ত হলো দুআ অব্যাহত রাখা ও হতাশ না হওয়া।
কেউ কেউ আছে, কিছুদিন দুআ করার পর যখন তার প্রার্থিত বিষয় দেখতে না পায়, তখন হতাশ হয়ে পড়ে আর মনে করে তার দুআ কবুল হচ্ছে না এবং কবুল হবেও না। ব্যস এই ভেবে দুআ করা ছেড়ে দেয়। এটা কিছুতেই উচিত নয়। কেননা হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
يُسْتَجَابُ لأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي.
তোমাদের প্রত্যেকের দুআ কবুল করা হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে আর বলে, আমি দুআ করেছি কিন্তু আমার দুআ কবুল করা হয়নি। (সহীহ বুখারী : ৬৩৪০; সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫; সুনানে আবু দাউদ: ১৪৮৩: জামে' তিরমিযী: ৩৩৮৭: সুনানে ইবন মাজাহঃ ৩৮৫৩; সহীহ ইবন হিব্বান: ৯৭৫; জামে মা'মার ইবন রাশিদ: ১৯৬৪৩)
উল্লেখ্য, বান্দা তো দুআ করে তার মর্জিমতো। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কবুল করেন তাঁর ইচ্ছামতো। বান্দার জন্য যা বেশি কল্যাণকর, তিনি তাই করেন। এমনও হতে পারে যে, বান্দা যা কামনা করে, কল্যাণ তার ভেতর নয়; বরং অন্য কিছুতে। তাই আল্লাহ তা'আলা বান্দা যা চায় তা না দিয়ে ওই কল্যাণকর বিষয়টাই দিয়ে থাকেন। এ কারণেই অজ্ঞ ব্যক্তি মনে করে তার দুআ কবুল হয়নি। এরূপ মনে করা কিছুতেই উচিত নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ مُؤْمِنٍ يَنْصُبُ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ يَسْأَلُهُ مَسْأَلَةً ، إِلا أَعْطَاهُ إِيَّاهَا ، إِمَّا عَجَّلَهَا لَهُ فِي الدُّنْيَا ، وَإِمَّا ذَخَرَهَا لَهُ فِي الآخِرَةِ مَا لَمْ يَعْجَلْ ، قَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، وَمَا عَجَلَتُهُ ؟ قَالَ : يَقُولُ : دَعَوْتُ وَدَعَوْتُ ، وَلا أُرَاهُ يُسْتَجَابُ
'যে-কোনও মুমিন আল্লাহর সামনে তার চেহারা তুলে ধরে আর তাঁর কাছে কোনও বিষয় প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দেন। হয়তো দুনিয়ায়ই তা নগদ দিয়ে দেন অথবা আখিরাতে তার জন্য তা জমা করে রাখেন, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে আর বলে, আমি কত দুআ করেছি, কিন্তু তা কবুল হতে দেখছি না।' (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ১০৮৭; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার: ৮৭৯; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ১৪৭)
কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, বান্দার দুআ দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তার প্রার্থিত বিষয়ের পরিবর্তে কোনও অনিষ্ট থেকে তাকে হেফাজত করেন। মোটকথা শর্ত মোতাবেক দুআ করা হলে তা অবশ্যই কবুল হয়, তা যেভাবেই হোক না কেন।
আরও যেসকল ব্যক্তির দুআ কবুল হয়
প্রকাশ থাকে যে, আলোচ্য হাদীছটিতে যে বলা হয়েছে তিন ব্যক্তির দুআ অবশ্যই কবুল হয়, এর দ্বারা বিষয়টাকে ওই তিন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। বিভিন্ন হাদীছে আরও বিভিন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে, তাদের দুআও অবশ্যই কবুল হয়। যেমন এক হাদীছে আছে-
