আল-আদাবুল মুফরাদ- ইমাম বুখারী রহঃ

আল-আদাবুল মুফরাদের পরিচ্ছেদসমূহ

হাদীস নং: ৬২১
আল-আদাবুল মুফরাদের পরিচ্ছেদসমূহ
২৭৭- সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার গুনাহ মাফের সেরা দু'আ
৬২১. হযরত শাদ্দাদ ইব্‌ন আওস (রাযিঃ) বলেন, নবী করীম (ﷺ) বলিয়াছেনঃ সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার বা গুনাহ্ মাফির শ্রেষ্ঠ দু'আ হইতেছে : اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ. أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ “প্রভু, তুমিই আমার প্রতিপালক! তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নাই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করিয়াছ এবং আমি তোমারই বান্দা—দাসানুদাস। আমি তোমার সাথে কালেমার স্বীকারোক্তির মাধ্যমে কৃত (দাসত্ব ও আনুগত্য করার) অঙ্গীকারের উপর আমার সাধ্যানুসারে অটল আছি। আমাকে প্রদত্ত তোমার নিয়ামতের কথা আমি অকপটে স্বীকার করিতেছি এবং স্বীকৃত পাপের কথাও অকুণ্ঠে স্বীকার করিতেছি। সুতরাং আমাকে মার্জনা কর; কেননা, তুমি ছাড়া যে গুনাহ মার্জনা করার আর কেহ নাই। আমার স্বীকৃত (পাপের) অনিষ্ট হইতে আমি তোমারই দরবারে আশ্রয় চাহিতেছি"। যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এইরূপ বলিবে এবং (ঐ রাত্রে) ইন্তিকাল করিবে সে বেহেশতে প্রবেশ করিবে (অথবা সে বেহেশতীদের অন্তর্ভুক্ত হইবে) এবং যদি সকালে বলে এবং ঐ দিন ইন্তিকাল করে—তবে সেও অনুরূপভাবে বেহেশতে প্রবেশ করিবে বা বেহেশতীদের অন্তর্ভুক্ত হইবে।
أبواب الأدب المفرد للبخاري
بَابُ سَيِّدِ الِاسْتِغْفَارِ
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ ، قَالَ : حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ زُرَيْعٍ ، قَالَ : حَدَّثَنَا حُسَيْنٌ ، قَالَ : حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ بُرَيْدَةَ ، عَنْ بُشَيْرِ بْنِ كَعْبٍ ، عَنْ شَدَّادِ بْنِ أَوْسٍ ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : " سَيِّدُ الاسْتِغْفَارِ : اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لا إِلَهَ إِلا أَنْتَ ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ ، وَأَبُوءُ بِذَنْبِي ، فَاغْفِرْ لِي ، فَإِنَّهُ لا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلا أَنْتَ ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ ، إِذَا قَالَ حِينَ يُمْسِي فَمَاتَ دَخَلَ الْجَنَّةَ ، أَوْ : كَانَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ ، وَإِذَا قَالَ حِينَ يُصْبِحُ فَمَاتَ مِنْ يَوْمِهِ . . . " مِثْلَهُ

হাদীসের ব্যাখ্যা:

