আল-আদাবুল মুফরাদ- ইমাম বুখারী রহঃ

আল-আদাবুল মুফরাদের পরিচ্ছেদসমূহ

হাদীস নং: ৮১১
আল-আদাবুল মুফরাদের পরিচ্ছেদসমূহ
৩৫০- “আপনার জন্য আমার পিতামাতা কুরবান” বলা
৮১১. হযরত বুরায়দা (রাযিঃ) বলেন, নবী করীম (ﷺ) একদা মসজিদে গেলেন তখন আবু মুসা (রাযিঃ) কুরআন তিলাওয়াত করিতেছিলেন। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, ইনি কে? আমি বলিলাম, আমি বুরায়দা (ইয়া রাসূলাল্লাহ্!) আপনার জন্য জান কবুল। তিনি বলিলেনঃ ইহাকে দাউদ-বংশের সুর-মাধুর্যের কিছুটা প্রদান করা হইয়াছে।
أبواب الأدب المفرد للبخاري
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ الْحَسَنِ، قَالَ‏:‏ أَخْبَرَنَا الْحُسَيْنُ، قَالَ‏:‏ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ بُرَيْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ‏:‏ خَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِلَى الْمَسْجِدِ وَأَبُو مُوسَى يَقْرَأُ، فَقَالَ‏:‏ مَنْ هَذَا‏؟‏ فَقُلْتُ‏:‏ أَنَا بُرَيْدَةُ جُعِلْتُ فِدَاكَ، قَالَ‏:‏ قَدْ أُعْطِيَ هَذَا مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ‏.‏

হাদীসের ব্যাখ্যা:

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. ছিলেন বহুবিধ গুণের অধিকারী এক মহান ব্যক্তিত্ব। তাঁর একটা বিশেষ গুণ ছিল সুমধুর কণ্ঠস্বরও। তাঁর কুরআন তিলাওয়াত ছিল বড়ই সুন্দর। কোনও এক রাতে তিনি কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করছিলেন। এ সময় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাঁর তিলাওয়াত শুনলেন। তাঁর তিলাওয়াতের মাধুর্যে তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। পরের দিন ভোরবেলা হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি. তাঁর সাহচর্যে আসলে তিনি তাঁকে বললেন-

হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের অলৌকিক সুর
لَقَدْ أَوْتَنْتَ مِزْمَارًا مِنْ مَزامير آل داود (আল্লাহ তোমাকে দাউদের সুরসমূহের একটি সুর দিয়েছেন)। হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের সুর ছিল অসাধারণ সুন্দর। বলা হয় তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুরের অধিকারী ছিলেন। তাঁর সুর ছিল অলৌকিক। একেক নবীর যেমন তাঁর নবুওয়াতের স্বপক্ষে একেক মু'জিযা বা অলৌকিক বিষয় থাকে, তেমনি হযরত দাউদ আলাইহিস সালামেরও অলৌকিক বিষয় ছিল। আর তা ছিল তাঁর সুমধুর সুর। বর্ণিত আছে, তিনি যখন তাঁর অসাধারণ সুর দিয়ে যাবুর গ্রন্থ পাঠ করতেন, তখন জীবজন্তুরাও তন্ময় হয়ে তা শুনত। তারা ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ত। উড়ন্ত পাখিরা যখন তাঁর তিলাওয়াত শুনত, তখন তাদের পক্ষে সামনে চলা সম্ভব হতো না। সেখানেই থেমে যেত আর তাঁর সুরে সুর মেলাত। তিনি যখন পাহাড়ের পাদদেশে তিলাওয়াত করতেন, তখন পাহাড়ও তাঁর সঙ্গে সুর মেলাত এবং তাঁর অনুসরণে তাসবীহ গেয়ে উঠত। এটা অসম্ভব কিছু নয়। তাদেরও নিজস্ব ভাষা আছে। আল্লাহপ্রদত্ত সেই ভাষায় তারা তাসবীহ পাঠে রত হতো। কুরআন মাজীদে ইরশাদ-

إِنَّا سَخَّرْنَا الْجِبَالَ مَعَهُ يُسَبِّحْنَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِشْرَاقِ وَالطَّيْرَ مَحْشُورَةً كُلٌّ لَهُ أَوَّابٌ

'আমি পর্বতমালাকে নিয়োজিত করেছিলাম, যাতে তারা তার সঙ্গে সন্ধ্যাবেলা ও সূর্যোদয়কালে তাসবীহ পাঠ করে। এবং পাখিদেরকেও, যাদেরকে একত্র করে নেওয়া হতো। তারা তার সঙ্গে মিলে আল্লাহর যিকিরে লিপ্ত থাকত।' (সূরা সোয়াদ, আয়াত ১৮, ১৯)