ثَلاَثَةٌ لاَ تُرَدُّ دَعْوَتُهُمُ الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ وَالإِمَامُ الْعَادِلُ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا اللَّهُ فَوْقَ الْغَمَامِ وَيَفْتَحُ لَهَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ وَيَقُولُ الرَّبُّ وَعِزَّتِي لأَنْصُرَنَّكَ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ
তিন ব্যক্তির দুআ প্রত্যাখ্যান করা হয় না। রোযাদারের দুআ, যতক্ষণ না সে ইফতার করে। ন্যায়পরায়ণ শাসকের দুআ। মজলুম ব্যক্তির দুআ। আল্লাহ তা'আলা তার দুআ মেঘের উপর তুলে নেন এবং তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেন আর তিনি বলেন, আমার ক্ষমতার শপথ! আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব, যদিও কিছুক্ষণ পরে হয়। (জামে' তিরমিযী: ৩৫৯৮; সুনানে ইবন মাজাহ: ১৭৫২; সহীহ ইবন খুযায়মা : ১৯০১; সহীহ ইবন হিব্বান: ৩৪২৮; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৬৩৯৩; শু'আবুল ঈমান : ৬৬৯৯)
অপর এক হাদীছে বলা হয়েছে-
خَمْسُ دَعَوَاتٍ يُسْتَجَابُ لَهُنَّ: دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ حَتَّى يَنْتَصِرَ وَدَعْوَةُ الْحَاجِّ حَتَّى يَصْدُرَ وَدَعْوَةُ الْمُجَاهِدِ حَتَّى يَقْعُدَ وَدَعْوَةُ الْمَرِيضِ حَتَّى يَبْرَأَ وَدَعْوَةُ الْأَخِ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ . ثُمَّ قَالَ: «وَأَسْرَعُ هَذِهِ الدَّعْوَات إِجَابَة دَعْوَة الْأَخ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ»
পাঁচটি দুআ প্রত্যাখ্যান করা হয় না। হাজীর দুআ, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। মুজাহিদের দুআ, যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে। মজলুম ব্যক্তির দুআ, যতক্ষণ না সে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। অসুস্থ ব্যক্তির দুআ, যতক্ষণ না সে আরোগ্য লাভ করে। এক ভাইয়ের জন্য তার পেছনে অপর ভাইয়ের দুআ। হযরত ইবন আব্বাস রাযি. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা দ্রুত কবুল হয় এক ভাইয়ের পেছনে অপর ভাইয়ের দুআ। (আল ফাকিহী : ৯০৯; বায়হাকী, শু’আবুল ঈমান : ১০৮৭)
সুতরাং এসব হাদীছে বর্ণিত ব্যক্তিবর্গের আপন আপন অবস্থাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা উচিত এবং সে অবস্থায় যত বেশি সম্ভব দু'আয় রত থাকা উচিত।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. বান্দার দুআ অবশ্যই কবুল হয়, যদি তা কবুলের শর্ত অনুযায়ী হয়।
খ. কারও প্রতি কিছুতেই জুলুম করা উচিত নয়। কেননা মজলুম ব্যক্তির দুআ কবুল হয়ে থাকে।
গ. মুসাফির ব্যক্তির জন্য সফরের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু এ অবস্থায় দুআ কবুল হয়ে থাকে। তার উচিত বেশি বেশি দুআ করা।
ঘ. কোনও সন্তানের এমন কিছু করতে নেই, যা পিতামাতার মনঃকষ্টের কারণ হয়। কেননা তারা বদদুআ করলে তা ব্যর্থ হয় না।
ঙ. সন্তানের প্রতি পিতামাতার বদদুআ যেহেতু ব্যর্থ যায় না, তাই সন্তানের প্রতি বদদুআ করা হতে তাদের বিরত থাকা উচিত।
اتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ؛ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ.