এ কালিমাগুলোর প্রতিটি শব্দে শব্দে আবদিয়তের অভিব্যক্তি ঘটেছে বলেই যে এর অনন্য মর্যাদা, তা বলাই বাহুল্য। সর্বপ্রথম আরয করা হয়েছে:
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّيْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِيْ وَأَنَا عَبْدُكَ
“হে আল্লাহ! তুমিই আমার রব বা প্রতিপালক। তুমি ব্যতীত কোন মালিক ও মা'বুদ নেই। তুমিই আমাকে অস্তিত্ব দান করেছো। আর আমি তোমারই বান্দা।"
وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلٰى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ
"আমি ঈমান আনয়ন করে তোমার সাথে আনুগত্যের যে ওয়াদা-অঙ্গীকার করেছি, আমার সাধ্য অনুসারে আমি তার উপর কায়েম থাকার চেষ্টা করবো।" এটা বান্দার পক্ষ থেকে তার দীনতা-হীনতা-দুর্বলতার স্বীকারোক্তি। সাথে সাথে ঈমানী ওয়াদা-অঙ্গীকারের নবায়নও বটে। তারপর আরয করা হয়েছে:
أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ
"আমার দ্বারা যে খাতা-কসুর, ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে এবং আগামীতে হবে, সেগুলোর অনিষ্ট থেকে হে আমার মালিক ও মওলা, তোমারই আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" এতে নিজ ত্রুটি-বিচ্যুতির স্বীকারোক্তির সাথে সাথে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনাও রয়েছে। তারপর বলা হয়েছে:
أَبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوْءُ بِذَنْبِيْ
"আমি আমার প্রতি তোমার যে এনাম-এহসান, উপকার ও দয়া, সেগুলোর কথা সাথে সাথে আমার নিজের অপরাধী হওয়ার কথা অকুণ্ঠচিত্তে অকপটে স্বীকার করছি।"
সর্বশেষে দরখাস্তঃ
فَاغْفِرْ لِيْ فَإِنَّهٗ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ
“হে আমার মালিক ও মওলা! তুমি তোমার রহম ও করমে আমার গুনাহগুলো মার্জনা করে দাও! কেননা, আমার গুনাহসমূহ মাফ করবে, তুমি ছাড়া এমন যে আর কেউই নেই। কেবল তুমিই আমাকে মার্জনা করতে পার।"

সত্য কথা হলো, যে ঈমানদার বান্দার এতটুকু মা'রিফত ও প্রজ্ঞা থাকবে যে, তার আলোকে সে তার নিজের ও নিজ আমলের হাকীকত উপলব্ধি করতে পারে, সাথে সাথে আল্লাহ তা'আলার আযমত ও জালালত তথা মাহাত্ম্য এবং তাঁর হকসমূহও সে জানে, সে ব্যক্তি কেবল নিজেকে অপরাধী ও গুনাহগারই মনে করবে এবং পুণ্যের সঞ্চয় যে তার একান্তই কম, এ ব্যাপারে সে রিক্তহস্ত, এ চেতনাটুকুও তার থাকবে। তারপর তার দেলের আওয়ায এবং আল্লাহ তা'আলার হুযুরে তার আকৃতি তাই হবে, যার অভিব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা দেওয়া এ ইস্তিগফারের দু'আয় ঘটেছে। এ বৈশিষ্ট্যের জন্যেই একে 'সাইয়েদুল ইস্তিগফার' বা ক্ষমা প্রার্থনার সেরা দু'আ বলে অভিহিত করা হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ হাদীসটি পৌঁছে যাওয়ার পর তাঁর প্রতি ঈমান পোষণকারী প্রতিটি উম্মতির উচিত হলো এর জন্যে যত্নবান হওয়া এবং কমপক্ষে প্রতিদিনে ও রাতে একবার সাচ্চা দেলে আল্লাহ তা'আলার দরবারে এ ইস্তিগফার করা। আল্লাহ তা'আলার রহমত হোক আমাদের উস্তাদ হযরত মওলানা সিরাজ আহমদ সাহেব রশীদপুরী (র)-এর প্রতি, আজ থেকে ৪৫ বছর পূর্বে১ দারুল উলুম দেওবন্দে মিশকাত শরীফের দরস দানকালে যখন ক্লাসে এ হাদীসটি পড়ান, তখন তিনি ক্লাসের সকল ছাত্রকে এটি মুখস্থ করার তাগিদ দেন এবং পরদিন সকলের মুখে মুখস্থ তা শুনবেন বলেও বলে দেন। সত্যি সত্যি পরের দিন প্রায় সকল ছাত্রের মুখ থেকেই তিনি তা শুনেও ছিলেন। তিনি তখন প্রতি দিনে ও প্রতি রাতে অন্তত একবার করে তা অবশ্যই পাঠ করার জন্যে ওসিয়ত করেছিলেন।

টিকা ১. এ বক্তব্যটি ১৯৬৯ সালে লিখিত, মানে আজ ১৯৯৬ সাল থেকে প্রায় ৭০ বৎসর পূর্বেকার কথা। অনুবাদক।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ মা'আরিফুল হাদীস (মাওলানা মনযূর নোমানী রহ.)
tahqiqতাহকীক:বিশুদ্ধ (পারিভাষিক সহীহ)
আল-আদাবুল মুফরাদ - হাদীস নং ৬২১ | মুসলিম বাংলা