আরও ইরশাদ-

وَلَقَدْ آتَيْنَا دَاوُودَ مِنَّا فَضْلًا ۖ يَا جِبَالُ أَوِّبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ ۖ

নিশ্চয়ই আমি দাউদকে বিশেষভাবে আমার নিকট থেকে অনুগ্রহ দান করেছিলাম। হে পাহাড়-পর্বত! তোমরাও দাউদের সঙ্গে আমার তাসবীহ পড়ো এবং হে পাখিরা! তোমরাও। (সূরা সাবা, আয়াত ১০)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু মুসা আশ'আরী রাযি.-এর সুরকে হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের সুরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হাদীছের শব্দ হলো آلِ دَاوُد। এর আক্ষরিক অর্থ 'দাউদের খানদান ও বংশধর'। কিন্তু এখানে বোঝানো উদ্দেশ্য স্বয়ং দাউদ আলাইহিস সালাম। আরবীতে آلِ শব্দটি লেখায় বা বলায় ব্যবহার হলেও কোনও কোনও জায়গায় তার অর্থ উদ্দেশ্য থাকে না। এখানেও সেরকমই হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোঝাতে চাচ্ছেন যে, হে আবু মুসা! যাবুর পাঠে দাউদের যেমন চমৎকার সুর ছিল, আল্লাহ তা'আলা কুরআন পাঠে তোমাকেও তেমনি সুন্দর সুর দিয়েছেন। এই বলে তিনি তাঁর কেবল প্রশংসাই করেননি: বরং সুন্দর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করার প্রতি তাঁর উৎসাহ বর্ধনও করেছেন। হাদীছে আছে, তিনি বলেছিলেন-

لَوْ رَأَيْتَنِي وَأَنَا أَسْتَمِعُ لِقرَاءَتِكَ الْبَارِحَةَ (তুমি যদি আমাকে দেখতে গত রাতে তোমার কুরআনপাঠ কী মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম)। অর্থাৎ তুমি তা দেখতে পেলে অনেক খুশি হতে। কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, তুমি যখন কুরআন পাঠ করছিলেন, তখন আমি ও আয়েশা তোমার কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তোমার তিলাওয়াত শুনতে পেয়ে আমরা কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম এবং তোমার তিলাওয়াত শুনলাম। হযরত আবূ মূসা রাযি. তাঁর এ কথায় খুবই অনুপ্রাণিত হন। কোনও কোনও বর্ণনায় আছে, তিনি বলে ওঠেন-

لَوْ عَلِمْتُ، لَحَبَّرْتُه لَكَ تَحْبِيرًا.

আমি যদি জানতাম (আপনি আমার তিলাওয়াত শুনছেন), তবে আমি আপনার জন্য আরও অনেক সুন্দর করে পড়তাম। (বায়হাকী, আস সুনানুল কুবরা ৪৭০৮; শু'আবুল ঈমান: ২৩৬৬; মুসনাদে আবু ইয়া'লা; ৭২৭৯; আবু দাউদ তয়ালিসী: ৭৭৪; মুসনাদে ইবনুল জা'দ: ২০৭৭; মুসান্নাফে ইবন আবী শায়বা: ৮৭৩৭: সুনানে দারিমী: ৩৫৪৩; আবু নু'আয়ম, হিলয়াতুল আওলিয়া, ৮ খণ্ড, ৩০২ পৃষ্ঠা)

আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিকে শোনানোর জন্য সুন্দর সুরে তিলাওয়াত করা
বোঝা গেল, কোনও আল্লাহওয়ালা বা দীনদার ব্যক্তিকে খুশি করার জন্য যদি কেউ তার কুরআন তিলাওয়াতকে অধিকতর সুন্দর করার চেষ্টা করে, তাতে কোনও দোষ নেই। এমনকি কুরআন তিলাওয়াতকালে যদি কোনও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে যায় আর তখন নিজ তিলাওয়াতকে অধিকতর সুন্দর করার চেষ্টা করে, তাতেও অসুবিধা নেই। বরং আল্লাহ তা'আলার কালামের তিলাওয়াত দ্বারা আল্লাহর বান্দাকে খুশি করার চেষ্টা দ্বারা সে বাড়তি ছাওয়াবের অধিকারী হবে।

হযরত আবু মুসা আশ'আরী রাযি.-এর আমল দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়। তিনি কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেলায়ই নয়; উম্মাহাতুল মুমিনীনের ক্ষেত্রেও এরকম করেছেন। কোনও এক রাতে তিনি নামাযে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত করছিলেন। তা শুনতে পেয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ খানিকটা এগিয়ে আসেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর তিলাওয়াত শুনতে থাকেন। ভোরবেলা হযরত আবু মুসা আশ'আরী রাযি.-কে এ কথা জানানো হলে তিনি বলে ওঠেন, আমি জানতে পারলে তাঁদের উদ্দেশ্যে আরও সুন্দর করে তিলাওয়াত করতাম। (ফাতহুল বারী, ৯ খন্ড, ১১৬ পৃষ্ঠা; ইবন সা'দ, আত তাবাকাতুল কুবরা, ২ খণ্ড, ৩৪৪ পৃষ্ঠা)