'মজলুমের দুআকে (অর্থাৎ বদদুআকে) ভয় করো, কেননা তার ও আল্লাহর মাঝখানে কোনও আড়াল থাকে না। (সহীহ বুখারী: ১৪৯৬; সহীহ মুসলিম: ১৯; জামে তিরমিযী: ২০১৪; সুনানে আবু দাউদ: ১৫৮৪: সুনানে নাসাঈ: ২৫২২; সুনানে ইবন মাজাহ: ১৭৮৩; মুসনাদে আহমাদ: ২০৭১)
উল্লেখ্য, জালিমের বিরুদ্ধে বদদুআ করতে সতর্কতা জরুরি। জুলুম যে বিষয়ে হয় এবং যে পরিমাণে হয়, বদদুআ সেই অনুপাতেই হওয়া উচিত। কেউ যদি কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করে, তবে উত্তম তো হলো ক্ষমা করে দেওয়া। যদি প্রতিশোধ নিতে চায়, তবে সমপরিমাণ আঘাত দ্বারাই প্রতিশোধ নেওয়া যাবে, তার বেশি নয়। আর যদি বদদুআ করে, সে ক্ষেত্রেও ওই পরিমাণেই বদদুআ করা যাবে, যেমন হে আল্লাহ! সে আমাকে যে আঘাত করেছে, আপনি তাকে এর শাস্তি দিন। যদি বলে 'আপনি তাকে ধ্বংস করে দিন', তবে এটা জুলুমের তুলনায় বেশি হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে তার বদদু'আটাই জুলুম হয়ে যাবে। এজন্যই জালিমকে গালমন্দ করার ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কেননা অনেক সময় মজলুমের গালমন্দও জালিমের জুলুমের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে উল্টো মজলুমই জালিম সাব্যস্ত হবে।
একবার উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ.-এর সামনে এক ব্যক্তি হাজ্জাজ ইবন ইউসুফকে গালমন্দ করছিল। উমর ইবন আব্দুল আযীয রহ. বললেন, থামো। কখনও এমন হয় যে, কারও প্রতি কোনওকিছু দ্বারা জুলুম করা হয়। পরে সে ব্যক্তি জালিমকে গালাগাল করতে থাকে। একপর্যায়ে গালাগাল করার দ্বারা তার হক উসুল হয়ে যায়। তারপর অতিরিক্ত যে গালাগাল করা হয়, তা দ্বারা সে নিজেই জালিম সাব্যস্ত হয়। ফলে তার কাছে প্রথম জুলুমকারী ব্যক্তির পাওনা সাব্যস্ত হয়ে যায়। (আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আয যুহদ ওয়ার রাকাইক: ৬৮১)
দ্বিতীয় হলো- وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ (মুসাফিরের দুআ)। অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোনও বৈধ উদ্দেশ্যে বা ফযীলতপূর্ণ কাজে সফর করে, সে আল্লাহ তা'আলার কাছে কোনও দুআ করলে তা অবশ্যই কবুল হয়। সে যতক্ষণ না বাড়িতে ফিরে আসে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার দুআ কবুলের এ সুযোগ থাকে। মুসাফির ব্যক্তির জন্য এ ফযীলত এ কারণে যে, সফর অবস্থায় তাকে অনেক কষ্ট-ক্লেশ সইতে হয়। নানা অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীনও তাকে হতে হয়। এমনিতেও পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজন ছেড়ে বাইরে চলে যাওয়ার কারণে তার মন ভাঙ্গা থাকে। কোনও কোনও বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, যারা ভগ্ন-হৃদয়ের লোক, আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে থাকেন। তাই তাদের দুআ বেশি কবুল হয়।
আর তৃতীয় হলো- وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ عَلَى وَلَدِهِ (এবং সন্তানের বিপক্ষে পিতার দুআ)। মায়ের বেলায়ও একই কথা। অর্থাৎ পিতা-মাতা যদি ছেলেমেয়ের উপর বদদুআ দেয়, তবে তা অবশ্যই কবুল হয়। তাই ছেলেমেয়ের উচিত সর্বদা পিতামাতাকে সন্তুষ্ট রাখা। কোনওক্রমেই যাতে তারা মনে কষ্ট না পান, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। কারণ একবার বদদুআ লেগে গেলে তা থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এটা পরীক্ষিত। পিতামাতার বদদু'আর কারণে জীবন বরবাদ হয়ে গেছে, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। বরবাদ কেবল দুনিয়ার জীবনই হয় না; আখিরাতের জীবনও ধ্বংস হয়ে যায়। তাই খুব সাবধান!
পিতামাতারও ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া উচিত। ছেলেমেয়ে কষ্ট দিলেও যত বেশি সম্ভব ক্ষমা করে দেওয়াই আদর্শ পিতামাতার পরিচায়ক। একবার বদদুআ দেওয়ার দ্বারা সন্তানের এমন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, যার প্রতিকার শতবারের দুআ দ্বারাও সম্ভব না হতে পারে। পরে হয়তো বদদুআ দেওয়ার কারণে জীবনভর অনুশোচনা করতে হবে। তাই ছেলেমেয়ে যতই কষ্ট দিক না কেন, তাদের বদদুআ দিতে নেই। বরং ক্ষমা করা উচিত, ক্ষমা করাতেই কল্যাণ। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন-
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّ مِنۡ اَزۡوَاجِکُمۡ وَاَوۡلَادِکُمۡ عَدُوًّا لَّکُمۡ فَاحۡذَرُوۡہُمۡ ۚ وَاِنۡ تَعۡفُوۡا وَتَصۡفَحُوۡا وَتَغۡفِرُوۡا فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
'হে মুমিনগণ! তোমাদের স্ত্রী ও তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। সুতরাং তাদের ব্যাপারে সাবধান থেকো। যদি তোমরা মার্জনা কর ও উপেক্ষা কর এবং ক্ষমা কর, তবে আল্লাহ তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। '(সূরা তাগাবুন, আয়াত ১৪)
ছেলেমেয়ে যদি অবাধ্যতা করে, কষ্ট দেয়, আদেশ-উপদেশ না শোনে, তথাপি বদদুআ না করে সংশোধনের চেষ্টাই অব্যাহত রাখতে হবে। চেষ্টার পাশাপাশি দুআ করতে থাকলে আশা করা যায় একসময় তাদের মধ্যে পরিবর্তন আসবে।
কোনও কোনও লোক অতিরিক্ত অস্থির স্বভাবের। কথায় কথায় বদদুআ করা তাদের অভ্যাস। ছেলেমেয়েরাও বাদ যায় না। যে বদদু'আর পেছনে সংগত কোনও কারণ নেই, সেরকম বদদুআ কার্যকর হয় না। তাই এতে ভয়ের কিছু নেই। তথাপি সন্তান হিসেবে পিতামাতার বদদুআ থেকে যত বেশি বাঁচা যায় সে চেষ্টাই করা উচিত।
দুআ কবুলের শর্ত
প্রকাশ থাকে যে, দুআ কবুলের জন্য কিছু শর্ত আছে। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো উপার্জন হালাল হওয়া। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ اللهَ طَيِّبٌ لا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا، وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ فَقَالَ ( يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ) المؤمنون: ٥١) وَقَالَ ( يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ) [البقرة: ١٧٢] ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ
'হে লোকসকল! আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র ছাড়া অন্যকিছু কবুল করেন না। আল্লাহ মুমিনদের এমন বিষয়ের আদেশ করেছেন, যার আদেশ করেছেন তিনি তাঁর রাসূলদের। আল্লাহ বলেন- হে রাসূলগণ। তোমরা পবিত্র (হালাল) বস্তু খাও এবং সৎকর্ম করো। তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক জানেন। আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, হে মুমিনগণ। আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তার মধ্যে যা পবিত্র তা থেকে খাও। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করে। তার মাথার চুল আলুথালু। শরীর ধুলোমলিন। সে আকাশের দিকে দুই হাত বিস্তার করে বলে, হে আমার রব্ব। হে আমার রব্ব। অথচ তার খাবার হারাম, যা পান করে তা হারাম, তার পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট হয়েছে। এ অবস্থায় কীভাবে তার দুআ কবুল হবে?' (সহীহ মুসলিম: ১০১৫; জামে তিরমিযী: ২৯৮৯; মুসনাদে আহমাদ: ৮৩৩০; মুসনাদে ইসহাক ইবন রাহুয়াহ। ১৯৯: সুনানে দারিমী ২৭৫৯। বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৬৩৯৪; শুআবুল ঈমান: ১১১৮)
বিখ্যাত বুযুর্গ ইয়াহইয়া ইবন মু'আয রাযী রহ. বলেন, ইবাদত-বন্দেগী হলো আল্লাহ তা'আলার খাজানা আর তার চাবি হলো দুআ। হালাল খাবার হলো সেই চাবির দাঁত। অর্থাৎ দাঁতবিহীন চাবি দ্বারা যেমন তালা খুলে না, তেমনি হালাল খাবার ছাড়াও দুআ কবুল হয় না।
দুআ কবুলের জন্য আরেক শর্ত হলো দুআ অব্যাহত রাখা ও হতাশ না হওয়া।
কেউ কেউ আছে, কিছুদিন দুআ করার পর যখন তার প্রার্থিত বিষয় দেখতে না পায়, তখন হতাশ হয়ে পড়ে আর মনে করে তার দুআ কবুল হচ্ছে না এবং কবুল হবেও না। ব্যস এই ভেবে দুআ করা ছেড়ে দেয়। এটা কিছুতেই উচিত নয়। কেননা হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
يُسْتَجَابُ لأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي.