এ হাদীছে দেখা যাচ্ছে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব আগ্রহের সঙ্গে হযরত আবু মুসা আশ'আরী রাযি.-এর কুরআন তিলাওয়াত শুনছিলেন। উম্মাহাতুল মুমিনীনও গভীর আগ্রহে তাঁর তিলাওয়াত শুনতেন। বস্তুত কুরআন মাজীদ নিজে পাঠ করা যেমন অত্যন্ত ফযীলতের কাজ, তেমনি অন্যের তিলাওয়াত শোনার দ্বারাও বিপুল ছাওয়াব অর্জন করা যায়। অন্যের তিলাওয়াত শ্রবণ করা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত। এটা কুরআন মাজীদের প্রতি মুহাব্বত সৃষ্টি ও কুরআন মাজীদের বক্তব্যে ধ্যান-ফিকির করার পক্ষেও সহায়ক। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে এ আমলের ব্যাপক চর্চা ছিল। পরবর্তীকালের উলামায়ে কেরাম ও বুযুর্গানে দীনও কুরআন শ্রবণের এ আমল অব্যাহত রেখেছেন। আমাদেরও এ বিষয়ে আগ্রহ পোষণ করা দরকার।

অন্যের ভালো গুণের প্রশংসা করা
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রাযি.-এর সুমধুর সুরে কুরআন তিলাওয়াত করার প্রশংসা করেছেন। এর দ্বারা বোঝা যায় অন্যের কোনও ভালো গুণ নজরে আসলে তার প্রশংসা করার অবকাশ আছে। কোনও কোনও হাদীছে এর নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু তা সেই ক্ষেত্রে, যখন মুখের উপর প্রশংসা করলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। অর্থাৎ সেই ব্যক্তির আত্মতুষ্টিতে লিপ্ত হওয়া বা অহংকারের শিকার হওয়ার ভয় থাকে। পক্ষান্তরে প্রশংসা করার দ্বারা যদি সে ব্যক্তি তার সেই গুণের সদ্ব্যবহারে অনুপ্রাণিত হয়, তবে প্রশংসা করাই ভালো। এমন অনেক দেখা গেছে, ভালো গুণের প্রশংসা করার দ্বারা সে ব্যক্তি অধিকতর উদ্যমী হয়ে উঠেছে, তার এগিয়ে চলাটা আরও বেশি গতিশীল হয়েছে।

বস্তুত অন্যকে অনুপ্রাণিত করার পক্ষে প্রশংসাবাক্য একটি উৎকৃষ্ট উপায়। কিন্তু অনেকেই এ বিষয়ে সচেতন নয়। অন্যের প্রশংসা করতে কেমন যেন কৃপণতার পরিচয় দেয়। ফলে তাদের অনেক দায়িত্বশীল প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনতে পারে না।

বহু শিক্ষক তার প্রচেষ্টায় কেবল এ কারণেই ব্যর্থ হয় যে, তারা তাদের শিক্ষার্থীদের কেবল শাসন করেই অভ্যস্ত; শিক্ষার্থীর কোনও কৃতিত্বে বাহবা দেওয়া বা প্রশংসা করার অভ্যাস তাদের নেই। এ সমস্যা কোনও কোনও পিতামাতার চরিত্রেও রয়েছে। তাই তারা তাদের সন্তানদের তালীম-তারবিয়াতে কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে ব্যর্থ হয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত থেকে এ শিক্ষাও রপ্ত করার প্রয়োজন আমাদের রয়েছে।

হাদীস থেকে শিক্ষণীয়ঃ

ক. কুরআন মাজীদ যথাসম্ভব উত্তম সুরে পড়া বাঞ্ছনীয়।

খ. অন্যের কুরআন তিলাওয়াত শোনার দ্বারাও বিপুল ছাওয়াব অর্জন করা যায়।

গ. অন্যের মধ্যে কোনও ভালো গুণ দেখতে পেলে বা কারও কোনও কৃতিত্বের পরিচয় পেলে সে বিষয়ে তার প্রশংসা করা কাম্য।

ঘ. অন্যের প্রশংসায় অহংকার ও আত্মমুগ্ধতার শিকার না হয়ে বরং তা দ্বারা অনুপ্রেরণা লাভ করা উচিত।
ব্যাখ্যা সূত্রঃ_ রিয়াযুস সালিহীন (অনুবাদ- মাওলানা আবুল বাশার মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম হাফি.)
tahqiqতাহকীক:তাহকীক চলমান