তোমাদের প্রত্যেকের দুআ কবুল করা হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে আর বলে, আমি দুআ করেছি কিন্তু আমার দুআ কবুল করা হয়নি। (সহীহ বুখারী : ৬৩৪০; সহীহ মুসলিম: ২৭৩৫; সুনানে আবু দাউদ: ১৪৮৩: জামে' তিরমিযী: ৩৩৮৭: সুনানে ইবন মাজাহঃ ৩৮৫৩; সহীহ ইবন হিব্বান: ৯৭৫; জামে মা'মার ইবন রাশিদ: ১৯৬৪৩)
উল্লেখ্য, বান্দা তো দুআ করে তার মর্জিমতো। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কবুল করেন তাঁর ইচ্ছামতো। বান্দার জন্য যা বেশি কল্যাণকর, তিনি তাই করেন। এমনও হতে পারে যে, বান্দা যা কামনা করে, কল্যাণ তার ভেতর নয়; বরং অন্য কিছুতে। তাই আল্লাহ তা'আলা বান্দা যা চায় তা না দিয়ে ওই কল্যাণকর বিষয়টাই দিয়ে থাকেন। এ কারণেই অজ্ঞ ব্যক্তি মনে করে তার দুআ কবুল হয়নি। এরূপ মনে করা কিছুতেই উচিত নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَا مِنْ مُؤْمِنٍ يَنْصُبُ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ يَسْأَلُهُ مَسْأَلَةً ، إِلا أَعْطَاهُ إِيَّاهَا ، إِمَّا عَجَّلَهَا لَهُ فِي الدُّنْيَا ، وَإِمَّا ذَخَرَهَا لَهُ فِي الآخِرَةِ مَا لَمْ يَعْجَلْ ، قَالَ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، وَمَا عَجَلَتُهُ ؟ قَالَ : يَقُولُ : دَعَوْتُ وَدَعَوْتُ ، وَلا أُرَاهُ يُسْتَجَابُ
'যে-কোনও মুমিন আল্লাহর সামনে তার চেহারা তুলে ধরে আর তাঁর কাছে কোনও বিষয় প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে তা অবশ্যই দেন। হয়তো দুনিয়ায়ই তা নগদ দিয়ে দেন অথবা আখিরাতে তার জন্য তা জমা করে রাখেন, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে আর বলে, আমি কত দুআ করেছি, কিন্তু তা কবুল হতে দেখছি না।' (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ১০৮৭; তহাবী, শারহু মুশকিলিল আছার: ৮৭৯; তাবারানী, আল মু'জামুল আওসাত: ১৪৭)
কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, বান্দার দুআ দ্বারা আল্লাহ তা'আলা তার প্রার্থিত বিষয়ের পরিবর্তে কোনও অনিষ্ট থেকে তাকে হেফাজত করেন। মোটকথা শর্ত মোতাবেক দুআ করা হলে তা অবশ্যই কবুল হয়, তা যেভাবেই হোক না কেন।
আরও যেসকল ব্যক্তির দুআ কবুল হয়
প্রকাশ থাকে যে, আলোচ্য হাদীছটিতে যে বলা হয়েছে তিন ব্যক্তির দুআ অবশ্যই কবুল হয়, এর দ্বারা বিষয়টাকে ওই তিন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উদ্দেশ্য নয়। বিভিন্ন হাদীছে আরও বিভিন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে জানানো হয়েছে যে, তাদের দুআও অবশ্যই কবুল হয়। যেমন এক হাদীছে আছে-
ثَلاَثَةٌ لاَ تُرَدُّ دَعْوَتُهُمُ الصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ وَالإِمَامُ الْعَادِلُ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ يَرْفَعُهَا اللَّهُ فَوْقَ الْغَمَامِ وَيَفْتَحُ لَهَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ وَيَقُولُ الرَّبُّ وَعِزَّتِي لأَنْصُرَنَّكَ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ
তিন ব্যক্তির দুআ প্রত্যাখ্যান করা হয় না। রোযাদারের দুআ, যতক্ষণ না সে ইফতার করে। ন্যায়পরায়ণ শাসকের দুআ। মজলুম ব্যক্তির দুআ। আল্লাহ তা'আলা তার দুআ মেঘের উপর তুলে নেন এবং তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেন আর তিনি বলেন, আমার ক্ষমতার শপথ! আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব, যদিও কিছুক্ষণ পরে হয়। (জামে' তিরমিযী: ৩৫৯৮; সুনানে ইবন মাজাহ: ১৭৫২; সহীহ ইবন খুযায়মা : ১৯০১; সহীহ ইবন হিব্বান: ৩৪২৮; বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা: ৬৩৯৩; শু'আবুল ঈমান : ৬৬৯৯)
অপর এক হাদীছে বলা হয়েছে-
خَمْسُ دَعَوَاتٍ يُسْتَجَابُ لَهُنَّ: دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ حَتَّى يَنْتَصِرَ وَدَعْوَةُ الْحَاجِّ حَتَّى يَصْدُرَ وَدَعْوَةُ الْمُجَاهِدِ حَتَّى يَقْعُدَ وَدَعْوَةُ الْمَرِيضِ حَتَّى يَبْرَأَ وَدَعْوَةُ الْأَخِ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ . ثُمَّ قَالَ: «وَأَسْرَعُ هَذِهِ الدَّعْوَات إِجَابَة دَعْوَة الْأَخ لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ»
পাঁচটি দুআ প্রত্যাখ্যান করা হয় না। হাজীর দুআ, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। মুজাহিদের দুআ, যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে। মজলুম ব্যক্তির দুআ, যতক্ষণ না সে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়। অসুস্থ ব্যক্তির দুআ, যতক্ষণ না সে আরোগ্য লাভ করে। এক ভাইয়ের জন্য তার পেছনে অপর ভাইয়ের দুআ। হযরত ইবন আব্বাস রাযি. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এর মধ্যে সর্বাপেক্ষা দ্রুত কবুল হয় এক ভাইয়ের পেছনে অপর ভাইয়ের দুআ। (আল ফাকিহী : ৯০৯; বায়হাকী, শু’আবুল ঈমান : ১০৮৭)
সুতরাং এসব হাদীছে বর্ণিত ব্যক্তিবর্গের আপন আপন অবস্থাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা উচিত এবং সে অবস্থায় যত বেশি সম্ভব দু'আয় রত থাকা উচিত।
হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ
ক. বান্দার দুআ অবশ্যই কবুল হয়, যদি তা কবুলের শর্ত অনুযায়ী হয়।
খ. কারও প্রতি কিছুতেই জুলুম করা উচিত নয়। কেননা মজলুম ব্যক্তির দুআ কবুল হয়ে থাকে।
গ. মুসাফির ব্যক্তির জন্য সফরের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু এ অবস্থায় দুআ কবুল হয়ে থাকে। তার উচিত বেশি বেশি দুআ করা।
ঘ. কোনও সন্তানের এমন কিছু করতে নেই, যা পিতামাতার মনঃকষ্টের কারণ হয়। কেননা তারা বদদুআ করলে তা ব্যর্থ হয় না।
ঙ. সন্তানের প্রতি পিতামাতার বদদুআ যেহেতু ব্যর্থ যায় না, তাই সন্তানের প্রতি বদদুআ করা হতে তাদের বিরত থাকা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)